বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
দাউদকান্দি থেকে ঢাকায় আসতে কোন অবস্থাতেই দু;আড়াই ঘন্টার বেশি সময় লাগার কথা না । সেখানে বয়স্ক মানুষের মতো পথে ধুকে ধুকে বাসটা যখন ঢাকায় এসে পৌছল ঘড়িতে তখন কাঁটায় কাঁটায় রাত আড়াইটা বাজে।
জগলুরা কয়েকজন বন্ধু মিলে গিয়েছিল দাউদকান্দি । ওর এক বন্ধুর বোনের বিয়েতে । যাবে না , যাবে না করেও সবার চাপা চাপিতে শেষ পর্যন্ত আর না গিয়ে পারেনি জগলু । বাংলায় একটা প্রবাদ আছে অনুরোধে ঢেকি গেলা, কিন্তু জগলুর কাছে এখন মনে হচ্ছে, সে অনুরোধে ঢেকি নয়, কামান গিলেছে । আর তা হজম না হয়ে হয়েছে বদহজম হয়েছে । বন্ধুরা সবাই বিয়ে বাড়ীতে রয়ে গেলেও । জগলু তারাহুরো করে চলে এসেছে কারন আগামিকাল ওর অফিস আছে । জগলু একটা তৈল কম্পানীতে মোটা বেতনে চাকরি করে । সেখানে শুক্রবার ছাড়া অন্য কোন দিন কোন রকমের ছুটি নেই । বছর শেষে আছে টানা ত্রিশ দিনের লম্বা ছুটি । শাশান্তি পরিবহনের বাসটা যাত্রাবাড়িতে আসতেই বেশির ভাগ যাত্রী নেমে গেল । সায়দাবাদেও নামলো আরো কয়েক’জন । জগলু নামলো টিকাটুলিতে । ওর বাসা নারিন্দার মুনির হোসেন লেনে ।
বাস’টা ওকে রাজধানী সুপার মার্কেটের সামনে পুলিশ বক্সের কাছে নামিয়ে দিয়ে একটানে চলে গেল গুলিস্তানের দিকে । বাসে তখনও কিছু যাত্রি বসেছিল । জগলু বিরক্তি নিয়ে ছুটে যাওয়া বাসটার দিকে কিছুক্ষন চেয়ে থাকলো । তারপর মনে মনে বললো- হারামজাদা ।
ইদানিং ও’র এই একটা বদ অভ্যাসটা হয়েছে । যখন তখন মনে মনে ও যাকে তাকে গালি গালাজ করে । অনেক সময় নিজের দেয়া গালিতে নিজেই চমকে উঠে জগলু । তবে এ’তে একধরনের তৃপ্তি বা আরাম পাওয়া যায় । ব্যথার উপড় আলতো করে হাত বুলালে যে ধরনের আরাম পাওয়া যায় । অনেকটা সে ধরনের আরাম । জগলু এর নাম দিয়েছে "পরিবেশ বান্ধব তৃপ্তি " ।
পথে বারবার বাসটা খারাপ হওয়াতে এমনিতে জগলুর মেজাজটা তেতে আছে , তার উপর এখন পথ ঘাট এ রকম শূণ্য দেখে, ওর মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেল । মনে মনে ও গজগজ করতে লাগলো, এর কোন মানে হয় ? এভাবে বিয়ে খেতে যাওয়ার কি দরকার ছিল ? বন্ধুদের উদ্দেশ্য করে জগলু মনে মনে ‘তিন অক্ষরের’ একটা গালি দিল । তবে আরাম পালো কিনা বোঝা গেল না । ব্যাগ দু’টো পায়ের দু’পাশে রেখে পকেট থেকে রুমাল বেড় করে ও মুখ মুছলো ।
জগলুর সঙ্গে দু’টো ব্যাগ । একটা লেদারের জার্র্নি ব্যাগ তাতে ওর কাপড় চোপোর । অন্যটা সিমেন্টের ব্যাগ দিয়ে বানানো বাজারের ব্যাগ । জগলু দাউদকান্দি বাজার থেকে বাসার জন্য কিছু মাছ কিনেছে । যদিও মাছওয়ালা পলিথিনের ব্যাগে বরফ দিয়ে মাছ গুলো বেঁধে দিয়েছিল তবুও জগলুর ধারনা মাছ গুলো এখন নষ্ট হচ্ছে । বরফ গলে ব্যাগটা থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঠান্ডা পানি পরছে । সেই সঙ্গে একটু একটু মাছের গন্ধও মনে হয় পাওয়া যাচ্ছে বলে ওর মনে হচ্ছে ।
দুই
টিকাটুলি থেকে হেঁটেই বাসায় যেতে হবে । এতো রাতে রিকসা পাবার কোন প্রশ্নই উঠে না । পথ ঘাট একেবারে শুনশান । কোথাও কোন লোকজন বা জনমানব নেই । আকাশে বিশাল একটা চাঁদ মেঘের সঙ্গে লুকুচুড়ি খেলছে । জগলু হেঁটে পুলিশ বক্সে থেকে খ্রিষ্টান কবরস্তানের রোডটায় এসে দাঁড়ায় । ওর হাতের বাম পাশে খ্রিরিষ্টান কবরস্তান, ডানপাশে বলধা গার্ডেন ।
খ্রিষ্টান কবরস্তান আর বলধা গার্ডেন দু’টোই উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা । রাতের অন্ধকারে বলদা গার্ডেন থেকে বড় বড়
ইউকিলিয়াস গাছগুলো অজগর সাপের মতো মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে । হঠাৎ দেখলে কেমন যানি গা ছমছম করে উঠে । জগলু একবার সেদিকে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল ।
তারপর খ্রিরিষ্টান কবরস্তানটার দিকে চাইতে ওর মনে হলো ভেতরের গাছপালা গুলো একটা আরেকটার উপর ঝুকে রাস্তার দিকে উকি দিয়ে আছে । জগলু হঠাৎ অনুভব কললো ওর গা কেমন ভয় ভয় লাগছে। মাথার চুলগুলো মনে হলো, একটা একটা করে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে । কিন্তু ওর বাস্তববাদী মন ভয় পাওয়ার কোন কারণ খুঁজে না পেলও নানান আজে বাজে চিন্তা মনের ভেতর উঠে আসছে । চারিদিকে কবরের শুনশান নিরবতা । জগলু ঘড়ি দেখলো , রাত পৌনে তিনটা বাজে ।
জগলু এদিক সেদিক তাকিয়ে লোকজন বা রিকসা খুঁজছে । একা হেঁটে যেতে ওর ক্যামন জানি মন সায় দিচ্ছে না । অজানা একটা ভয় একটু একটু করে ওর অজান্তেই এগিয়ে আসছে । জগলু মাছের ব্যাগটা পায়ের কাছে রেখে, পকেট
থেকে মোবাইল বেড় করলো । সুইচে টিপ দিয়ে অন করতেই -দু বার পিপ পিপ শব্দ করে মোবাইলটা বন্ধ হয়ে গেল । বাসে বসেই ও দেখেছিল মোবাইলের চার্জ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে । তাই এখন মোবাইলটা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ও খব একটা অবাক হলো না । শুধু মুখে “চুক” করে শব্দ করে মোবাইলটা আবার পকেটে রেখে দিয়ে বললো- না , হেঁটেই যেতে হবে । কবরস্হান তো কি হয়েছে । আল্লাহ ভরসা । জগলু যেই হাঁটার জন্য পায়ের কাছে রাখা ব্যাগ দুটো তুলে নিয়েছে, ঠিক সেই সময় ও খেলাল করলো রাস্তার ওপর পাশ থেকে কেউ একজন হেঁটে এগিকটায়ই আসছে । মনে মনে ও সাহস পেল । যাক, বাঁচা গেল । সঙ্গে কেউ একজন থাকলে হাঁটা কোন ব্যাপার না ।
খাঁটো মতো , কালো কোট পড়া লোকটা জগলুর সামনে এসে দাঁড়াল । একবার ওর দিকে, তারপর ওর পাশে রাখা ব্যাগ দু’টোর দিকে তাকিয়ে বললো, জনাব কোন সমস্যা ?
জগলু মাথা নেড়ে না করলো , তারপর বললো - না কোন সমস্যা না । ভাল করে লোকটার দিকে তাকাতেই ও দেখলো , লোকটার পরনে কোট প্যান্ট থাকলেও পা দুটো খালি । ও মনে মনে ভাবলো পাগল টাগল নাকি । লোকটার
মুখের আকৃতিটাও কেমন যেন একটু চ্যাপটা আর লম্বাটে । গলাটা মনে হচ্ছে শরীর থেকে বেড় হয়ে যেতে চাচ্ছে । কোটের কলারের উপড় দিয়ে লম্বা গলাটা বিশ্রীভাবে বেড় হয়ে আছে । জগলুর কাউকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার স্বভাব না । কিন্তু তবুও কেন যেন হঠাৎ উদয় হওয়া এ লোকটার সব কিছুর দিকে জগলুর চোখ অতি সহজেই ছুটে যাচ্ছে ।
এবং বেঁছে বেঁছে লোকটার শারীরিক খুঁতগুলো ওর চোখে পরছে । ও আরো খেয়াল করলো যে, লোকটার উপস্হিতি ওর মধ্যে একধরনের ভীতির সৃষ্টি করছে । লোকটা ঠিক যেন স্বাভাবিক না । কোথায় যেন একটা সমস্যা রয়েছে । ও অসস্থি বোধ করতে লাগলো । জগলুকে চুপ থাকতে দেখে লোকটা আবারও প্রশ্ন করলো - জনাব কোন সমস্যা ? আমি কি কোন কাজে আসতে পারি ?
-না সমস্যা না । তবে কোন রিকসা পাচ্ছি না । এটা অবশ্য একটা সমস্যা ।
-কোথায় যাবেন ?
-এইতো সামনেই । জগলু হাত দিয়ে সামনের টিপুসুলতান রোডটা দিকটা দেখালো । ও নারিন্দা ! আমিও ওদিকটায় যাবো , চলুন তবে হাঁটি । লোকটা ওর মাছের ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে সামান্য হাসতে হাসতে বললো । জগলু ইতস্তর্থ করতে লাগলো, মনে মনে সিদ্বান্ত নিতে পারছেনা লোকটার সঙ্গে যাওয়া ঠিক হবে কি না ।
লোকটা এবার ও’র মুখের কাছে এসে ফিসফিস করে বললো
- ভয় পাচ্ছেন ? তবে থাক । আমি একলা একলাই যাই । লোকটার মুখ থেক বিশ্রী একটা গন্ধ এসে ওর নাকে লাগলো । জগলুর মনে হলো ওর ভেতটা গুলিয়ে উঠলো । পেটটা ক্যামন মোচর দিয়ে উঠলো । জগলু কোন মতে বললো - না , আপনাকে আবার ভয় কিসের । তারপর “থু’ করে রাস্তার একপাশে একদলা থুতু ফেললো ।
লোকটা খেক খেক করে হেসে বললো - জি,ঠিক বলেছেন, আমাকে আবার ভয় কিসের ? জগলু ব্যাগ দু’টো নিয়ে হাঁটতে শুরু করতেই লোকটাও হাঁটতে ওর পাশে পাশে হাঁটতে লাগলো ।
ব্যাগে ভেতর মনে হয় মাছ আছে, না জনাব ? জগলু অনেকটা চমকে উঠে লোকটার দিকে তাকালো । অন্য কেউ হলো অবাক বিস্ময়ে পাল্টা প্রশ্ন করতো - আপনি কিভাবে জানলেন ? কিন্তু জগলু পাল্টা কোন প্রশ্ন না করে শুধু ছোট্র শব্দ করলো হু । এবং মনে মনে ভাবলো ব্যাগের ভেতর যে মাছ আছে সেটা বুঝতে আইনএস্টেন হতে হয় না । একটু জ্ঞান থাকলেই বোঝা যায় । ব্যাগ থেকে যে চুইয়ে চুইয়ে পানি পরছে সেটা দেখলেও বোঝা যায় যে ব্যাগের ভেতর পাছ আছে । আর ঘ্রাণ শক্তি যদি একটু প্রখর হয় তবে কোন কথাই নাই । গন্ধ শুকেই বলে দেওয়া যায় যে, ব্যাগের ভেতর কি আছে । কেননা জগলুর ইতি মধ্যে মনে হয়েছে ব্যাগের ভেতর থাকা মাছগুলো গন্ধ ছড়াচ্ছে ।
সুতারাং লোকটার ঘ্রাণ শক্তি প্রখর ।
- বাঘা পাপদা আর টেংরা মাছ তাই না জনাব ? লোকটা একবার ব্যাগের দিকে তাকিয়ে তারপর সামনের দিকে তাকায় । মুখে বিশ্রী রকমের একটা হাসি । এবার কিন্তু জগলু চমকে উঠে । বুকের ভেতটা কেমন যেন ধক করে উঠলো । শুধু জগলু কেন ? যে কোন মানুষেরই কথাটা শুনার পর চমকে উঠার কথা ।
কেননা, দাউদকান্দি বাজারে বড় বড় পাপদা মাছগুলো দেখে জগলু বেশ বেশ অবাক হয়েছিল । মাছওয়ালা বলেছিল , স্যার নিয়া যান, এগুলি বাঘা পাপদা । সবসময় পাওয়া যায় না । একবার খাইলে সারা জীবন মুখে সোয়াদ লেগে থাকবো । জগলু নিজে পাপদা মাছ খায় না । পাবদা কেন, এক ইলিশ ছাড়া কোন মাছই ও খায়না । তবুও মাছগুলো কিনেছে ওর বাবা জন্য । ওর বাবা বরিশালের মানুষ । কথায় কথায় মাছের গল্প শুনায় । তার গল্পের মধ্যে এ বাঘা পাবদা মাছের গল্প ও আছে । তাই বাঘা পাবদা নাম শুনেই জগলু বাবার জন্য মাছগুলো কিনে ফেলেছে । আর মায়ের জন্য কিনেছে তার প্রিয় ছোটছোট টেংরা মাছ ।
তিন
জগলুর বাবা বেশ কিছু দিন যাবত অসুস্থ । ডাক্তার রোগ ধরতে পারছেন না । আগামী মাসে তার জগলুর বড় বোন টুম্বার কাছে আমেরিকায় যাবার কথা আছে । ভিসাও হয়ে গেছে । সেখানে চিকিৎসা হবে ।
জগলু লোকটার প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে হাঁটতে থাকে । মুখে কথা না বললেও ওর মধ্যে একধরনের ভয় কাজ করছে । ও আসলে ভয়টাকে পোশ্রয় দিতে চাচ্ছে না । ভয় হলো চুইংগামের মতো । টানলে বড় হতেই থাকে, বড় হতেই থাকে । তা কত দিয়ে কিনলেন জনাব ? লোকটা জগলুর প্রায় কানের কাছে মুখটা এনে ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে । আবারও পঁচা গন্ধে জগলুর পেট গুলিয়ে উঠে । জগলু চট করে সড়ে যায় । তারপর মনে মনে বলে, সেটাও আপনি জানেন নিশ্চই ।
একটু রাগত ভাবে কথা বলতে ইচ্ছে হলেও জগলু নিজেকে সামলে নিয়ে লোকটার দিকে ঠান্ডা চোখে তাকায়, তারপর বলে - আপনি আসলে কে ? কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে জগলু টের পায় ওর মাথাটা আবারও ঝিমঝমি করছে । ঘা’ড়ের লোমগুলো একটা একটা করে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে । এর মানে হচ্ছে ও এখন ভয় পাচ্ছে ।
আমি কে ? জগলুর প্রশ্নটা রিপিট করে লোকটা খেক খেক করে হেসে উঠে । শেয়ালের মতো সে হাসির শব্দ । ঠিক সে সময় হঠাৎ রাস্তার দু’পাশের সোডিয়াম বাতিগুলো নিবে যায় । জগলু দাঁড়িয়ে পরে । একবার ঝেরে দৌড় মারতে ইচ্ছে করে ওর । কিন্তু চিন্তাটা দ্রুত মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে জোড়ে জোড়ে হাঁটতে থাকে । মনে মনে ভাবে এভাবে মাছ আনাটা ঠিক হয়নি । নিশ্চিত খারাপ কোন জিনিষের পাল্লায় পরেছে ও । এ ধরনের জিনিষের কথা বাবার কাছে ও অনেক শুনেছে । যদি জিনিষটা একবার বুঝতে পারে যে, ও ভয় পেয়েছে, তা হলে আজ খবর আছে । জগলুর ডান পাশ দিয়ে কোন শব্দ না করেই লোকটা হাঁটছে ।
পাঁচশো বিশ টাকা তাই না ? উত্তরটা দিয়ে লোকটা আবারও হেঁসে উঠে । জগলু এবার দাঁড়িয়ে পরে সোজা লোকটার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে - আপনি কে ? কি চান ? কেন আমাকে ভয় দেখাতে চাচ্ছেন ? জগলুর চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেছে । মনে মনে ও আল্লাহকে ডাকছে । আর বলছে আমি ভয় পাবো না । আমি কিছুতেই ভয় পাবোনা । হাঁটতে থাকো, থেমো না । আমার পরিচয় আসলেই জানতে চাও ?
লোকটা চটকরে আপনে থেকে তুমিতে নেমে আসে । জি, আপনি কে ? কি চান ? তোমার সঙ্গ চাই । আবারও সেই খেক খেক করে হেসি । আমি ইসলিস । লোকটা হাসতে হাসতেই বলে । হাসি যেন আর থামেই না । চেনো আমাকে ? আমাকে চেনা যায় ? নাম শুনেছো নিশ্চয় ।
জগলুর হঠাৎ মনে হয় এটা কি কোন মাস্তান টাস্তানের নাম ? কিন্তু পরক্ষনেই ওর চট করে মনে পরে যায় ইবলিস শয়তান না তো ? জগলু কোন রকম তোতলাতে তোতলাতে বলে - দেখুন মজা করবেন না ? এখন মজা করার সময় না । ইবলিস তো মজা করে না । যা করে বুঝে শুনেই করে । মজা করে মানুষ জাতি । আশরাফুল মাখলুকাত । সৃষ্টির সেরা জীব । কথাটা বলে, লোকটা দু’টো ঠোট দিয়ে ফু ফু ফু ফু ফু শব্দ করে। তারপর হাসতে থাকে । জগলু কি করব বুঝতে পারে না । ফেল ফেল করে লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকে । এই মুহুর্তে ওর মাথা কোন কাজ করছে না । যেন হঠাৎ করেই চিন্তা শক্তি লোপ পেয়েছে । জগলু মনে মনে দোয়া দুরুত পড়তে চেষ্টা করে । কিন্তু কোন কিছু মনে আসে না । অথচ ও কোরআন শরীফ বেশ শুদ্ধভাবে পড়তে পারে ।
পারবা না । কোন দোয়া বা আয়াতই এখন তোমার মনে করে পড়তে পারবানা । তোমার সব আমি ভুলিয়ে দিয়েছি ।
তোমার সব আমি ভুলিয়ে দিয়েছি । আমার অনেক ক্ষমতা । আমার ইচ্ছেই এখন তোমার কর্ম । হাঁটতে থাকো । হাঁটতে থাকে । একদম থামবা না ।
জগলুর হঠাৎ মনে হয়, লোকটা ওর সঙ্গে রসিকতা করছে না তো ? কঠিন রকমের কোন রসিকতা । পরে বন্ধু বান্ধবের কাছে এ ঘটনা বর্ননা করে মজা করবে । হঠাৎ জগলু ঘুরে বলে আপনি, যেই হন, এখান থেকে চলে যান । just leave ।
লোকটা কুতকুতে চোখে কিছুক্ষন জগলুর দিকে তাকিয়ে থাকে , তারপর ফোস করে নিশ্বাস ছেড় বলে , তোমার বিশ্বাষ হচ্ছে না যে আমি ইবলিশ । তাই না ? লোকটার চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে উঠেছে । আবচ্ছা আলোতেও জগলু তা বেশ দেখতে পায় ।
আপনি যে ই হোন না কেন ? আমার তাতে কিচ্ছু যায় আসে না । এখান থেকে চলে যান । আমাকে বিরক্ত করবেন না । আমি কিন্তু চিৎকার করবো ।
করো,যতো খুশি চিৎকার করো, দেখো গলা দিয়ে কোন শব্দ বেড় হয় কিনা ?
জগলু সত্যি সত্যি চিৎকার করতে চেষ্টা করে টের পায় গলা দিয়ে কোন শব্দ বেড় হচ্ছে না । লোকটা আবার ও খেক খেক করে বিশ্রী ভাবে হেসে উঠে । জগন্য হাসির শব্দ রাতের আকাশ বাতাস কেঁপে কেঁপে উঠে । জগলু কোন মতে বলে- তোর বিশ্রী হাসি নিয়ে দূর হ শয়তান ।
- তাহলে সুন্দর করে মেয়েদের কন্ঠে হাসি ? যা শুনেই তোমার ভেতর প্রেম জেগে উঠে । হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিতে ইচ্ছে করে । শরীরে শরীরে ঢলাঢলি খেলতে ইচ্ছে করে । বলেই লোকটা মেয়ে কন্ঠে হেঁসে উঠে । জগলু নিজের চোখ, কানকে বিশ্বাস করতে পারে না । মনে হলো ও মাথা ঘুরে পরে যাবে । ও’র চোখ বন্ধ করে ফেলে । তারপর মনে মনে বলে, ‘আমি যা দেখছি তা সব ভুল । আমার অবচেতন মনের কল্পর্ণা । ভুত প্রেত বলে কিছু নেই । কিচ্ছু নেই’ ।
শুন জগলু মিয়া, ভুত-প্রেত বলে কিছু নাই সত্যি । কিন্তু ইবলিস আছে । আমি ইবলিস । চোখ খোল । আমাকে দেখ । আমার সঙ্গে প্রেম প্রেম খেল । আবারও নারী কন্ঠে হাসি । এবার জগলু আরো চমকে উঠে । কেননা হাসির শব্দটা তিথির । জগলুর খালাত বোন। গতমাসে যার বিয়ে হয়েছে ।
চোখ খুল জগলু । এখন তোমার ইচ্ছে বলে কিছু নাই । আমার ইচ্ছাই তোমার ইচ্ছা ।
জগলুর মনে হলো ওর চোখ আপনা আপনি খুলে গেল । বিস্ময়ে ও আরো হতবাক হয়ে যায় । সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে আর কেউ না । তিথি ।
কি, আমার সঙ্গে প্রেম প্রেম খেলতে ইচ্ছে হয় ? তিথি ভ্র নাচিয়ে প্রশ্ন করে । বিয়ে হয়েছে তো কি হয়েছে ? আসো প্রেম প্রেম খেলি । ছাদের সিড়ির কথা মনে নেই । চলো ঐভাবে আবারও ঘষাঘষি খেলি । তিথি হাসতে থাকে । তারপর হাসি থামিয়ে বলে - কামরানের কথা ভেবো না । ওটারে ধাক্কা দিয়ে ট্রেনের নীচে ফেলে দেবো । তারপর তুমি আর আমি পিটিস পিটিস । কুত্তাটা ইমপরটেট । আর তুমি বেশ মোটাতাজা । অনেক মজা হবে । আসে আমাকে জড়িয়ে ধরো জগলু । আমার দেবদাস । আর লুকিয়ে লুকিয়ে পানি খেতে হবে না । জগ থেকে এবার ঢকঢক করে শরবত খাও । তিথি হা হা হা হাসতে থাকে ।
জগলুর মনে হলোও মরে যাবে । তিথিকে সিঁড়িতে চুমু খাবার কথা পৃথিবীর কেউ জানে না । সত্যিকারের তিথি কোন অবস্থাতেই ওর সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারে না । কোন অবস্থাতেই না ।
যে করেই হোক এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হবে । নিশ্চই আমার কঠিন রকমের হেলুসিনেসন হচ্ছে । যা দেখছি সব ভুল । ভ্রম। জগলু মাথা ঝাকাতে চেষ্টা করে । যেন মাথা ঝাকালে আবার সব ঠিক হয়ে যাবে ।
কোন কিছুই ভুল না জগলু । যা দেখছো সব সত্যি । তুমি শুধু তিথির উপরটা দেখেছ । ভেতরটা দেখনি । দেখা সম্ভবও না । মানুষ হয়ে অন্য মানুষের মনের খোঁজ পাওয়া সম্ভব না । মনের খোঁজ জানে শুধু আল্লাহ আর ইবলিস । আমি সেই ইবলিস । আবার ও হাসির শব্দ । তবে এবার আর তিথি না । সেই পুরানো শেয়ালের মতো হাসি । তিথি থেকে লোকটা আস্তে আস্তে আগের রুপে ফিরে আসে । জগলুর কাছে মনে হয় ওর পা গুলো মাটিতে গেঁথে যাচ্ছে । কে যেন মাটির নীচ থেকে পাগুলো নিজের দিকে টানছে । শত চেস্টা করেও জগলু পা গুলো নাড়াতে পারে না । তারপরও মনের সব শক্তি এক করে নিজেকে বোঝাতে চেস্টা করে । ভয় পেলে চলবে না । ভয়ে পেলে চলবে । আল্লাহ আছেন । আল্লাহ আছেন । আল্লাহ বাঁচাও । জগলু হঠাৎ আল্লাহু বলে চিৎকার করে উঠে ।
ঠিক সে সময় উল্টো দিক থেকে । তীব্র আলো এসে পরে জগলুর শরীরে । জগলু মাথা ঘুরে ড্রেনের উপর পরে যায় । কয়েটা পা ওর আশে পাশে ছোটাছুটি করে । ওকে ড্রেন থেকে টেনে তুলে । জগলু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে - মাছের ব্যাগটা ছিড়ে বড় বড় পাপদা মাছ গুলো লাফিয়ে লাফিয়ে ড্রেনে নেমে যায় ।
পরিশেষ : রাতে টহলে বেড় হয়ে নারিন্দা পুলিশ ফারির সেকেন্ড অফিসার তমাল কান্তি সাহা জগলুকে খ্রীষ্টান কবরস্থানের কাছের ড্রেন থেকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেলে । ভর্তি করে । ঠিক সেদিন ভোরেই জগলুর খালাতো বোন তিথির স্বামী ইন্জেনিয়ার কামরান অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে ট্রেনের নীচে কাটা পরে মারা যায় । কামরান বিয়ের সপ্তাখানেক পরেই একটা সন্মেলনে অংশগ্রহন করার কথা বলে সেখানে গেলেও আসলে সে সেখানে গিয়েছিল চিক্যিসার জন্য
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now