বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

“হ্যাঁপুরের মহারাজ ও না-বনের নির্বাসিতরা”

"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X Mohammad Shahzaman Shuvoh দেশের মানচিত্রে হ্যাঁপুর নামের রাজ্যটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ এটি কোনো ভৌগোলিক রাজ্য নয়; এটি মানুষের মনের ভেতরে গড়ে ওঠা এক অদ্ভুত সভ্যতা। সেখানে শিশুরা জন্মের পর প্রথম যে শব্দটি শেখে, তা “না” নয়—“হ্যাঁ”। আর শেষ বয়সে মৃত্যুশয্যাতেও তাদের ঠোঁটে লেগে থাকে, “আচ্ছা, যদি দরকার হয়…” হ্যাঁপুরের রাজধানীর নাম ছিল “সম্মতিনগর”। রাজপ্রাসাদের সামনে বিশাল এক ফলকে সোনালী অক্ষরে লেখা ছিল— “না বলা অসভ্যতা, হ্যাঁ বলা মানবতা।” রাজ্যের সব নাগরিক এই বাণী মুখস্থ করত। স্কুলের প্রথম ক্লাসেই শিক্ষকরা পড়াতেন— “কেউ কিছু চাইলে না বলবে না। না বলা মানে অহংকার। না বলা মানে হৃদয়হীনতা। না বলা মানে সমাজবিরোধিতা।” এই রাজ্যের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন মহারাজ সায়দুল সম্মতি তৃতীয়। তার উপাধি ছিল—“সর্বজনহ্যাঁ মহামান্য”। তিনি এতটাই বিনয়ী ছিলেন যে কেউ যদি মাঝরাতে এসে বলত, “মহারাজ, আপনার সিংহাসনটা একটু ধার দেন, আমার বিয়ের ফটোশুট হবে”—তিনি হাসিমুখে বলতেন, “অবশ্যই, মানবসেবাই ধর্ম।” ফলে হ্যাঁপুরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত জিনিস ছিল রাজসিংহাসন, আর সবচেয়ে কম ব্যবহৃত জিনিস ছিল রাজবুদ্ধি। রাজ্যের প্রতিটি দপ্তরে একটি করে ঘণ্টা ঝুলত। কেউ সাহায্য চাইলে ঘণ্টা বাজত। মজার ব্যাপার হলো, ঘণ্টা বাজানোর মানুষের সংখ্যা ছিল লাখ লাখ, কিন্তু ঘণ্টা না বাজিয়ে নিজে কাজ করার মানুষের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। কারণ হ্যাঁপুরে কাজ করার চেয়ে অন্যকে দিয়ে কাজ করানোকে বেশি সামাজিক দক্ষতা মনে করা হতো। সেখানে এক অদ্ভুত পেশা ছিল—“অনুরোধ পরামর্শদাতা”। এরা মানুষকে শেখাত কীভাবে কারও মুখের দিকে তাকিয়ে এমন করুণ কণ্ঠে কথা বলতে হয়, যাতে সামনে থাকা মানুষটি না বলতে লজ্জা পায়। রাজধানীর বাজারে প্রায়ই দেখা যেত— —“ভাই, আপনার ঘোড়াটা একটু দেন, শ্বশুরবাড়ি যাব।” —“নিন।” —“আর আপনার চাকরটাকেও দেন, সে ঘোড়াটা চালাতে জানে।” —“নিন।” —“আপনার বউয়ের রান্নাটা যদি সঙ্গে প্যাকেট করে দেন…” —“আচ্ছা, সেটাও নিন।” হ্যাঁপুরের মানুষ এতটাই ভদ্র ছিল যে চোরেরা বাড়িতে ঢুকে জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার আগে মালিককে জিজ্ঞেস করত— “কষ্ট করে আলমারির চাবিটা দেবেন?” আর মালিক মৃদু হেসে বলত— “ওমা, আপনি নিজে খুলতে গেলে কষ্ট হবে যে!” এই রাজ্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় সামাজিক অনুষ্ঠান ছিল “সম্মতি উৎসব”। বছরে একদিন সবাই একে অপরকে অদ্ভুত সব অনুরোধ করত, আর যে সবচেয়ে হাসিমুখে নিজের সর্বনাশ করতে পারত, তাকে দেওয়া হতো “মানবতার হীরকপদক”। একবার এক লোক তার প্রতিবেশীকে বলেছিল— “ভাই, আপনার জমিটা একটু ব্যবহার করব।” প্রতিবেশী রাজি হলো। দুই মাস পর দেখা গেল সেখানে শপিংমল দাঁড়িয়ে গেছে। লোকটি বলল— “আপনি তো না বলেননি!” প্রতিবেশী তখন গর্বভরে বলল— “আমাদের পরিবার সাত পুরুষ ধরে কাউকে না বলে না।” তারপর ভাড়া বাসায় উঠে গিয়ে সে মানবিকতার ওপর বক্তৃতা দিতে লাগল। এই রাজ্যে “ব্যস্ততা” শব্দটিকে অশ্লীল মনে করা হতো। কেউ যদি বলত, “আমি এখন একটু ব্যস্ত”—তাহলে সমাজ তাকে ভয়ংকর স্বার্থপর হিসেবে চিহ্নিত করত। ফলে সবাই সবসময় অব্যস্ত থাকার অভিনয় করত, যদিও ভেতরে ভেতরে তারা ছিল ক্লান্ত, ক্ষয়ে যাওয়া এবং চুপচাপ ভেঙে পড়া মানুষ। হ্যাঁপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগে এক গবেষণায় দেখা গেল, রাজ্যের আশি শতাংশ মানুষ রাতে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদে। কিন্তু সকালে উঠে আবার হাসিমুখে বলে— “বলুন, আপনার জন্য কী করতে পারি?” বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা এই রোগের নাম দিয়েছিলেন—“সামাজিক সম্মতিজনিত আত্মক্ষয় ব্যাধি”। কিন্তু এই গবেষণা প্রকাশের আগেই সরকার সেটি নিষিদ্ধ করে দেয়। কারণ তাতে রাজ্যের মহান আদর্শের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাওয়া গিয়েছিল। রাজ্যের এক কোণে ছিল ছোট্ট একটি বন—“না-বন”। সেখানে কিছু নির্বাসিত মানুষ বাস করত। এরা জীবনের কোনো না কোনো সময়ে সাহস করে “না” বলেছিল। ফলে সমাজ তাদের ভয়ংকর বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। না-বনের মানুষদের নিয়ে হ্যাঁপুরে ভয়ংকর গল্প প্রচলিত ছিল। কেউ বলত— “ওরা নাকি নিজের সময়কে নিজের বলে মনে করে!” কেউ বলত— “ওরা নাকি ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নেয়!” আবার কেউ ফিসফিস করে বলত— “শুনেছি, ওরা নাকি অন্যের অনুরোধ শুনে আগে ভাবে, পরে উত্তর দেয়!” হ্যাঁপুরের শিশুরা এসব শুনে আতঙ্কে মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরত। একদিন রাজ্যের প্রধান হিসাবরক্ষক গিয়াস উদ্দিন হিসাবি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি জীবনে কখনো কাউকে না বলেননি। অফিসের সহকর্মীর কাজ, প্রতিবেশীর বাজার, আত্মীয়ের দেনা, বন্ধুর সন্তানের টিউশনি—সব কিছুর দায় নিজের কাঁধে তুলে নিতে নিতে একদিন তার মেরুদণ্ড সত্যিই বাঁকা হয়ে গেল। রাজচিকিৎসক তাকে পরীক্ষা করে বললেন— “আপনার শরীরে কোনো রোগ নেই। আপনার আত্মা অতিরিক্ত ভদ্রতায় রক্তশূন্য হয়ে গেছে।” কিন্তু গিয়াস উদ্দিন তবুও চিকিৎসককে বললেন— “আপনি যদি বলেন, আমি আরও একটু কাজ করতে পারি…” তার স্ত্রী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন— “মানুষটা বিয়ের দিনও ‘না’ বলতে পারেনি। কাবিনের অঙ্ক জিজ্ঞেস করতেই বলেছিল—যা ভালো মনে হয়…” হ্যাঁপুরে সবচেয়ে করুণ দৃশ্য ছিল সন্ধ্যার সময়। অফিস শেষে ক্লান্ত মানুষগুলো নিজের ঘরে ফিরত না। কেউ বন্ধুর কাজ করছে, কেউ আত্মীয়ের ঝামেলা সামলাচ্ছে, কেউ আবার এমন মানুষের অনুরোধ পালন করছে, যার নামও ঠিকমতো জানে না। তাদের নিজেদের সন্তানেরা দরজায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করত। বৃদ্ধ মায়েরা জানালার পাশে বসে থাকত। স্ত্রীরা রান্না ঠান্ডা করে আবার গরম করত। কিন্তু হ্যাঁপুরের নাগরিকেরা মনে করত, পরিবারকে সময় দেওয়ার চেয়ে পৃথিবীর সব মানুষের খুশি নিশ্চিত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একদিন রাজ্যে এক রহস্যময় বৃদ্ধ এলেন। তার নাম কেউ জানত না। তিনি শহরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি অদ্ভুত দোকান খুললেন—“না বলার প্রশিক্ষণ কেন্দ্র”। দোকানের সামনে লেখা ছিল— “প্রথম ‘না’ বিনামূল্যে।” লোকজন আতঙ্কে দূর থেকে তাকিয়ে থাকত। কেউ কাছে যেত না। কারণ গুজব ছড়িয়েছিল, এই দোকানে গেলে মানুষ স্বার্থপর হয়ে যায়। তবু কৌতূহলবশত একদিন এক তরুণ ঢুকল। তার নাম রাশেদ। বয়স ত্রিশ। চোখের নিচে কালি। কাঁধে চারজনের কাজ। মুখে বাধ্য হাসি। বৃদ্ধ তাকে জিজ্ঞেস করলেন— “তুমি ক্লান্ত?” রাশেদ ভদ্রভাবে বলল— “না না, আমি ভালো আছি।” বৃদ্ধ হেসে বললেন— “এই যে, প্রথম মিথ্যাটা বের হলো।” তারপর তিনি রাশেদকে আয়নার সামনে দাঁড় করালেন। বললেন— “এবার বলো—আমি পারব না।” রাশেদের ঠোঁট কাঁপতে লাগল। যেন ভয়ংকর কোনো অপরাধ করতে যাচ্ছে। তার শরীর ঘামতে লাগল। মনে হলো আকাশ ভেঙে পড়বে। সে ধীরে ধীরে বলল— “আমি… পারব না।” কিছুই ঘটল না। বজ্রপাত হলো না। পৃথিবী ধ্বংস হলো না। কেউ এসে তাকে গ্রেফতার করল না। বরং বহুদিন পর তার বুকটা হালকা লাগল। সেদিনের পর রাশেদ ছোট ছোট জায়গায় “না” বলতে শুরু করল। —“দুঃখিত, আজ আমি বিশ্রাম নেব।” —“এই কাজটি এখন আমার পক্ষে সম্ভব নয়।” —“আমি সাহায্য করতে চাই, কিন্তু আমারও সীমাবদ্ধতা আছে।” প্রথমে মানুষ অবাক হলো। তারপর কেউ কেউ রেগে গেল। কারণ তারা হঠাৎ বুঝতে পারল, এতদিন তারা একজন মানুষ নয়—একটি বিনামূল্যের যন্ত্র ব্যবহার করছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে অদ্ভুত পরিবর্তন শুরু হলো। রাশেদ আগের চেয়ে শান্ত হয়ে গেল। তার পরিবারের সঙ্গে সময় বাড়ল। সে আবার বই পড়তে শুরু করল। তার হাসি আর বাধ্যতামূলক লাগত না। এই খবর আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল। হ্যাঁপুর সরকার দ্রুত জরুরি বৈঠক ডাকল। মন্ত্রীসভায় আতঙ্কিত কণ্ঠে বলা হলো— “মানুষ যদি না বলতে শেখে, তাহলে অন্যের ব্যক্তিগত কাজগুলো করবে কে?” আরেক মন্ত্রী বললেন— “এতে তো আত্মীয়স্বজনের ওপর বিনামূল্যে শ্রমের ঐতিহ্য ধ্বংস হয়ে যাবে!” তৃতীয় মন্ত্রী কাঁদতে কাঁদতে বললেন— “তাহলে তো মানুষ নিজের জীবন নিয়েও ভাবতে শুরু করবে!” অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো—“না” শব্দটিকে রাষ্ট্রদ্রোহী ঘোষণা করা হবে। রাজ্যে নতুন আইন জারি হলো— “কোনো নাগরিক টানা তিনবার না বললে তাকে অসামাজিক হিসেবে গণ্য করা হবে।” ফলে মানুষ নতুন কৌশল আবিষ্কার করল। তারা সরাসরি “না” না বলে বলত— “দেখি…” “চেষ্টা করব…” “আসলে ব্যাপারটা…” এভাবে হ্যাঁপুরে ভদ্রতার নতুন অভিধান তৈরি হলো, যেখানে “দেখি” মানে ছিল “না”, আর “ইনশাআল্লাহ” মানে ছিল “কখনোই না”। কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। মানুষ বুঝতে শুরু করেছে, নিজের সীমা রক্ষা করা অপরাধ নয়। যে সম্পর্ক একটি বিনীত অসম্মতিকে সহ্য করতে পারে না, সেটি আসলে সম্পর্ক নয়—একটি নীরব শোষণব্যবস্থা। একদিন মহারাজ নিজেও গোপনে সেই বৃদ্ধের দোকানে গেলেন। তিনি ক্লান্ত ছিলেন। বহু বছর ধরে সবাইকে খুশি করতে করতে তিনি নিজের পছন্দের রং পর্যন্ত ভুলে গেছেন। বৃদ্ধ তাকে জিজ্ঞেস করলেন— “আপনি শেষ কবে নিজের জন্য কিছু করেছেন?” মহারাজ দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে তার চোখ ভিজে উঠল। তিনি ফিসফিস করে বললেন— “আমার মনে নেই…” বৃদ্ধ তাকে আয়নার সামনে দাঁড় করালেন। মহারাজ কাঁপা গলায় বললেন— “না…” এই একটি শব্দ উচ্চারণ করতেই যেন রাজপ্রাসাদের দেয়ালে শত বছরের জমে থাকা ধুলো নড়ে উঠল। সেদিন রাতে হ্যাঁপুরের আকাশে অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। মানুষ প্রথমবারের মতো নিজেদের ঘরে একটু আগে ফিরল। কেউ সন্তানের সঙ্গে গল্প করল। কেউ মায়ের পাশে বসে চা খেল। কেউ একা ছাদে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আর অনেক দিন পর তারা বুঝল— মানবতা মানে নিজের জীবনটাকে নিঃশেষ করে ফেলা নয়। কারও পাশে দাঁড়ানো মহৎ, কিন্তু নিজের ভেতরের মানুষটিকে প্রতিদিন হত্যা করে নয়। তারপর থেকে হ্যাঁপুরে নতুন একটি প্রবাদ চালু হলো— “যে মানুষ প্রয়োজনমতো ‘না’ বলতে পারে না, তার ‘হ্যাঁ’-এরও কোনো মূল্য থাকে না।”


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ “হ্যাঁপুরের মহারাজ ও না-বনের নির্বাসিতরা”

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now