বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আমার বড় ভাইয়ের অনেক কিছুই খুব স্বাভাবিক না। আমার মায়ের মুখে শুনেছি, আমার বড় ভাই নাকি ছেলেবেলায় মাঝে-মাঝে হারিয়ে যেত। কখনও তিনদিনের জন্য, কখনও সাত দিনের জন্য। পুলিশে খবর দিয়ে কিংবা সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন ছাপিয়েও নাকি কোনও লাভহত না। অনেক পরে আমার বাবা-মা বুঝতে পেরেছিলেন আমার ভাইকে কারা যেন নিয়ে যেত, আবার দিয়েও যেত। ওই ভৌতিক ঘটনায় আমার মা ভীষন ঘাবড়ে গেলেও আমার বাবা কেন যেন নিশ্চিন্ত থাকত। ছেলে নিখোঁজ, অথচ বাবা টেনশন করছে না-এই ব্যাপারটিও ভারী রহস্যময়। এসবই আমি আমার মায়ের মুখে শুনেছি। আমার বড় ভাইয়ের নাম রোকন। দেখতে একেবারেই আমাদের মতনা। আমার মা-বাবার গায়ের রং শ্যামলা। আমারও। মেয়ে বলেই এই নিয়ে আমার মনে যে কত কষ্ঠ! অথচ রোকন ভাইয়া ফরসা, লম্বা। কেবল ফরসা আর লম্বাই না- রোকন ভাইয়া ভীষণ হ্যান্ডসাম। প্রথম দর্শনেই সবাই মুগ্ধ হয়ে যায়। আমার বান্ধবী ফরিদা তো রোকন ভাইয়াকে দেখে… কী বলব … সত্যিই রোকন ভাইয়া আমাদের পরিবারে একেবারেই বেমানান। রোকন ভাইয়ার জন্ম ঠাকুরগাঁও শহরে। বাবা তখন ওই শহরেই প্রাকটিস করতেন। ডাক্তার হিসেবে বাবার নাকি খুব নামডাক হয়েছিল। আমি তখনও হইনি। এসবই আমি আমার মায়ের মুখে শুনেছি। রোকন ভাইয়াকে একটা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ক্লাস ফাইভে ওঠার পর প্রথম হারিয়ে গেল ভাইয়া … রোকন ভাইয়া এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর আব্বা ঢাকা চলে এলেন। ভাইয়াকে নিযে বেশ ঝামেলা হচ্ছিল। ঘন ঘন হারিয়ে যাচ্ছিল। ঘরে ফল, মিষ্টি, গোলাপ ফুল- এসব পাওয়া যাচ্ছিল। ভাইয়া নাকি খেতেচাইত না। খেতে বললে বলত খেয়েছি। কি খেয়েছো-জিজ্ঞেস করলেবলত, আপেল, রসগোল্লা আর দুধ … আব্বা ঢাকার কলাবাগানে বাড়ি কিনলেন। একতলায় চেম্বার। আমি নতুন স্কুলে ভর্তি হলাম। পুরনো স্কুল ছেড়ে আসতে আমার রীতিমতো কষ্টই হচ্ছিল।রুমা, সালমা, দীপ্তি এদের মুখগুলি সারাক্ষণ মনে পড়ত। সে যাক। রোকন ভাইয়া পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল। এসএসসি পরীক্ষায় খুব ভালো রেজাল্ট করে ঢাকা কলেজে ভর্তি হল ভাইয়া। হটাৎ করেই আব্বা মারা গেলেন। রোকন ভাইয়া তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। আমাদের ছোট্ট সংসারে শোকের ছায়াঘনালো। মা স্তব্দ হয়ে গেলেন। বাবার জন্য আমারও খুব খারাপ লাগত।বাবা যে আমার সঙ্গে খুব গল্প করত তা নয়। আমি বরং বাবাকে ভয়ই পেতাম। তবে বাবা যে আমায় খুব ভালোবাসত তা বুঝতে পারতাম …বাবাকে আমার ভারি গম্ভীর মনে হত। ঘরে থাকলে বাবা সারাক্ষণ বই পড়ত। বাবার লাইব্রেরিতে যে কত বই! মনে হয় বইপড়ার অভ্যেস আমি আমার বাবার কাছ থেকেই পেয়েছি। ধীরে ধীরে আমরা শোক সামলে নিলাম। দোতলায় থাকি। একতলার চেম্বারটা উঠিয়ে ভাড়া দিয়েছি। পরিবারটি চমৎকার । আতিক আঙ্কেল ব্যাঙ্কার। তার মেয়ে ফরিদা, আমারই সমবয়েসি, ক্লাস টেনে পড়ে, আমার বান্ধবী। বেশ বুঝতে পারলাম- ফরিদা ভাইয়াকে মনে মনে পছন্দ করে। ফরিদা আমাকে একদিন জড়িয়ে ধরে বলল, উফঃ তোর ভাইয়াটা যা সুন্দর না আফরিন! এই কথা শুনে আমার ফরিদার জন্য খারাপই লাগল। রোকন ভাইয়া ওর দিকে মুখ তুলে তাকালে তো। ভাইয়া যা গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। কথা এত কম বলে। আর ভীষণ নামাজী। ফজরের নামাজ পড়ে কী সুন্দর সুর করে কোরান তেলায়াৎ করে। ভাইয়া বাসায় যতক্ষণ থাকে নিজের ঘরেই থাকে। মাঝেমাঝে ছাদে পায়চারী করে। খাওয়ার সময় অবশ্য খাওয়ার টেবিলে আমরা তিনজনই খাই। আমি টিভির সাউন্ড কমিয়ে দেখি। অবশ্যভাইয়া আমাকে কখনও বকে-টকে না। ভাইয়া কলেজে থাকলে আমি ভাইয়ার ঘর গুছিয়ে দিই। ভাইয়া রাগ করে না।( মা ভাইয়ার ঘরে ঢুকলে কী কারণে ভাইয়া রাগ করে।) ভাইয়ার ঘরে ঢুকলেই কেমন একটা মিষ্টি গন্ধ পাই। মিষ্টি গন্ধটা অনেকটাআতরের গন্ধের মতন। একদিন ভাইয়া বাসায় ছিল না। ঘর গোছাতে ভাইয়ার ঘরে ঢুকেছি … দেখি টেবিলের ওপর একটা রূপার থালায় আঙুর, (থালাটা আমাদেরনা …আমি সিওর ) অন্য একটি চিনেমাটির প্লেটে (এই প্লেটটা আমাদের না) দুটি বড় বড় সাইজের রসগোল্লা আর চিনেমাটির প্লেটের ঠিক পাশে গোলাপের ছোট একটি ডাল; ডালে লাল টকটকে ফুল। কে যেন রিনরিনে মিষ্টি গলায় বলল: কেমন আছ আফরিন? আমি চমকে উঠলাম। মাথা কেমন টলে উঠল। হিম- হিম ঠান্ডা অসার শরীর নিয়ে কোনওমতে পায়ে পায়ে ঘর ছেড়ে চলে আসি। কথাটা মাকে আর বললাম না … এর পর থেকে ভাইয়ার ঘরে আর ঢুকিনা। রান্না আর টিভি দেখার ফাঁকে মায়ের সঙ্গে গল্প করে সময় কাটে। মা কত যে গল্প জানে। ছেলেবেলার গল্প। মার ছোটবেলা কেটেছিল ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গির তলমাল নদীর পাড়ে। নানার সঙ্গে শীতকালে তলমাল নদীর চরে পাখি শিকারের গল্প শুনতে আমার সবচে ভালো লাগে । একবার ভোরবেলা কুয়াশা ফুঁড়ে এক দুধওয়ালা এল। দুধওয়ালা সবাইকে নাকি গরম দুধ খাইয়েছিল। টাকাপয়সা কিছু নেয়নি। দুধওয়ালা চলে যেতেই নানাবলেছিল, দুধওয়ালাটা ছিল জিন। তোর নানা ছোট থাকতে শীতকালে তলমাল নদীর চরে একবার দুধওয়ালাকে দেখেছিল। দুধওয়ালা তখনও গরম দুধ খাইয়েছিল। আমি অবাক হয়ে মাকে বলি মা জিনরাও কি মানুষের মতই মানুষের মধ্যেই থাকে ? মা বলে, থাকে তো। একবার শোন কী হল। ঠাকুরগাঁও থাকতে তোর বাবা রাতবিরাতে রোগী দেখতে ছুটতেন। একবার ঠাকুরগাঁওয়ের উলির বিলের পাশে রহিমনপুর জিনবাড়িতে তোর আব্বা রোগী দেখতে গিয়েছিল। জিনবাড়িতে মানে! আমি অবাক। তোর বাবা চেম্বার থেকে বাসায় ফিরছিল। কনকনে শীতের রাত।হঠাৎ কুয়াশা ফুঁড়ে লম্বাচওড়া এক তরুণএসে উপস্থিত। তরুণটি তারনাম বলল, জিলানী। তার বউ নাকি প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করছে। বাড়ি নাকি কাছেই এখনই একবার যেতে হবে। তো, তোর বাবা রাজি হল যেতে ।হঠাৎ দেখে একটা ঘোড়াগাড়ি। জিলানী ঘোড়াগাড়িতে তোর বাবাকে উঠতে বলল। ঘোড়াগাড়ি চলছেতো চলছে। কুয়াশায় ভালো দেখা যায় না। কোথায় যাচ্ছি জিজ্ঞেস করতেই জিলানী বলল, উলির বিলের পাশে রহিমনপুর উলির বিলের পাশে রহিমনপুর। সেতো অনেক দূর। জিলানী কিছু বললনা। বরং বলল, তার বউয়ের নাম আঞ্জুমান। শরীর নাকি ভালো না। সে যাই হোক। আরও কিছুক্ষণ চলার পরে থামল ঘোড়াগাড়ি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now