বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
‘জলপরি’ জাহাজের কাপ্তেন সমুদ্রে ভাসমান এক বোতলের ভিতরে এই বিবরণী পেয়ে পুলিশের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।
‘অ্যাডভেঞ্চারের’ গল্পে প্রায়ই পাঠ করা যায়, একটা বোতলে কেউ কেউ দরকারি চিঠিপত্র ভরে সমুদ্রে ফেলে দিয়েছে, এবং অবশেষে সে বোতলটা হয়েছে অন্য কারুর হস্তগত। তারপর জনসাধারণের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে অদ্ভুত কোনো রহস্যের কাহিনি।
এই পদ্ধতিটা বরাবরই আকৃষ্ট করেছে আমাকে। আমিও এই পদ্ধতি অবলম্বন করলুম। যখন এই ভাসমান বোতলটা জল থেকে কেউ উদ্ধার করবে, আমি তখন নিশ্চয়ই ইহলোকে বিদ্যমান থাকব না।
এক বিষয়ে আমি নিশ্চিত আছি। হারাধনের দ্বীপে দশ-দশটা হত্যাকাহিনি নিয়ে নিশ্চয়ই চারিদিকে বিশেষ উত্তেজনার সৃষ্টি হবে। এবং পুলিশও যে প্রাণপণে চেষ্টা করবে, সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই। কিন্তু তদন্তের যে কোনোই ফল হবে না এবং আসল হত্যাকারীকে কেউ যে আবিষ্কার করতে পারবে না, সেটাও আমি আগে থাকতেই অনুমান করতে পারছি। নিখুঁত অপরাধ করবার জন্যে উচ্চশ্রেণির অপরাধীরা প্রায়ই আগ্রহ প্রকাশ করে থাকে। হারাধনের দ্বীপের হত্যাকাণ্ড হচ্ছে সেইরকম এক নিখুঁত অপরাধ; পুলিশের সাধ্য নেই যে, এই মামলার রহস্য ভেদ করে। পুলিশের এই অসহায় অবস্থা কল্পনা করেই অতঃপর আমি নিজেই সমস্ত সমস্যার সমাধান করতে চাই।
আমি হচ্ছি চন্দ্রকান্ত চৌধুরি। হাইকোর্টের ভূতপূর্ব বিচারক। অত্যন্ত কঠোর বিচারক বলে আমার একটা কুখ্যাতি ছিল। সকলে আমার নাম দিয়েছিল, ফাসুড়ে জজ! সেটা নিতান্ত অমূলক নয়। অপরাধীদের চরম দণ্ড দেবার সুযোগ পেলে, আমি একটা নিষ্ঠুর আনন্দ উপভোগ করতুম। জীবনে বহু আসামিকেই প্রাণদণ্ড দিয়েছি, ক্ষমা করিনি কারুকেই।
অপরাধীর পর অপরাধীর বিচার করতে করতে আমার মনের ভিতরে আসে এক বিশেষ পরিবর্তন। দিনে দিনে ভালো করেই অনুভব করতে পারলুম যে, আমার চরিত্রও বদলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। অন্য লোকে খুন করে ধরা পড়েছে এবং আমিও করেছি তার শাস্তিবিধান। ক্রমে ব্যাপারটা এমনি একঘেঁয়ে হয়ে উঠল যে, সেটাতে আমার মনে জাগত না আর কোনো উত্তেজনা।
মনে মনে ভাবতে লাগলুম, হত্যাকারীর বিচারক না হয়ে আমি নিজেই যদি হই হত্যাকারী? সাধারণ নয়, অসাধারণ হত্যাকারী—যে হত্যা করবে, অথচ ধরা পড়ে আসামি হয়ে বিচারকের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে না। কেউ তাকে কোনোই সন্দেহ করতে পারবে না। অর্থাৎ সেই হত্যা হবে নিখুঁত অপরাধ।
বিচারকার্য থেকে অবসর গ্রহণ করবার পর থেকে মনে মনে প্রায় নিখুঁত অপরাধের কথা নিয়ে নাড়াচাড়া করতুম।
এই সময়ে পেলুম পরলোকের আমন্ত্রণ। আমি হৃদরোগের দ্বারা আক্রান্ত হলুম। তার উপরে আমার হল সন্ন্যাস রোগও রক্তের চাপ বেড়ে যাওয়ায় দুইদুই বার অজ্ঞান হয়ে গেলুম। বড়ো বড়ো ডাক্তারেরা মত প্রকাশ করলে, তৃতীয় আক্রমণই হবে আমার পক্ষে মারাত্মক। অর্থাৎ হয় হৃদরোগে, নয় সন্ন্যাসরোগে অদূর-ভবিষ্যতেই আমার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী।
তখনই মনে মনে সংকল্প করলুম, আমার উচ্চাকাঙক্ষাকে সফল না করে পৃথিবী থেকে আমি বিদায় গ্রহণ করব না। নিখুঁত অপরাধ! হ্যাঁ, আমাকে করতে হবে একটা চিরস্মরণীয় অপরাধের অনুষ্ঠান!
লোকে যেমন বেছে বেছে বলির পশু সংগ্রহ করে, আমিও তেমনি বেছে বেছে এমন কয়েক ব্যক্তির নাম সংগ্রহ করলুম, আইন যাদের দণ্ড দিতে পারেনি, কিন্তু অপরাধী বলে যাদের কুখ্যাতি আছে। তাদের বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করবার জন্যে আমাকে চর নিযুক্ত করে বড়ো অল্প অর্থ ব্যয় করতে হয়নি।
অ্যাটনি বিজন বোসকে মধ্যস্থ রেখে আমি কাজ শুরু করে দিলুম। যদিও তার কাছে আমি কোনো কথাই ভাঙিনি, তবু অ্যাটনিরা তো নির্বোধ জীব নয়, সে বোধহয় একটা কিছু সন্দেহ করেছিল। সেই সন্দেহই হল তার কাল। সমস্ত বন্দোবস্ত যখন পাকা হয়ে গেল, তাকেও দিলুম আমি প্রাণদণ্ড। কেমন করে, এখানে তা নিয়ে আর আলোচনা করতে চাই না। তবে হারাধনের দ্বীপে আসবার আগেই তার মুখ আমি চিরকালের জন্যে বন্ধ করে দিয়েছি। আমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেবার লোক আর কেউ নেই।
হারাধনের দ্বীপ হচ্ছে আমার নিখুঁত অপরাধের পক্ষে আদর্শ স্থান। বাড়িঘর সবই সাজানো-গুছানো ছিল, সেই অবস্থাতেই তিন মাসের জন্যে দ্বীপটা আমি বেনামে ভাড়া নিয়েছি। বিজন বোসের সাহায্যেই অতিথি অভ্যর্থনা করবার জন্যে যা কিছু ব্যবস্থা ঠিক করে ফেলেছিলুম।
নিজেকেও অতিথি সেজে এখানে আসতে হবে, অতএব সকলের চোখে ধুলো দেবার জন্যে মাঝখানে খাড়া করলুম চারুশীলা দেবীকে। তিনি কাল্পনিক লোক নন। সত্য সত্যই আট-দশ বছর আগে তার সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছিল, কিন্তু এখন তিনি পরলোকে! তার নামে একখানা চিঠি লিখে নিজের সঙ্গে রাখলুম— যেন এই দ্বীপটা কিনে তিনিই আমাকে এখানে নিমন্ত্রণ করে এনেছেন। এই মিথ্যাটাকে সত্যের মতো সহজ করে আনবার জন্যে মনে মনে বারবার এই কথা নিয়েই আলোচনা করতে লাগলুম এবং দ্বীপের অন্যান্য আগন্তুকদেরও কাছে সেই চিঠিখানা বার করে দেখাতে ছাড়লুম না। বলা বাহুল্য, প্রত্যেকেই বিশ্বাস করেছিল আমার কথা।
অতঃপর আমার এই নিখুঁত অপরাধের কাহিনি। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব কথা বলবার দরকার নেই। মনোতোষের গেলাসে সকলের অগোচরে সায়ানাইড মিশিয়ে দিয়েছিলুম আমিই। আমার কাছে আর-একটা জিনিসও ছিল—যা অল্পমাত্রায় ঔষধ আর বেশিমাত্রায় বিষ। ‘ক্লোর্যাল হাইড্রেট’। ঘুমোবার ঔষধরূপে এটা ব্যবহার করা যায়, কিন্তু মাত্ৰাধিক্য হলেই মারাত্মক হয়ে ওঠে। ডাক্তারও সত্যবালাকে একটা ঘুমোবার ওষুধ দিয়েছিলেন। সেটা কি তা আমি জানি না, কিন্তু সত্যবালার ওষুধের গেলাসে সেই সঙ্গে ক্লোর্যাল হাইড্রেট মিশিয়ে দেওয়াও আমার পক্ষে কঠিন হয়নি। মেজর সেন মারা পড়েছেন বিনা যন্ত্রণায়। আমি যখন পা টিপে টিপে তার পিছনে গিয়ে দাড়াই তখন তিনি কিছুই টের পাননি। আমার হাতে ছিল একটা লোহার ডান্ডা। এক আঘাতেই তার মৃত্যু হয়।
এমন সাবধানে আমি কাজ করে গিয়েছি, কেউ আমরা উপরে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করতে পারেনি। ডাক্তার বোস বরাবরই সন্দেহ করে এসেছেন অমলেন্দুকে। তাঁর সেই সন্দেহকে দৃঢ়মূল করে তোলবার জন্যে আমিও কোনো যুক্তির আশ্রয় নিতে ছাড়িনি।
▪▪▪সর্বশেষ▪▪▪
‘জলপরি’ জাহাজের কাপ্তেন সমুদ্রে ভাসমান এক বোতলের ভিতরে যে বিবরণী পেয়ে পুলিশের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন তারই বাকি অংশ। অবশেষে কৌশলে ডাক্তারকেও আমি আমার পক্ষে টেনে নিলুম। তাকে বললুম, এইবার আমি নিজের মৃত্যুর ভান করে আসল হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করতে চাই।
প্রথমে তিনি আমার কথার অর্থ ধরতে পারেননি। তারপর আমি তাকে ভালো করে সব কথা বুঝিয়ে দিলুম। সকলে জানবে যে কেউ গুলি করে আমাকে মেরে ফেলেছে, কিন্তু আসলে আমি বেঁচে থেকেই প্রকৃত হত্যাকারীর কার্যকলাপের উপরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখব।
তারপর ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়াল যথেষ্ট থিয়েটারি—যদিও সেটা হচ্ছে আমার খামখেয়াল মাত্র। লাল পর্দাটা মুড়ি দিয়ে আমি সোফার উপরে গিয়ে বসলুম। ডাক্তার আমার কপালের উপরে এঁকে দিলেন একটা রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন। আমার মাথায় পরানো রইল একটা সাদা রঙের পশমি পরচুলা।
আর সকলের মতো ডাক্তারও প্রাণের ভয়ে অত্যন্ত অশাস্তি ভোগ করছিলেন। আমার প্রস্তাবটা তাঁর খুব মনে লেগে গেল। আমার কথামতো কাজ করতে তিনি একটুও নারাজ হলেন না।
আমার তথাকথিত মৃত্যু'-র পরে আমার দেহটাকে উপরের ঘরে তুলে রেখে আসা হল। আমি বেশ জানতুম, মানুষ মৃতদেহকে—বিশেষত নিহত মানুষের দেহকে যথেষ্ট অপার্থিব বলে মনে করে। আমার মৃত্যুর পরেও আমার দেহকে আবার পরীক্ষা করবার জন্যে কেউ যে আর উপরকার ঘরে ঢুকতে চাইবে না, এটাও আমি বেশ বুঝে নিয়েছিলুম।
কিন্তু মৃত্যুর আগেই আমি নিত্যানন্দ ও সৌদামিনীকেও পরলোকে পাঠাবার ব্যবস্থা করেছিলুম। নিত্যানন্দ মারা পড়ে মেজর সেনেরই মতন। সে কাঠ কাটছিল, আমি পিছন দিক থেকে ভোজালি দিয়ে তাকে আঘাত করি। কিন্তু সৌদামিনীকে হত্যা করবার জন্যে আমাকে কিঞ্চিৎ বেগ পেতে হয়েছিল। প্রথমে খাবার ঘরে তারও চায়ের পেয়ালায় আমি মিশিয়ে দিই ক্লোর্যাল হাইড্রেট’। চা-পানের পরই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে চেয়ারের উপরে বসিয়ে রেখে সকলে যখন বৈঠকখানায় গেল, তখন সর্বশেষে ছিলুম আমি। তারপর তিনি যখন কতকটা চেতনা হারিয়ে ফেলেছেন, সেই সময়ে এক মুহুর্তের মধ্যেই হাইপোডামিক সিরিঞ্জে’র সাহায্যে তার দেহের মধ্যে সায়ানাইডের বিষ ঢুকিয়ে দিয়ে সে ঘর থেকে আমি চলে আসি।
মৃত্যুর পরেই আমি স্থির করলুম, এইবার ডাক্তারকেও পথ থেকে সরাবার সময় এসেছে। ডাক্তারকে বললুম, রাত্রে চুপি চুপি তার সঙ্গে আমার পরামর্শ আছে। দ্বীপের যেদিকে নদীর মোহনা, তিনি যেন সেইদিকে গিয়ে আমার জন্যে অপেক্ষা করেন। কিছু সন্দেহ না করেই তিনি রাজি হয়ে গেলেন। যথাসময়ে তার সঙ্গে আমার দেখা হল। তাকে নিয়ে আমি জলের ধারে একটা উচ্চভূমির উপরে গিয়ে উঠলুম।
আমি জানতুম, জল সেখানে খুব গভীর। কথা কইতে কইতে হঠাৎ আমি তাকে বললুম, দেখুন ডাক্তার বোস, নীচে একখানা নৌকো বাধা রয়েছে না? শুনেই তিনি আগ্রহভরে জলের ধারে ঝুঁকে পড়লেন। তারপর আমার হাত থেকে আচমকা একটা ধাক্কা খেয়ে ঝুপ করে তিনি পড়ে গেলেন একেবারে জলের ভিতরে। আমি জানতুম তিনি সাঁতার কাটতে পারেন না।
মহেন্দ্রকে কীভাবে হত্যা করেছি সেটা বোধহয় আর ব্যাখ্যা করে বলতে হবে না। তারপর মারা পড়ে অমলেন্দু—যদিও আমার হাতে তাকে মরতে হয়নি। স্বপ্নার রিভলভারের গুলিতে কেমন করে সে মারা পড়ে, উপরের ঘর থেকেই সে দৃশ্যটা আমি দেখতে পেয়েছিলুম।
স্বপ্না উত্তেজিতভাবে ছুটতে ছুটতে বাড়ির দিকে আসে। তারপর উপরে উঠে নিজের ঘরে ঢুকে বসে পড়ে। সেই সময় পিছন দিক থেকে গিয়ে আমি তার গলা টিপে ধরি।
তারপর নিজের ঘরে ফিরে এসেই আমি অত্যন্ত অস্বস্তি বোধ করতে থাকি। বেশ বুঝতে পারলুম, আমার রক্তের চাপ ক্রমশ বেড়ে উঠেছে। মনে অত্যন্ত দুশ্চিন্তা হল, পাছে এই বিয়োগান্ত নাটকের চরম দৃশ্যটা যথেষ্ট রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠবার আগেই মারা পড়ি, সেই ভয়ে তাড়াতাড়ি লিখে ফেললুম আমার এই কাহিনি।
কাগজখানাকে বোতলে পুরে ছিপি এঁটে জলে ফেলে দিতেও দেরি করলুম না। কিন্তু তার আগেও আরও যা করেছিলুম, আমার কাহিনির মধ্যে সে কথাও বলে রাখতে আমি ভুলিনি। নিখুঁত অপরাধের পালা চুকিয়ে, শয্যায় আশ্রয় নিয়ে আমিও পান করব পোটাসিয়াম সায়ানাইড’। হৃদরোগে নয়, রক্তের চাপে নয়, ইহলোক ত্যাগ করবার পথ খুঁজে নিই আমিই স্বয়ং!
(সমাপ্ত)
----------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now