বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শাহবাগ থেকে মিরপুরের বাসে উঠলাম। ফার্মগেট যাবো। ফাঁকা দেখে একদম পেছনের সিটে গিয়ে পা মেলে দিয়ে বসলাম। সিগ্ন্যাল ছেড়ে দেয়ার আগেই বাস ভরে গেলো।
.
বিশ বাইশ বছরের একটা ছেলে ভাড়া তুলছে। আমার কাছে চাইতেই ফার্মগেটের ভাড়া দিয়ে দিলাম। আমার পাশের জন এক শো টাকার নোট দিলো। কন্ডাক্টর ছেলেটা ষাট টাকা ফেরত দিলো। পাশের জন চিৎকার করে উঠলো- শাহবাগ থেকে মিরপুর বিশ টাকা! ওই ব্যাটা স্টুডেন্ট ভাড়া রাখ।
.
-আজকে শুক্রবার। আজকের দিনে স্টুডেন্ট কাটা হইবো না।
.
-তাইলে লোকাল ভাড়া রাখ। দাঁড়ায় দাঁড়ায় লোক তুলছস না? ত্রিশ টাকা রাখবি দুই জনের।
.
-হইবো না।
.
রেগে গিয়ে পাশের জন কন্ডাক্টরের হাতে ধরা সব টাকা কেড়ে নিলো। তারপর ওখান থেকে বেছে বেছে নিজের এক শো টাকার নোট আলাদা করলো। মুখে চলছে অশ্রাব্য গালিগালাজ আর চিৎকার- টাকা পাইয়াই ইচ্ছেমত নিয়া নিছস না? এইবার দেখি ক্যামনে টাকা নিস!
.
হাত থেকে টাকা কেড়ে নেয়ার ঘটনায় কন্ডাক্টর ছেলেটা হতভম্ব হয়েছিলো। এখন আবার জ্ঞান ফিরেছে! সেও মুখের উপর মুখ তুলে কথা বলা শুরু করলো- মগের মুল্লুক পাইছেন? টাকা টান দিয়া নেন।
পাশের ছেলেটা ততক্ষণে কন্ডাক্টরের গায়ে হাত তুলেছে। মাথায় দুই চারটা চাটি মারলো।
.
এই প্রথম পাশের ছেলেটার দিকে তাকালাম। মুখে স্টাইলিশ দাঁড়ি। কোলে ব্যাগ। চোখে চশমা। ছাত্র হয়তো। আশেপাশের সব যাত্রীই কন্ডাক্টরকে শান্ত হতে বলছে। মাইর খেয়ে তার কথার গতি আরো বেড়েছে। যে টাকা টান দিয়েছিল সে আবার টাকা ফেরত দিলে কন্ডাক্টর টাকা না নিয়ে বলল- এইখানে একটা পাঁচ শো টাকার নোট ছিল। সেইটা নাই ক্যান! আমি টাকা নিমু না।
.
আর যায় কোথায়! দ্বিতীয় দফায় সে মাইর খেলো। গালে, মাথায়..
.
চশমাওয়ালা হাত চালাচ্ছে আর মুখে চলছে- আমরা মিরপুরের লোকাল পোলা। তোরে আজকে লাশ বানাইয়া ছাড়মু। বেশি তেড়িবেড়ি করস..
.
বাংলা মটর। আশেপাশের সব গাড়ি চলছে। আমাদের বাসটা থেমে আছে। ড্রাইভার নিজেই উঠে এসেছেন। সে কন্ডাক্টরের পক্ষ নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ চিৎকার চেঁচামেচি করলো। ভাড়া যে বিশ টাকা করে এটা বলল। সেও হালে পানি পেলো না। উল্টো গাড়ি চালানো বাদ দিয়ে ঝগড়ার মাঝখানে আসায় সব যাত্রী মিলে তার পিছে লাগলো। ড্রাইভার বেচারা ফিরে যেতে বাধ্য হলো।
.
কন্ডাক্টর টাকা ফেরত নিয়েছে। ঝগড়া প্রায় থেমেই গিয়েছিল। মাঝ খান থেকে আরেক ছাত্র এসে তার টাকা দাবী করলো। সেও বেশি ভাড়া(মূলত অরিজিনাল ভাড়া) রাখার কারণে কন্ডাক্টরের সাথে কথা কাটাকাটি শুরু করলো। কন্ডাক্টর ছেলেটা মাইর খেয়েও দমে যায় নি। মুখে তর্ক ঠিকই চালাচ্ছে। আমার পাশের জন(মিরপুরের লোকাল পোলা) রাগ দমাতে না পেরে সেও নতুন ক্যাচালে যোগ দিলো। দুইজন মিলে কন্ডাক্টরকে আরো দুই চারটা চড় থাপ্পর লাগালো।
.
কারওয়ানবাজার পার হতেই দুই পক্ষ মোটামুটি শান্ত। কন্ডাক্টর আবার ভাড়া তোলা শুরু করেছে। তার চোখ মুখ, চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। চেহারায় কাঠিন্য চলে এসেছে। আমার পাশের জন এবার ভাড়া দিলো। ত্রিশ টাকা। কন্ডাক্টর ভাড়া নিলো, কিছু বললো না।
.
আমি ঝামেলা ছাড়া থাকতে পছন্দ করি। অন্যের ব্যাপারে নাক গলাই না। কি মনে করে জানি না, ইয়ার ফোনটা খুললাম। কন্ডাক্টর ছেলেটাকে ডাক দিলাম। দাঁড়িয়ে ওর মাথায় হাত রেখে বললাম- 'তুমি কন্ডাক্টর মানুষ। তোমার এত রাগ দেখালে চলবে? যাত্রী যদি না ওঠে কার কাছ থেকে ভাড়া নিবা? সেই যাত্রীর সাথে মারামারি করা তো কোন কাজের কথা না। দুই একজন দশ টাকা কম দেবে, এটুকু তো মানতেই হবে। তাছাড়া তোমার তো লস নাই। অনেক লোক দাঁড় করিয়ে তুলছ। ওদের ভাড়াটা তো এক্সট্রা পাচ্ছই।' কথা বলতে বলতে মাথা থেকে হাতটা সরিয়ে তার ঘাড়ে রাখলাম।
.
কাঠিন্য মাখা চেহারাটা একবারে ভেঙ্গে পড়লো। আমার হাতে মাথা ঠেকিয়ে শব্দ করে কাঁদতে শুরু করলো। কাঁদতে কাঁদতেই কথা বলতে লাগলো। যেন আমি অভিভাবক। সে নালিশ জানাচ্ছে।
.
-ওই লোক আমার কাছে টাকা চাইলেই তো আমি দিতাম। উনি কাইড়া নিলো ক্যা?
.
-আরে ব্যাটা। বাদ দে। দেখস না স্টুডেন্ট? মেজাজ ঠিক ছিল না এজন্যই ওমন করছে। ওনার এটা করা ঠিক হয় নাই। তোরও তো ঠিক হয় নাই, গায়ে পড়ে ঝগড়া লাগানোর।
.
-কালকে রাইত থাইকা বাসে আছি। এক ফোঁটা ঘুমাই নাই। কন্ডাক্টরি করতাছি। আমাগো রাগ হয় না? আমারে মারবো? মাইরা কি করবো? কন?
.
আমি কোন উত্তর দিলাম না। রাগ তো সবারই হয়। সবাই সেটা দেখায়ও। অথচ রাগের বদলে একটা হাসি দিলে কতো কি মিটে যায়! কাঁধে হাত রেখে মিষ্টি করে দুটো কথা বলার কাছে দশ বিশ টাকা যে কতটা মূল্যহীন, সেটা কেউ জানতেও চায় না।
.
আমরা দিন দিন হাসতে ভুলে যাচ্ছি। মিষ্টি করে দুটো কথা বলতে ভুলে যাচ্ছি। রাগ দেখানো আর ক্ষমতার কথা বলাতেই আমাদের যত বাহাদুরি।
.
ফার্মগেট এসে গেছে। আমি নেমে পড়লাম...
.
লেখাঃ মিকসেতু মিঠু
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now