বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

হ্যাশট্যাগ হিরো

"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ শহরের নাম ছিল একসময় “শান্তিপুর”, যদিও এখন কেউ আর সেই নামে ডাকে না। এখন সবাই ডাকে—“ভাইরাল নগরী”। কারণ এখানে শান্তির চেয়ে শব্দ বেশি, আর ভাবনার চেয়ে ট্রেন্ড বেশি টেকে। এই শহরের সবচেয়ে বড় মৌসুম ছিল কোরবানির ঈদের আগে-পরে। তবে এখানে কোরবানির চেয়ে বেশি আলোচনার বিষয় ছিল—পশুর নাম। শান্তিপুরের এক প্রান্তে ছিল এক অদ্ভুত বাজার—“নামবাজার”। এখানে গরু-ছাগল কেনা-বেচা হতো ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি বেচাকেনা হতো নামের। দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা থাকত—“আজকের স্পেশাল: ট্রেন্ডিং নাম ১০০ টাকা থেকে শুরু”, “ভিআইপি নাম প্যাকেজ”, “ইনফ্লুয়েন্সার নাম ডিসকাউন্ট”। এই বাজারের সবচেয়ে বিখ্যাত নাম বিক্রেতা ছিল এক ব্যক্তি—তার নাম সবাই ভুলে গিয়েছিল, কারণ সে নিজেই প্রতিদিন নাম বদলাত। কখনো “নামরাজা”, কখনো “নাম-গুরু”, আবার কখনো “নেমিং সিইও”। তার দাবি ছিল—“পশুর আসল পরিচয় হলো তার নাম। নাম ভালো হলে গরু নিজেই স্টার হয়ে যায়।” ঈদের এক মাস আগে বাজারে প্রবেশ করল এক যুবক—তার নাম মাহফুজ, কিন্তু সবাই তাকে ডাকত “কনটেন্ট ক্রিয়েটর মাহফুজ”। তার হাতে ছিল বিশাল এক গরুর ছবি, আর চোখে স্বপ্ন—ভাইরাল হওয়ার স্বপ্ন। সে নামবাজারে ঢুকেই বলল, “ভাই, আমার গরুর জন্য একটা নাম চাই, যেটা ট্রেন্ড করবে।” নামরাজা হাসল। “ট্রেন্ড করতে চাইলে নাম নয়, ব্র্যান্ড নিতে হয়।” মাহফুজ উত্তেজিত হয়ে বলল, “ব্র্যান্ডই দেন।” নামরাজা তার মাথা থেকে কাল্পনিক ধুলো ঝেড়ে বলল, “এই মৌসুমে হট নাম হচ্ছে—‘সুলতান দ্য গ্রেট’, ‘বজ্র-নন্দন’, ‘কাটারি কিং’, ‘ডিজিটাল বাদশা’।” মাহফুজ কিছুক্ষণ ভেবে বলল, “না ভাই, এগুলো পুরনো হয়ে গেছে। একটু ইউনিক কিছু চাই।” নামরাজা চোখ টিপে বলল, “তাহলে আছে—‘ভাইরাল বাবু’, ‘ট্রেন্ডি খান’, ‘হ্যাশট্যাগ হিরো’।” মাহফুজ খুশিতে হাততালি দিল, “‘হ্যাশট্যাগ হিরো’! এইটা একদম পারফেক্ট।” সেই দিন থেকেই শহরের মোড়-মহল্লায় একটা নতুন গরুর নাম ছড়িয়ে পড়ল—হ্যাশট্যাগ হিরো। গরুটির আসল গুণ ছিল সে খুব শান্ত, ঘাস খেত আর মাঝে মাঝে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকত। কিন্তু নামের ভারে সে যেন হঠাৎ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেল। ইনস্টাগ্রামে তার আলাদা অ্যাকাউন্ট খোলা হলো। ক্যাপশনে লেখা— “Meet #HashtagHero ???????? The future of Qurbani.” এরপর শুরু হলো শহরের নাম প্রতিযোগিতা। একজন বলল, তার গরুর নাম হবে “কিং অফ ইমোশন”। আরেকজন বলল, “ডার্ক নাইট অব কোরবানি”। কেউ আবার তার ছাগলের নাম রাখল—“লাভ স্টোরি এক্স”। ধীরে ধীরে নামবাজার আরও বড় হয়ে উঠল। এখানে এখন নাম শুধু নাম নয়—স্ট্যাটাস, সম্মান আর ফলোয়ার বাড়ানোর হাতিয়ার। এদিকে শহরের এক বৃদ্ধ আলেম ছিলেন—হুজুর আব্দুস সামাদ। তিনি এই পরিবর্তন দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলতেন। তিনি একদিন বাজারে এলেন, হাতে পুরনো এক বই। তিনি কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সব দেখলেন—নাম বিক্রি হচ্ছে, হাসাহাসি হচ্ছে, ভিডিও বানানো হচ্ছে। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, “মানুষ এখন নাম দিয়ে পশুকে নয়, নিজের অহংকারকে সাজাচ্ছে।” কেউ শুনল না। বরং এক তরুণ এসে ক্যামেরা অন করে বলল, “হুজুর, একটা রিঅ্যাকশন ভিডিও দিবেন?” হুজুর মাথা নেড়ে চলে গেলেন। ঈদের আগের রাতে শহরের পরিস্থিতি এমন দাঁড়াল যে, গরুর চেয়ে তার নাম বেশি আলোচিত। হ্যাশট্যাগ হিরো এখন ট্রেন্ডিং টপে। মানুষ তার ছবি দিয়ে মিম বানাচ্ছে, কেউ আবার গান বানাচ্ছে— “হ্যাশট্যাগ হিরো, তুমি কোথায় যাও…” মাহফুজ গর্বে বুক ফুলিয়ে বলছিল, “দেখেছ? আমার গরু এখন সেলিব্রিটি।” কিন্তু সেই রাতেই একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। গরুটা হঠাৎ স্বপ্ন দেখল—স্বপ্নে সে দেখছে, তার সামনে অসংখ্য নাম ভেসে উঠছে। “কাটারি কিং”, “ডিজিটাল বাদশা”, “ইমোশনাল বুল”, “ভাইরাল হিরো”—সব নাম তার গলায় ঝুলছে, ভারী হয়ে যাচ্ছে। সে হাঁটতে পারছে না। গরুটা চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার মুখে কোনো শব্দ নেই—শুধু ঘাস চিবানোর অভ্যাস। পরদিন সকালে দেখা গেল, হ্যাশট্যাগ হিরো চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখে কোনো উচ্ছ্বাস নেই। যেন নামের ভারে সে নিজেকেই ভুলে গেছে। ঈদের দিন এল। শান্তিপুরে তাকবির ধ্বনি উঠল, কোরবানি শুরু হলো। কিন্তু নামবাজারে এক অদ্ভুত দৃশ্য—প্রত্যেক পশুর পাশে বড় বড় ব্যানার, LED স্ক্রিন, লাইভ স্ট্রিম। “Live Qurbani of King of Emotion!” “Exclusive slaughter of Digital Badshah!” “Breaking: Hashtag Hero arrives!” কিন্তু কোরবানির মূল উদ্দেশ্য যেন কোথাও হারিয়ে গেল। কেউ তাকবির কম বলছে, ভিডিও বেশি করছে। হুজুর আব্দুস সামাদ আবার এলেন। এবার তিনি কিছু বললেন না। শুধু দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকলেন। একজন ইউটিউবার তার কাছে এসে বলল, “হুজুর, একটা ছোট্ট ইন্টারভিউ দিবেন? কোরবানির উপর আপনার রিঅ্যাকশন চাই।” হুজুর শান্তভাবে বললেন, “তোমরা পশুর নাম রাখছ, না নিজের নফসের?” ছেলেটি থমকে গেল, কিন্তু তারপর হাসল— “ভাই, এইটা কনটেন্ট না।” সন্ধ্যার দিকে কোরবানির মাংস বিতরণ শুরু হলো। কিন্তু শহরের এক কোণে হ্যাশট্যাগ হিরোর পাশে মাহফুজ বসে ছিল চুপচাপ। ক্যামেরা অফ। সে প্রথমবার গরুর দিকে ভালো করে তাকাল। গরুটা তার দিকে তাকিয়ে ছিল না—সে যেন কোথাও দূরে তাকিয়ে আছে, যেখানে কোনো নাম নেই, কোনো ট্রেন্ড নেই। মাহফুজ ধীরে ধীরে বলল, “তোর নামটা কি খুব ভারী হয়ে গিয়েছিল?” গরু কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিল, যেন বলছে—“আমি তো শুধু প্রাণী ছিলাম।” ঈদের পর শহর আবার স্বাভাবিক হলো, কিন্তু নামবাজার আগের মতো রইল না। ধীরে ধীরে মানুষ বুঝতে শুরু করল, নাম বড় হতে পারে, কিন্তু অর্থ বড় না হলে সেই নামও ফাঁকা শব্দ। হুজুর আব্দুস সামাদ একদিন আবার সেই বাজার দিয়ে হাঁটছিলেন। এবার সাইনবোর্ডে লেখা ছিল ছোট করে— “নাম নয়, নিয়ত বড় হোক।” তিনি একটু থেমে বললেন, “শেষ পর্যন্ত মানুষ নামের জন্য নয়, অর্থের জন্য বাঁচে—এ কথা মানুষ দেরিতে বুঝে।” দূরে কোথাও একজন শিশু তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, আমাদের গরুর নাম কী হবে?” বাবা একটু হাসলেন, তারপর বললেন, “আগে গরুকে গরু হতে দাও, তারপর নাম দেব।” শান্তিপুরে তখন বাতাস একটু অন্যরকম লাগছিল। যেন শব্দ কমেছে, আর ভাবনা বেড়েছে। কিন্তু নামবাজার পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি—সে শুধু অপেক্ষা করছে পরবর্তী ট্রেন্ডের জন্য। কারণ এই শহরে নাম কখনো মরে না, শুধু রূপ বদলায়। আর মানুষ? মানুষ শুধু নামের ভেতর নিজের প্রতিফলন খুঁজতে খুঁজতে কখন যে নিজের আসল পরিচয় ভুলে যায়—সেটাই এই গল্পের সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গ।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ হ্যাশট্যাগ হিরো

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now