বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
হৃদয়হীন প্রাণী
.
অনেক দ্রুত দৌড়াচ্ছি মনে হচ্ছে এখন যদি উসাইন বোল্ট আমার সাথে দৌড়ে প্রতিযোগিতা করে তাহলে আমি জয়ী হব। দৌড়াতে দৌড়াতে পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখলাম ১১টা ২৬ বাজে আর মাত্র চার মিনিট পর তুর্ণা এক্সপ্রেস ছাড়বে। এই ট্রেন মিস করলে আজকে চট্টগ্রাম যেতে পারব না। হাপাতে হাপাতে এসে কমলাপুর রেলস্টেশনে আসলাম। ওইতো ট্রেন চলতে শুরু করছে আবার দৌড় দিলাম। কোনরকম একটা বগির হাতল ধরে ট্রেনে উঠলাম।অনেক পানি তৃষ্ণা পেয়েছে একটু পানি খেতে পারলে ভাল লাগতো।পকেটে খুচরো কয়েকটা টাকা আছে এই খুচরো দিয়ে পানি কেনা যাবেনা। আশেপাশে তাকাতে লাগলাম যদি কারো কাছে পানির বোতল দেখতে পাই। পিছনে তাকাতেই দেখতে পেলাম গার্ড এদিকে আসছে। আমি দাঁড়িয়ে না থেকে সামনের দিকে আগাতে লাগলাম। দুইটা বগি পার করে এসে তৃতীয় নম্বর বগিতে ঢুকে পরলাম। এই বগিতে মাত্র তিনজন মানুষ আছে মধ্যবয়সী একজন পুরুষ একজন মহিলা আর বাকীজন বাচ্চা একটা মেয়ে। মনে হচ্ছে একটা পরিবার রিজার্ভ করে নিয়েছে বগিটা। আমি অনুমতি ছাড়াই একটা সীটে ধপাস করে বসে পড়লাম। আমাকে বসতে দেখে উনারা আমার দিকে কটু দৃষ্টি নিয়ে তাকালো। মজার বিষয় হচ্ছে বাচ্চা মেয়েটা এতক্ষণ কান্না করছিল আমাকে বসতে দেখে কান্না থামিয়ে দিলো। আমি মহিলাকে লক্ষ্য করে বললাম আন্টি পানি আছে? একটু পানি দেওয়া যাবে? মহিলা নিচ থেকে ব্যাগ উঠিয়ে পানির বোতল আমার দিকে এগিয়ে দিল।আমি বোতলের মুখ খুলে ঢকঢক করে অর্ধেক বোতল পানি খেয়ে ফেললাম। বোতল ফিরিয়ে দিয়ে বললাম বগিটা কী আপনারা রিজার্ভ করেছেন? পুরুষ লোকটা বলল হ্যাঁ। আমি বললাম আঙ্কেল কিছু মনে না করলে আমি এখানে পাঁচ মিনিট থাকি? পুরুষ লোকটা একবার মহিলার দিকে তাকালো তারপর বলল আচ্ছা থাকো। আমি ধন্যবাদ জানিয়ে মাথাটা সীটে এলিয়ে দিলাম। বাচ্চা মেয়েটা এবার কথা বলে উঠলো ওর মায়ের কাছে জিজ্ঞাস করল আম্মু উনি কে? মহিলা বলল আম্মু ও তোমার ভাইয়া হয়। ওর মায়ের কথা শোনার পর মেয়েটা কোল থেকে নেমে এসে আমার সামনে দাঁড়ালো আমাকে ভাল করে দেখতে লাগলো। দেখা শেষ হলে ওর মায়ের কাছে ফিরে গিয়ে বলল আম্মু এইটা কোন ভাইয়া? আমার ভাইয়াতো মরে গেছে। ওর আম্মু আবার বলল এইটা তোমার আর একটা ভাইয়া। মেয়েটা আবার আমার কাছে চলে আসলো আমি যে সীটে বসে আছি তার পাশের সীটে উঠতে চেষ্টা করলো আমি ওকে তুলে নিয়ে আমার কোলে বসালাম। কোলে উঠেই কথা বলতে শুরু করলো,তুমি আমার ভাইয়া? আমি বললাম হ্যাঁ আমি তোমার ভাইয়া। ভাইয়া তুমি কোথায় যাবা? আমি স্বাভাবিকভাবে বলালাম যে দিকে চোখ যায়। কেন তোমার বাড়ি নাই? আমি বললাম নাহ আমার কোন বাড়ি ঘর নাই। বাড়ি না থাকলে তোমার বাবা মা কোথায় থাকে? আমি ওর দিকে তাকালাম বুঝতে চেষ্টা করলাম ওর বয়স কত হবে সর্বোচ্চ চার বছর হবে। এই বয়সে পাকনা পাকনা কথা শিখে গেছে। আমি কিছুক্ষণ ভেবে বললাম আমার বাবা নাই আপু আমি আমার মাকেও চিনি না। এই সভ্যসমাজ আমাকে জারজ সন্তান বলে। আমার কথা শুনে মেয়েটার বাবা মা দুইজনেই আমার দিকে তাকালো। হয়তো ভাবছে কীভাবে আমি স্বাভাবিক থেকে নিজের পরিচয় দিচ্ছি। আমি এবার ওকে জিজ্ঞাস করলাম আপু তোমার নাম কী? ও উত্তর দিল আমার নাম সুমাইয়া। তোমার নাম কী ভাইয়া? আমি বললাম আমার নাম ফাহাদ। সুমাইয়া জিজ্ঞাস করলো ভাইয়া জারজ কী? আমি বললাম তুমি বড় হও তখন বুঝতে পারবে। ও আচ্ছা বলে ওর মায়ের কাছে চলে গেল। ওর মায়ের কাছে গিয়ে চিপস চাইলো ওর মা ওকে দুই প্যাকেট চিপস বের করে দিল ব্যাগ থেকে। চিপস নিয়ে সুমাইয়া আবার আমার কাছে এসে হাত বাড়িয়ে দিল আমি ওকে কোলে তুলে নিলাম। আমাকে বলল চিপসের প্যাকেট ছিঁড়ে দিতে। চিপসের প্যাকেট ছিঁড়ে দেওয়ার পর একটা চিপস নিয়ে আমার মুখে তুলে দিল আমি খেতে চাইলাম না। ও জোড় করে আমাকে চিপস খাইয়ে ছাড়ল। দুইজনে ভাগ করে দুই প্যাকেট চিপস খেয়ে নিলাম। চিপস খাওয়া শেষ হলে সুমাইয়া আমার সাথে বিভিন্ন গল্পগুজব করতে করতে আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে গেল।
.
সুমাইয়াকে কোলে নিয়ে ওর বাবার কাছে গেলাম বললাম, আঙ্কেল ওকে নিন আমি চলে যাব। আঙ্কেল জিজ্ঞাস করল কোথায় যাবে? আমি বললাম জানিনা কোথায় যাব। তুমি এতদিন কী করতে, কোথায় ছিলে?এতদিন মাস্তান ছিলাম আজ এক মন্ত্রীর ছেলেকে খুন করে পালিয়ে এসেছি। আমার কথা শুনে আঙ্কেল আন্টি দুইজনেই চমকে উঠলো। আঙ্কেল আমাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। দেখা শেষ হলে বলল, কোথাও যেতে হবে না। এখানেই থাকো সকাল হলে আমার বাসায় যাবে আমাদের সাথে। আঙ্কেলের কথা শুনে এবার আমি চমকে উঠলাম। আমার অবস্থা দেখে আঙ্কেল বলল ছাত্র জীবনে সাইকোলজি নিয়ে পড়ালেখা করেছি। এখনো সাইকোলজিক্যাল উপন্যাস সাইকোলজিক্যাল গল্পের বই পড়ার নেশা আছে। তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে বিশ বাইশ বছরের বেশী বয়স হবে না। আমার ছেলেটারও বয়স ছিল বিশ বছর, মাসখানেক আগে মারা গেছে। তুমি আমার ছেলের বয়সী হবে। আমি আবার আঙ্কেলের দিকে তাকিয়ে কিছু অনুসন্ধান করতে লাগলাম। আঙ্কেল বলল তুমি জানতে চাইছো আমার বয়স এতো অথচ সুমাইয়া এতো ছোট কেন? আমার বয়স বিয়াল্লিশ বছর বিশ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলাম তোমার আন্টিকে। তোমার আন্টি আর আমি ক্লাসমেট ছিলাম। আমাদের মধ্যে ভাল বন্ধুত্ব ছিল আমাদের আন্ডারস্ট্যান্ডিং ভাল ছিল। আগে মানুষ মেয়েদের তাড়াতাড়ি বিয়ে দিতো। তোমার আন্টির বিয়ে দিতে চেয়েছিল অন্য জায়গায়। ওর বিয়ের কথা শুনে আমার খারাপ লাগে ওকে বিয়ের প্রস্তাব দেই কিন্তু ও রাজি হয় না ওর বাবার কথা ভেবে। আমি ছিলাম আমার বাবার একমাত্র ছেলে তিন মেয়ের পর আমি হয়েছিলাম আমার আদরটাও ছিল বেশী। বাবার কাছে গিয়ে জেদ ধরেছিলাম বিয়ে করব বলে। তারপর বাবা সব ব্যবস্থা করে দেয়। শোনো বাবা তুমি যখন কোন সংকোচ ছাড়াই সব কিছু বলতেছিলে তখনই আমি বুঝে গেছি তুমি সাধারণের বাইরে। আমার মেয়ের প্রতি তোমার ভালবাসা দেখে বুঝে গেছি তোমার ভিতরে ভাল একটা মন আছে। দেখতে পারছো মেয়েটা কিভাবে তোমাকে জড়িয়ে ধরে আছে। মনে হচ্ছে তুমি ওর কতদিনের চেনা। অনেক চেষ্টা তদবির করে দাম্পত্য জীবনের প্রায় সতের আঠার বছর পর আল্লাহ মেয়েটাকে দান করছেন। আমি চাইনা মেয়েটা আমার কষ্টে থাকুক। তুমি যদি এখন চলে যাও ও ঘুম থেকে উঠে তোমাকে পাবে না। তোমাকে না পেলেই আবার কান্নাকাটি শুরু করে দিবে। আমার ছেলেটা ছিল জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী হাটতে পারতো না কথা বলতে পারতো না। ডাক্তার বলেছিল ও বাঁচবে না। আস্তে আস্তে মেনে নিয়েছিলাম বাস্তবতা। মেয়েটা ওর ভাইকে খুব ভালবাসতো ভাইয়ের সাথেই সবসময় থাকতো এমনকি রাতে ভাইকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতো। ওর ভাইয়া মারা যাওয়ার পর ও সবচেয়ে বেশী ভেঙে পরে ওর ভাইয়ার ঘরে গিয়ে ওর ভাইয়াকে খুঁজে না পেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দেয়। অনেক কষ্টে ওকে বোঝাতে সক্ষম হই যে ওর ভাইয়া মারা গেছে। আজ তোমার সাথে ওর আচরণ দেখে আমি তোমার আন্টি দুজনেই খুব খুশি হয়েছি অনেকদিন পর শান্তির নিশ্বাস ফেলেছি। এখন যদি তুমি চলে যাও তাহলে কাল আবার আগের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। আঙ্কেলের কথা শেষ হলে আমি সুমাইয়ার দিকে তাকিয়ে দেখলাম এখনো আমার বুকে মাথা গুঁজে ঘুমাচ্ছে। আমি ওর মুখে একটা চুমু এঁকে দিয়ে আঙ্কেলের সামনের সীটে বসে পরলাম। কিছুক্ষণ পর আন্টি জিজ্ঞাস করলো রাতে কিছু খেয়েছো? আমি মাথা ঝাঁকিয়ে না বললাম। আন্টি ব্যাগ থেকে টিফিন বক্স বের করলো দেখলাম বক্সের মধ্যে নুডলস আছে। আন্টি চামচে করে নুডলস নিয়ে আমার মুখে সামনে ধরলো বলল খায়ে নাও। আমি আন্টির দিকে তাকিয়ে রইলাম আন্টির মুখে দেখতে পাচ্ছিলাম একজন মমতাময়ী মায়ের প্রতিচ্ছায়া। আমি মনে করতে চেষ্টা করলাম শেষ কবে কে আমাকে এভাবে স্নেহময়ী হাতে খাইয়ে দিয়েছিল। আন্টি আর বলল কী হলো হা করো আমি হা করে নুডলস টুকু মুখে নিয়ে খেয়ে নিলাম। নুডলস খাওয়ার সময় আমার পাথরের মত শক্ত হৃদয় ফেটে পানি বের হতে চাচ্ছিল। কিন্তু আমি পানি বের হতে দেইনি। এ হৃদয় দিয়ে পানি বের হতে পারে না। এ হৃদয় শুধু মানুষের রক্ত দিয়ে হলি খেলতে পারে।
.
সকাল সাতটার দিকে চট্টগ্রাম এসে পৌঁছালাম। ট্রেন থেকে নেমে সি এন জি তে উঠে আঙ্কেলের বসায় গেলাম। বাসা দেখে মনে হলো খুব ধনী পরিবার। আঙ্কেল আমাকে হাত ধরে নিয়ে একটা রুমে ঢুকল বলল, এটা আমার ছেলের রুম ছিল তুমি আজ থেকে এখানেই থাকবে। কথাগুলো বলার সময় দেখলাম আঙ্কেলের চোখে পানি চিকচিক করছে। হঠাৎ করেই সুমাইয়া দৌড়ে এসে ভাইয়া বলে হাত বাড়িয়ে দিল আমি ওকে কোলে তুলে নিলাম। আঙ্কেল সুমাইয়াকে বলল ভাইয়াকে ছেড়ে দাও ভাইয়া এখন ফ্রেশ হবে। আমি বললাম আঙ্কেল সুমাইয়া আমার কাছে থাকুক। আমার কথা শুনে সুমাইয়া বলে উঠলো আমি ভাইয়ার কাছে থাকব। আঙ্কেল রুম থেকে যাওয়ার আগে বলে গেল ওয়ারড্রবে কাপড় আছে। ড্রেসিংটেবিল প্রয়োজনীয় সব কিছু আছে কোনরকম সংকোচ ছাড়া সবকিছু ব্যবহার করবে। আঙ্কেল চলে গেলে সুমাইয়া গল্প শুরু করে দিল ওর ইয়া বড় টেডিবিয়ার আছে, ছাদে ফুল গাছ আছে, ফুল গাছে প্রজাপতি এসে বসলে ও ধরতে যায়। কিন্তু প্রজাপতি ওকে ফাঁকি দিয়ে উড়ে যায়। আমাকে বলল ভাইয়া আমার একটা প্রজাপতি ধরে দিবে? আমি বললাম ঠিক আছে আমি তোমাকে প্রজাপতি ধরে দিব। সুমাইয়া চলে গেলে বাতরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসলাম। বিছানায় বসে ভাবতে লাগলাম কাল কোথায় ছিলাম আজ কোথায় আছি। গতকালও এই সময়ে আমি ছিলাম মাস্তান, শহরের টপ ক্লাস মাস্তান। কাউকে খুন করতে আমার হাত কাঁপতো না।কাল এই সময়েই আমার কোন পরিবার ছিল না। সুমাইয়ার মত কেউ ভাইয়া বলে ডাক দিত না। সুমাইয়ার বাবার মত কেউ হাত ধরে বললত না আজ থেকে এখানেই থাকবে। এক দিনের ব্যবধানে আমি পশু থেকে মানুষ হয়ে গেছি। একটা পরিবারের সদস্য হয়ে গেছি ছোট একটা নিষ্পাপ শিশুর ভাইয়া হয়ে গেছি। আন্টি এসে ডাকদিল নাস্তা করার জন্য। ডাইনিং রুমে গিয়ে চেয়ারে বসলে আন্টি পরাটা আর ডিম ভাজি প্লেটে উঠিয়ে দিল। আমি মাথা নিচু করে খেতে শুরু করলাম। সুমাইয়া এসে আমার কোলে বসল আমাকে বলল ভাইয়া আমাকে খাইয়ে দাও। সুমাইয়ার আসা দেখে আন্টি বলল তুমি আমার কাছে আসো আমি খাইয়ে দিচ্ছি। সুমাইয়া বলল না আমি ভাইয়ার সাথে খাবো। আমি আন্টিকে বললাম সমস্যা নেই ও আমার সাথেই খাবে। পরাটা ডিম ভাজি ছিঁড়ে সুমাইয়ার মুখে তুলে দিতে লাগলা। কিছুক্ষণ পর আন্টির ফোঁপানোর শব্দ পেলাম তাকিয়ে দেখলাম আন্টি আমাদের দিকে তাকিয়ে কাঁদছে। আমার তাকানো দেখে আঁচলে মুখ ঢেকে আন্টি রুমে চলে গেল।
.
নাস্তা শেষ করে সুমাইয়াকে নিয়ে টিভির রুমে আসলাম। দেখতে পেলাম বাংলাদেশের প্রতিটা চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজ বন্ধুর হাতে খুন হয়েছে মন্ত্রীর ছেলে। চ্যানেল পাল্টে এটিএন নিউজে গেলাম এখানে দেখতে পেলাম বিস্তারিত দেখাচ্ছে। এক সাংবাদিক সরাসরি প্রতিবেদনে বলছে খুনি এখনো ধরা পরেনি ডিবিপুলিশ জানিয়েছে খুব তাড়াতাড়ি তদন্ত শুরু হবে। নিউজ দেখতে দেখতে একসময় চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে গেল। সুমাইয়াককে রেখে রুমে চলে আসলাম। শোয়ার কিছুক্ষণ পরে ঘুমের দেশে হারিয়ে গেলাম। আন্টির ডাকে ঘুম ভাঙলো চোখ খুলে দেখলাম সুমাইয়া আমার হাতের উপর মাথা দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে। সুমাইয়ার হাত সরিয়ে দিয়ে উঠে বসলাম। আন্টি বলল গোসল করে খেতে আসো। আন্টি চলে গেলে সুমাইয়াকে টেনে তুললাম ও উঠে চোখ ঢলতে লাগলো। ওকে কোলে করে নিয়ে বাতরুমে ঢুকলাম আন্টিকে ডেকে বললাম সুমাইয়ার কাপড় দিয়ে যাওয়ার জন্য। আন্টি এসে সুমাইয়ার কাপড় দিয়ে গেল। দুই ভাইবোন একসাথে গোসল করে খেতে বসলাম। সুমাইয়া যথারীতি আমার কোলে উঠে বসেছে আমার সাথে খাবে বলে। খাওয়ার সময় আন্টি রুই মাছের বড় মাথাটা উঠিয়ে দিল আমার প্লেটে। সুমাইয়াকে খাইয়ে দিয়ে আমিও খেয়ে নিলাম। ভালই চলছিল আমার নতুন জীবন। এই জীবনের প্রাপ্তিগুলো ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার। না চাইতেই সুমাইয়ার মত নিষ্পাপ একটা বোন পেয়েছি। সারাজীবন মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত থেকে একটা স্নেহময়ী মা পেয়েছি। গুরুগম্ভীর একটা বাবা পেয়েছি। সেদিন দুপুরে ঘুম থেকে জেগে দেখি সুমাইয়া আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে আর আন্টি আমার মাথার কাছে বসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আমার চোখ খোলা দেখে আন্টি বলল ছেলেটাকে প্রতিদিন মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ঘুম পারাতে হতো। কত ইচ্ছে ছিল ছেলের মুখে মা ডাক শুনব কিন্তু আল্লাহর কী ইচ্ছা ছেলেটা কোন দিন কথা বলতে পারলো না। কথাগুলো বলার সময় আন্টির চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। শাড়ির আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে রুম থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল এমন সময় আমার ভেতরের এক অদৃশ্য সত্তা আচমকা মা বলে ডেকে উঠলো ! আন্টি মা ডাক শুনে দৌড়ে এসে বলল আর একটা বার মা বলে ডাক দে বাবা। এবার কোন অদৃশ্য সত্তা না একজন মমতাময়ী মা কে মা বলে ডাকলাম। আন্টি আমাকে জড়িয়ে ধরে আবার কেঁদে উঠলো। সেই থেকে আন্টি কে মা বলে ডাকি। এই ঘটনার দুইদিন পর আঙ্কেল বলল একজনকে মা ডাকবি অথচ অন্যজনকে আঙ্কেল ডাকবি তা কীভাবে সম্ভব? নাকি আমাকে বাবা হিসাবে পছন্দ হয় না? সেদিন সব জড়তা কাটিয়ে উঠে বাবা বলে ডেকেছিলাম।
.
প্রায় একমাস পর সুমাইয়াকে নিয়ে বাসা থেকে বের হলাম। আসার সময় মায়ের কাছ থেকে কিছু টাকা নিয়ে এসেছি শপিং করব। রিক্সা করে আমি আর সুমাইয়া মার্কেটিং করতে শহরে চলে আসলাম। বাসা থেকে শহরের মার্কেট দশ মিনিটের পথ। সুমাইয়া একটা টেডিবিয়ার দেখে কেনার জন্য জেদ ধরলো দোকানে গিয়ে দেখলাম। যেটাকে টেডিবিয়ার ভাবছিলাম সেটা আসলে ব্যাগ। ব্যাগের পিছে টেডিবিয়ারের মাথা সংযোগ করা। দোকানদারের কাছে ব্যাগটার দাম জিজ্ঞাস করলে দোকানদার চারশত টাকা বলে আমার মুখের দিকে তাকালো। দোকানীর মুখ দেখে মনে হলো সে আমাকে দেখে চমকে উঠেছে। আমি বিপদেরগন্ধ আঁচ করতে পারলাম। মন্ত্রীর ছেলেকে যখন খুন করেছিলাম তখন মুখ ক্লিনশেভ করাছিল এখন আমার মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি আছে। বাবা কয়েকদিন আগে বলেছিল তোমার ছবি পত্রিকায় দিয়ে তোমার সন্ধান চেয়েছে ডিবিপুলিশ। দোকান থেকে ব্যাগটা কিনে সুমাইয়াকে নিয়ে তাড়াতাড়ি পা চালাতে লাগলাম যতদ্রুত সম্ভব বাড়ি যেতে হবে। মার্কেটের গেটের কাছে আসতেই একদল সাদা পোশাকপরা মানুষ আমাকে ঘিরে ধরলো। পিছন থেকে পিস্তলের মাথা দিয়ে একজন খোঁচা দিয়ে বলল পালানোর চেষ্টা করলে মাথা উড়িয়ে দিবো। অচেনা লোকদের এমন আচরণ দেখে সুমাইয়া চিৎকার করে কেঁদে উঠলো। আমি সাদা পোশাকধারী পুলিশদের বললাম আমাকে নিয়ে যাও কিন্তু বাচ্চাকে ওর বাসায় পৌঁছে দাও। পুলিশের একজন জিজ্ঞাসা করল কার বাচ্চা? আমি বললাম শিল্পপতি রহাত চৌধুরীর মেয়ে। পুলিশ সুমাইয়েকে নিয়ে গেল সুমাইয়া যাতে চাইছিল না ভাইয়া ভাইয়া করে কাঁদছিল। পুলিশের সাথে এসে মাইক্রোতে উঠলাম। পুলিশের হাতে এরেস্ট হওয়া নতুন অভিজ্ঞতা না এর আগেও কয়েকবার এরেস্ট হয়েছি তবে প্রতিবার মন্ত্রীর ছেলের জোড়ে বেঁচে গেছি। এবারতো কেউ নেই বাঁচানোর মত তারপর আবার মন্ত্রীর ছেলেকে খুনের অভিযোগে গ্রেফতার। চোখ বন্ধ করে সীটে মাথা এলিয়ে দিলাম।
.
যখন বুঝতে শিখেছিলাম তখন নিজেকে আবিষ্কার করেছিলাম ছিন্নমূল হিসাবে। আশেপাশে সবাইকে দেখতাম তারা মা বাবার সাথে বসবাস করতো কিন্তু আমার মত গুটিকয় ছেলেমেয়ের বাবা মা ছিল না। হাজারো প্রশ্ন জাগতো আমাদের মা বাবা কোথায়? আমরা কাউকে মা বাবা বলে ডাকি না কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর দেবার মত কেউ ছিল না। সভ্যসমাজ আমাদের জারজ সন্তান বলে আখ্যায়িত করতো। তখন বুঝতাম না জারজ কাকে বলে? ধীরেধীরে পরিণত হতে থাকলাম দুনিয়ার সব অংক বুঝতে শুরু করলাম। একসময় বুঝতে পারলাম কারো পাপের ফসল আমরা ছিন্নমূল মানুষ গুলো। ঘৃণা করতে শুরু করলাম মা জাতিকে। সব নারী কে মনে হতো খুনি। পৃথিবীর একটা নারীকে শুধু ভালবাসাতাম শুদ্ধা করতাম। সে ছিল আমাদের ছিন্নমূলদের ভরসা আমাদের তমা আপু। তমা আপু প্রতি শুক্রবার এসে আমাদের পড়াতো। আসার সময় আমাদের জন্য বিভিন্ন খাবার নিয়ে আসতো। সবাই আমাদের ঘৃণা করলেও তমা আপু আমাদের কখনো ঘৃণা করতো না। আমাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আমমাদের সাহস যোগাত। বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করতে শেখাত। আমাদের স্বপ্ন দেখাতো। হঠাৎ করেই তমা আপুর আসা বন্ধ হয়ে গেল। আমরা প্রতি শুক্রবার আপুর জন্য অপেক্ষা করতাম কিন্তু আমাদের অপেক্ষা অপেক্ষাই থেকে যেতো। প্রায় দুই মাস পর হঠাৎ করেই একদিন তমা আপু আবার এসেছিল আমরা সবাই অনেক অভিযোগ দাঁড় করিয়েছিলাম। কিন্তু কোন অভিযোগের সমাধান করে যায়নি তমা আপু। সেদিন আমাদের সবার হাতে বিরানির প্যাকেট হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। বিরানি পেয়ে আমরা অনেক খুশি হয়ে ছিলাম। অনেক দিন পর তৃপ্তি নিয়ে খাবার খেয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের সব হাসি কান্নায় পরিণত হয়েছিল যখন তমা আপু বলেছিল আমি মনে হয় আর তোদের কাছে আসতে পারবনা আমার বিয়ে হয়ে গেছে। সেদিন বিদায়বেলা তমা আপুর চোখে পানি দেখেছিলাম। তমা আপু চলে যাওয়ার কিছুদিন পর মাস্তান দলে নাম দেই। তখন আমার বয়স বারো বছর ছিল মনে হয়। মাস্তানিতে বড় বড় সাফল্য অর্জন করে শহরের নামকরা মাস্তানে পরিণত হয়ে যাই। কোন এক ঘটনায় পরিচয় হয়ে যায় মন্ত্রীর ছেলে আয়ানের সাথে তখন আমার বয়স আঠারোর মত। মন্ত্রীর ছেলে আর আমি সমবয়সী হওয়ায় দুইজনের মাঝে গভীর বন্ধুত্ব হয়ে যায়। তারপর চলতে থাকে দুইজনের সব অনৈতিক কাজ। চট্টগ্রাম আসার দিন সন্ধায় একটা মেয়েকে তুলে এনেছিলাম আয়ানের কথায়। আয়ান যখন মেয়েটাকে নিয়ে রুমে ঢুকছিল তখন মেয়েটা চিৎকার করে বলছিল আমাকে ছেড়ে দিন আমাকে ছেড়ে দিন। আয়ান তখন বরাবরের মতো পৈচাশিক হাসি হাসছিল। মেয়েটা একবার আয়ানের হাত থেকে ছুটে এসে আমার পায়ের কাছে বসে বলছিল দয়া করে আমাকে আমার বাসায় দিয়ে আসুন। আমি কোন কথা না বলে পাশ কাটিয়ে চলে আসছিলাম। আয়ান আবার মেয়েটাকে নিয়ে যাচ্ছিল । হঠাৎ করেই মেয়েটা আমাকে লক্ষ্য করে বলল প্লিজ ভাইয়া আমাকে নিয়ে যান। আমি যদি আপনার বোন হতাম তাহলে আমাকে এভাবে একটা পশুর কাছে রেখে যেতে পারতেন? মেয়েটার মুখে বোন শব্দ শুনে আমার কল্পনায় তমা আপুর সেই মুখটা বারবার ভেসে উঠছিল। এর আগেও অনেক মেয়েকে এভাবে তুলে এনে আয়ানের ভোগের বস্তু বানিয়েছি। আবার অনেক মেয়েই নিজে থেকে এসেই আয়ানের ভোগ সামগ্রী হয় কিন্তু কোনদিন কোন মেয়ের কথায় আমার ভাবান্তর হয়নি। আমি ঘুরে দাঁড়িয়ে আয়ানকে লক্ষ্য করে বললাম ওকে ছেড়ে দে। আয়ান আমার কথা শুনে বলল তুই পাগল হয়ে গেছিস? আমি বললাম হ্যাঁ আমি পাগল হয়ে গেছি তুই ওকে ছেড়ে দে নাইলে পাগলামি দেখতে পাবি। আয়ন বলল আমি ওকে ছাড়ব না দেখা তোর পাগলামি। আমি কোন কিছু না ভেবে পিস্তল বের করে দুইটা গুলি করে দিলাম। মেয়েটাকে নিয়ে চলে আসলাম ওর বাসায়। মেয়েটার মা ওকে দেখে যখন জড়িয়ে ধরে কাঁদছিল তখন বুঝতে পেরেছিলাম আমার মায়ের মত সব মা না। আমি চলে আসার সময় মেয়েটা জিজ্ঞাসা করল কোথায় যাবেন? আমি বললাম জানি না এখন কোথায় যাব। ও বলল আপনি পালিয়ে যান ভাইয়া।আমি বললাম জীবন নিয়ে আমার কোন ইন্টারেস্ট নাই আমি পালাব না। মেয়েটা বলল আপনার বোনের কছম দিলাম। আমি তখন মেয়েটার দিকে একবার তাকিয়ে চলে এসেছিলাম। হঠাৎ মাইক্রো থেমে গেল তাকিয়ে দেখি থানায় চলে এসেছি। দুইদিন পর আমাকে কোর্টে আনা হল কোর্টে এসে দেখি মা বাবা সুমাইয়া উকিলের চেয়ারের পেছনের সাড়িতে বসে আছে। আমাকে দেখেই সুমাইয়া আমার কাছে আসার জন্য কান্না শুরু করে দিল। অবশেষে জজ সাহেবের অনুমতি পেয়ে সুমাইয়াকে আমার কাছে নিয়ে আসলো। শুনানি শেষ হলে মন্ত্রীর ছেলেকে খুন করার অপরাধে আমাকে ফাঁসির হুকুম দিল। রায় শুনেই মা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো। বাবার দিকে তাকিয়ে দেখলাম বাবা রোমাল দিয়ে চোখ মুছছে। পুলিশ এসে সুমাইয়াকে নিতে আসলো। আমার মনে হলো কেউ আমার কলিজা নিতে এসেছে। সুমাইয়া যেতে চাইলো না পুলিশ জোড় করে সুমাইয়াকে নিয়ে গেল। আমার কাছ থেকে যাওয়ার সময় সুমাইয়া কাঁদতে শুরু করে দিল। পুলিশ সুমাইয়াকে মায়ের কাছে নিয়ে গেল মা সুমাইয়াকে জড়িয়ে ধরে আরো জোড়ে কাঁদতে লাগলো। মা আর সুমাইয়ার চোখের পানি দেখে আমারো চোখ লাল হয়ে গেল। আচ্ছা আমার কী কাঁদা দরকার? না আমি কাঁদতে পারি না। আমার হৃদয় অনুভূতি শুন্য, আমি হৃদয়হীন প্রানী। হৃদয়হীনরা কাঁদতে পারে না, তাদের কাঁদা মানায় না।
.
লেখাঃ বিকৃত মনের মানুষ
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now