বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
দুই
সত্যি, বন্ধু হারাবার ব্যথা আমি জানি। কারণ আমি আমার এক অতিপ্রিয় বন্ধুকে হারিয়েছি। স্কুলে গেলেই তার স্মৃতিগুলো আমাকে নাড়াদিয়ে ওঠে। তার কথা ভেবে চোখে পানি চলে আসে। সত্যি, সে আমার হৃদয়ে একটা বড় স্থান করে নিয়েছে। তাকে এই পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া বড় কঠিন কাজ। কে বা পারবে তাকে খুঁজে বার করতে? সে যে এক অসাধারণ মানুষ।
আমি যার কথা বলছি তার নাম রবিন। তার বাবার মৃত্যু হয়েছে অনেক আগেই। তার মা একটি এনজিওতে চাকরী করতো। পৃথিবীতে তার আর কোন আপনজন নেই। এই সব তথ্যই আমি জেনেছি তার সম্বন্ধে। তার মার সাথে আমার কোনদিন সামনা-সামনি দেখাও হয়নি। তাহলে, তাকে কোথায় বা পাব?
একদিন আমি আর আমার বন্ধু অর্ণব দুজন মিলে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীর বাড়ির ঠিকানার তালিকা থেকে রবিনের ঠিকানা খুঁজে বার করলাম। ঠিকানাটা বেশ অদ্ভুত ধরনের ছিল। ঠিক এই রকম-
কাজি রবিন আহমেদ
মাতা- বিলকিস আহমেদ
রোড় নং-১৭; বাড়ি-৯/২
পুকুর এলাকা-৩, বটতলা।
আমরা ঠিকানা অনুযায়ী একদিন সময় করে বটতলাতে গেলাম। সিএনজি থেকে নামলাম একটা বড়বাগানের সামনে। “পুকুর এলাকা-৩” খুঁজতে বেশি সময় লাগলো না। তবে জায়গাটা খুঁজে পাবার পর আমরা বেশ অবাক হলাম। কারণ জায়গাটার অবস্থা দেখে। বিশাল বড় একটা মাঠ, ঘর-বাড়ি অনেক কম। সেখানে একটা অনেক বড় পুকুর। তার পাশে বড়-বড় ছয়টা বটগাছ। সেগুলোর বয়স আনুমানিক একশোরও বেশি হবে। সেখানে মানুষজন খুব কম। দূরে কয়েকটি বাড়ি দেখে আমরা হাঁটতে হাঁটতে সেদিকে এগিয়ে যেতে লাগলাম। এবার “রোড় নম্বর-১৭” খোঁজার পালা। খুঁজতে বেশি সময় লাগলো না। কারণ, আমরা ১৭ নম্বর রোড়েই হাঁটছিলাম। সাইনবোর্ডে দেখলাম। এরপর ৯-নম্বর বাড়ি। খুঁজতে খুঁজতে পেলাম রাস্তার শেষ প্রান্তে। বাড়িটা তিনতলা। এর দুইতলায় রবিনরা থাকে। বাড়িটা উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। বড় একটা গেট কিন্তু, গেটে কোন দারোয়ান নেই। আমরা গেট ঠেলা দিয়ে ভেতরে ঢুকলাম। ভেতরে কোন মানুষের দেখা পেলাম না। বাড়ির সামনে ছোট একটা ফোঁয়ারা। ফোঁয়ারাতে পানি ঝরছে।
আমরা এবার বাড়ির সিঁড়ি ধরে উপরে উঠতে লাগলাম। দুইতলায় পৌঁছে দুটি দরজার মুখোমুখি হলাম। কোনটি ওদের বাসা হবে তা বোঝা কঠিন। প্রথমে আমরা বাম দিকের দরজার কড়া নাড়ালাম। দুই থেকে তিনবার কড়া নাড়াবার পর একজন রাগি গোছের মহিলা দরজা খুলে আমাদের দিকে অগ্নিঝরা দৃষ্টিতে তাকালেন। বললেন,তোরা কে? এখানে কি চাস?
আমি অন্তু আর ও অর্ণব। এটা কি রবিনদের বাসা?
না। এটা রবিনদের বাসা না।
আপনি কি রবিনকে চেনেন?
তোরা এই ঠিকানা কোথায় পেলি?
জ্বি, মানে রবিন আমাদের সাথে পড়তো।সে স্কুলে যায়না আজ অনেক দিন হলো। এই জন্য স্কুল থেকে তার ঠিকানা নিয়ে আমরা তারসাথে দেখা করতে এসেছি।
তাকে তোরা কোন দিনও পাবিনা। এবার এখান থেকে তোরা চলে যা।
এরপর আরকিছু জিজ্ঞাসা করবার আগেই তিনি দরজা বন্ধ করে দিলেন। আমরা বুঝলাম, তিনি রবিনদের পরিবারের সকলকেই ভালোভাবে চিনতেন।
এতদূর থেকে এতকষ্ট করে এসে রবিনের সাথে দেখা না করে তো আর যাওয়া যায়না। অন্তত তার বর্তমান ঠিকানাটা তো আমাদের জানা দরকার। তাই আমরা দুই মিনিট পর আবার সেই দরজার কড়া নাড়ালাম। বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষা করেও যখন দরজা খুললনা, তখন আমরা দরজায় জোরে ধাক্কা দিলাম। দরজা এমনিতেই খুলে গেল। আমরা ঘরে প্রবেশ করলাম। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। দেখলাম, ঘরে আর কোন দরজা নেই, আর সেই মহিলা উধাও। শুধু একটা জানালা আছে। জানালা দিয়ে খুব আলো আসছে। জানালার পাশে একটা ঘুনধরা রিডিং টেবিল। লাইট, ফ্যান কিংবা অন্য কোন আসবাবপত্র ঘরে নেই। আমরা ভয়ে একে অন্যের হাত ধরলাম। মনে সাহস আনলাম। এরপর জানালার কাছে যেয়ে দাঁড়ালাম। সেখান থেকে বটগাছ গুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল।
এরপর হঠাৎ আমার চোখ পড়লো টেবিলের একটা ড্রোয়ারের উপর। ড্রোয়ার খুলে আমি অবাক হলাম। রবিনকে উপহার দেওয়া আমার সেই জ্যামিতি বক্সটা। যাতে প্রতিটি জিনিস এখনও অব্যবহৃত অবস্থায় আছে। আরও কিছু কাগজ দেখলাম ড্রোয়ারে। সবই সাদা কাগজ ছিল। কিন্তু তারমধ্যে একটা কাগজে লাল কালিতে লেখা – 'দুঃখিত অন্তু। আমি তোর মৃত্যুর জন্য দায়ী হতে চাই না'।
অর্ণব জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল। আমি গোপনে কাগজটা ভাজ করে প্যান্টের পকেটে ঢুকালাম।
আমি অর্ণব কে বললাম – অর্ণব, আমার মনে হয় আমাদের এখানে আর বেশীক্ষণ থাকাটা উচিত হবে না।
অর্ণব বলল- চল, তাড়াতাড়ি চলে যাই।
এরপর আমরা ঘর থেকে দ্রূত বের হয়ে আসলাম। বাড়িটা থেকে বের হয়ে খুব জোরে হেঁটে আমরা বটগাছ গুলোর নিচে এসে দাড়ালাম। গাছগুলোর দিকে দুজন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি। কেমন যেন ধোঁয়া ধোঁয়া ভাব। দুজনেই নির্বাক। চারিদিকে শান্ত পরিবেশ। এমন সময় হটাৎ চমকে উঠলাম। মনে হলো পেছন থেকে কেউ কর্কশ গলায় ডাক দিল, “অন্তু”। সজোরে পিছনে ফিরলাম। দেখলাম একটা আলোর গোলা খুব দ্রুতগতিতে চোখের পলকে বটগাছ গুলোর উপর দিয়ে উড়তে উড়তে সেই বাড়ির দিকে যেয়ে জানালাটাকে উজ্জ্বল করে তুলল। এরপর ধীরে ধীরে আলোটা নিভে গেল।
আজ অনেক দিন হয়ে গেল। তারপর থেকে আমরা আর রবিনের কোন খোঁজ করিনি। আমি আর অর্ণব ঘটনাটিকে নিজেদের মধ্যেই রেখেছি। কাউকে বললে আমাদের ক্ষতি হতে পারে, এই কথা ভেবে কাউকে বলিনি। রবিন আমাদের খুব ভালো বন্ধু ছিল। একসময় স্কুলের স্যার-ম্যাডাম থেকে শুরু করে ছোট-বড় সবাই জানতো যে, আমরা তিনজন একে অপরের বেস্টফ্রেন্ড। শুধু স্কুলের সময় নয়, দিনের পুরোটা সময়ই আমরা তিনজন একসাথে কাটাতাম। সবাই আমাদেরকে থ্রী-ডায়মন্ড নামে চিনতো।
রবিন আমার খুব ভাল বন্ধু হবার কারণে, তার একটা গোপনীয় ব্যাপার “তার পরিচয়” আমি একদিন হঠাৎ জেনে ফেলি। আর এটাই বোধ হয় ওদের নিয়ম, যে ওদের সত্য পরিচয় যে টেরপায় তাকে ওরা মেরে ফেলে। কিন্তু রবিন আমার প্রকৃত বন্ধু ছিল। যার কারণে সে নিজেকে আমার কাছ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়েছে। অবশ্য অর্ণব এব্যাপারে আগে কিছুই জানতো না। এইবার রবিনদের বাড়ি থেকে ঘুরে আসার পর তাকে সবকিছু জানাতে হয়েছে। নির্দ্বিধায় অর্ণব একজন সাহসী ছেলে বলা চলে।
তবে সেই কাগজটা আমার কাছেই আছে। সাদা কাগজে লাল কালির লেখাগুলি বেশ অদ্ভুত। দেখলে মনে হয় এর মাঝে আরও অনেক অর্থ লুকিয়ে আছে। যা আমাকে আরও অবাক করে তোলে। মনের ভেতরে রবিনকে নিয়ে জাগে নানান কৌতুহল। আসলেই সে আজব ছিল। আমাকে আরও একবার হঠাৎ ঝলক দিয়ে চলে গেল।
তবে জীবনে শেষবারের মত হলেও রবিনের সাথে আমার দেখা করবার ইচ্ছে আছে। দেখি, ভবিষৎতে তার দেখা মেলে কিনা। আমি সব চেষ্টাই করব তার সাথে দেখা করবার জন্য।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now