বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

যকের ধন ----- (পর্ব ২২তম ও শেষ পর্ব)

"রোমাঞ্চকর গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X " যকের ধন " হেমেন্দ্রকুমার রায় ---------------- (পর্ব ২২তম ও শেষ পর্ব) ▪▪▪ভীষণ গহ্বর▪▪▪ অল্প-অল্প চাঁদের আলো ফুটেছে, সে আলোতে আর কিছু দেখা যাচ্ছে না-অন্ধকার ছাড়া। প্রেতলোকের মতন নির্জন পথ। আমাদের পায়ের শব্দে যেন চারিদিকের স্তব্ধতা চমকে চমকে উঠছে। আশপাশের কালি-দিয়ে-আঁকা গাছপালাগুলো মাঝে মাঝে বাতাস লেগে তুলছে আর আমাদের মনে হচ্ছে, থেকে থেকে অন্ধকার যেন তার ডান নাড়া দিচ্ছে । আমি বললুম, দেখ বিমল, আমাদের আর এগুনে ঠিক নয়। —কেন? —এই অন্ধকারে একলা পথ চলতে করালী নিশ্চয় ভয় পাবে। খুব সম্ভব, সে এখন কোন গুহায় শুয়ে ঘুমুচ্ছে আর আমরা হয়তো তাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে যাব। তার চেয়ে আপাততঃ আমরাও কোথাও মাথা গুজে কিছু বিশ্রাম করে নি এস, তারপর ভোর হলেই আবার চলতে সুরু করা যাবে। বিমল বললে, কুমার, তুমি ঠিক বলেছ। করালীকে ধরবার আগ্রহে এসব কথা আমার মনেই ছিল না। রক্তজবার রঙে-চোবানো উষার প্রথম আলো সবে যখন পূর্বআকাশের ধারে পাড় বুনে দিচ্ছে, আমরা তখন আবার উঠে পথ চলতে শুরু করলুম। চারিদিকে নানা জাতের পাখিরা মিলে গানের আসর জমিয়ে তুলেছে, গাছের সবুজ পাতারাও যেন কাঁপতে কাঁপতে মর্মর-সুরে সেই গানে যোগ দিয়েছে, আর তার তালে তালে ঝরে পড়ে ঝরনার জল নাচতে নাচতে নীচে নেমে যাচ্ছে। আকাশে বাতাসে পৃথিবীতে কেমন একটি শান্তিভরা আনন্দের আভাস! এরি মধ্যে আমরা কিন্তু আজ হিংসাপূর্ণ আগ্রহে ছুটে চলেছি—এটা ভেবেও আমার মন বার বার কেমন সঙ্কুচিত হয়ে পড়তে লাগল।. পাহাড়ের পর পাহাড়ের মাথার উপরে সুর্যের মুখ যখন জ্বলন্ত মটকের মতন জেগে উঠল, আমরা তখন পথের একটা বাকের মুখে এসে পড়েছি। বাঘা এগিয়ে এগিয়ে চলছিল, বাকের মুখে গিয়েই হঠাৎ সে ঘেউ ঘেউ করে চেঁচিয়ে উঠল । আমরা সবাই সতর্ক ছিলুম, সে চ্যাঁচালে কেন, দেখবার জন্যে তখনি সকলে ছুটে বাঁকের মুখে গিয়ে দাঁড়ালুম। দেখলুম, খানিক তফাতে একটা লোক দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে! দেখবামাত্র চিনলুম, সে করালী ! তার হাতে একটা বড় বাক্স—যকের ধন! আমাদের দেখেই করালী বেগে একদৌড় মারলে—সঙ্গে সঙ্গে বিমলও তীরের মতন তার দিকে ছুটে গেল। আমরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। ছুটতে ছুটতে বিমল একেবারে করালীর কাছে গিয়ে পড়ল। তারপর সে চেঁচিয়ে বললে, করালী, যদি প্রাণে বাঁচতে চাও, তবে থামো। নইলে আমি গুলি করে তোমাকে কুকুরের মত মেরে ফেলব। কিন্তু করালী থামলে না, হঠাৎ পথের বাঁ-দিকে একটা উঁচু জায়গায় লাফিয়ে উঠেই অদৃশ্য হয়ে গেল—বিমল সেখানে থমকে দাঁড়াল,—এক মুহুর্তের জন্যে। তারপরেই সেও লাফিয়ে উপরে উঠল, আমরা তাকেও আর দেখতে পেলুম না। ততক্ষণে আমাদের হুঁস হল—‘রামহরি, শীগগির এস’ বলেই আমি প্রাণপণে দৌড়ে অগ্রসর হলুম। সেই উঁচু জায়গাটার কাছে গিয়ে দেখলুম, সেখানে পাহাড়ের গায়ে রয়েছে একটা গুহার মুখ। আমি একলাফে উপরে উঠতেই একটা বিকট চীৎকার এসে আমার কানের ভিতরে ঢুকল—সঙ্গে সঙ্গে শুনলুম বিমলের কণ্ঠস্বরে উচ্চ আর্তনাদ। তারপরই সব স্তব্ধ। আমার বুকের ভিতরটা যেন কেমন করে উঠল—বেগে ছুটে গিয়ে গুহার মধ্যে ঢুকে পড়লুম। ভিতরে গিয়ে দেখি কেউ তো সেখানে নেই। অত্যন্ত আশ্চর্য ও স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম। পরমুহূর্তে রামহরিও এসে গুহার মধ্যে ঢুকে বললে, ‘কে অমন চেঁচিয়ে উঠল? কৈ, খোকাবাবু কোথায়? —জানি না রামহরি, আমি শুনলুম গুহার ভেতর থেকে বিমল আর্তনাদ করে উঠল। কিন্তু ভেতরে এসে কারুকেই তো দেখতে পাচ্ছি না? গুহার একদিকটা আঁধারে ঝাপসা। সেইদিকে গিয়েই রামহরি বলে উঠল, এই যে, ভেতরে আর একটা পথ রয়েছে। দৌড়ে গিয়ে দেখি, সত্যিই তো! একটা গলির মত পথ ভিতর দিকে চলে গেছে—কিন্তু অন্ধকারে সেখানে একটুও নজর চলে না। আমি বললুম, রামহরি, শীগগির বিজলী-মশাল বের কর, বন্দুকটা আমাকে দাও। বন্দুকটা আমার হাতে দিয়ে রামহরি বিজলী-মশাল বার করলে, তারপর সাবধানে ভিতরে গিয়ে ঢুকল। আমিও বন্দুকটা বাগিয়ে ধরে সতর্ক চোখে চারিদিকে তাকাতে তাকাতে তার সঙ্গে সঙ্গে চললুম। উপরে, নীচে, এপাশে, ওপাশে গুহার নিরেট পাথর, তারই ভিতর দিয়ে যেতে যেতে আবার আমার মনে পড়ল, সেই যকের ধনের সুড়ঙ্গের কথা। আচম্বিতে রামহরি দাঁড়িয়ে পড়ে আঁতকে উঠে বললে, সর্বনাশ। আমি বললুম, ব্যাপার কি? রামহরি বললে, সামনেই প্রকাণ্ড একটা গর্ত! বিজলী-মশালের তীব্র আলোতে দেখলুম, ঠিক রামহরির পায়ের তলাতেই গুহার পথ শেষ হয়ে গেছে, তারপরেই মস্তবড় একটা। অন্ধকার-ভরা ফাঁক যেন হাঁ করে আমাদের গিলতে আসছে। বিমল কি ওরই মধ্যে পড়ে গেছে? যতটা পারি গলা চড়িয়ে চেঁচিয়ে ডাকলুম, বিমল, বিমল, বিমল? পৃথিবীর গর্ত থেকে করুণ স্বরে কে যেন সাড়া দিলে—কুমার, কুমার! বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও! গহবরের ধারে লম্ব হয়ে শুয়ে পড়ে রামহরির হাত থেকে বিজলীমশালটা নিয়ে দেখলুম, গর্তের মুখটা প্রায় পঞ্চাশ-ষাট হাত চওড়া। তলার দিকে চেয়ে দেখলুম প্রায় ত্রিশ হাত নীচে কি যেন চক্‌ চক্‌ করছে! ভালো করে চেয়ে দেখি, জল। আবার চেঁচিয়ে বললুম, বিমল, কোথায় তুমি? অনেক নীচে থেকে বিমল বললে, এই যে, জলের ভেতরে। শীগগির আমাকে তোলবার ব্যবস্থা কর ভাই, আমার হাত-পায়ে খিল ধরেছে, এখুনি ডুবে যাব। —রামহরি, রামহরি! ব্যাগের ভেতর থেকে দড়ির বাণ্ডিল বের কর—জলদি! রামহরি তখনি পিঠ থেকে বড় ব্যাগটা নামিয়ে খুলতে বসে গেল। আমি বিজলী-মশালটা নীচু-মুখে করে দেখলুম, কালো জলের ভিতরে ঢেউ তুলে বিমল সাঁতার দিচ্ছে। তাড়াতাড়ি দড়িটা নামিয়ে দিলুম, বিমল সাঁতরে এসে দড়িটা দু-হাতে চেপে ধরলে। আমি আবার চেঁচিয়ে বললুম, বিমল, দেওয়ালে পা দিয়ে দড়ি বেয়ে তুমি উপরে উঠতে পারবে, না, আমরা তোমায় টেনে তুলব? বিমলও চেঁচিয়ে বললে, বোধহয় আমি নিজেই উঠতে পারব। আমি আর রামহরি সজোরে দড়ি ধরে রইলুম, খানিক পরে বিমল নিজেই উপরে এসে উঠল, তারপর আমার কোলের ভিতরে পড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে অজ্ঞান হয়ে গেল। আমরা দুজনে তাকে ধরাধরি করে বাইরে নিয়ে এলুম। ▪▪▪পরিণাম▪▪▪ বিমলের জ্ঞান হলে পর আমি জিজ্ঞাসা করলুম, কি করে তুমি গর্তের মধ্যে গিয়ে পড়লে? বিমল বললে, করালীর পিছনে পিছনে যেই আমি গুহার মধ্যে গিয়ে ঢুকলুম, সে অমনি ঐ অন্ধকার গলির মধ্যে সেঁধিয়ে পড়ল। আমিও ছাড়লুম না, গলির ভিতরে ঢুকে সেই অন্ধকারেই আমি তাকে জড়িয়ে ধরলুম, তারপর দুজনের ধস্তাধস্তি শুরু হল। কিন্তু আমরা কেউ জানতুম না যে, ওখানে আবার একটা গহ্বর আছে, ঠেলাঠেলি জড়াজড়ি করতে করতে দুজনেই হঠাৎ তার ভেতরে পড়ে গেলুম। আমি শিউরে বলে উঠলুম, অ্যাঁঃ! করালী তাহলে এখনো গহ্বরের মধ্যে আছে? —হ্যাঁ কিন্তু বেঁচে নেই। —সে কি? —যদিও অন্ধকারে সেখানে চোখ চলে না, তবু আমি নিশ্চয়ই বলতে পারি, সে ডুবে মরেছে। কারণ, আমরা জলে পড়বার পর ঠিক আমার পাশেই দু-চারবার ঝপাঝপ, শব্দ হয়েই সব চুপ হয়ে গেল। নিশ্চয়ই সে সাতার জানত না, জানলে জলের ভেতরে শব্দ হত। আমি রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞাসা করলুম, আর যকের ধনের বাক্সটা? বিমল একটা বিষাদ-ভরা হাসি হেসে মাথা নাড়তে নাড়তে বললে, আমি যখন করালীকে জড়িয়ে ধরি, তখনে সে বাক্সটা ছাড়েনি। আমার বিশ্বাস, বাক্সট নিয়েই সে জলপথে পরলোকে যাত্রা করেছে। —“কিন্তু বাক্সটা যদি গলির ভেতরে পড়ে থাকে? বলেই আমি বিজলী-মশালটা নিয়ে আবার গুহার ভিতরকার গলির মধ্যে গিয়ে ঢুকলুম। কিন্তু মিছে আশা, সেখানে বাক্সের চিহ্নমাত্রও নেই। আর একবার সেই বিরাট গগ্বরের দিকে তীক্ষদৃষ্টিতে চেয়ে দেখলুম, অনেক নীচে অন্ধকার-মাখা-জলরাশি মৃতের মতন স্থির ও স্তব্ধ হয়ে আছে, এই একটু আগেই সে যে একটা মানুষের প্রাণ ও সাত-রাজার ধনকে নিষ্ঠুরভাবে গ্রাস করে ফেলেছে, তাকে দেখে এখন আর সে সন্দেহ করবারও উপায় নেই। হতাশভাবে বাইরে এসে অবসন্নের মতন বসে পড়লুম। বিমল শুধোলে, কেমন, পেলে না তো? মাথা নেড়ে নীরবে জানালুম—না। —তা আমি আগেই জানি। করালী প্রাণে মরেছে বটে, কিন্তু যকের ধন ছাড়েনি। শেষ জিৎ তারই। স্তব্ধ হয়ে বসে রইলুম। দুঃখে, ক্ষোভে, বিরক্তিতে মনটা আমার ভরে উঠল; এত বিপদ, এত কষ্টভোগের পর এতবড় নিরাশ! আমার ডাক-ছেড়ে কাঁদবার ইচ্ছা হতে লাগল। বিমলও হতাশভাবে মাটির দিকে চেয়ে চুপ করে বসে রইল। অনেকক্ষণ পরে রামহরি বললে, তোমরা দুজনে অমন মন-মরা হয়ে থাকলে তো চলবে না। যকের ধন ভাগ্যেই নেই তাতে হয়েছে কি? প্রাণে বেঁচেছ এই ঢের। যা হাতে না আসতেই অত বিপদ, এত ঝঞ্ঝাট, যার জন্যে এতগুলো প্রাণ গেল, তা পেলে না জানি আরো কত মুস্কিলই হত! এখন ঘরের ছেলে ভালোয় ভালোয় ঘরে ফিরে চল। বিমল মাথা তুলে হেসে বললে, ঠিক বলেছ রামহরি। আঙুর যখন নাগালের বাইরে, তখন তাকে তেতো বলেই মনকে প্রবোধ দেওয়া যাক। যকের ধন কি মানুষের ভোগে লাগে? করালী ভূত হয়ে চিরকাল তা ভোগ করুক—দরকার নেই আর তার জন্যে মাথা ঘামিয়ে। আপাততঃ বড়ই ক্ষুধার উদ্রেক হয়েছে, কুমার! তুমি একবার চেষ্টা করে দেখ, পাখিটাখি কিছু মারতে পারো কি না। ততক্ষণে রামহরি ভাত চড়িয়ে দিক, আর আমি ওষুধ মালিস করে গায়ের ব্যথা দূর করি। আমি বললুম, কাজেই। বিমল বললে, ‘আহারের পর নিদ্রা, তারপর দুর্গা বলে স্বদেশের দিকে যাত্রা, কি বল? আমি বললুম, অগত্যা। (সমাপ্ত) ---------


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ যকের ধন ----- (পর্ব ২২তম ও শেষ পর্ব)

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now