বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

জীবনের গল্প

"জীবনের গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "জীবনের গল্প" . . সন্ধ্যার আকাশে রক্তিম সূর্যটা আকাশের পশ্চিম প্রান্তে প্রায় ডুবুডুবু অবস্থায় আগ্নিকুন্ড রুপে স্থির হয়ে আছে। গগণ চুম্মি এই রক্তিম সূর্য রশ্নি আকাশের দূরত্ব ভেদ করে সোজা ব্যালকুনিতে এসে আচড়ে পরেছে। এমন সময় ব্যালকুনিতে আরাম কেদারায় আবস্থান করছে শুভ। পড়ন্ত বিকেলের এই মনমুগ্ধকর পরিবেশের সঙ্গি হয়েও তার হৃদয় আজ শূন্যতার হাহাকারে ছটফট করছে। শুভ পেশায় একজন ডাক্তার। শহরের অনেক বড় মেডিকেলের একজন বিশেষজ্ঞ সে। শুভও আজ অন্য আর দশ জন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির কাতারে একজন। কিন্তু একাকীত্ব আর যন্ত্রনায় তাকে একদম হ্রাস করে ফেলেছে। কোন কিছুতে মন বসছে না তার। বিশেষ করে ইতি চলে যাওয়ার পর থেকেই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। একটি বারের জন্যেও সত্যিটা জানার চেষ্টা করলনা সে। কি ছিল তার দৃষ্টির আড়ালে? নাহ! কিচ্ছু দেখল না সে। বরং ভুল বুঝে সেই যে চলে গেল আর ফিরে এল না। শুধু তাই নয়! চলে তো গেলই, কিন্তু দিয়ে গেল মিথ্যে অপবাদ। . একদিন এমন একটা সময় ছিল যখন শুভর যোগ্যতা থাকা সত্বেও টাকার অভাবে চাকরিটা হচ্ছিল না। কারন বর্তমানে প্রচলিত নীতি তো এটাই যে, টাকা ছাড়া কিছুই হয়না তাতে যোগ্যতার জোড় যতই থাকুক! কিন্তু এত বড় একটা মেডিকেলের বিশেষজ্ঞ হিসেবে সরকারি আওতায় চাকরি পাওয়াও তো চাট্টেখানি কথা নয়! আর শুভর পক্ষেও ঐ মূহুর্তে এত বড় অংঙ্কের টাকা দিয়ে চাকরিটা পাওয়া সম্ভব ছিল না। ঠিক এমন পরিস্থিতিতে শুভর কিছুই করার ছিল না। তাই তার স্বপ্ন পূরনের জন্য নিরুপায় হয়ে ইতির বাবার সাহায্যে হাত বাড়াতে বাধ্য হয় সে। অতঃপর শুভর চাকরিটা হয়। এত দিনের আশা ভরসা আর স্বপ্ন পূরন হয় তার। . ইতি আর শুভ দুজন দুজনকে আগে থেকেই ভালবাসতো। শুভ মেডিকেলে ফাইনাল ইয়ারে থাকা কালীন তাদের এই রিলেশনের সূচনা। তারপর পারিবারিক ভাবেই ব্যাপারটা মেনে নেয়া হয়। যা হোক, ইতির বাবা তার মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজের টাকা পয়সা খরচ করে শুভর চাকরিটা পাওয়া ব্যবস্থা করে দিয়েছিল। আসলে এ যুগে স্বার্থ ছাড়া কেউ কিছু করে না। হয়ত এর পিছনে তারও একটা স্বার্থ ছিল! আর তা হল, তার মেয়ে ইতির জীবনের সুখ। অবশ্য পৃথিবীর প্রত্যেকটি বাবার ক্ষেত্রে এটুকু স্বার্থের দাবী অস্বাভাবিকের কিছু নয়। আর শুভও দেখতে শুনতে মন্দ ছিল না। তবে তার পরিবারে ছিল না কেউ। ইতির সাথে তার সম্পর্কের কথা পরিবারে জানাজানি হওয়ার পর থেকেই ইতির পরিবারের সাথে নিজেকে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিয়েছিল শুভ। শুভ মেসে থেকে পড়ালেখা করলেও ইতির সাথে মাঝে মাঝে তাদের বাসায় আসা যাওয়া হতো। এতে ইতির পরিবার থেকেও তেমন কোন প্রভাব পরতো না। . যাইহোক, শুভর চাকরিটা হওয়ার কয়েক মাস পর ভাল দিন তারিখ দেখে তাদের ধুমধাম করে বিয়ে দেয়া হয়। খুব ভালই চলছিল তাদের বিবাহের এই দাম্পত্য জীবন। এভাবে ঠিক তিনটি বছর দেখতে না দেখতেই কেটে গেল তাদের। সুখ আর আনন্দে ভরপুর ছিল তাদের ছোট্ট সংসারে। কোন শূন্যতা বা অপ্রাপ্তি কখনই স্পর্শ করতে পারেনি তাদের। তাদের আনন্দের সীমা আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে লাগল যখন তারা জানতে পারল ইতি তিন মাসের অন্তসত্বা। খুশিতে দিশেহারা হয়ে পরেছিল তারা। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! ঠিক এমনই এক আনন্দমূখর সময়ে হঠাৎ সব কিছু তছনছ হয়ে গেল তাদের। ভেঙ্গে চুড়মাড় হয়ে গেল মনের মাধুরীতে সাঁজানো স্বপ্নের রাজ মহল। কাল বৈশাখি ঝরের ন্যায় সব কিছু দুঃখের কালো স্রোতে ভেসে গেল। . এই তো সেই দিনের কথা, এত বছরের এই ডাক্তারি পেশায় কখনও কোন রোগিকে দেখে কাঁদেনি শুভ। কিন্তু সেদিন ইমার্জেন্সিতে যে রোগিকে দেখল তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলনা সে। খুবই মূমুর্ষ অবস্থায় তাকে মেডিকেলে ভর্তি করা হয়েছিল। দ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হল তাকে। আল্লাহর অশেষ কৃপায় সুষ্ঠ ভাবে অপারেশন সাকসেস করল শুভ। কিন্তু শুভর চোখ থেকে ঝর্ণার বেগে অশ্রু গড়িয়ে পরছে। হয়ত আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেনা শুভর এই চক্ষু জলের আড়ালের রহস্য। হয়ত নিশ্চই এর পিছনে খুব বড় একটা রহস্য লুকিয়ে আছে! কিন্তু এই মূহুর্তে এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই কারও। ইতিও ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছে কিন্তু শুভর কাছে কিচ্ছু জানতে চায়নি। . যাইহোক, এক পর্যায়ে সেই রোগি কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর শুভ তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসে। সাথে তার মেয়ে অনুকেও। হ্যা তারাও মা- মেয়ে ছাড়া পরিবারে আর কেউ নেই। এমনকি তার চিকিৎসার জন্য ভিটে বাড়ি টাকা পয়সা যা যা ছিল সব কিছু শেষ করছে তারা। এই মূহুর্তে হাসপাতালের বেড ছাড়া তাদেরও আর কোথাও মাথা লুকানোর ঠাই নেই। মেয়ের পার্ট টাইমের ছোট্ট একটা জব আর টিউশনির টাকা দিয়েই এতদিন তাদের দু মা- মেয়ের কোন রকম টেনে হেচড়ে দিন পাড় হতো। ঠিক এমনই এক বিভীষিকাময় মূহুর্তে আল্লাহ তাদেরকে শুভর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছে হয়ত। মহান আল্লাহ উপরে বসে সব কিছু খুব স্পস্ট দেখতে পায়। আর তাই হয়ত উপরওয়ালা তাদেরকে ঠিক সময়ে ঠিক মানুষের হাতে তুলে দিয়েছেন। যাদের অসহায়ত্ব মোচনের জন্য শুভই এখন একমাত্র ভরসা। হয়ত এর পিছনের রহস্যটা আরও অনেক বড়। . ঐদিকে শুভর এই কাজটা কোন ভাবেই মেনে নিতে পারেনি ইতি। ঘরে একটা ফালতু ঝামেলা নিয়ে এসেছে বলে ইতির মন্তব্য। চেনা নেই জানা নেই হুট করে কোথাকার কোন অসুস্থ মহিলাকে এনে ঘরে আশ্রয় দিয়েছে। তার উপর মহিলাটার সাথে একটা যুবতি মেয়ে। মেয়েটার সাথে কথাবার্তা বলা, তার উপর দ্বায়িত্ব দেখানো, তার পড়ার খরচ ও নিত্য খোঁজ খবর রাখা সহ ইত্যাদি কোন কিছুই মানতে পারছিলনা ইতি। কারন, কোন স্ত্রী তার স্বামীকে অন্য নারীর প্রতি দ্বায়িত্ব দেখানো কোন ভাবেই মেনে নিতে পারে না। সেই সাথে ঐ অসুস্থ মহিলার সেবা যত্ন করাটাও দিন দিন ইতির কাছে চরম অসহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পর ইতি বার বার তাদেরকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়ার কথা বলতো শুভকে। এক পর্যায়ে এই ব্যাপারটা নিয়ে তাদের মধ্যে খুব ঝগড়া হয়। শুভ অনেক চেষ্টা করেছে ইতিকে সব ঘটনা খুলে বলার কিন্তু সে কিচ্ছু শুনতে রাজি নয়। এসব নিয়ে তাদের মধ্যে অনেক কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে শুভ পরিস্থিতি সামলাতে না পেরে ইতির গায় হাত তুলে। আর ইতিও তখন রাগ সামলাতে না পেরে শুভকে ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে যায়। . আজ প্রায় ৭ মাস হয়ে গেল ইতির সাথে যোগাযোগ বন্ধ। অবশ্য এতদিনে বেশ কয়েক বার ইতিকে ফিরিয়ে আনতে তাদের বাড়িতে গিয়েছিল শুভ। কিন্তু প্রতি বারই সে ব্যর্থ হয়েছে। শুভ আসলে ইতি তার রুমের দরজা বন্ধ করে ভিতরে বসে থাকতো। কোন কথা বলার সুযোগ দিতো না এমনকি ইতির মা-বাবাও এব্যাপারে কিচ্ছু জিজ্ঞাস করতো না শুভকে। শুভ নিজ থেকেও যদি ঘটনাটি বলতে চাইতো তাহলে তাকেও থামিয়ে দেয়া হত। তাদের বক্তব্য এটাই ছিল যে, "বিপদের সময় টাকা পয়সা খরচ করে শুভর পাশে দাঁড়িয়েছিল তারা। কিন্তু আজ কোথাকার কোন উটকো ঝামেলা এনে বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছে। যেন তারাই অনেক আপন কেউ। তাই ঐ বাড়ি থেকে যেদিন ওরা বিদায় হবে ঠিক সেদিনই তাদের মেয়ে ইতি আবার ফিরে যাবে, তার আগে নয়"। যা হোক, ইতির মা-বাবার কাছে সেদিনের কথা গুলো শুনে শুভ আর কোন কথা বাড়ায়নি। নিরবে মুখ বুজে শ্বশুর বাড়ি থেকে সেদিন চলে এসেছিল সে। সেই থেকে শুভ আর একটি বারের জন্যেও ইতিকে ফিরিয়ে আনতে যায়নি। এভাবেই ইতিকে ছাড়া কেটে গেল ৭টি মাস। . কিন্তু আজ খুব মন খারাপ শুভর। কারন, খবর পেয়েছে আজ ইতির কোল জুড়ে তাদের নবজাতকের আগমন হয়েছে। শুনেছে তাদের মেয়ে বাবু হয়েছে। আর শুভরও খুব আশা ছিল তাদের মেয়ে হবে। তাই মনটা ব্যাকুল হয়ে আছে তার নবাগত মেয়েটাকে এক পলক দেখার জন্যে। কিন্তু কিভাবে দেখবে তা ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না শুভ। ব্যালকুনিতে আরাম কেদারায় বসে শুধু ভাবতে লাগল অতীতের দিন গুলো। এই ঘর, এই সংসার, এখানের প্রত্যেকটি জিনিস-পত্র সব কিছু ইতির হাতে সাঁজানো। ইতিকে ছাড়া ঘরটা কেমন শূন্য শূন্য লাগছে। কোন কিছুতে মন বসছেনা তার। বুক জুড়ে কিছু চাপা কষ্ট বাসা বেঁধেছে। যেন কলিজাটা কেউ চিপে ধরেছে তার। আর যেন সইতে পারছে না সে। নাহ! আর স্থির থাকতে পারছিল না শুভ। হঠাৎ বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। আজ তাকে যেতেই হবে! অন্তত তার মেয়েটাকে এক নজর দেখার জন্য হলেও তাকে আজ যেতে হবে। ঠিক যেমন ভাবনা তেমন কাজ! শুভ কিছু মিষ্টি জাতব সাথে নিয়ে সকল বাঁধা উপেক্ষা করে দ্রুত চলে গেল তার নবজাতক সন্তানকে দেখার জন্য। . ঐদিকে তার শ্বশুর বাড়িতে অনেক লোকের আগমন। তাদের আত্নীয়-স্বজন সবাই ইতি ও তার মেয়েকে দেখতে এসেছে। বাড়িতে খুশির আমেজ চলছে। ঠিক এমন সময় শুভর আগমনে সবাই নিরব হয়ে গেল। সমস্ত হৈ-হুল্লোড় থেমে গিয়ে মূহুর্তের মধ্য পুরো বাড়িতে কেমন এক স্তব্ধ পরিবেশ বিরাজ করছে। শুভ সমস্ত দ্বিধা-দ্বন্দ উপেক্ষা করে সবার সামনে থেকে সোজা ইতির রুমে গিয়ে প্রবেশ করলো। ইতি বিছানায় শুয়ে আছে বেবিকে কোলের কাছে নিয়ে। শুভ অপলকে তাকিয়ে আছে তার নাবজাতক নিষ্পাপ ফুটফুটে মেয়েটার মুখের দিকে। বাহিরে সবাই বলা বলি করছিল যে, মেয়েটা নাকি তার বাবার মত হয়েছে। হ্যা শুভও সেটা বুঝার চেষ্টা করছিল কিন্তু পারছিল না। . আনন্দে শুভর চোখ জোড়া ঝলঝল করছিল। অনেক আবেগ জড়ানো দৃষ্টিতে প্রাণ ভরে দূর থেকেই কিছুক্ষন দেখে নিল তার মেয়েটাকে। তারপর কাছে এসে মেয়েকে খুব যত্নে কোলে তুলে নিল শুভ। খুশিতে ঝলকানি দিয়ে উঠছিল শুভর নাক, মুখ আর চোখ। কিন্তু নাহ! এই আনন্দটুকুও আর দীর্ঘায়িত হল না। মেয়েটাকে কিছুক্ষন আদর করার পরেই আবার ফিরিয়ে দিতে হল তার মায়ের কোলে। এবার ইতির দিকে দৃষ্টি ফিরাল শুভ। দেখল ইতিরও চোখ জোড়া ঝলঝল করছে আনন্দে। শুভ আস্তে বউয়ের পাশে এসে বসল। এক ধ্যানে দুজন দুজনার দিকে তাকিয়ে রইল তারা। শুভ ইতির কপালে হাত রাখল। ইতি চুপচাপ শুয়ে রইলো। এরপর বউয়ের হাত জোড়া মুষ্টিবদ্ধ করে নিজের হাতে চেপে ধরল। কারো মুখে কোন কথা নেই! একদম চুপচাপ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল তারা। এভাবে কিছুক্ষন থাকার পর হঠাৎ শুভ বলে উঠল, . --জানি, তুমি হয়ত আমার কোন কথাই আর শুনবে না। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি সত্যি আর পারছি না। হয়ত তুমি আর ফিরবে না! কিন্তু একটি বার, শুধু একটি বার তুমি আমাকে আমার কথা গুলো বলার একটা মাত্র সুযোগ দাও! দেখবে তোমার সব ভুল ভেঙ্গে যাবে। প্লিজ! . এক নাগারে কথা গুলো বলতে আবারও কিছু অশ্রু বিসর্জন দিল শুভ। ইতিরও যেন কলিজাটা মোচড় দিয়ে উঠল এমন দিনে স্বামীর চোখে জল দেখে। আরে শুভ তো পুরুষ মানুষ! অথচ কাঁন্নার যেন শেষ নেই তার। সেই ছোট্ট বেলা থেকে কাঁন্নাই ছিল তার একমাত্র সঙ্গি। যা আজও পিছু ছাড়লনা তার। যাইহোক, কথা গুলো বলা শেষ হতেই শুভ তার পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে ইতির হাতের মুঠে গুজে দিল এবং চোখ জোড়া মুছে নিয়ে আবারও বলে উঠল, . --এটা ছাড়া হয়ত তোমাকে ফিরে পাওয়ার আর কোন রাস্তা অবশিষ্ঠ নেই। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি সত্যিই আর পারছি না! তাই অন্তত আমাদের সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে হলেও দয়া করে তুমি ফিরে এসো। plz come back not for me, only think about our child. plz come back! . কথা গুলো শেষ করেই ইতির মুষ্টিবদ্ধ হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে রুম থেকে সোজা বেরিয়ে গেল শুভ। পিছন থেকে শুভকে ডাক দিয়ে ফিরাতে চেয়েও আর ফিরাতে পারল না সে। সেদিনের মত শুভ চলেই গেল কিন্তু কেউ বাঁধা দিল না। এতদিনে ইতিও তার ভুলটা বুঝতে পেরেছে। কিন্তু অত্যাধিক মাত্রার অভিমান তার চোখকে কালো পর্দার মত ঢেকে দিয়েছিল। যা আজ সে স্পস্ট দেখতে পাচ্ছে। সে বুঝতে পেরেছে তার ভুল গুলো। এতদিনের দুঃখ, রাগ, অভিমান সব কিছু ভুলে গেল তার নাবাগত সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে। সত্যি এমনটা করা মোটেও ঠিক হয়নি তার। নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করে উঠে ইতি। এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ মনে পরে শুভর দেয়া কাগজটার কথা! এমন কি লেখা আছে এখানে? যা এত দিনের ভুল ভাঙ্গাতে সক্ষম? অতঃপর খুব আগ্রহ নিয়ে কাগজটা খুলল সে। দেখল একটা গল্প লেখা আছে সেখানে। গল্পের শুরুতেই হেড লাইনের লেখাটি ছিল "জীবনের গল্প" নামে। ইতি মনযোগ দিয়ে পড়তে লাগলো এই জীবনের গল্পটি- → → ★★★ জীবনের গল্প★★★ . আজ থেকে প্রায় ৩৫বছর আগের কথা, একটি এতিম ছেলে ছিল যার পরিবারে আপন বলতে কেউ ছিল না। ছেলেটি জন্মের আগেই তার বাবাকে হারায়। ঠিক তার ৭বছর পর সে তার মাকেও হারায়। ছেলেটি তার মায়ের মৃত্যু খুব কাছ থেকেই দেখেছে। অসুস্থ মা চিকিৎসার অভাবে ছেলের চোখের সামনে যন্ত্রনায় কাতরাতে কাতরাতে কিভাবে মারা যায় তা খুব কাছ থেকে একদম সরাসরি দেখেছিল ছেলেটি। সেই থেকেই ছেলেটির স্বপ্ন হয়ে দাঁড়ালো একদিন অনেক বড় একজন ডাক্তার হয়ে অসুস্থ মানুষের সেবা করবে। কিন্তু কিভাবে? তা হয়ত ঠিক জানা নেই ছেলেটির। . সেই ছোট্ট বেলা থেকেই অনেক কষ্ট করেছে ছেলেটি। কখনও বা রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে কাগজ কুড়াতো আবার কখনও ডাস্টবিন বা পচা নর্দমায় গিয়ে ভাংড়ি মাল কুড়িয়ে দু'বেলা পেটের আহার যোগাড় করতো। কখনও কুলির মত সাহেবদের বাজারের ব্যাগ টেনে দিতো আবার কখনও রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে কাপ-প্রিজ ধোয়ার কাজ করতো। কখনও গ্যারেজ, কখনও বা দালানের ইট ভাঙ্গার কাজ। কখনও ময়লার ড্রেন পরিষ্কারের কাজ আবার কখনও বা কারখানার কাজ। এই অল্প বয়সেই ইত্যাদি আরও অনেক পরিশ্রমের কাজ করতো ছেলেটি। কিন্তু পড়ালেখার প্রতি চরম নেশা ছিল তার। তাই কাজের ফাকে মাঝে মাঝে একটা স্কুলে পড়তে যেত ছেলেটি। ঠিক এমনই এক করুন পরিস্থিতিতে আল্লাহর অশেষ কৃপায় ছেলেটির জীবনে ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। ছেলেটির জীবনে নেমে আসে এক নতুন অধ্যায়। . এলাকার একজন মধ্য বয়সি মহিলা ছেলেটিকে নিত্য ফলো করতো। এমনকি একদিন ছেলেটি স্কুল থেকে ফিরার পর চায়ের দোকানের মালিক তাকে খুব মেরেছিল। কারন, সে দোকানের কাজ ফাঁকি দিয়ে স্কুলে গিয়েছিল। তাই ছেলেটাকে মেরে দোকান থেকে বের করে রাস্তায় নামিয়ে দেয়। ঠিক এমন সময় ঐ মহিলাটি তাকে তার বাসায় নিয়ে আশ্রয় দেয়। শুধু আশ্রয় দেয় তাই নয়! ছেলেটাকে ভাল একটা স্কুলে ভর্তি করে দেয়। ভরন পোষন সহ সব রকমের ব্যবস্থা করে দেয় সে। . ঐ মহিলাটির স্বামী প্রবাসি ছিলেন। পাঁচ বছর পর পর তার স্বামী দেশে আসতো এবং এক দেড় মাস থেকে আবার চলে যেত। তাই তার স্বামী দেশে আসার আগেই ছেলেটিকে হোস্টেলে পাঠিয়ে দিতো এবং স্বামী চলে গেলে আবারও তাকে বাসায় নিয়ে আসতো। মহিলাটি তাকে নিজের সন্তানের মত আদর করতো। ঠিক মত খেয়াল রাখতো, পড়ালেখার খরচ, হোস্টেল খরচ ইত্যাদি সব কিছু বহন করতো। এভাবে করে ঐ মহিলার কোলে থেকেই কেটে গেল প্রায় ১৫টি বছর। ছেলেটি ঐ মহিলাকেই নিজের মা বলে ডাকতো। এখন ছেলেটি অনেক বড় হয়েছে। সব কিছু বুঝতে শিখেছে সে। মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন ছিল সেখানেও চাঞ্চ পেয়েছে। তাই তাকে মেসে থাকতে হতো। তবে মাঝে মাঝে বাসায় এসে মাকে দেখে যেত এবং তার ছোট্ট একটা বোন হয়েছিল তাকেও আদর করে যেত। ঠিক এভাবেই চলছিল আরও কয়েকটি বছর। কিন্তু একদিন হঠাৎ একটা খবর এসে সব কিছু ভেঙ্গে তছনছ করে দিল। ঐ মহিলাটির স্বামী কোন একটা দূর্ঘটনায় নিহত হলেন। তারপর থেকেই সংসারটা ছন্নছাড়া হয়ে গেল। মহিলাটি তার কোলের ৮ বছরের ছোট্ট মেয়েটিকে নিয়ে দূরে কোথাও চলে গেলেন। যাওয়ার আগে ছেলেটিকে বলে গেলেন, তাকে আর না খুঁজতে। জীবনের বাকি পথটুকু কষ্ট করে হলেও চালিয়ে নিতে বলেছিলেন। আর এটাও বলেছিলেন যে, ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন কখনও যেন ভেঙ্গে না যায়। . সেই থেকে ছেলেটির জীবনে আবারও এক নতুন যুদ্ধ শুরু হয়। প্রতিনিয়ত জীবনের সাথে সংগ্রাম করে সামনে এগিয়ে গেল ছেলেটি। কিন্তু এক পর্যায়ে ছেলেটির স্বপ্ন পূরনের দ্বার প্রান্তে এসে সব কিছু শেষ হয়ে যাচ্ছিল। ঠিক এমন সময় আবারও একজন ব্যক্তির সাহায্যের হাত এগিয়ে এসে তার ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন পূরন হয়। তারপর সে একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির কাতারে নিজেকে খুজে পায়। অতঃপর বিয়ে করে নেয় এবং ছোট্ট একটা সাঁজানো গোছানো সংসার হয় ছেলেটির। এভাবে করে কেটে যায় প্রায় আরও কয়েকটি বছর। খুব ভালই চলছিল ছেলেটির এই ডাক্তারি পেশা। কিন্তু একদিন হঠাৎ ছেলেটি তার মেডিকেলে এমন একজন রোগির দর্শন পেল যাকে দেখে ছেলেটি আর ঠিক থাকতে পারছিল না। কারন, তিনিই ছিলেন সেই মহিলা যার উছিলায় ছেলেটি আজ এই পর্যন্ত আসতে পেরেছে। এত গুলো বছর পর আবারও তাকে খুঁজে পেয়ে আনন্দে দিশেহারা হয়ে গেল ছেলেটি। বাচ্চাদের মত ঝাপিয়ে পরে কেঁদে উঠলেন তার সেই মাকে আবারও ফিরে পেয়ে। জীবনের সমস্ত শূন্যতা সব কিছু কানায় কানায় ভরে গেল তাকে পেয়ে। এত গুলো বছর কোথায় ছিল, কিভাবে ছিল তা ঠিক জানেনা ছেলেটি। কিন্তু তাকে আর হারাতে চায়না শুধু এটাই জানে। তাই সেই ছেলেটি তাকে মেডিকেল থেকে ছাড়িয়ে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসলেন এবং ছোট্ট বোনটারও দ্বায়িত্ব নিলেন। . কিন্তু এজন্য ছেলেটিকে চরম খেসারত দিতে হল। ছেলেটির বউ এসব নিয়ে তাকে ভুল বিঝে চলে যায়। যাওয়ার সময় সে তার ঐ ছোট্ট বোনের সাথে জড়িয়ে অনেক বাজে কথাও শুনিয়ে যায়। ভুল বুঝে মিথ্যে অপবাদ দেয়া হয় তাকে। কিন্তু একটি বারের জন্যেও খুঁজে দেখল না যে, কি ছিল তার দৃষ্টির আড়ালে? সেই যে চলে গেল আজও ফিরল না। সেখানেও ছেলেটি প্রায় ৭মাস কষ্ট পেয়ে নিরবে চুপ করে থাকে। এমনকি এখনও খুব কষ্ট পাচ্ছে কিন্তু কাউকে বুঝাতে পারছে না তার কষ্ট গুলো। সেই ছোট্ট বেলা থেকে শুধু কষ্টই পেয়ে এসেছে ছেলেটি। মাঝখানে মাত্র কয়েকটি বছর সুখে কেটেছে হয়ত। কিন্তু আবারও সেই কষ্ট ছেলেটিকে যেন চারিদিক থেকে ঘিরে ধরেছে। যাকে আকড়ে ধরে ছেলেটির জীবনের বাকি দিন গুলো সুখ সাচ্ছন্দে থাকতে চেয়েছিল সেও তাকে ভুল বুঝে দূরে সরে গেল। এখন কি করবে ছেলেটি? সে কি আর কখনও সুখের মুখ দেখতে পারবে না? সে উত্তর আজও জানা নেই ছেলেটির। কিন্তু তবু তার ফেরার আশায় এখনও পথ চেয়ে বসে থাকে ছেলেটি। অনেক কষ্টে অতিবাহিত হচ্ছে তার প্রতিটি প্রহর। . উপরওয়ালা কি তাহলে ছেলেটির ভাগ্যে শুধু কষ্টই লিখে রেখেছে? তবে কি ছেলেটি আর কখনও সুখের মুখ দেখতে পারবে না? তা হয়ত ঠিক জানেনা ছেলেটি। শুধু জানে, সে একদিন ঠিকই ফিরে আসবে। যেদিন সে তার ভুলটা বুঝতে পারবে সেদিন ঠিকই ফিরে আসবে। সেই অপেক্ষায় আজও পথ চেয়ে বসে আছে ছেলেটি। (সমাপ্ত) → → → এতক্ষন খুব মনযোগ দিয়ে গল্পটা পড়ছিল ইতি। কিন্তু আশ্চার্যের বিষয় হল, গল্পটি পড়তে পড়তে কখন যে চোখের জলে বালিশ ভিজে গেল তা ঠিক টের পেল না সে। কষ্টে যেন কলিজা মোচড় দিয়ে উঠতে লাগল তার। অসুস্থ শরীর নিয়ে বিছানার উপর ছটফট করতে লাগল সে। দেহে কোন শক্তি নেই, মুখ থেকে কোন কথা বের হচ্ছিল না। কিন্তু সেই ইতি নিজেই এখন জোড়ে চিৎকার দিয়ে কেঁদে উঠল। খুব জোড়ে জোড়ে চিৎকার করতে লাগল ইতি। নিষ্পাপ নবজাতক সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে আরও অনেক জোড়ে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে শুরু করল। আহা! জীবনে কি চরম ভুলটাই না করছে সে। ইতির কাঁন্নার শব্দ শুনে বাড়ির সবাই এসে তার কাছে ভিড় জমালো। কিন্তু ইতি একদিকে কাঁদছে আর অন্য দিকে করুন কন্ঠে বিলাপ করছে যে, . পৃথিবীর সব চেয়ে বড় পাঁপ কাজটাই সে করেছে। সে এত বড় মনের একজন ব্যক্তিকে বিনা অপরাধে এতদিন শুধু শুধু কষ্ট দিয়ে এসেছে। সামান্ন কারনে সে তার স্বামীকে দুঃখ দিয়েছে। যে লোকটা তার জীবনে শুধু কষ্টই পেয়েছে আজ আবারও সেই তাকেই কষ্ট পেতে হল। চিৎকার দিয়ে কথা গুলো বলছে আর কাঁন্না করছে। এ কাঁন্নার যেন শেষ নেই। মনে হচ্ছে পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ তার বুকে এসে জমা হয়েছে। কারও জীবনের গল্প যে এতটা কষ্টের হতে পারে তা কখনও ধারণাই করতে পারেনি ইতি। তাই এখন শুধু চোখের জল ফেলতে হচ্ছে। . বাড়ির লোকেরা যখন তার কাঁন্নার কারন জানতে চাইলো তখন ইতি তাদের মুখের উপর ঐ গল্পের কাগজটা ছুড়ে মারলেন। তারাও সবাই লেখাটি পড়তে গিয়ে চোখের জলে গাল ভিজিয়ে ফেলল। হ্যাঁ এই গল্পের ছেলেটি আর অন্য কেউ নয়, সকলের অতি পরিচিত ব্যক্তি। যিনি এই বাড়ির জামাই। যিনি ইতির স্বামী। তিনিই হলেন আজকের এই নবজাতকের জন্মদাতা। এটা তারই জীবনের গল্প। . [The End] → → লেখাঃ মেহেদী হাসান শুভ


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -৩৩
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -৩২
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প-৩১
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -৩০
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৯
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৮
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৭
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৬
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৫
→ শেষ জীবনের গল্প - (পর্ব-১২)
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৪
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২৩
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২২
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২১
→ অবরুদ্ধ জীবনের গল্প -২০

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now