বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
" যকের ধন "
হেমেন্দ্রকুমার রায়
----------------
(পর্ব ৯)
▪▪▪নতুন বিপদের ভয়▪▪▪
তিনদিন মামার বাড়ীতে খুব আদরে কাটিয়ে মায়ের কাছ থেকে মামি বিদায় নিলুম। মা কি সহজে আমাকে ছেড়ে দিতে চান? তবু তাকে আমরা যকের ধন আর বিপদ-আপদের কথা কিছুই বলনি, তিনি শুধু জানতেন আমরা আসামে বেড়াতে যাচ্ছি।
যাবার সময়ে বিমলকে ডেকে মা বললেন, দেখো পাবা, আমার শিবরাত্রির সলতেটুকুকে তোমার হাতে সঁপে দিলুম, ওকে সাবধানে রেখ?
বিমল বললে, ভয় কি মা, কুমার তো আর কচি খোকাটি নেই, ওর জন্যে তোমাকে কিছু ভাবতে হবে না।
মা বললেন, না বাছা, কুমারকে তুমি কোথাও একলা ছেড়ে দিও না-ও ভারি গোঁয়ার-গোবিন্দ, কি করতে কি করে বসবে কিছুই ঠিক নেই। ও যদি তোমার মত শান্তশিষ্টটি হত তাহলে আমাকে এত ভেবে মরতে হত না?
বিমল একটু মুচকে হেসে বললে, আচ্ছা মা, আমি তো সঙ্গে রইলুম, যাতে গোঁয়ার্তুমি করতে না পারে, সেদিকে আমি চোখ রাখব।
আমি মনে মনে হাসতে লাগলুম। মা ভাবছেন আমি গোঁয়ারগোবিন্দ আর বিমল শান্তশিষ্ট। কিন্তু বিমল যে আমার চেয়ে কত বড় গোঁয়ার আর ডানপিটে, মা যদি তা ঘুণাক্ষরেও জানতেন!
মায়ের পায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে আমি, বিমল আর রামহরি দুর্গা বলে বেরিয়ে পড়লুম—বাঘা আমাদের পিছনে পিছনে আসতে লাগল। কিন্তু শান্তিপুরের স্টেশনের ভিতরে এসে, রেলগাড়ীকে দেখেই বাঘা পেটের তলায় ল্যাজ গুজে একেবারে যেন মুসড়ে পড়ল। সে বুঝলে, আবার তাকে জন্তুদের গাড়ীর ভিতরে নিয়ে গিয়ে একলাটি বেঁধে রেখে আসা হবে।
রাণাঘাটে নেমে আমরা আসল গাড়ী ধরলুম। বিমল খুশিমুখে বললে, যাক্ এবারে আর করালীর ভয় নেই। সে হয়তো এখন আসামে বসে নিজের হাত কামড়াচ্ছে, আর আমাদের মুণ্ডুপাত করছে?
আমি বললুম, আসাম থেকে করালী এখন কলকাতায় ফিরে থাকতেও পারে।
বিমল বললে, কলকাতায় কেন, সে এখন যমালয়ে গেলেও আমার আপত্তি নেই। চল, গাড়ীতে উঠে বসা যাক?
অনেক রাত্রে গাড়ী সারাঘাটে গিয়ে দাঁড়াল। যে-সময়ের কথা বলা হচ্চে, পদ্মার উপর তখনে সারার বিখ্যাত পুলটি তৈরি হয়নি। সারাঘাটে সকলকে তখন গাড়া থেকে নেমে স্টীমারে করে পদ্মার ওপারে গিয়ে আবার রেলগাড়ী চড়তে হত। কাজেই সারায় এসে আমাদেরও মাল-পত্তর নিয়ে গাড়ী থেকে নামতে হল।
আগেই বলেছি, আমি কখনো কলকাতার বাইরে পা বাড়াইনি। স্টীমারে চড়ে চারিদিকের দৃশ্য দেখে আমার যেন তাক লেগে গেল! কলকাতার গঙ্গার চেয়েও চওড়া নদী যে আবার আছে, এই পদ্মাকে দেখে প্রথম সেটা বুঝতে পারলুম। আকাশে চাঁদ উঠেছে আর গায়ে জ্যোৎস্না মেখে পদ্মা নেচে, ফুলে, বেগে ছুটে চলছে— রূপোর জল দিয়ে তার ঢেউগুলি তৈরী। মাঝে মাঝে সাদা ধবধবে বালির চর চোখের সামনে কখনো জেগে উঠছে, কখনো মিলিয়ে যাচ্ছে—স্বপ্নের ছবির মতন। আমার মনে হল ঐ নিরিবিলি বালির চরগুলির মধ্যে হয়তো এতক্ষণ পরীরা এসে হাসি-খুসি, খেলাধূলা করছিল। স্টীমারের গর্জন শুনে দৈত্য বা দানব আসছে ভেবে এখন তারা ভয় পেয়ে হাওয়ার সঙ্গে হাওয়া হয়ে মিশিয়ে গেছে !
বালির চর এড়িয়ে স্টীমার ক্রমেই অন্য তীরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, খালাসীরা জল মাপছে আর চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কি বলছে। স্টীমারের একদিকে নানা জাতের মেয়ে-পুরুষ একসঙ্গে জড়ামড়ি করে বসে, শুয়ে, দাঁড়িয়ে গোলমাল করছে, আর একদিকে ডেকের উপরে উজ্জল আলোতে চেয়ার-টেবিল পেতে বাহার দিয়ে বসে সাহেব-মেমরা খানা খাচ্ছে। খানিকক্ষণ পরে অন্যদিকে মুখ ফেরাতেই দেখি, একটা লোক আড়-চোখে আমার পানে তাকিয়ে আছে। তার সঙ্গে আমার চোখাচোখি হতেই সে হন হন করে এগিয়ে ভিড়ের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল!
স্টীমার ঘাটে এসে লাগল। আমরা সবাই একে একে নীচে নেমে স্টেশনের দিকে চললুম। আসাম মেল তখন আমাদের অপেক্ষায় দাড়িয়ে ভোঁস ভোঁস করে ধোঁয়া ছাড়ছিল—আমরাও তার পেটের ভিতর ঢুকে নিশ্চিন্ত হয়ে বসলুম। কামরার জানলার কাছে আমি বসেছিলুম। প্লাটফর্মের ওপাশে আর একখানা রেলগাড়ী—সেখানাতে দাঞ্জিলিঙের যাত্রীদের ভিড়। ফাষ্ট ও সেকেণ্ড ক্লাসের সায়েব-মেমের কামরার ভিতরে বিছানা পাতছিল—একঘুমে রাত কাটিয়ে দেবার জন্যে। তাদের ঘুমের আয়োজন দেখতে দেখতে আমারও চোখ ঢুলে এল। আমিও শুয়ে পড়বার চেষ্টা করছি—হঠাৎ আবার দেখলুম, স্টীমারের সেই অচেন লোকটা প্লাটফর্মের উপরে দাঁড়িয়ে তেমনি আড়-চোখে আমাদের দিকে বারে বারে চেয়ে দেখছে।
এবার আমার ভারি সন্দেহ হল। বিমলের দিকে ফিরে বললুম, ‘ওহে, দেখ দেখ?
বিমল বেঞ্চির উপর কম্বল পাততে পাততে বললে, আর দেখাশুনে কিছু নয়—এখন চোখ বুজে নাক ডাকিয়ে ঘুমোবার সময়?
—ওহে, না দেখলে চলবে না। স্টীমার থেকে একটা লোক বরাবর আমাদের ওপর নজর রেখেছে—এখনো সে দাঁড়িয়ে আছে, যেন পাহারা দিচ্ছে!
শুনেই বিমল একলাফে জানলার কাছে এসে বললে, কৈ কোথায়?
—ঐ যে।
কিন্তু লোকটাও তখন বুঝতে পেরেছিল যে, আমরা তার উপরে সন্দেহ করেছি। সে তাড়াতাড়ি মুখ ফিরিয়ে সেখান থেকে সরে পড়ল।
বিমল চিন্তিতের মত বললে, তাই তো, এ আবার কে?
—করালীর চর নয় তো?
— করালী? কিন্তু সে কি করে জানবে আজ আমরা এখানে আছি?
—হয়তো করালী আমাদের চালাকি ধরে ফেলেছে! সে জানত আমরা চার দিন পরেই আবার আসামে যাব। আসামে যেতে গেলে এ পথে আসতেই হবে। তাই সে হয়তো এইখানে এতদিন ঘাঁটি আগলে বসেছিল।
— অসম্ভব নয়। আচ্ছা, একবার নেমে দেখা যাক, করালী এই গাড়ীর কোন কামরায় লুকিয়ে আছে কিনা?—এই বলেই বিমল প্লাটফর্মের উপর নেমে এগিয়ে গেল।
গাড়ী যখন ছাড়ে-ছাড়ে, বিমল তখন ফিরে এল।
আমি বললুম, কি দেখলে?
—কিছু না। প্রত্যেক কামরায় তন্নভন্ন করে খুঁজেছি—করালী কোথাও নেই। বোধ হয় আমরা মিছে সন্দেহ করেছি?
বিমলের কথায় আবার আমি অনেকট নিশ্চিন্ত হলুম-যদিও মনের মধ্যে কেমন একটা খটকা লেগে রইল।
গাড়ী ছেড়ে দিলে।
বিমল বললে, ওহে কুমার, এই বেলা যতটা পারে ঘুমিয়ে নাও – আসামে একবার গিয়ে পড়লে হয়তো আমাদের আহার-নিদ্রা একরকম ত্যাগ করতেই হবে।
বিমল বেঞ্চির উপরে 'আঃ' বলে সটান লম্ব হল, আমিও শুয়ে পড়লুম। সুখের বিষয়, এ কামরায় আর কেউ ছিল না, সুতরাং ঘুমে আর ব্যাঘাত পড়বার ভয় নেই ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now