বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
শিরোনাম: কান্নার শেষে আনন্দ।
লেখক: আব্দুল্লাহ বিন মালিক।
শীতের শেষ ভোর। কুয়াশা তখনও গ্রামের মাটি ছেড়ে যায়নি, ঠিক তখনই খবরটা এলো—গ্রামের এক বয়োজ্যেষ্ঠ মুরব্বি আর নেই। বয়সের ভারে ন্যুব্জ মানুষটি রাতভর অসুস্থ ছিলেন, কিন্তু ডাক্তার দেখানোর সুযোগ হয়নি। ভোরের আলো ফোটার আগেই তিনি নিথর হয়ে পড়েছিলেন বিছানায়।
খবর পেয়ে থানা থেকে আমাকে পাঠানো হলো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। এমনিতে মৃত্যুর পর পুলিশের তেমন কিছু করার থাকে না, কিন্তু এই গ্রামে ওই বৃদ্ধ মানুষটির একটা আলাদা জায়গা ছিল। তিনি ছিলেন এলাকার মুরব্বি, বহু মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানো একজন মানুষ, যাঁকে সবাই সম্মান করত। তাই তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা এলাকা যেন উথালপাথাল হয়ে উঠল।
আমি যখন বাড়ির উঠানে পৌঁছালাম, ততক্ষণে সেখানে জনসমুদ্র। বাড়ির উঠান ছাপিয়ে রাস্তা পর্যন্ত মানুষে ভরে গেছে। কেউ কাঁদছেন, কেউ বিলাপ করছেন, কেউ আবার স্মৃতিচারণ করছেন সেই মানুষটির ভালোবাসার কথা বলে—কীভাবে তিনি একদিন কারও ধানের ক্ষতি পুষিয়ে দিয়েছিলেন, কীভাবে তিনি এলাকার ঝগড়া মিটিয়ে দিতেন, কীভাবে দরিদ্র মানুষদের চুপচাপ সাহায্য করতেন। মহিলারা ভেতরের ঘরে ভিড় জমিয়েছেন, পুরুষরা বাইরে। এমন এক আবেগঘন পরিস্থিতিতে জানাজার জন্য মরদেহ সরানোটাই হয়ে দাঁড়াল সবচেয়ে কঠিন কাজ।
পরিবারের লোকজন কিছুতেই মরদেহ ছাড়তে রাজি হচ্ছিলেন না। প্রতিবেশীরাও একই রকম আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে গেটের সামনে জটলা পাকিয়ে ফেলেছিলেন, কেউ কেউ পথ আটকে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কান্নার রোল আর মানুষের ভিড়ে পরিস্থিতি প্রতি মুহূর্তে জটিল হয়ে উঠছিল। আমরা কয়েকজন সহকর্মী মিলে অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে, অনেক ধৈর্য ধরে অবশেষে মরদেহ জানাজার মাঠের দিকে নিয়ে যেতে সক্ষম হলাম। মাঠে পৌঁছাতেই দেখা গেল সেখানেও একই অবস্থা—নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শত শত মানুষ শেষবারের মতো একনজর দেখতে ভিড় করেছেন। আশপাশের গ্রাম থেকেও মানুষ ছুটে এসেছেন, কারণ এলাকায় তাঁর পরিচিতি ও সম্মান ছিল অনেক বিস্তৃত।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠের চারপাশে অস্থায়ী গেট করে একটা নিয়ন্ত্রিত বলয় তৈরি করা হলো। মরদেহকে রাখা হলো পরিবারের ঘনিষ্ঠজনদের কাছে, গেটের ভেতরের দিকে। বাকি সবাইকে গেটের বাইরে রাখা হলো, যাতে জানাজার আগে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিটুকু নিরিবিলিতে সম্পন্ন করা যায়। চারদিকে থমথমে নীরবতা, শুধু মাঝেমধ্যে কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল। ইমাম সাহেব জানাজার নিয়মকানুন বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, মানুষ কাতারবন্দি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। আমি গেটের কাছে দাঁড়িয়ে চারপাশে চোখ রাখছিলাম, যাতে ভিড়ের চাপে কোনো অঘটন না ঘটে।
ঠিক তখনই ঘটল সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা।
সবার চোখের সামনে, কাফনে জড়ানো মানুষটি হঠাৎ নড়ে উঠলেন। প্রথমে সবাই ভাবলেন চোখের ভুল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে গেল—তিনি ধীরে ধীরে উঠে বসছেন! গোটা মাঠজুড়ে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। যাঁরা কাছে ছিলেন, তাঁরা চিৎকার করে পিছিয়ে গেলেন। কেউ কেউ ভয়ে মাটিতে বসে পড়লেন, কেউবা দৌড়াতে শুরু করলেন। পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কে জমে গেলেন, কারও মুখ দিয়ে কথাই বেরোচ্ছিল না। এমন পরিস্থিতিতে ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক—যাঁকে একটু আগে সবাই মৃত ভেবে জানাজার জন্য প্রস্তুত করছিলেন, তিনিই চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠলেন।
আমি নিজেও সেই মুহূর্তে কয়েক সেকেন্ডের জন্য থমকে গিয়েছিলাম। বহুদিনের চাকরিজীবনে নানা রকম কঠিন পরিস্থিতি সামলেছি, কিন্তু এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখিনি। তবে দ্রুতই নিজেকে সামলে নিয়ে সহকর্মীদের নির্দেশ দিলাম যাতে ভিড় নিয়ন্ত্রণে রাখা হয় এবং কেউ আতঙ্কে পালাতে গিয়ে আহত না হন। পাশাপাশি এলাকার একজন ডাক্তারকে দ্রুত খবর দিয়ে আনানো হলো।
ডাক্তার সাহেব পরীক্ষা করে যা বললেন, তাতে সবার আতঙ্ক কেটে গিয়ে বিস্ময়ে রূপ নিল। মানুষটি আসলে মারা যাননি। রাতের অসুস্থতার সময় তাঁর শ্বাস-প্রশ্বাস ও নাড়ির স্পন্দন এতটাই ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল যে অন্ধকারে ও আতঙ্কের মধ্যে বাড়ির লোকজন তা ধরতে পারেননি এবং ভুলবশত তাঁকে মৃত ভেবে বসেছিলেন। সঠিক চিকিৎসাগত পরীক্ষা ছাড়াই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোটাই ছিল মূল ভুল। বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে মাঝেমধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস ও হৃৎস্পন্দন এতটাই ক্ষীণ হয়ে যেতে পারে যে বিশেষজ্ঞ পরীক্ষা ছাড়া তা বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। কিছু সময় পর তাঁর জ্ঞান কিছুটা ফিরে এলে, নিজেকে কাফনে জড়ানো অবস্থায় দেখে তিনি নিজেও কিছুটা হকচকিয়ে গিয়েছিলেন।
এই খবর জানার পর মাঠে যেন আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। যে মানুষগুলো কিছুক্ষণ আগে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন, তাঁরাই এখন আনন্দে কাঁদছেন। এলাকার মসজিদ থেকে মাইকে ঘোষণা দেওয়া হলো—তিনি সুস্থ আছেন, তিনি মারা যাননি। মুহূর্তেই খবরটা ছড়িয়ে পড়ল পুরো গ্রামে। যাঁরা জানাজায় অংশ নিতে ছুটে এসেছিলেন, তাঁরাই এখন কৃতজ্ঞতার সিজদায় লুটিয়ে পড়লেন। কেউ কেউ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলেন, কেউ মিষ্টি বিতরণের আয়োজন শুরু করে দিলেন।
আমি তখনও গেটের পাশে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা দেখছিলাম। কর্তব্যের সূত্রে বহু মানুষের মৃত্যু-পরবর্তী পরিস্থিতি সামলেছি, কিন্তু এমন এক অভিজ্ঞতা যেখানে মৃত্যুর আয়োজন মুহূর্তেই রূপ নিল প্রাণের উৎসবে—তা আমার কাছে চিরকাল অবিশ্বাস্য এক স্মৃতি হয়ে রইল। মানুষের জীবন-মৃত্যুর সীমারেখা যে কতটা সূক্ষ্ম, আর সেই সূক্ষ্ম রেখার ওপারে কতটা অনিশ্চয়তা লুকিয়ে থাকতে পারে—সেই সকাল আমাকে তা নতুন করে চিনিয়ে দিয়েছিল।
সেই বৃদ্ধ মানুষটি সুস্থ হয়ে বাকি জীবন আরও কয়েক বছর গ্রামের মানুষের সাথে কাটিয়েছিলেন, আর এই ঘটনা এলাকার মানুষের মুখে মুখে ফিরত—এক বিস্ময়কর সকালের গল্প হয়ে, যেখানে কান্নার মাঠ হঠাৎ বদলে গিয়েছিল আনন্দের উৎসবে।
(দ্রষ্টব্য: এই গল্পটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। এখানে কোনো ব্যক্তি, স্থান বা ঘটনার সাথে বাস্তবের কোনো মিল নেই।)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now