বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

কোজাগর

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "কোজাগর" শ্যামল দত্ত চৌধুরী ------------------ দু’বার বাস বদল। তারপর রিকশাভ্যান। যে স্কুলে মা পড়ান, সেখানে পৌছতে লাগে আড়াইঘণ্টা। বাবা মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভ। তাই আলোদিদিই আমার সবসময়ের সঙ্গী। শুনেছি গ্রাম থেকে আমার দিদাই পঠিয়েছিল আলোদিদিকে মায়ের কাছে। আলোদিদির কেউ নেই। কোথাও কখনও যায় না, কেউ ওর খবর নিতে আসে না। সাদা শাড়ি পরে থাকে, মাছ-মাংস খায় না। বাবাকে দেখলে মাথা কাপড় দিয়ে ঢাকে। আমার স্কুল হাঁটাপথে মিনিটকুড়ির রাস্তা। স্কুলে পৌছে দেয়। আবার ছুটির পরে আমাকে নিতে আসে আলোদিদি। সন্ধেবেলা আমার কাছে লেভাপড়া শেখে। আমি যা পড়ি, তার সবটা শিখিয়ে দিই। আলোদিদি গল্পের বই পড়তে খুব ভালবাসে। মা লাইব্রেরি থেকে ওকে অনেক গল্পের বই এনে দেন। স্কুলে দীপক ভীষণ বিরক্ত করে আমাকে। পরীক্ষার সময় আমার খাতা টেনে নেয়। আমার টিফিন খেয়ে ফেলে। একবার আমার সোয়েটার খুলে গাছের উঁচু ডালে ছুড়ে দিয়েছিল। আলোদিদি আমাকে নিতে এসে সব শুনে রেগে আগুন। স্কুলবাসের লাইনে দাঁড়িয়েছিল দীপক। আলোদিদি ওকে হিড়হিড় করে টেনে এনে গাছে উঠিয়ে আমার সোয়েটার উদ্ধার করে দিয়েছিল। এমন বকুনি দিয়েছিল দীপককে যে, ও আর কখনও আমাকে ঘাঁটায় না। দিদা থাকেন গ্রামের বাড়িতে। দাদা অনেক বুড়ো হয়েছেন। কিন্তু এখনও নিজের হাতে জমিতে চাষ করেন মুনিষদের সঙ্গে। দুই মামার ব্যবসা আছে। সোনামামা চাষের বীজের এজেন্ট। চাষ করার সরঞ্জাম, পাম্প, জেনারেটর বিক্রির দোকান খোকামামার। কখনও-কখনও ব্যবসার কাজে কিংবা জমির মামলার তদারকিতে আসে। আমাদের শীলপাড়ার বাসায় দেখা করে যায়। আলোদিদির ব্ৰতকথায় খুব টান। ব্ৰতপার্বণ লেগেই আছে সারা বছর। মন দিয়ে লক্ষ্মীপুজো করে। আমাকে অনেক গল্প বলে। আমাদের বাড়ির লাগোয়া একফালি জমিতে আলোদিদি তুলসী গাছ পুঁতেছে। আবোল তাবোলের করিতা যেমন মুখস্থ, তেমনি তুলসীদেবীর প্রার্থনাও। আলোদিদি বলে, রোজ তুলসীর পুজো করলে মরণকালে শ্ৰীকৃষ্ণপদ লাভ করা যায়। লাভ হয় না লোকসান, সে তো জানার উপায় নেই। কিন্তু আলোদিদি স্নান করে তুলসী গাছে জল ঢালতে-ঢালতে যখন বলে “তুলসী-তুলসী নারায়ণ / তুমি তুলসী বৃন্দাবন৷/ তোমার মাথায় জল ঢালি/ অন্তিমে দিও চরণস্থল।” তখন আমি দাঁড়িয়ে-দাঁড়িয়ে শুনি। সন্ধেবেলা মাটির প্রদীপ জ্বালিয়ে আলোদিদি বিড়বিড় করে বলে, “তুলসীতলায় দিলাম বাতি/ সাক্ষী থেকে তুমি সতী / তেত্ৰিশ কোটি দেবগণ / আর লক্ষ্মী নারায়ণ।” শুনতে-শুনতে আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছে। বন্ধুদের বললে ওরা অবাক হয়ে তাকায়। হাসিঠাট্টা করে আমাকে নিয়ে। কিন্তু গর্ব হয় আমার। মনে হয়, আমি এমন সব ব্যাপার জানি যা ওরা জানে না। সেবার বাবা ঠিক করেছেন দুর্গাপুজোর পরে আমরা বেড়াতে যাব দিঘায়। দিদা হঠাৎ বলে পাঠিয়েছেন, পুরো এক বছর বাপুন আসেনি। এবার আসতেই হবে। কোনও ওজার-আপত্তি চলবে না। আমার নাম বাপুন। সোনামামা আসবে আমাকে নিতে। বাবা বললেন, “তা কী করে হবে? আমাদের যাওয়ার কথা দিঘা। ফিরব লক্ষ্মীপুজোর আগের দিন।” মা তাকালেন আমার দিকে। আমার যাওয়ার ইচ্ছে দুটো জায়গাতেই। গ্রামের বাড়ি, দাদু, দিদা, মামা-মামিমারা, ভাইবোনেরা সকলে আমাকে টানে, সকলে আমাকে ভালবাসে। ওখানে যেতে আমারও খুব ভাল লাগে। খোলা মাঠ, খেত, আম-কাঁঠালের বাগান, পুকুরঘাট, মাছধরা। স্বাধীনভাবে ভাইবোনেদের সঙ্গে সারাদিন চরে বেড়াও, কেউ বকুনি দেবে না। এখানে তো কেবল বাধানিষেধ। ‘একলা রাস্তায় যাবে না। অচেনা লোকের সঙ্গে কথা বলবে না। সে কিছু দিলে খাবে না। অমুক ছেলের সঙ্গে মিশবে না। বেড়াতে গেলেও কেবল পড়তে বোস আর পড়তে বোস।’ এবার গ্রামে গেলে মা-বাবা সঙ্গে থাকবেন না। আরও স্বাধীন। তাই আমি বললাম মাকে, “তোমরা যাও বেড়াতে। আমি যাব দিদার কাছে।” সোনামামা যেদিন এসে আমাকে নিয়ে গেল। তার পরদিন মা-বাবা আর আলোদিদির দিঘায় রওনা হওয়ার কথা। আলোদিদির ইচ্ছে ছিল আমার সঙ্গে গ্রামে যায়, কিন্তু বাবার ভয়ে চুপ করে রইল। গ্রামে কয়েকটা দিন কীভাবে যে কেটে গেল তা আমার আলাদা করে মনে নেই। মামাতো ভাইবোন মিলিয়ে আমরা ছ'জন। তার উপর ময়নামাসি এসেছিল মেয়েকে নিয়ে। হইহুল্লোড়ের মধ্যে আমার স্বৰ্গবাস একদিন শেষ হয়ে এল। সোনামামা আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে ক’টা দিন থাকতে যাবে শ্বশুরবাড়িতে। তাই মামিমা, ঝুমুর আর রাতুলের সঙ্গে আমিও উঠে পড়লাম ট্রেনে। আজ লক্ষ্মীপুজো। গতকাল রাতে মা-বাবাদের ফেরার কথা দিঘা থেকে। জানলার গ্রিল ধরে আলোদিদি দাঁড়িয়েছিল। আমি কোথাও গেলে ঠিক এইভাবে অপেক্ষা করে আলোদিদি। একগাল হেসে দরজা খুলে দিল। আমাকে জড়িয়ে ধরে চুল ঘেঁটে আদর করে দিল। আমি বললাম, “দিঘায় কেমন কাটল আলোদিদি?” “ভাল। তুই গেলে আরও মজা হত। তোর মুখ দেখে মনে হচ্ছে ফিরে আসার মন ছিল না, না রে?” এই ক’দিনের সমস্ত গল্প বললাম আলোদিদিকে। জিজ্ঞেস করে-করে আরও অনেক খুঁটিনাটি জেনে নিল। তারপর বলল, “বাকি গল্প পরে হবে। এবার খেয়ে নিবি চল।” “তুমিও বোসো আলোদিদি, একসঙ্গে খাব।” “পাগল! আমার না আজ উপোস? পুজোর পরে প্রসাদ খাব’খন।” “ইস, লক্ষ্মীপুজো আমার এত ভাল লাগে! কদমা, নারকেল নাডু, মুড়কির মোয়া! আহ দারুণ। আর কী প্ৰসাদ আছে আলোদিদি? লুচি-বেগুনভাজা করবে না? পায়েস...” “ছিঃ বাপুন, ওসবে আগে থেকে লোভ করতে নেই। প্ৰসাদ হোক, তবে তো? ঠাকুরকে পুজো করে আগে ‘ভোগ” নিবেদন করতে হয়। ঠাকুর গ্রহণ করলে তবেই তা প্ৰসাদ হয়ে যায়। ঠিক সময়েই প্ৰসাদ পাবি রে। এবেলা ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে নে৷” কোজাগরী পূর্ণিমা লেগে গেলে তারপর পুজো। ততক্ষণে আমি পুজোয় আয়োজন এগিয়ে রাখিগে...” ঘুম ভেঙে খেয়াল হল, মা-বাবাকে দেখছি না যে? আলোদিদির সঙ্গে এসে থেকে এত গল্প করেছি যে, ভুলেই গিয়েছি ওঁদের কথা জিজ্ঞেস করতে। সন্ধে হয়ে এসেছে। ঘরে-ঘরে ঝাপসা অন্ধকার। আলোদিদি আলো জ্বালায়নি কেন? আলোদিদিকে ভাবতে-ভাবতে আমি লাইটের সুইচ টিপলাম। পাশেরটা বসার ঘর, আবার ডাইনিং টেবিল আছে। আলোদিদি নেই। তার পাশে মা-বাবার ঘর। ওই ঘরে আলোদিদি ঢোকে না। তা হলে গেল কোথায়? রান্নাঘর অন্ধকার। তরে কি বাজারে গিয়েছে? হয়তো পুজোর জন্য কিছু কিনতে দশকর্ম ভান্ডারে গিয়েছে। হঠাৎ পিছন থেকে আলোদিদি বলল, “কীগো বাপুন, ডাকাডাকি করছ, কেন?” “তুমি কোথায় গিয়েছিলে?” “ঠাকুরঘরে। আল্পনা দিলাম। একা হাতে সব করতে হচ্ছে না? মা লক্ষ্মীর পটে শ্বেতচন্দনের টিপ দিচ্ছিলাম।” রান্নাঘরের লাগোয়া ছোট্ট একটা ঘর। লেপ-তোশকের তোরঙ্গ আছে। এককোণে মায়ের ঠাকুরের আসনও আছে। ওই ঘরটায় অবশ্য আলোদিদিই বেশী সময় কাটায়। ঘরটা অন্ধকার, দরজা ভেজানো। কখন বেরল আলোদিদি টের পাইনি। অন্ধকারে ফোঁটা পরাচ্ছিল নাকি? বললাম, ‘মা-বাবাকে দেখছি না, ওঁরা কোথায়?” আলোদিদি তাকাল আমার দিকে। চোখের দৃষ্টি স্থির। কেমন যেন বুক কেঁপে উঠল আমার। বলল, “মা-বাবাকে ছেড়ে থাকতে পারিস না বুঝি কেমন বড় হয়েছিস তুই?” ‘ওরা কোথায় আলোদিদি?” “আমাকে ছেড়ে তুই থাকতে পারবি? যদি আমি দূরে কোথাও চলে যাই।” আমি হেসে বললাম, ‘কী যে বলো, কোথায় যাবে তুমি? আগে বলো মা কোথায়?’ “তোকে ছেড়ে দিদির খুব মন কেমন করছিল। তাই জামাইবাবুকে নিয়ে তোর মামাবাড়িতে গিয়েছে। এবার পুজোর সময় হয়েছে। আজ আশ্বিনের কোজাগরী পূর্ণিমা, আমার সঙ্গে রাত জাগবি না বাপুন? তারপর তোকে নিয়ে যাব দিদিজামাইবাবুর কাছে।” এমন সময় দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। সঙ্গে ঘন-ঘন ডোরবেল। কে যেন খুব ব্যস্ত মানুষ এসেছে। দরজা খুলতেই খোকামামা হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল। আমাকে দুহাতে জাপটে ধরে বলল, “ভাল আছিস তো রে বাপুন? শিগগির চল, আমি তোকে নিয়ে যেতে এসেছি। তোর দাদু-দিদা ভীষণ চিন্তা করছে তোর জন্য। চল-চল।’ আমি অবাক হয়ে বললাম, “কেন খোকামামা? আজ সকালেই তো এলাম। আমার সঙ্গে আলোদিদিকেও নিয়ে যাবে তো?’ কোনও উত্তর দিল না খোকামামা। গাড়ি ভাড়া করে এসেছিল। ঘরের দরজা টেনে বন্ধ করে, আমাকে প্রায় টানতে-টানতে গাড়িতে তুলে সোজা ফিরে যাওয়ার রাস্তা ধরল। ঘরের আলো নেভানোর সময়ও আমাকে দিল না। আমাদের সঙ্গে আলোদিদি যাবেই বা কী করে? পরে শুনেছিলাম, দিঘা থেকে ফেরার পথে ওদের বাস একটা গাছে ধাক্কা মেরে নয়ানজুলিতে কচ্ছপের মতো উলটে পড়েছিল। আটজন যাত্রীর মৃত্যু হয়েছিল। তাদের মধ্যে মা-বাবা আর আলোদিদিও ছিল। পরদিন গ্রামের লোকাল থানা থেকে বেলার দিকে খবর গিয়েছিল দাদুর কাছে। সে অনেক-অনেক বছর আগেকার কথা। আজও কোজাগরী পূর্ণিমার রাতে ঘুমের মধ্যে শুনতে পাই আমার আলোদিদি মা লক্ষ্মীর পাঁচালি পাঠ করছে। (সমাপ্ত) --------- ।। একাকী কন্যা ।।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৭ জন


এ জাতীয় গল্প

→ কোজাগর

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now