বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
জীবনের পরীক্ষা
।।
বাবার মৃত্যুর পর মায়ের বয়সটা যেন হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে।।মায়ের চিন্তা ক্লিষ্ট মুখটাতে করুন ছাপ লেপ্টে আছে। তখন আমি সবে পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ি।।মায়ের সাদা কাপড়টাতে সেলাইয়ের আঁচড় বেড়েই যাচ্ছে।মায়ের তৈল বিহীন শুষ্ক এলোচুলে স্রষ্টার বার্ধকের আগাম বার্তা দেখতে পাচ্ছি।।
ভয় পাচ্ছি ভিষন,ভিষন ভয়।।আমাদের ঘড়টা থমথমে।। বুঝতে পারছি মা কেমন যেন অসহায় হয়ে গেছে।।আমাদের খাবার হতে শুরু করে গায়ের পোষাক সব জৌলসহীন।
।
চৌত্রের দুপুরে মায়ের সারামুখ ঘেমে গেছে।বাড়ির উঠানে কোদাল চালিয়ে মা কিছু সবজির চারা বুনতেছে।তপতপে রোদে মায়ের মুখ হতে টপটপ করে ঘাম ঝড়তেছে।।আমি নিড়ানি হাতে মাটির টুকরু ভাঙ্গছি।তৃষ্ণার্থ এবং ক্ষুধার্থ।।মা কয়েক মুঠো পান্তা ভাত মরিচ দিয়ে নিজ হাতে মেখে আমার মুখে তুলে দিচ্ছে।আমি খাবার গিলতে পারছি না।গলার কাছে বুকের সব কষ্ট আটকে আছে।আমি খাবনা বলে দৌড়ে নদীর পাড়ে এসে বসলাম।আমি তাকিয়ে গভীর ভাবে নিজের হাত দুটি দেখতেছি।সরু সরু আঙ্গুল।অনেক ছোট দুটি হাত।।
।
গভীর রাত পেটে চিনচিনে ব্যাথা।।টিনের ফুটো দিয়ে জোৎসনার আভা ফেটে বেরুচ্ছে।।ঠিক যেমন টা ক্ষুধার যন্ত্রনা আমার পেট হতে বেরুতে চাচ্ছে।।
মায়ের মুখটা আবছা আলোতে কেমন জীর্ন ও ক্লিষ্ট লাগছে।।মায়ের চোখের পাতায় ও গালে জলের রেখা খুঁজেছি,জানি আজো মা নিরবে অনেক কেঁদেছে।।
অামার হাতদুটি এখনো অনেক ছোট।।
।
সেদিন সকাল হতে নিরুদ্দেশ হতে ইচ্ছা করছে।।ছোট ছোট পায়ে খুব ধীরে হাঁটছি, বৃস্তিত ফসলের ক্ষেতের আইল ধরে।মাথার উপর গনগনে সূর্য্য।। হদুল রঙ্গা ছোট ছোট ফুলে প্রজাপতি উড়ছে।একট ফুল ছিড়ে মুখে নিয়েছি।।
হাত ছোট,পা ছোট,পেট ছোট কিন্তুু ক্ষুধাটা ছোট না।।নিস্বঙ্গ একটা চিল মাথার উপর চক্কর কাটছে।সীমাহীন সূঁচালো দৃষ্টি নিয়ে,, সেটাও ক্ষুধার দৃষ্টি।
।
অন্ধকার সন্ধ্যা, থমথমে ঘড়।মা সুর করে দোয়া পড়তেছে।।আমি বিরবির করে বলছি পোলাও,কোর্মা,দই,মাংস।।।
অর্থ ভিন্ন তবে মনের আকুতি একজনের জন্যই।।
।
আজ ইট ভাঙ্গা দুই হাতে দগদগে ফোসকা,,পানিতে পরিপূর্ন,,কয়েকটা ফেঁটে চূয়ে চূয়ে পানি পড়ছে।
সেই সাথে চোখ হতেও,তবে ভিন্ন কারনে।।
আজ কাল পরশু কেউ থেমে থাকেনি,,যখন সময় হেঁটে চলত তখন ক্ষুধারা দৌড়াতো,
একসময় এসে সময় দৌড়াতে শুরু করল আর ক্ষুধারা হেঁটে চলতো।আজ ক্ষুধা থেমে গেছে আর সময় হারিয়ে গেছে।।ছোট্ট দুটি হাত আজ অনেক বড়।।
।
মনে পড়ছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্পোর্টের আগে ছাত্রদের হাতের কাজের তৈরি কোন জিনিস জমা দিতে হতো।তখন সবাই সাধারনত চালুন,ঝাকা,খলই,ঝাড়ু এসব কিনে জমা দিত কিন্তুু আমি নিজের তৈরি মাটি দিয়ে কয়েকটা পুতুল জমা দিয়েছিলাম।এক স্যার এসব দেখে রেগে প্রচন্ড জুড়ে থাপ্পর দিয়েছিল।।আমার ঠোঁট ফেটে গিয়েছিল এবং রক্তও পড়েছিল।।
।
৮ম শ্রেনীতে পড়ার সময় পরীক্ষার ফিস দিতে পারিনি বলে এক স্যার লাইব্রেরীতে ডেকে নিয়ে বেত দিয়ে আমার হাত ধরে পিঠে অনেকগুলি বাড়ি দিয়ে ছিল।ফ্লোরে পড়ে গেলে একটা লাথি মেরেছিল।।আমি কাদঁতে কাদঁতে চলে এসেছিলাম।সেসব আঘাতের চিহ্ন আজ গায়ে না থাকলেও মনের ভিতর ছাপ পড়ে গেছে।।কখনোই তা বদলে যাবেনা।।
।
সে সময় আমি আর আমার এক স্কুল ফ্রেন্ড কায়েস ইটের ভাটাতে ইট ভাংঙ্গার কাজ করতাম আর পাশিপাশি পড়াশোনা করতাম।।তখন আমরা নবম শ্রেনীতে পড়ি।।একদিন প্রায় সন্ধ্যা বেলা ইটের খোলা হতে ফিরতে ছিলাম।পথমধ্যে প্রচন্ড বাতাস উঠলো বুঝলাম ঝড় হবে।দৌড়ে দুতলা বিল্ডিং করা এক বাড়ির পাশে আম গাছের নিচে দাড়ালাম।আরো কয়েকজন মানুষ দাড়ানো ছিল।সেখানে বাড়ির বারান্দায় বাসার মালিক ও তার স্ত্রী কন্যা বসা ছিল।তাদের মেয়েটি এসে আমাদের সাথে থাকা সুন্দর পোষাক পড়া মানুষদের ডেকে নিয়ে গেল।আমরা লুঙ্গি ও ছেড়া জামা দুই বন্ধু সেখানেই দাড়ানো ছিলাম।আমাদের দিকে বাড়ির কেউ ফিরেও তাকায় নি।প্রচন্ড বৃষ্টি আর বাতাসের সময় দুই বন্ধু হাত ধরে সেখানে দাড়িয়ে ঘন্টা খানেক ভিজেছি।।
।
এইচ এস সি পরীক্ষা দিয়ে আমি একটা জব নিলাম।আমার ফ্রেন্ড গোল্ডেন এ+পেল।ওরে বললাম মেডিক্যালে ভর্তি হতে।।সেভাবেই প্রিপারেশন নিলো।চান্সও পেল তবে ভর্তির জন্য ডোনেশনের জন্য ৬০ হাজার টাকা লাগবে।কয়েক মাসের জমানো ত্রিশ হাজার আর বাবার দেয়া একমাত্র স্মৃতির স্বর্নের চেনটা বিক্রি করে টাকাটা ওর হাতে দিলাম।।
অনেক জুরাজুরি করে দিলাম।।শর্তও দিলাম স্কলারশীপ নিয়ে ফরেন হতে আমাকে এক প্যাকেট হাভানা চুরুট এনে দিতে হবে।।
।
১৩ সালে লন্ডন হতে কায়েস সরাসরি বগুড়াতে আমার কাছে আসলো।হাতে এক কার্টুন হাভানা চুরুট ধরিয়ে দিল।বলল হারামি তুর হাভানা চুরুটের জন্যই এই কষ্ট করতে হল।
কিছুদিন পর ও বাড়িতে যেতে বলল,আন্টি নাকি ওর জন্য একটা মেয়ে ঠিক করেছে, আমি গেলেই আংটি পড়িয়ে সেদিনই বিয়ে করবে।বাড়িতে গিয়ে কয়েকজন আত্মীয় মিলে মেয়ের বাড়িতে গেলাম মেয়ে দেখতে।বাড়ি পৌছেই আমরা অবাক হয়ে গেলাম।
এতো সেই বাড়ি যেখানে একদিন প্রচন্ড ঝড়ে আম গাছের নিচে দাড়িয়ে ভিজেছিলাম।।মেয়েটিকে আমাদের সামনে নিয়ে আসল, মনে হল এই সেই মেয়ে।।আমার বন্ধু সরাসরি বলে দিল সারা পৃথিবীর যে কোন বাড়ি বা মেয়ে কে বিয়ে করবে কিন্তুু এই বাড়িতে কিংবা এই মেয়েকে বিয়ে করবে না।আমি মাথা নিচু করে ছিলাম।ও সবাইকে সেদিনের কথাটা বলল।যারা মানুষের বাহীরটা দেখে মানুষ কে বিশ্লেষন করে তাদের সাথে সম্পর্ক হতে পারেনা।আমাকে টেনে বাহীরে নিয়ে আসল।
আমার দিকে তাকিয়ে বলল আমার জায়গায় থাকলে তুই নিজেও একই কাজ করতি।।দুজন রাস্তায় দাড়িয়ে প্রান খোলে হেঁসেছিলাম।প্রকৃতিই মানুষের কৃতকর্মের ফল দিয়ে দেয়।
।
সেদিন বেতের বাড়ি দেওয়া স্যারটাকে দেখলাম।স্যার বয়সের ভারে চলতে পারেনা।উনার এক হাত আর পা প্যারালাইজড।অসুস্থতার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে।আমি আমার বন্ধুর চেম্বারে যাচ্ছিলাম।স্যার নিচে গাড়ি হতে নামতেই চিনে আমি পা ছুঁয়ে সালাম করলাম।তারপর কোলে নিয়ে ওয়েটিং রুমে বসলাম।কায়েসের কাছে গিয়ে বললাম স্যার এসেছে তুইতো এত বড় ডাক্তার দেখনা কিছু করতে পারিস কিনা।
কায়েস বললো হিমেল এই স্যারই তুকে একদিন লাথি মেরেছিল তাইনা।
আমি বললাম ছোট বেলায় পড়েছি শিক্ষক যেখানে আঘাত করে সেটুকু নাকি জাহান্নামের আগুনে পুড়বেনা।সেসব অতীতের ঘ্লানীর কথা কবেই ভুলে গেছি।
স্যার এখন আগের চেয়ে সুস্থ।
।
অন্ধকার জীবনে কাটানো সেই রাতগুলির যন্ত্রনার কথাও ফিঁকে হয়ে গেছে।তবে কাছের কিছু মানুষের মুখ ফিরিয়ে নেবার কথা ভুলিনি।তারাই আজ আবার নানান সমস্যায় পড়ে আমার কাছে আসে।।ওদের প্রতি বিদ্বেষ নেই তবে নিজের উপর ঘৃনা লাগে।। কখনোই কারো খারাপ চাইনি।কেনই চাইবো,, স্রষ্টা প্রতিটা কাজের পেছনে তার একটা উদ্দেশ্য রেখেছে।কখনো তার প্রতি বিমুখ হতে নেই।।
।।
ছোট বেলায় দাদিকে প্রায়শয় বলতে শুনতাম,,আজ মরলে কাল হবে দুই দিন।।
এই এক লাইনের চেয়ে বড় শিক্ষা পৃথিবীর কোন বই দিতে পারবে না।।
কায়েস প্রায়শই এটা সেটা গিপ্ট করে, ল্যাপটপ,কখনো মোবাইল,বিভিন্ন এন্টিক,বই।
ওরে বলি এসব নিতে খুব লজ্জা লাগে এসব দিসনা।।কায়েস বলেছিল,,DOST is the day I will stop loving you, when my eyes will closed forever..।।
এক সাথে কত দিন অনাহারে থেকেছি,,একসাথে ইটের বুকে কত হাতুরী চালিয়েছি।এক গ্লাস পানি দুজন খেয়েছি।কখন জানি পরস্পর পরস্পরের বুকে লিপিবদ্ধ হয়ে গেছি।।
।
জীবনটা কিছুই না আবার অনেক কিছু।।
প্রানের কোন মূল্য নেই কারন এর চেয়ে দামি কিছু হতেই পারেনা।
আপনার জুতা নেই বলে কাঁদছেন আর একজনের পা টাই নেই।কথা গুলি বড় বেশি সত্য।
আজকের দিনের প্রতিটা মূহুর্ত বেঁচে থাকুন।।দেখা আর উপলব্দি করার মত মন তৈরি করুন।আপনাকে এড়িয়ে যাওয়া মানুষটিই হয়ত আপনাকে সবচেয়ে বেশি ভালবাসবে।।সত্যটা কখনো বলে বুঝানোর কিছু নেই।। অনুভবের তিব্র আকুতিই আগামীর ভোরটাকে কুয়াশার আবরন হতে মুক্ত করবে।।
।
প্রকৃতি কেন বিষন্ব হয় জানেন,,
যখন স্রষ্টার মন বিষণ্ণ হয় আর তখন তার বিষণ্ণতা তার সৃষ্টির মাঝেও চলে আসে।আপনি ভাল থাকলে আপনাকে যারা ভালবাসে দেখবেন তারাও ভাল থাকবে।।।
সবশেষে
ভাল থাকুক সকল ছোট্ট দুই হাতের মালিকরা।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now