বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

যাযাবর

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X যাযাবর -মাহজুব হাসান খোলা জানালা ভেঙ্গে আশ্বিনের ভিজে হাওয়া ক্যালেন্ডারে আগামী মাসের পাতা গুলো উল্টে দেয় রোজ। শোয়ার ঘরে ঝুলতে থাকা ঝুনঝুনি টা গান গায় টুং টাং করে। মনে করিয়ে দেয় বাইরে বাতাস, বাইরে ঝড়, বাইরে রোদের মৃদুতা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালায় সজিব। -“এইভাবে কেউ চুল আঁচড়ায়?” -“কেন, কী হইছে?” -“মনে হচ্ছে গ্রাম থেকে উঠে এসছ।” -“গ্রাম থেইকেই তো আসছি।” -“দেখি তো, কাছে আসো, আমি আঁচড়ে দেই।” মনে মনে বিরক্ত হলেও কিছু বলে না সজিব। চুল টাও কি নিজের মত আঁচড়াতে পারবেনা? তেল পর্যন্ত দিতে পারেনি, বাইরে যাওয়ার আগে চুলে নাকি তেল দেওয়া যাবেনা। চুলে তেল না দিলে কেমন অস্থির লাগে সজিবের; বাতাসে ফরফর করে চুল উড়ে। তবে বিরক্তি টা বেশীক্ষণ ধরে রাখতে পারেনা ও। চুল আঁচড়ানোর ছুতোয় আঁচলের তলে ওর মুখ টা হারিয়ে যায় কিছুক্ষণের জন্য। -“কী করছ?” -“কই, কিছু না তো।” -“সবসময় এক কাজ।” কপট রাগ দেখিয়ে মুখ ঝামটা মারে বুবলি। সত্যি সত্যি রাগ করলে ওর নাকের পাটা ফুলে ওঠে। পার্থক্য টা জানেনা সজিব। ও ভাবে বুবলি হয়তো সত্যিই রাগ করেছে। -“আর করব না।” মনে মনে হাসে বুবলি। কিন্তু, মুখে কিছু বলে না। রাগ-রহস্য নিজে থেকে উদ্ধার করতে পারলে ভাল, না পারলে নাই। সি.এন.জি. ডেকে নিয়ে এসছে সজিব, উঠতে যাবে এই সময় বুবলি হঠাৎ চিৎকার দিয়ে উঠল- -“এই, তুমি বেল্ট পরনি?... ...মাইক্রোফোনে ফীডব্যাকের হাই পীচ সাউন্ড টা ঝাপসা হয়ে আসা শব্দ আর দৃশ্যগুলোর কোলাজ টা ছিঁড়ে ফেলে বেরসিকের মত। চীড়ে যায় কানের পর্দা। বাস্তবে ফেরত আসে সজীব। কিন্তু পুরোপুরি না। চোখের সামনে সিনেমার রঙ্গীন পর্দার মত ভাসতে থাকে, হালকা হলুদ রঙের শাড়িটা। দামী চকচকে স্যুট পরে স্টেজে ওঠা কাঁচা পাকা চুলের মাঝবয়সী সুদর্শন মানুষটা ওর চোখ কান এড়িয়ে যায়। স্টেজে দাঁড়িয়ে ম্যানেজার স্যার কিছু একটা বলতে থাকেন। কিন্তু কী যে বলছেন তা হাজার চেষ্টা করেও বলতে পারবেনা সজিব। ওর মাথায় ঘুরছে হলুদ রঙের শাড়িটা। ওদের অফিসের ইয়ারলি পার্টি হচ্ছে। সাধারণত বাইরে কোন রেস্টুরেন্টেই হয়। কিন্তু এবার বাজেট একটু শর্ট, তাই অফিসের লবি তেই খাওয়া দাওয়ার আয়োজন করা হয়েছে। অফিস এমন কিছু আহামরি না, ছয় তলা বিল্ডিং এর তিন তলার ফ্লোর পুরোটা। স্কয়ার ফিট কত তা অবশ্য বলতে পারবে না সজিব। এসব জিনিসে এমনিতে ওর আগ্রহ কম, বোঝেও না খুব একটা। রিসেপশন ডেস্ক সরিয়ে দেয়ালের গায়ে গায়ে নিয়ে আসা হয়েছে, পাশে আরও দু একটা টেবিল এনে জোড়া দেয়া। রট আয়রন এর চটা ওঠা চেয়ার গুলা সব জড়ো করে রাখা আছে। পঞ্চাশ-ষাট জনের মত লোকের জায়গা হবে, মানুষ বোধহয় তার চে’ বেশী। কেউ চেয়ার গোল করে নিয়ে আড্ডা দিচ্ছে, কেউ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছে। কিন্তু পুরো পার্টিতে ও ছাড়া আর সবাই গড়গড় করে তোতাপাখির মত কথা বলে যাচ্ছে। আর যারা বলছে না তারা গোল গোল চোখ করে, কলের পুতুলের মত মাথা ঝুঁকিয়ে ঝুঁকিয়ে শুনছে। চোখ বন্ধ করে চুপচাপ কান পেতে খেয়াল করলে হঠাৎ মনে হবে, যেন মাছের বাজারে দরদাম চলছে। শুধু সজিবেরই এই বাজারে বেচাকেনার কিছু নেই, লেনা-দেনার কিছু নেই। বাজার? ছোটবেলায় বাপের সাথে হাটে যেত সজিব, হাফপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জী পরে। সপ্তাহে শুধু একদিন হাট বসত। দূর দূর থেকে মানুষ আসত মাসের সদাই করতে। আশেপাশের দু’ তিন গ্রামের একটাই বাজার। সারা সপ্তাহ এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করে থাকত ও। উত্তেজনায় আগের রাতে ঘুমাতে পারত না বলে প্রায়ই ঘুম ভাঙ্গত দেরীতে। সেই দিনগুলাতে বাজারে নিয়ে যায়নি বলে সেকী কান্না। শিমুল তুলার বালিশ ভিজত যেন মাঘের জানালায় বেখেয়ালে ফেলে রাখা বৃষ্টিতে। রাশভারী বাপকে যমের মতো ভয় পেত সজিব, শুধু এই একটা সময় ছাড়া। যার রাগে-হুঙ্কারে ভয়ে প্যান্ট ভিজিয়ে দিত, সেই লোকটাই হাটবারে হয়ে যেত একদম হাসিখুশি ভালমানুষ। টিকটিকির ডিম নিয়ে কাড়াকাড়ি করত ওর সাথে। এক হাতে ছালার ব্যাগ আর এক হাতে ওর ছোট্ট হাত ধরে, দুপুরের রোদ টা সন্ধ্যার গোধূলি না হওয়া পর্যন্ত রাজ্যের গল্প করত। ওদের পূর্বপুরুষের কথা বলত, হাজার মানুষের ভুলে যাওয়া ইতিহাসের কথা বলত। মহাজনের সাথে ঝামেলায় কেমন করে ওদের ভিটেমাটি ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়েছে; নিজের বাপ-দাদার জমি থেকে শুয়োরের বাচ্চাগুলা কেমন করে শেয়াল-কুকুরের মত তাড়িয়ে দিয়েছিল, সেসব কথা। মহাজনের পোষা লাঠিয়াল এর সাথে হাতাহাতির চিহ্ন হয়ে আছে কপালের কাছে বিশ্রী কাটা দাগটা; বুক চাপড়ে গর্ব করার সেসব কথা। ছোট্ট সজিবের কাছে কেবলই গল্প ছিল এসব। যেন তার বাপ বিতাড়িত কোন রাজকুমার, দুষ্টু রাজার শয়তানিতে হার মেনে পালিয়ে এসেছে। পূর্বপুরুষের দুঃখগাঁথা এভাবেই এক জন্মান্তরে উত্তরসূরির রূপকথা হয়ে যায়। যাযাবর মানুষ সবকিছু ফেলে যায়, তার চলার পথে শুধু পড়ে থাকে কিছু চেনা অচেনা গল্প। সেই বাজারের নেশা, সেই রূপকথার নেশা এখনো কাটেনি সজিবের। তাই বুবলিকে বলেনি, কিন্তু মনে মনে খুব করে একটা ছেলে সন্তান চায় সজিব। বাপ-বেটায় একসাথে বাজার করবে শুধু পরম্পরা আছে বলে নয়, একে অপরের বন্ধু হবে বলে। তবু বাপের মত লুঙ্গী পরে বাজারে যাওয়া হয় না তার। কতবার বকে বকে যে বুবলি এই স্বভাবটা বদলেছে তার ইয়ত্তা নেই। একটু দূরেই তো দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা। ঐতো, আই শ্যাডো আর ব্লাশ দেয়া একপাল শহুরে সভ্য মহিলাদের মাঝে তাকে খুকি খুকি লাগে। সস্তা কিছু ফাঁপা প্যাকেটের মধ্যে বুবলিকে মজা বিলে পদ্মপাতার মত অনেক বেশী বন্য আর শুভ্র বলে মনেহয়। ওর তো আর দু’-দশটা কাজের মেয়ে খাটানো থলথলে চর্বিসর্বস্ব পেট না; রীতিমতো দু’ বেলা ঘর মোছা, শিল পাটায় মশলা বাটা পেট। নতুন কেনা জর্জেটে নিজেকে আধা ঢাকি আধা রাখি কায়দায় মুড়ে সব গুলা ছেলের মাথা খাচ্ছে। কলিগ দের লোভে চকচক চোখ আর, লালায় লকলক জীভের আভাস সজিব কে খুব অদ্ভুত ভাবে নাড়া দেয়। নিজের প্রতি হীন্মন্যতার সাথে সাথে স্ত্রীর জন্য ঈর্ষা মেশানো গর্ব টাও ঠেসেঠুসে বুকের আনাচে কানাচে জায়গা করে নেয়। তবে বুবলির ভাবটা এমন যেন ওর দিকে তাকিয়ে থাকা অগুণিত দৃষ্টি, বর্শার ফলার মত বিঁধছে না শরীরে। যেন এসবের অনেক ঊর্ধে উর্ধ সে; যেন এতগুলো যুবকের লালায়িত, মুগ্ধ দৃষ্টিতে তার বড় অরুচী। বড় ম্যাডামের বস্তাপচা বাসি গল্পেই যত আগ্রহ। সজিবদের বড় ম্যাডাম, দিলারা জামান, এম.ডি.’র বউ। কানাঘুষায় শুনেছে সজিব, তাঁর আসল নাম নাকি দিলারা খাতুন, এফিডেভিট করে নাম চেঞ্জ করেছেন; স্যারের টাইটেল নেয়নি পর্যন্ত। দিলারা রশীদ, নামটা তাঁর নাকি ঠিক পছন্দ হয়নি। জামাই এর টাকা দিয়ে বনানী তে একটা বুটিক হাউস দিয়েছে, সাথে বিউটি পার্লার ও। অথচ তাঁর নাম টা নিতে আপত্তি, শালা মে’মানুষ! আজ কোন মডেলের সাথে দেখা হল, কাল কোন নায়িকার ব্লাউজে মসলিনের ফলস বসাল- এই হল তার সারাদিনের গল্প। সহ্য হয় এসব নখড়া? প্রথম প্রথম এই সব গল্পই হা করে গিলেত সজিব। তখন নতুন নতুন চাকরি। স্যারের কথায় একদিন ম্যাডামের সাথে বাজারে পর্যন্ত গেছিল। খুশি মনেই যাওয়া, বসের বউ কে খুশি রাখার অর্থ হচ্ছে চাকরি পার্মানেন্ট করা। তখন সেটার দরকার ছিল খুব। ঢাকায় নতুন, দুঃসম্পর্কের এক মামা ছাড়া পরিচিত কেউ নাই। সেই মামার কথাতেই চাকরিটা হল বোধহয়। সজিব এতটা আশা করেনি, কোথাকার কোন চৌদ্দপোষা মামা; গ্রাম থেকে এসে তার কাছে চাইল, আর ওমনি নাচতে নাচতে উনি চাকরি দিয়ে দিলেন? প্রথমে একটু ভয়ই পেয়ে গেছিল। চাকরি জুটিয়ে দেয়ার সুবাদে, কানা-খোঁড়া মেয়ে ধরে নিয়ে গছিয়ে দিবে না তো আবার? তখনো জানত না, মামার ছেলে মেয়ে নাই। ওনাদের বাড়ি ছেড়ে মেসে ওঠার পর থেকে অনেক দিন ভেবেছে দু’কেজি ওজনের ইলিশ মাছ আর পোয়া খানেক সরিষা নিয়ে একদিন হঠাৎ উপস্থিত হবে। মাঝে সাঝেই শুক্রবারে বাজার করতে বেরিয়েছে সজিব, ইলিশ মাছটা কেনা হয়নি কখনো। তাদের প্রতি অনর্থক সন্দেহের গ্লানি মনের মধ্যে মাছের কাঁটার মতই আটকে ছিল, ওমুখো হতে দেয়নি আর। তার পর তিন তিনটা বোনাস আর একটা ইনক্রিমেন্ট কেটে গেছে। মাস ছয়েক হল বিয়ে করেছে সজিব। ওদের গ্রামেরই মেয়ে, বুবলি। ছোট বেলা থেকেই চিনত, কিন্তু আলাপ ছিলনা তেমন। তখন বৈশাখ মাস; সেই যেবার প্যারিস রোডের গগন শিরীষ গুলো নুয়ে পড়ে মিশে গেল ঝড়ের সাথে, সে সময়ের কথা। সজিব বোঝেনি দাদার আমলের ক’টা গাছ নিয়ে এত মাতামাতি করার কী আছে? ঐ একই ঝড়ে ওর গ্রামের শ’ দেড়েক বাড়ির টিন উড়ে গেছে; পেপারেও এসেছে সে খবর। কাউকে এ নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতে দেখেনি তো। নিজেও কয়েক দিন পর, দাবার ছকে ঘেরা জীবনে দিবারাত্রির ফাঁক গলে এসব অপ্রয়োজনীয় কথা মনে রাখতে ভুলে গেছে। কিন্তু মনে আছে সেই প্রথম দিন গুলোতে বাড়ি ফেরার জন্য অস্থির হয়ে থাকার কথা। লাঞ্চের সময় বাদে পাঁচ ছয় বার চা-সিগারেট খেয়েও সময় কাটত না। সে বৈশাখে ঝড়ের মতই ছিল যে ওর বুবলি। প্রথম প্রথম লজ্জা পেত খুব। কিন্তু ক’দিন যেতেই, আদরের উম্মাদ ঝড়ে সজিব নুয়ে যেত প্যারিস রোডের আকাশ ছোঁয়া গগন শিরীষ গুলোর মত। ক্লান্তির চাদর, অবসাদের ওম নিয়ে এসে শান্তির ঘুম হয়ে নামত ঘুণে ধরা কাঠের ক্যাঁচক্যাঁচে বিছানায়। ঢাকায় আসলে যে কালো মানুষ ফর্সা হয়ে যায়- কথাটা নেহায়েত মিথ্যা না। মেয়েটা কালো ছিল না কখনোই, কিন্তু ঢাকায় এসে গায়ের মেটে রঙ টা পাকা নাশপাতির মত ফুটফুট করে ওঠে। শুধু কী গায়ের রং? ওটুকু হলে তো খুশিই হত সজিব। কিন্তু না, সন্ধ্যার লাজুক রজনীগন্ধার মত এক প্রহর না পেরোতেই লজ্জা ঝেড়ে ফুটে ওঠে বুবলি। একটু একটু করে বৈশাখ শেষ হয়, ঝড় থেমে আসে। কথায় কথায় কবে যে সেই আদুরে, ঈষৎ গেঁয়ো টান টা গায়েব হয়ে গেল ওর কন্ঠ থেকে তা বলতে পারবেনা সজিব। বলতে পারবেনা, শাড়ির ভাঁজের আড়ালে ঠিক কবে থেকে বুবলির নাভিটা উঁকি দেয়া শুরু করল। প্রথম খটকা টা লাগল, যখন বাচ্চা নেয়ার ব্যাপারে দু’ জনের মিল হয়না। সজিব ভেবেছিল অনেক হয়েছে; আর কত? বয়স তো কম হল না, বিয়ের পর দেরী করবেনা খুব বেশী। ভেবেছিল তার গ্রাম্য বউ টা তাতে খুশিই হবে। কিন্তু হিসাব মিলতে চায়না। স্বপ্ন আর বাস্তবতা প্রতারণা করে একে অপরের সাথে। বুবলির এখন বাচ্চা কোলে নিয়ে ঘোরার সময় না। বাপের বাড়িতে যে মেয়ে সারা জীবন বন্দী হয়ে ছিল, এত কষ্টে পাওয়া স্বাধীনতা এত দ্রুত, এত সহজে কিছুতেই সে ছাড়বেনা। এখনো কত কিছু দেখার আছে, শেখার আছে। সিনেপ্লেক্সে সিনেমা দেখবে সে, এয়ারপোর্টে দেখবে প্লেন ওড়া, ধানমণ্ডি লেকে জামাই কে নিয়ে প্যাডেল বোটে চড়ে ঘুরে বেড়াবে। শুধু কি তাই? কোলকাতা থেকে একটা বেনারসী তার কিনতেই হবে, আর দিল্লী থেকে একটা পাখি ড্রেস; সিনেমার নায়ক-নায়িকার মত জড়াজড়ি করে ছবি তুলতেই হবে তাজমহলের সামনে দাঁড়িয়ে। কারও মা একদিন সে হবে ঠিকই, কিন্তু আগে কারও বউ হয়ে জীবনের মিঠে-নোনা স্বাদ টা মনের সাধ মিটিয়ে একটু চেখে দেখতে চায়। তবু, এক ঝড়ো বিকেলের পর ক্লান্ত সন্ধ্যায় ভুল করে এক পশলা বৃষ্টি নামলই নাহয়। যেদিন এইসব নিয়ে কথা কাটাকাটি চলছে তার ঠিক দু’সপ্তাহ পর বুবলির মনে সন্দেহ উঁকি দেয়। তলপেটে হাত রেখে মনে মনে সে দোয়া দরূদ পড়তে থাকে; “আল্লাহ্‌, এখন না, আর ক’টা দিন পরে হোক, শুধু আর ক’টা দিন।” তৃতীয় সপ্তাহের পর আর কোন সন্দেহ থাকে না। বুবলি এবার হাত তুলে দোয়া করে, “আমাদের দু’জন কে ভাল রেখো, কোন ক্ষতি হতে দিও না।” একজনের স্ত্রী বদলে যেতে থাকে আর একজনের মা হবে বলে। গল্পগুলো কখনোই বদলায় না, শধু চরিত্র গুলো বদলাতে থাকে ক্রমাগত। এমনি ভাবেই বদলে যায় বুবলি। শুধু মা হবে বলে নয়; গ্রামের রক্ষণশীল পরিবারে মা-বাবার ভালোবাসা আর আত্মীয় স্বজনের ইঙ্গিত-কটাক্ষ-কটূক্তির দেয়ালে ঘেরা বন্দী মেয়েটা শহরে এসে মুক্তির মোহ খুঁজে পায় বলে। সজিবের মনে এমনিই নিরবিচ্ছিন্ন জোয়ার ভাঁটা চলতে থাকে। তলিয়ে যেতে যেতেও ভেসে উঠতে হয়। চিন্তার স্রোতে হঠাৎ করে বাঁধ দেয় আধা পরিচিত একটা মুখ। -“সজিব ভাই নাকি- অ্যাঁ? চেনাই যাচ্ছে না যে এক্কেবারে। শার্ট কি বুবলি আপা পছন্দ করে দিয়েছে?” -“হ্যাঁ।” -“তাই বলেন। আপনাকে যা হ্যান্ডসাম লাগছে না! উইক ডে তে এ রকম শার্ট পরে আসেন না কেন- কী এক সাদা শার্ট পরে আসেন, বুড়া বুড়া লাগে।” -“এরপর থেইকে আসব।” -“থাকেন তাহলে। আমার আবার আজকে আরেকটা পার্টি আছে, ভাগ্নির জন্মদিন। এই পার্টি খেতে খেতে ফিগারটা কিছুতেই ঠিক রাখা গেল না। আপা কে কিছু খেতে দেন না নাকি- ওমা, এত সুন্দর ফিগার, দেখেই হিংসা হয়।” বোকার মত তাকিয়ে থাকে সজিব, বুঝতে পারেনা কী বলবে। মহিলাই বলে- -“এই রে, আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে। থাকেন, গেলাম, শনিবার অফিসে দেখা হবে।” নিজের অজান্তেই মাথা ঝাঁকায় সজিব। অফিসের কথায় মনে পড়ে যায় আর একদিনের কথা। আবার তলিয়ে যায় ও, একটু একটু করে। অফিসে যাবার জন্য রেডী হচ্ছিল। ভাত বেড়ে দিয়ে বসে ছিল বুবলি, দেরী হচ্ছে বলে, ঘরে এসে দেখে ক্যাটক্যাটে কমলা রঙের একটা শার্ট পরছে সজিব, সাথে নীল জিন্স। -“এইটা কী পরছ?” আয়নায় বুবলির ছায়ার দিকে তাকিয়ে বলে, -“কেন, কী সমস্যা, দেখতে ভাল লাগে না?” -“খ্যাত খ্যাত লাগে।” বোতাম লাগাতে লাগাতে মুখ ঘুরিয়ে তাকায় সজিব। মনটা একটু ব্যাজার হয়েছে। জীবনের প্রথম ইনকামের টাকায় খুব শখ করে ঢাকা কলেজের সামনে থেকে এই শার্ট কেনা। ৫০০ টাকা দামের শার্ট, দোকানদার কিছুতেই দাম কমাবে না; শেষ পর্যন্ত আধা ঘণ্টা ঝুলাঝুলি করার পর ২০০ টাকায় দিল। সেই শার্ট চার বছর চলেছে, এখনো নতুনের মতো; আর তাকে কিনা খ্যাত খ্যাত লাগে? লাগুক, আগামী এক সপ্তাহ এই শার্ট পরেই সে অফিস যাবে। রাগ করে সেদিন ভাত না খেয়েই অফিস চলে আসে। পরদিন আলমারি খুলে দেখে কমলা শার্ট টা নাই, তার বদলে হালকা আকাশি রংএর একটা শার্ট ঝুলছে। রাগারাগি করবে ভেবেও করে না, গত রাতের কথা মনে পড়ে। রাত টা সুন্দর ছিল, সকাল টা খামোখা নষ্ট করে লাভ নাই। কতদিন আগের কথা এগুলো? সজিবের মনে হচ্ছে গত জন্মের এঁটোকাঁটা স্মৃতি বৃথাই হাতড়িয়ে মরছে ও। কিন্তু নির্দিষ্ট একটা মুহূর্ত খুঁজে পাচ্ছেনা কিছুতেই। প্রেগন্যান্সির প্রায় তিন মাস হতে চলল। খুব ভাল ভাবে খেয়াল না করলে এখনো বোঝা যায়না ওই রেশমের মত সমতল, মাখন-কোমল পেটটার নীচে ছোট্ট একটা জীবন ধুকপুক করে বেঁচে আছে। তলপেটে স্নেহের সঞ্চয় টা এখনো পুরুষের কামনার নিমিত্ত শুধু, যত্নের কারণ হয়ে উঠতে আরও কিছুদিন দেরী ছিল বোধহয়। এসব কথা ভেবে শহুরে স্মার্ট কাপল দের ভীড়ে একটু লজ্জাই পেয়ে যায় সজিব। বিয়ের এক বছর না পেরোতেই বউ প্রেগন্যান্ট। অথচ, রঞ্জু ভাইদের বিয়ে চার বছর হতে চলল, সেলিনা আপাদেরও বছর দুই হবে- কই, এদের কেউই তো ওর মত এত ব্যস্ত না। বুবলির কথাই ঠিক মনেহয়, নিজেকে কেমন যেন খ্যাত খ্যাত লাগে। কনুইয়ের ধাক্কা এসে ওর পেটে খোঁচা লাগে। ভাবনার ঢেউ গুলো স্তিমিত হয়ে পড়ে অমাবস্যায় সমুদ্রের মত। ত্যালত্যালে মার্কা একটা গা-জ্বলানো হাসি দিয়ে নাবিল ভাই বলে, -“তারপর, সজিব ভাই, শেষমেশ ভাবী কে তাহলে নিয়ে আসলেন?” লজ্জা পেয়ে হাসে সজিব। নতুন বরের হাওয়া, বাচ্চা না হওয়া পর্যন্ত কাটবে বলে মনে হয় না। একসাথে ছবি তুলতে গেলে এখনো ক্যামেরার দিকে সোজাসুজি তাকাতে পারে না ও, অস্বস্তি হয়। -“ভাবী কিন্তু সুন্দর হয়েছে খুব, পরিচয় করিয়ে দিবেন না?” -“আপনে যান, কথা বলেন। ও খুব মিশুক।” -“বড় ম্যাডাম আছে তো, আর একটু পরে যাই, নাহলে বসে বসে বুটিকের গল্প শুনতে হবে। থাকেন তাহলে, যাই...” ঢেউ থেকে উঠতে যেয়ে আবার চুর চুর করে ভেঙ্গে ঘোলা জলে পড়ে যায় সজিব। হারিয়ে যাওয়ার পর খুঁজতে থাকে নিজেকে। ভাবতে থাকে ওদের টোনা-টুনির সংসারের কথা। একবার ভাত খেতে বসেছে দুজন মিলে, শুক্রবার ছুটির দিন। বুবলি ভাত পাতে রেখে উঠে পড়ল। কী সমস্যা? সজিব ভাত খেলে নাকি কনুই পর্যন্ত ভাত ওঠে, চাষাদের মত খাওয়া; তার সাথে সে ভাত খাবেনা। ততদিনে বুবলির পেটে বাচ্চা, ভালমন্দ কিছু বলাও যায়না; বললেই খাওয়া দাওয়া বন্ধ। তার থেকে নিজে একটু কষ্ট স্বীকার করে নিলেই হয়। শুধু বুবলির সামনেই তো, শুধু তো ছুটির দিন, আর শুধু রাতের খাবার টা। মেয়েটা ওর জন্য এত কষ্ট করছে, ও এটুকু করতে পারবেনা? কেমন স্বামী সে? এরকম গুচ্ছের কাহিনী, প্রতিদিনই কিছু না কিছু লেগেই আছে। তবু ছয় মাস একসাথে থাকার পরও খুব কি বদলেছে সজিব? এখনো সকালে উঠে দাঁত ব্রাশ করত করতে করতে সে বারান্দায় চলে আসে। গ্রীলের ফাঁকে মুখ লাগিয়ে সশব্দে থুথু ফেলে। ঘুম ঘুম চোখে চুলার তলা থেকে বের করে আনা কয়লা, দাঁতে ঘষতে ঘষতে সারা উঠান চড়ে বেড়ানোর আজন্ম চর্চিত অভ্যাস ওকে শহুরে হতে দেয়না। চার ফিট বাই পাঁচ ফিট একটা টয়লেটে ঈষৎ হলদেটে বেসিনের সামনে ডিম লাইটের টিমটিমে আলো টা ওকে সভ্য হতে দেয়না। এখনো চেয়ারে পা তুলে বসে তিন বেলা ভাত খেয়ে আরামের ঢেঁকুর তুলে, জর্দা দিয়ে ঠোঁট লাল করে পান না খেলে দিনটা ভাল যায় না ওর। বেসিনে হাত ধোয় সে, কিন্তু তার আগে ভাতের প্লেটে পানি না ফেলেলে স্বস্ত্বি হয়না। শীতের রাতে পায়ের পাতায় আর কানে সরিষার তেল না মেখে শুলে ঠান্ডা লেগে যায়, গরম চা পিরিচে ঢেলে না খেলে জিহ্বা পুড়ে যায়। এখনো প্রমোশনের আশায়, বসের আলতু ফালতু জোকসে গা দুলিয়ে হাসতে পারেনা ও। ঈশ্বরের মত বিশাল, মস্ত এই বাজখাঁই শহরটা, সভ্যতার ধর্মে, নাগরিকতার জমিনি কিতাবে ওর অন্ধ নাস্তিকতায়, বিশ্বাসের এতটুকু চীড় ধরাতে পারেনা। খোলস এর বাইরেই রয়ে যায় সজিব; উন্মুক্ত, স্বাধীন আর নগ্ন। অফিস পার্টির এসব রুটিন আড্ডা আর আষাঢ়ে গল্প সবসময়ই ওর সিগারেটের তৃষ্ণা বাড়িয়ে দেয়। পকেট হাতড়ে দেখে নেয় আছে কিনা। ভাগ্যিস আছে, নাহলে পাঁচ টাকার নেশার জন্য এই দুপুর রোদে গলতে থাকা পীচের ওপর অনেক খানি হাঁটতে হত। অফিসের ভেতর স্মোক করা নিষেধ, দুই তলায় স্মোকিং জোন আছে ওখানে যেতে হবে। অপমানের ধোঁয়া গুলো বুক ভরে টেনে নিয়ে হতাশার কুয়াশা ছেড়ে দিবে শূন্যে। পকেটে হাত রেখে তাড়াহুড়া করে দোতলাতেই যাচ্ছিল সে। কিন্তু একপাল মেয়েমানুষের উশৃঙ্খল নির্লজ্জ হাসি কানে বড় অশ্লীল ঠেকে। মন আবার ফিরে যায় হলুদ শাড়িটার এক রঙা বেগুনী আঁচলে। সন্দিগ্ধ আর হীন মন টা ভাবে, নিশ্চয়ই ওকে নিয়েই হাসছে ওরা। যে যেখানেই হাসুক, ঠাট্টাগুলো কাঙালের বুকে এসে বাধে। দলটাকে খুব কাছ থেকে পাশ কাটাতে যেয়ে কিছু একটা শুনে ফেলে ও- “...রাত ধরে। গায়ে ব্যাথা নিয়ে বেহুঁশ হয়ে আ...” কথাগুলো গরম পানির ছিটা দেয় সজিবের কানে। আরও বেশী, যখন বুঝতে পারে কথাগুলো বুবলির, আর কথা গুলো ওকে নিয়ে। প্রতি মুহূর্তে যার খোঁটা শুনতে শুনতে, বকা খেতে খেতে ক্লান্ত; যার প্রতিটা কথায়, আচরণে, দেহ ভঙ্গীমায় সজিব নিশ্চিত যে তাকে নিয়ে বুবলির হতাশার শেষ নেই- সেই বুবলির মুখে নিজের সম্পর্কে এমন কথা খুব অবাক করে দেয় ওকে। পরনের কাপড়ে গোধূলির আঁচ লাগার আগে থেকে গোপনে লালিত যে স্বপ্ন- সিনেপ্লেক্স, বেনারসী, প্লেন ওড়া, ধানমণ্ডি লেক, পাখি ড্রেস, তাজমহল- সবকিছু যার কারণে এক নিমেষে একাকার হয়ে যায়; সেই মানুষের জন্য এত প্রেম? এমন নির্লিপ্ত সারল্য, এমন হিংস্র সততা! নিকোটিনের সমস্ত পিপাসা উবে যায় ফুসফুসের প্রত্যেকটা কণা থেকে। রয়ে যায় শুধু প্রাপ্তির সুখ, আর ভুলে যাওয়া কোন এক সিনেমার রঙিন কিছু দৃশ্য। প্রহর পেরিয়ে দুপুর রোদটা গোধূলি হয়ে যায় সবার অজান্তে, অগোচরে। কৃষ্ণচূড়ার গুঁড়িগুঁড়ি ছায়া পাখা মেলে ধবল মেঘের গায়ে। পীচঢালা রাস্তায় গরীবের রিকশা হয় পঙ্খীরাজ। ছাপোষা কর্মচারীর আটপৌরে বাসি জীবনটা এক বিকেলের জন্য রূপকথা হয়ে যায়। -“কী করছ তুমি?” -“কই, কী করলাম আবার?” -“সবসময় খালি এক কাজ।” মুখে কিছু বলে না বুবলি, শুধু চোখে কামনার কাজল নিয়ে কামড়ে ধরে নিচের ঠোঁট। আশ্বিনের সব আর্দ্রতা নিয়ে এগিয়ে আসে বৃষ্টি ঝরাবে বলে। রাগ-রহস্য কি উদ্ধার করতে পারে সজীব?


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৮ জন


এ জাতীয় গল্প

→ সময় বড্ড যাযাবর....
→ যাযাবর

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now