বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

হলুদের ছায়ায় জীবন

"সত্য ঘটনা" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ । সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। কুমিল্লার প্রত্যন্ত গ্রামে বসে রোজার সময়ের ইফতারের আয়োজন নিয়ে ব্যস্ত নাসিমা। চারদিকে রঙিন প্লাস্টিকের প্লেট, কাঁচা পেঁপে ভর্তা, ডালভাজি আর ছোট্ট একটা কড়াইতে ভাজা বেগুনি চুলার ওপরে গরম হতে থাকে। তার মুখে অল্প হাসি, চোখে ক্লান্তি। বয়স এখন বিয়াল্লিশ, কিন্তু তার শরীরের ভার যেন অকালেই তাকে পঞ্চাশের চৌকাঠে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। গ্রামের মেয়েরা প্রায়ই তাকে বলে, — “আহা, নাসিমা আপা, তুমি না খুব স্বাস্থ্যবান, তোমার শরীরে একটুও ঘাটতি নাই।” কিন্তু ভিতরে ভিতরে নাসিমা জানে, তার শরীর প্রতিদিন নতুন বোঝা চাপিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে গত একবছর ধরে মাঝেমধ্যে পেটের ডান দিকে অদ্ভুত ব্যথা হয়। শুরুতে মনে হতো গ্যাস্ট্রিকের ঝামেলা। ভাতের সঙ্গে ঝাল কিছু খেলেই যেন গরম ঢেউয়ের মতো ব্যথা গড়িয়ে আসে। একসময় সেই ব্যথা রাত জাগিয়ে রাখে, বুক ধড়ফড় করতে থাকে। তবু সে গুরুত্ব দেয়নি। তার জীবনে অবহেলার জায়গাটা ছিল বহু পুরনো। স্বামী বিদেশে, সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধে। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা, শ্বশুর-শাশুড়ির চিকিৎসা, জমি-জমার খরচ—এসব সামলাতে গিয়ে নিজের দিকে তাকানোর সময় পায়নি। কিন্তু গত মাসে হঠাৎ এক রাতে ব্যথাটা এত তীব্র হলো যে সে মেঝেতে শুয়ে কাঁদতে লাগল। পেটে যেন কেউ ধারালো ছুরি বসিয়ে ঘুরিয়ে দিচ্ছে। বমি হলো একাধিকবার, শরীর ঠান্ডা হয়ে এল। পরদিন ছেলে জোর করে তাকে শহরের হাসপাতালে নিয়ে গেল। ডাক্তার এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাম করালেন। রিপোর্ট হাতে নিয়ে ডাক্তার বললেন, — “আপনার গলব্লাডারে পাথর হয়েছে। গলস্টোন বলে। এগুলোই ব্যথার কারণ।” নাসিমা প্রথমে অবাক হলো। পাথর আবার শরীরের ভেতরে হয় নাকি? তার চোখে অবিশ্বাস। ডাক্তার ধীরে ধীরে বুঝিয়ে দিলেন, — “পিত্তথলি হলো যকৃৎ থেকে আসা পিত্তরস জমা রাখার জায়গা। চর্বি হজমে এই পিত্তরস কাজ করে। কিন্তু কোনো কারণে যদি ভারসাম্য নষ্ট হয়—কোলেস্টেরল বা বিলিরুবিন বেড়ে যায়, অথবা পিত্তথলি ঠিকমতো খালি না হয়—তাহলেই পাথর তৈরি হয়। আপনার ক্ষেত্রে তাই হয়েছে।” সে সময় তার মনে ভেসে উঠল গত কয়েক বছরের অভ্যাসগুলো। ভোরে উঠেই খালি পেটে অনেকক্ষণ মাঠে কাজ করা, দুপুরে তাড়াহুড়ো করে ভাত খাওয়া, প্রায়ই ভাজাভুজি বেশি খাওয়া, আর নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস না থাকা—সবই যেন এই সমস্যার দিকে ঠেলে দিয়েছে। ডাক্তার আরও বললেন, — “নারীদের ঝুঁকি বেশি। বিশেষ করে গর্ভধারণের পর, বয়স বাড়লে, ওজন বেশি হলে, কিংবা দীর্ঘদিন উপবাসে থাকলে এ রোগ দেখা দেয়। আপনার সবগুলো কারণই মিলে গেছে।” নাসিমা চুপ করে শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল, এ রোগ শুধু শরীরের নয়, অবহেলারও শাস্তি। হাসপাতাল থেকে ফেরার পর গ্রামের লোকেরা নানা কথা বলতে লাগল। কেউ বলল, — “এ তো বড় কিছু না, একটু ওষুধ খেলেই ঠিক হয়ে যাবে।” আবার কেউ ফিসফিস করে বলল, — “এমন রোগ হলে তো অপারেশন করতে হয়। সাবধানে থেকো।” নাসিমার ছেলে শহরের একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে এল। চিকিৎসক লিখে দিলেন—অপারেশন না করলেও এখনই জীবনযাত্রা বদলাতে হবে। চর্বিযুক্ত খাবার বাদ দিতে হবে, নিয়মিত হেঁটে শরীর সচল রাখতে হবে, পানি বেশি খেতে হবে। না হলে যেকোনো সময় পাথর পিত্তনালী আটকে জটিল অবস্থা তৈরি করতে পারে। সেই রাতেই নাসিমা ছেলের পাশে বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। — “বাবা, আমি তো ভাবতাম গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা। অবহেলা করেছিলাম। এখন বুঝছি, শরীর অবহেলা করলে সে ক্ষমা করে না।” ছেলে তার হাত ধরে বলল, — “এখনো দেরি হয়নি মা। তুমি শুধু খেয়াল রাখো। আমরা তোমার পাশে আছি।” পরদিন ভোরে নাসিমা উঠল অন্যরকম দৃঢ়তা নিয়ে। নামাজ শেষ করে বাড়ির উঠোনে হাঁটতে শুরু করল। প্রথম দিন দশ মিনিটের বেশি হাঁটতে পারেনি, শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু সে থামেনি। ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে লাগল। রান্নায় ভাজার পরিমাণ কমাল, চর্বি এড়িয়ে চলল। পাশের বাড়ির মেয়েদের বলল, — “তোমরা হাসাহাসি করো না, কিন্তু শরীরের যত্ন না নিলে একদিন তোমরাও কষ্ট পাবে।” গ্রামের নারীরা প্রথমে অবাক হলো। তারা ভাবত, শরীর মোটা মানেই স্বাস্থ্যবান। কিন্তু নাসিমা নিজের অভিজ্ঞতা শোনালে তারা মন দিয়ে শুনতে লাগল। কেউ কেউ হাঁটতে শুরু করল, কেউ কমিয়ে দিল তেল-ঝাল। কয়েক মাস পর নাসিমা আবার হাসপাতালে চেকআপ করতে গেল। ডাক্তার দেখে বললেন, — “আপনার অবস্থা স্থিতিশীল। ব্যথা খুব একটা বাড়েনি, জীবনধারা পরিবর্তনই আপনাকে এখন রক্ষা করছে।” ডাক্তারের সেই কথা যেন আশীর্বাদের মতো লাগল। নাসিমা হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—আর কখনো শরীরকে অবহেলা করবে না। গ্রামের মেয়েরা এখন প্রায়ই তার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, — “আপা, শরীর সুস্থ রাখতে কী করতে হবে?” নাসিমা হাসিমুখে বলে, — “অল্প খাও, স্বাস্থ্যকর খাও, বেশি হাঁটো, আর সবচেয়ে বড় কথা—নিজেকে অবহেলা কোরো না।” তার চোখে তখন অদ্ভুত শান্তি। ব্যথার ছায়া আছে, কিন্তু সেই ছায়ার ভেতর দিয়ে আলো ফুটে উঠেছে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১২০ জন


এ জাতীয় গল্প

→ হলুদের ছায়ায় জীবন

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now