বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

হারিয়ে যাওয়া চিঠির নীরবতা

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X লেখকঃ মোহাম্মদ শাহজামান শুভ । সৈকতের ডেস্কে এখনও পড়ে আছে সেই শেষ চিঠি। পাতলা সাদা খামের ভেতরে তিন্নির লেখা, কালি ম্লান হয়ে আসছে। প্রায় দুই মাস কেটে গেছে, নতুন কোনো খাম ডাকঘর থেকে আসেনি। প্রতিদিন বিকেলে ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার শব্দ শুনে সৈকতের বুক ধড়ফড় করে ওঠে। হোস্টেলের করিডর দিয়ে সে অস্থির পায়ে নিচে নেমে আসে, কখনো দাঁড়িয়ে থাকে গেটের পাশে। কিন্তু ডাকপিয়নের ব্যাগ থেকে বের হয় কেবল অন্য কারো নামে আসা চিঠি, তার নামে কিছুই নেই। তখন বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে, মনে হয় এক অজানা অন্ধকারে সে ক্রমশ ডুবে যাচ্ছে। তাদের এই পত্রমিতালি শুরু হয়েছিল ১৯৯৬ সালের শীতকালে। এক শিক্ষাসফরে কাপ্তাই লেকে গিয়েছিল সৈকতের ক্লাস। সেখানে কাকতালীয়ভাবে পরিচয় ঘটে তিন্নির সাথে। প্রথমে স্রেফ আলাপ, তারপর ঠিকানার আদানপ্রদান। তিন্নি তখন নানিয়ারচরের এক সরকারি কলেজে পড়ছে। দু’জনের মধ্যে হয়তো প্রেমের সরাসরি স্বীকারোক্তি হয়নি, কিন্তু চিঠির পাতায় পাতায় ছিল আবেগ, বিশ্বাস, স্বপ্নের রঙিন আঁকিবুকি। চিঠির বাক্যগুলোই হয়ে উঠেছিল তাদের দেখা-না-হওয়া ভালোবাসার একমাত্র সাক্ষ্য। তিন্নি লিখত তার পাহাড়ি জীবনের গল্প, ছোট নদী, ঝিরি আর কাকদের সকালবেলার ডাকের কথা। সৈকত লিখত হোস্টেলের জীবন, পরীক্ষা, বইপত্র আর কোলাহলমুখর শহরের রূপ-রসের কথা। প্রতি মাসে অন্তত একবার চিঠি বিনিময় হতো। সেই শব্দগুলোর ভেতরেই লুকানো ছিল তাদের হাসি, কান্না, অভিমান আর আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু এইচএসসি টেস্ট পরীক্ষার পর থেকে যেন হঠাৎ ছেদ পড়ল সেই স্রোতে। প্রথমদিকে তিন্নি কিছুটা অনিয়মিত হলেও চিঠি পাঠাত। কিন্তু গত দুই মাস ধরে কোনো উত্তরই নেই। সৈকত ভেবেছিল হয়তো ডাক হারিয়ে গেছে। আবার লিখল। লিখল অস্থির মন নিয়ে, বারবার ঠিকানা মিলিয়ে। তারপরও কোনো উত্তর নেই। সন্ধ্যার পর হোস্টেলের কক্ষে জানালা খুলে বসে থাকে সৈকত। দূরে ক্যাম্পাসের আলো জ্বলজ্বল করে, আকাশে জ্বলতে থাকা তারাগুলোকে দেখে তার মনে পড়ে তিন্নির লেখা একটা বাক্য— “যদি কখনো খুব একা লাগে, আকাশের দিকে তাকাবে। ওই একই আকাশ আমি-ও দেখব।” কিন্তু এখন আকাশও তার কাছে নির্বাক, নির্জন। সৈকতের মনোভাব ক্রমশ ভেঙে পড়ছে। আগে যেখানে বন্ধুরা মজা করে বলত—“তোর তো পাহাড়ি প্রেয়সী আছে”, এখন তারা আর কিছু বলে না। সৈকত নিজেও নীরব হয়ে গেছে। পড়াশোনার দিকে মনোযোগ হারাচ্ছে। মাঝে মাঝে ভাবছে, তিন্নি হয়তো চিঠি লিখতে পারছে না, কোনো পারিবারিক বাঁধা এসেছে। আবার ভয় করে—হয়তো তিন্নি ইচ্ছে করেই সম্পর্কটা শেষ করে দিয়েছে। এক রাতে হোস্টেলের ছাদে উঠে দাঁড়াল সৈকত। চাঁদ উঠেছে অর্ধেক, চারদিক নিস্তব্ধ। বুকের ভেতর তার যেন এক অদ্ভুত শূন্যতা। সে মনে করতে চেষ্টা করল, তাদের সম্পর্কটা কি আদৌ ভালোবাসা ছিল, নাকি স্রেফ এক আবেগী বন্ধুত্ব? কিন্তু উত্তর পেল না। কেবল ভেতরে জমা হলো অসীম হাহাকার। পরদিন হঠাৎ সে সিদ্ধান্ত নিল—তিন্নির কাছে যাবে। নানিয়ারচর ছোট একটা জায়গা, যাওয়া খুব কষ্টকর নয়। পরীক্ষা শেষ হবার পর, গোপনে ভ্রমণের অজুহাতে সে রওনা দিল পাহাড়ের পথে। বাস থেকে নামতেই চোখে পড়ল পাহাড়ি রাস্তা, সরু ঝিরি, বাঁশঝাড়। তিন্নির কথাগুলো মনে পড়তে লাগল। কিন্তু পৌঁছে দেখল অচেনা দৃশ্য। তিন্নির বাসার দরজায় কড়া নাড়তেই বেরিয়ে এল এক বয়স্ক ভদ্রলোক। তিনি বিস্মিত দৃষ্টিতে সৈকতের দিকে তাকালেন। সৈকত পরিচয় দিল, বলল সে তিন্নির বন্ধু। ভদ্রলোকের চোখে ভেসে উঠল গভীর বিষণ্নতা। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন— “তুমি জানো না? তিন্নি আর নেই। দুই মাস আগে পাহাড়ি সড়কে দুর্ঘটনায়… আমরা ওকে হারিয়েছি।” মুহূর্তেই পৃথিবী যেন ভেঙে পড়ল সৈকতের ওপর। বুকের ভেতর যেন আগুনের ঢেউ উঠল, কিন্তু চোখে জল এল না। সে বিশ্বাসই করতে পারল না। মনে হচ্ছিল, এই কথা নিছক এক দুঃস্বপ্ন। ভদ্রলোক আরও বললেন—“ওর ঘরে একটা বাক্স আছে, অনেক চিঠি জমিয়ে রেখেছিল। হয়তো তোমার লেখা।” সৈকত নিস্তব্ধ পায়ে ঘরে ঢুকল। সত্যিই কাঠের একটা বাক্সে সযত্নে রাখা অসংখ্য খাম। খামের উপর তার নিজের লেখা অক্ষর—“তিন্নির জন্য।” চিঠিগুলো স্পর্শ করতেই বুকের ভেতর হাহাকার ছিঁড়ে বেরোল। তিন্নি তার প্রতিটি চিঠি রেখেছিল, উত্তর দিতে চেয়েছিল হয়তো, কিন্তু জীবনের নির্মমতার কাছে হেরে গেছে। সেই রাতে সৈকত বসে রইল পাহাড়ের আকাশের নিচে। দূরে ঝিরি বয়ে চলেছে, বাঁশঝাড়ে হাওয়ার শব্দ। আকাশে জ্বলছে অগণিত তারা। মনে হলো তিন্নি হয়তো সত্যিই এই আকাশ থেকে তাকিয়ে আছে। তার অমলিন হাসি যেন ভেসে আসছে দূর থেকে। হোস্টেলে ফিরে এসে সৈকত আর আগের মতো নেই। বন্ধুরা দেখে অবাক হয়, সে এখন আরও নীরব, আরও অন্তর্মুখী। বইয়ের পাতার মধ্যে হারিয়ে যায়, কিন্তু চোখে অদৃশ্য অশ্রুর ছাপ। ডেস্কের ড্রয়ারে রাখা শেষ চিঠিটা সে আর কখনো কারো সামনে খুলে না। শুধু মাঝে মাঝে খামের ওপর হাত রেখে ফিসফিস করে বলে— “তিন্নি, তুমি আমার কাছে থাকবে, যতদিন আমি বাঁচি।”


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ হারিয়ে যাওয়া চিঠির নীরবতা

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now