বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"হারাধনের দ্বীপ"
হেমেন্দ্রকুমার রায়
-----------------
▪▪▪প্রথম পরিচ্ছেদ▪▪▪
শ্ৰীচন্দ্রকান্ত চৌধুরি। আগে ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের জজসাহেব, এখন অবসর গ্রহণ করেছেন। একখানি উচ্চ-শ্রেণির কামরায় চেপে ট্রেনে করে তিনি যাচ্ছিলেন পোর্ট ক্যানিং-এর দিকে। সিগার টানতে টানতে পড়ছিলেন একখানি খবরের কাগজ ।
খবরের কাগজ থেকে মুখ তুলে কামরার জানলা দিয়ে তিনি বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন। সূর্যকরদীপ্ত নির্মেঘ আকাশ, তার তলায় মাঠের পর মাঠ, বনের পর বন, তালীকুঞ্জ, বাঁশঝাড়, ঝোপঝাপ, ঝিল-খাল-পুকুর। তারপর তিনি হাতের ঘড়ির দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। গন্তব্যস্থলে গিয়ে পৌছতে এখনও বিলম্ব আছে।
খবরের কাগজে অদ্ভুত এই হারাধনের দ্বীপ সম্বন্ধে যে-সব কথা বেরিয়েছে, তিনি মনে মনে তাই নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলেন। হারাধনের দ্বীপ? এমন দ্বীপের নাম কেউ কখনো শোনেনি। অথচ এই অশ্রুত দ্বীপের কথা নিয়ে আজকাল কাগজওয়ালারা ক্রমাগত মাথা না ঘামিয়ে পারছে না।
সুন্দরবনের শেষ প্রান্তে গঙ্গাসাগরের কাছে ছোটো-বড়ো-মাঝারি দ্বীপ আছে অনেকগুলি। কোনো কোনো বড়ো দ্বীপের নাম আছে, আবার অনেক দ্বীপই হচ্ছে একেবারেই অনামা। গত মহাযুদ্ধের সময় কে-এক সাধারণ ব্যক্তি ধনকুবের রূপে অসাধারণ হয়ে ওঠে। হঠাৎ কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার মালিক হয়ে সে আবু হোসেনের মতো টাকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে শুরু করে দেয়। সেই সময়ে কী এক আজব খেয়ালের দ্বারা চালিত হয়ে সে গঙ্গাসাগরের কাছে ছোটো একটি নামহীন দ্বীপ ক্রয় করে ফেলে, তারপর নিজের মর্জি অনুসারে সেই দ্বীপের নাম দেয়—‘হারাধনের দ্বীপ’। এবং অজস্র টাকা ঢেলে সেই বিজন দ্বীপের উপরে প্রাসাদের মতো মস্ত একখানা বাড়ি তৈরি করায়।
হাতে টাকা থাকলে মানুষ খেয়ালের বশে সব কিছুই করতে পারে। দিবাস্বপ্নে অনেক কিছুই চমৎকার বলে মনে হয়, কিন্তু কঠিন বাস্তবের সামনে এসে দাঁড়ালে সুখের স্বপ্ন ছুটে যেতে বিলম্ব হয় না। এই আধুনিক আবু হোসেনও সেই সত্য হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করলে। দ্বীপে যাতায়াত করবার জন্য নিয়মিত কোনো জলযানের ব্যবস্থা ছিল না। কাজেই কলকাতা থেকে আবশ্যক জিনিসপত্তর— বিশেষ করে আহাৰ্য্যসামগ্ৰী—যথাসময়ে সরবরাহ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে ওঠে। তার উপরে বর্ষাকালে সামুদ্রিক ঝড় যখন দুর্বার বেগে দ্বীপকে ভীষণভাবে আক্রমণ করে এবং দিন-রাত ধরে অশ্রান্ত বৃষ্টিধারায় দ্বীপ হয়ে পড়ে জলে জলে জলময়, তখন দ্বীপের নবাগত বাসিন্দাদের জীবন হয়ে ওঠে অত্যন্ত অসহায় এবং দুর্বহ। সুতরাং সেই হঠাৎ নবাবের খেয়াল ছুটে যেতে বেশি দেরি লাগল না।
মাস কয়েক যেতে না যেতেই সে আবার কলকাতায় পালিয়ে এসে, বাড়ি সমেত সেই দ্বীপটাকে জলের দরে বেচে ফেলবার জন্যে খবরের কাগজে উজ্জ্বল ভাষায় বড়ো বড়ো হরফে বিজ্ঞাপন দিতে লাগল। কিছুদিন পরেই শোনা গেল, আবার কে এক নির্বোধ ব্যক্তি পরে পস্তাবে বলে সস্তায় সেই দ্বীপটা কিনে নিয়েছে।
চন্দ্রবাবু নিজের পকেটের ভিতরে হাত ঢুকিয়ে বার করলেন একখানা চিঠি। পত্রলেখকের হাতের লেখা যার-পর-নাই খারাপ, কিন্তু জায়গায় জায়গায় তা আবার এমন স্পষ্ট যে পড়তে কোনোই কষ্ট হয় না ঃ–
প্রিয় চন্দ্রবাবু...অনেক কাল আপনার কোনো খবর পাইনি। ...কিন্তু আপনাকে এই হারাধনের দ্বীপে আসতেই হবে...পরিস্থানের মতো সুন্দর দ্বীপ.কত কথাই বলবার আছে..সেই পুরনো-দিনের কথা...প্রকৃতির কোলে বসে উপভোগ করব সূর্যের সোনার কিরণ..আসতেই হবে, নিশ্চয়ই আসবেন। ...আসচে বারেই তারিখে পোর্ট ক্যানিংয়ে আবার আপনার সঙ্গে দেখা হবে, আর প্রস্তুত থাকবে আমাদের একখানা লাঞ্চ’।
তলায় নাম সই করা হয়েছে—শ্ৰীমতী চারুশীলা দেবী।
চন্দ্রবাবু ভাবতে লাগলেন। আট-দশ বছর আগে দেওঘরে বেড়াতে গিয়ে এক চারুশীলা দেবীর সঙ্গে তার আলাপ হয়েছিল। তিনি ছিলেন এক অত্যন্ত ধনী জমিদারের বিধবা সহধর্মিণী । তখন তার বয়স ছিল বোধ হয় ত্রিশ-বত্রিশ। তিনিও ছিলেন অতিশয় খামখেয়ালি ।
ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লেন ভূতপূর্ব জজ চন্দ্রকান্ত চৌধুরি।
শ্রীমতী স্বপ্না সেন। সেই ট্রেনেই একখানি তৃতীয় শ্রেণির কামরায় চড়ে যাত্রা করছে পোর্ট ক্যানিং-এর দিকেই। কামরায় আরও কয়েকজন যাত্রী রয়েছে। সকলেই পরিচিত। স্বপ্না মনে মনে ভাবছিল, ভাগ্যে সে কর্মপ্রার্থী হয়ে খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়েছিল, তাই এতদিন পরে অস্থায়ী হলেও একটা ভালো কাজ পাওয়া গেল। তাকে হতে হবে একজন মহিলার সঙ্গিনী।
পকেট থেকে একখানি পত্র বার করে সে পড়তে লাগল – ‘সংবাদপত্রে আপনার বিজ্ঞাপন দেখেছি। আপনি যে মাহিনী চেয়েছেন তা দিতে আমার আপত্তি নেই। বারোই তারিখে বৈকালবেলায় আমি ‘পোর্ট ক্যানিং’এ হাজির থাকব। সেই সময়েই আমার সঙ্গে দেখা করলে আনন্দিত হব। রাহা খরচের জন্যে ২০/= টাকা পাঠালুম। ইতি—শ্ৰীমতী কাননকুন্তলা দেবী।
কাননকুন্তলা! বাবা, কী কষ্টকল্পিত নাম? ভদ্রমহিলা নিশ্চয়ই অনেক টাকার মালিক, নইলে একটা দ্বীপকে-দ্বীপই কিনে ফেলতে পারেন? দ্বীপের নামটাও কী বেয়াড়া! ‘হারাধনের দ্বীপ’! কে কবে শুনেছে এমন নাম?
স্বপ্নার মন হঠাৎ ফিরে গেল পিছনের দিকে মনে পড়ল তার কুমার নরেন্দ্রনারায়ণের কথা। তার কাছে সে কাজ করেছে প্রায় দুই বৎসর। কাজ কিছু কঠিন নয়, বিপত্নীক নরেন্দ্রনারায়ণের একমাত্র শিশুপুত্রকে দেখাশুনা করবার ভার ছিল তারই উপরে। নরেন্দ্রনারায়ণের একমাত্র বংশধর নীরেন্দ্রনারায়ণ। সেই হত তার অগাধ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী।
স্বপ্না শিউরে উঠল। নরেন্দ্রনারায়ণ–নরেন্দ্রনারায়ণ—না, না, নরেন্দ্রনারায়ণের কথা মন থেকে তার একেবারেই মুছে ফেলা উচিত!
কিন্তু—কিন্তু আর একটা করুণ দৃশ্য যে সে কিছুতেই ভুলতে পারছে না! পুরীর সেই সমুদ্রতীর! নীরেন্দ্রনারায়ণের ছোট্ট মুখখানি একবার ভাসছে, একবার ডুবছে—ভেসে যাচ্ছে উত্তাল তরঙ্গমালার দিকে। সে-ও তাকে বাঁচাবার জন্যে জলে ঝাপ দিলে বটে, কিন্তু মনে মনে নিশ্চিত ভাবেই জানত সে, কিছুতেই বাঁচাতে পারবে না তাকে।
না, না, কেন সে আবার ভেবে মরছে এইসব দুঃস্বপ্নের কথা?
নিজের মনকে শক্ত করে স্বপ্না কামরার জানলার দিকে ফিরে বসল। চেয়ে দেখতে লাগল প্রকৃতির নাচঘরে চলচ্চিত্রের পর চলচ্চিত্র—এক ছবি সুমুখে আসে, আর এক ছবি মিলিয়ে যায়!
স্বপ্নার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ঠিক তার সামনের বেঞ্চিতেই বসেছিল অমলেন্দু সেন।
নিজের মনে মনেই সে বললে, মেয়েটি সুন্দরী বটে। বেশ বুদ্ধিমতী বলেও মনে হয়। আচ্ছা পরে এর সঙ্গে একটু ভালো করে আলাপ করতে হবে।
কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তার মন আবার বলে উঠল, ধ্যেৎ, এসব আলাপ-পরিচয়ের কথা নিয়ে মাথা ঘামাবার সময় এখন নেই। এখন কাজের সময়, সে এসেছে জরুরি কাজের ভার নিয়ে।
হুঁ। অ্যাটনি বিজন বোস। লোকটা হচ্ছে অত্যন্ত রহস্যময়। বলে কিনা, বেশি কথার দরকার নেই অমলেন্দুবাবু। আপনার মত কী বলুন? হ্যাঁ, কি না?
অমলেন্দু বলে, আপনি পাঁচ হাজার দিতে চান? এমন অবহেলাভরে কথাগুলো সে বলেছিল, যেন পাঁচ হাজার টাকা তার কাছে ধর্তব্যের মধ্যেই গণ্য নয়। অথচ সে সময়ে পরের দিনের খাবার কেনবার সামর্থ্যও তার ছিল না। সে সময়ে এটুকুও সে বুঝতে পেরেছিল যে, বিজন বোস তার অবহেলার ভাবটা মোটেই আমলে আনেনি। অ্যাটর্নিদের চোখে ধুলো দেওয়া সহজ নয়। বিজন বোস চুপ করে আছে দেখে সে আবার শুধোয়, তাহলে এ বিষয়ে আপনি আর কোনো খবর দিতে রাজি নন? বিজন বোস নিশ্চিতভাবে মাথা নেড়ে বলে, না অমলেন্দুবাবু! আমার মক্কেল ভালো করেই খবর নিয়ে জেনেছেন যে, আপনি নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি হলেও আপনার বর্তমান আর্থিক অবস্থা এখন সচ্ছল নয়। তারই কথামতো আপনাকে আমি পাঁচ হাজার টাকা দেব এই শর্তে যে, আসছে ১২ই তারিখে বৈকালবেলায় আপনি ‘পোর্ট ক্যানিং-এ গিয়ে হাজির থাকবেন। সেখান থেকে একখানা মোটরলাঞ্চ আপনাকে নিয়ে হারাধনের দ্বীপে যাত্রা করবে। তারপর দ্বীপে উপস্থিত হয়ে আপনাকে কাজ করতে হবে আমার মক্কেলের ইচ্ছা অনুসারে।
অমলেন্দু বলে, সেই দ্বীপে আমাকে থাকতে হবে কতদিন?
—এক সপ্তাহের বেশি নয়।
অমলেন্দু অল্পক্ষণ চিন্তা করে বলে, কিন্তু জেনে রাখবেন, আমি কোনো বেআইনি কাজ করতে প্রস্তুত নই।
মুখ টিপে মৃদু হাসি হেসে বিজন বোস বলে, কেউ আপনাকে বে-আইনি কাজ করতে বললে দ্বীপ থেকে অনায়াসেই আপনি চলে আসতে পারবেন, কেউ বাধা দেবে না।
নিকুচি করেছে! এতক্ষণ পরে লোকটা আবার মুখ টিপে হাসলে। আইনবিরুদ্ধ কাজ করা অমলেন্দুর স্বভাববিরুদ্ধ নয়, ও-হাসি যেন ইঙ্গিতে সেই কথাই প্রকাশ করতে চায়! হ্যাঁ, দু-এক বার নিজেকে সামলাবার জন্যে তাকে এমন কিছু করতে হয়েছে, তা মুখ ফুটে বলা যায় না দশ জনের সামনে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেকে সে সামলে নিতে পেরেছে, কোনো বাধা না মেনেই। —হ্যাঁ, কোনো বাধা না মেনেই।
তা হারাধনের দ্বীপটা তার কাছে বোধহয় নিতান্ত মন্দ লাগবে না। একসঙ্গে ভ্রমণ ও অর্থোপার্জন!
গাড়ির একটা কোণ নিয়ে সিধে হয়ে চুপ করে বসেছিলেন সৌদামিনী দেবী। বয়স তার পয়ষট্টির কম হবে না। একহারা দেহ, ব্রাহ্মসমাজের মেয়ে। মাঝে মাঝে বিরক্ত চোখে কামরার অন্যান্য লোকগুলোর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখছিলেন। কামরার ভিতরে ভিড় আর গ্রীষ্মের আতিশয্যে অস্থির হয়ে উঠেছে সবাই। একটু অসুবিধা কেউ সইতে পারে না, সবতাতেই বাড়াবাড়ি। এই তো আমি কেমন স্থির ও শান্তভাবে বসে আছি! আমাকে দেখেও কি ওদের বুদ্ধি হয় না?
কামরার ভিতরে ছিল জন-চারেক তরুণী। তাদের হাবভাব ও সাজপোশাক একেবারে বেহদ বেহায়ার মতো। আমাদেরও বয়সকালে মেয়েরা সাজপোশাক ভালোবসত। কিন্তু তখন তো এমন নির্লজ্জতা কখনো দেখিনি! কালে কালে হল কী? এদের কঠিন শিক্ষা দেওয়া উচিত।
সকলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে সৌদামিনী তাকালেন জানলার বাইরের দিকে। কিন্তু প্রাকৃতিক দৃশ্য তার দৃষ্টি আকৃষ্ট করলে না, মনে মনে ভাবছিলেন তিনি গত বৎসরের কথা।
হ্যাঁ, গত বৎসরে এই সময়ে তিনি ছিলেন গিরিডিতে। এবারে চলছেন গঙ্গাসাগর সঙ্গমে, হারাধানের দ্বীপে।
‘ভ্যানিটি কেস’ থেকে একখানা আগে-পড়া চিঠি বার করে আবার পড়তে লাগলেন —
প্রিয় সৌদামিনী দেবী, আশা করি আমাকে আপনি ভুলে যাননি। কয়েক বৎসর আগে আমরা দুজনে পশ্চিমে একসঙ্গে কিছুকাল কাটিয়েছিলুম, এ কথা আপনার মনে আছে তো? সেদিনের মিলন-স্মৃতি আজও আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে আছে।
গঙ্গাসাগরের সঙ্গমে আমি একটি ছোটো দ্বীপ কিনেছি। সেখানে মনের মতো একখানি বাড়িও পেয়েছি। তার ভিতরে গিয়ে বসলে আপনি ভুলে যাবেন সব একেলে ঝঞ্ঝাটের কথা—অর্থাৎ এরোপ্লেন, ট্রাম-বাস-মোটর, গ্রামোফোন, রেডিয়ো-সিনেমা আর মেয়েদের আধ-ফুট-উঁচু হাই-হিল জুতোর কথা। আপনি যদি মাসখানেক এখানে এসে যাপন করেন, তাহলে অত্যন্ত আনন্দিত হব। জায়গাটির একটি নামও দিয়েছি—‘হারাধনের দ্বীপ’। নামটা সেকেলে, নয়? তা আমরা দুজনেই তো সেকেলে যা-কিছু পছন্দ করি। আসবেন। আসছে ১২ই তারিখে বৈকালবেলায় ‘পোর্ট ক্যানিং-এ আমি আপনার জন্যে প্রস্তুত হয়ে থাকব।
ইতি—
আপনার কাঃ কুঃ
আবার কাঃ কুঃ? মানুষটি কে? সাটে নাম লিখেছে কেন? ফি বছরেই তো একবার করে এখানে-ওখানে বেড়াতে যাওয়ার অভ্যাস তার আছে। কবে, কোথায় এই মানুষটির সঙ্গে তার দেখা হয়েছিল, মনে পড়ে না তো! তিনি মেয়ে না পুরুষ? লেখার ছাদ দেখে তো মনে হয় মেয়েমানুষ। তা যিনিই হোন, বিনা পয়সায় এমন বেড়িয়ে আসবার লোভ তো ছাড়া যায় না! শেষ পর্যন্ত দেখাই যাক না কেন?
ট্রেন একটা স্টেশনে এসে থামল। বিরক্ত মুখে বাইরের দিকে তাকালেন মেজর সেন। একে তো এইসব পাড়াগেঁয়ে ট্রেনগুলো গোরুর গাড়ির সঙ্গে তাল রেখে চলবার চেষ্টা করে, তার উপরে ঘড়িঘড়ি যখন-তখন যে কোনো স্টেশনে এসে আচল হয়ে থাকা। জ্বালাতন!
কিন্তু এই ‘কাঃ কুঃ’ লোকটা কে? লিখেছে: আমাদের এই হারাধনের দ্বীপে এলে আপনার দুইজন পুরাতন বন্ধুর দেখা পাবেন। আমিও আপনার কাছে নতুন মানুষ নই। সবাই মিলে কিছুদিন আবার পুরাতন স্মৃতির জগতে রাস করা যাবে।
পুরাতন স্মৃতির জগতে? সেখানে বাস করার জন্যে তার মনে কোনোই আগ্রহ নেই। সেখানে মনকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে ভালো লাগে না তার। অতীত কালের কথা ভাবলেই মনে জাগে তার বিশেষ এক ঘটনার স্মৃতি। সে ঘটনা তিনি লুকিয়ে রাখতে চান সন্তপর্ণে।
কিন্তু চুলোয় যাক সেসব কথা। এই হারাধনের দ্বীপের রহস্যটা কী? আজকাল খবরের কাগজে প্রায়ই এই অজানা দ্বীপটার সম্বন্ধে অদ্ভুত-সব কাহিনি পাঠ করা যায়। হঠাৎ সেখানে তার আমন্ত্রণ হল কেন?
ভেবেচিন্তে কোনোই সুরাহা হল না। ট্রেন আবার চলতে শুরু করলে। তিনি আশ্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলেন।
ডাক্তার বোস গম্ভীরভাবে তার রিজার্ভ করা কামরার ভিতরে বসে আছেন।
আজ জীবনের পথ হয়েছে তার কুসুমাস্তৃত। অনেক বাধাবিঘ্ন, অনেক কাঁটাঝোপ পার হয়ে আজ তিনি যে পথে এসে দাঁড়িয়েছেন, তা নিয়ে যাবে তাকে উচ্চতম, সৌভাগ্যের দিকে। আজ তার হাতযশের কথা ছড়িয়ে পড়েছে দেশ-বিদেশে। তাকে ঘিরে থাকে রোগীদের জনতা, না-চাইতে তার ঘরে এসে পড়ে কাঁড়িকাঁড়ি টাকা। কয়েক বৎসর আগেও এটা ছিল স্বপ্নাতীত ব্যাপার। তার বর্তমান উপভোগ্য, তার ভবিষ্যৎ সমুজ্জ্বল।
কেবল অতীতে থেকে গিয়েছে একটি খুঁত। তখনও তিনি আরোহণ করেছেন খ্যাতির সোপানে, কিন্তু একটি মাত্র ঘটনা তার জীবনকে করে তুলেছিল অপ্রীতিকর। কেবল অপ্রীতিকরই নয়। আর-একটু হলেই ভেঙে পড়তে পারত তাঁর যশের ভিত্তি। থাক সে কথা, নতুন করে আর ভাবার দরকার নেই। কিন্তু এই লোকটা কে? এমন করে নিজের নাম সই করেছে, ভালো করে পড়াই যায় না। কিন্তু সে যে তাকে চেনে, সে বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই। হারাধনের দ্বীপে গিয়ে কিছুদিন অবকাশ যাপন করার জন্যে আমন্ত্রিত হয়েছেন তিনি।
অবকাশ! যেন অবকাশের সুযোগ তাঁর আছে। রোগী আর রোগী, টাকা আর টাকা! রোগী দেখা বন্ধ করলে টাকা আসাও বন্ধ হয়। কিন্তু রোগী আর টাকা নিয়েই তো প্রতিদিন কাটিয়ে দেওয়া চলে না। মাঝে মাঝে হাঁপ ছাড়তে না পারলে জীবন যে হয়ে উঠবে বিষাক্ত। হ্যা, ইতিমধ্যেই তার জীবন হয়ে উঠেছে ভারবহ। কিছুদিনের ছুটি না নিলে এ ভার আর নামবে না। তাই তিনি গ্রহণ করেছেন এই আমন্ত্রণ।
ট্রেনের আর-একটি কামরায় বসে মহেন্দ্র নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে তারপর মনে মনেই বললে, ‘পোর্ট ক্যানিং-এ পৌছতে আর বেশি দেরি নেই।’ বুকপকেটে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে সে বার করলে একখানা পকেটবুক। তারই খানকয় পাতা উলটে এক জায়গায় থেমে সে কতকগুলো নামের ফর্দ পাঠ করতে লাগল: চন্দ্রকান্ত চৌধুরি, স্বপ্না সেন, অমলেন্দু সেন, সৌদামিনী, মেজর সেন, ডাক্তার বোস, মনোতোষ চৌধুরি এবং নিত্যানন্দ দাস ও সত্যবালা—স্বামী আর স্ত্রী। বাড়িখানা তদারক করার ভার আছে শেষ দুজনেরই উপরে।
মহেন্দ্র নিজের মনেই বললে, তাহলে এই ক-জনকে নিয়েই আমার কারবার। তা এদের নিয়ে বেশি বেগ পেতে হবে না বলেই মনে হচ্ছে।
পকেটবুকখানা আবার বুকপকেটের ভিতরে স্থাপন করে জানলা দিয়ে সে একবার বাইরে মুখ বাড়িয়ে দিলে। পাশের কামরার আর এক ভদ্রলোকও জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আছেন। তার সঙ্গে চোখাচৌখি হতেই মহেন্দ্র জানলার কাছ থেকে সরে এসে বসল। আপন মনে বললে, গোঁফ দেখেই চিনেছি! সেই মিলিটারি ভদ্রলোক! উনি আমাকে চিনতে পারলেন কি না জানি না। কিন্তু যদি পরিচয় জিজ্ঞাসা করেন, আমি কী বলব? বললেই হবে, আমি সিংহল-প্রবাসী বাঙালি, স্বদেশে বেড়াবার শখ হয়েছে, তাই এদিকে এসেছি।
(ক্রমশ)
---------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now