বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

গ্লাসবাহী মানুষ

"মজার গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ পৃথিবীতে মানুষের পরিচয় অনেক রকম। কেউ বই বহন করে, কেউ বাজারের ব্যাগ, কেউ দায়িত্ব, কেউ ক্ষমতা। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর জাতটি হলো—গ্লাসবাহী মানুষ। এরা হাতে কোনো দৃশ্যমান গ্লাস না থাকলেও সারাক্ষণ একটি অদৃশ্য পানিভরা গ্লাস বহন করে বেড়ায়। গ্লাসের পানিটুকু কখনো দুশ্চিন্তা, কখনো অহংকার, কখনো অভিমান, কখনো অপমান, কখনো ভবিষ্যতের ভয়, কখনো অতীতের আফসোস। আশ্চর্যের বিষয়, এই গ্লাস কেউ তাদের হাতে ধরিয়ে দেয় না; নিজেরাই তুলে নেয়। তারপর এমনভাবে ধরে রাখে, যেন পৃথিবীর ভারসাম্য ওই গ্লাসের ওপরই নির্ভর করছে। আমার এক প্রতিবেশী আছেন। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই তিনি তাঁর গ্লাসে নতুন করে পানি ভরেন। বাজারে আলুর দাম বাড়ল—এক মগ পানি। পাশের বাড়ির ছেলের চাকরি হলো—আরেক মগ। নিজের ছেলের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হতে এখনও তিন মাস বাকি—তবু আধা গ্লাস ভরে গেল। বিকেলের দিকে যদি বিদ্যুৎ পাঁচ মিনিট যায়, তবে তিনি গ্লাস দু'হাতে ধরে বসে থাকেন। মনে হয়, বিদ্যুৎ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী তাঁর ব্যক্তিগত শত্রু। আমি একদিন বললাম, “চাচা, গ্লাসটা একটু টেবিলে রাখুন।” তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “তুমি ছোট মানুষ, বুঝবে না। দুশ্চিন্তা না করলে মানুষ মানুষ হয় না।” এই কথাটা শুনে আমি কয়েক দিন গবেষণা করলাম। সত্যিই দেখলাম, আমাদের সমাজে যার গ্লাস যত ভারী, তার সামাজিক মর্যাদাও যেন তত বেশি। যে মানুষ হেসে কথা বলে, তাকে সবাই সন্দেহ করে। মনে মনে ভাবে, লোকটার নিশ্চয়ই কোনো কাজ নেই। অথচ যার কপালে বারোটা ভাঁজ, মুখে দীর্ঘশ্বাস আর হাতে অদৃশ্য গ্লাস—তাকে সবাই বলে, “আহা! কী দায়িত্ববান মানুষ!” এক আত্মীয়ের সঙ্গে বহুদিন পর দেখা। কুশল জিজ্ঞেস করতেই তিনি উত্তর দিলেন না। প্রথমে গ্লাসের ওজন সম্পর্কে দশ মিনিটের একটি মৌখিক প্রতিবেদন দিলেন। দেশে কী হবে, বিদেশে কী হবে, আবহাওয়া কোথায় যাচ্ছে, বাজার কোথায় থামবে, পৃথিবী আর কতদিন টিকবে—সব তাঁর গ্লাসে জমা। আমি ভেবেছিলাম, তাঁর নিশ্চয়ই রাষ্ট্র পরিচালনার কোনো গোপন দায়িত্ব আছে। পরে জানতে পারলাম, তিনি অবসরপ্রাপ্ত। এখন তাঁর একমাত্র পূর্ণকালীন কাজ হলো গ্লাস বহন করা। অফিসে গিয়ে দেখলাম, সেখানেও একই অবস্থা। একজন সহকর্মী সকাল থেকে মুখ এমন করে রেখেছেন, যেন দেশের বার্ষিক বাজেট একাই তাঁকে লিখতে হবে। বিকেলে জানা গেল, তিনি আসলে ই-মেইলের পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন। আরেকজন একটি ফাইল টেবিল থেকে তুলে সারাদিন হাতে ধরে ঘুরলেন। কাজ কিছুই করলেন না। আমি বললাম, “ফাইলটা রেখে কাজটা করুন।” তিনি বললেন, “না, হাতে না রাখলে দায়িত্বশীল দেখাবে কীভাবে?” তখন বুঝলাম, ফাইল নয়, তিনি তাঁর গ্লাসটাই প্রদর্শন করছেন। গ্লাসবাহী মানুষের আরেকটি বৈশিষ্ট্য আছে। তারা নিজের গ্লাসে সন্তুষ্ট থাকে না; অন্যের গ্লাসও পরীক্ষা করে। “তোমার এত হাসি কেন? নিশ্চয়ই কোনো টেনশন নেই!”—এই প্রশ্নে তারা অপমানের গন্ধ খুঁজে পায়। যেন সুখী থাকা একটি চরিত্রগত দুর্বলতা। তারা চায়, সবাই অন্তত অর্ধেক গ্লাস দুশ্চিন্তা নিয়ে চলুক। কারণ একা একা ভার বহন করলে কষ্ট হয়; সবাই বহন করলে সেটাকে সংস্কৃতি বলা যায়। একদিন এক বন্ধু ঘোষণা দিল, “আজ থেকে আমি রাতে ঘুমানোর আগে সব চিন্তা নামিয়ে রাখব।” কথাটি শুনে বন্ধুমহলে অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল। একজন বলল, “এভাবে চললে তুমি জীবনে বড় হতে পারবে না।” আরেকজন বলল, “যার দুশ্চিন্তা নেই, তার আবার ভবিষ্যৎ কী?” তৃতীয়জন আরও বাস্তববাদী। সে বলল, “চিন্তা না করলে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেবে কী?” বন্ধুটি শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বদলাল। কারণ সমাজে গ্লাসবিহীন মানুষকে এখনও পুরোপুরি গ্রহণ করার মতো মানসিকতা তৈরি হয়নি। আজকাল অবশ্য গ্লাসের নতুন সংস্করণ বের হয়েছে। আগের গ্লাস ছিল কাচের, এখন ডিজিটাল। মোবাইল ফোন খুললেই গ্লাস ভরে যায়। সকালে ঘুম ভাঙতেই খবর—অমুক কী বললেন, তমুক কী লিখলেন, কে কাকে আনফলো করলেন, কার পোস্টে কত লাইক। প্রতিটি নোটিফিকেশন গ্লাসে এক ফোঁটা করে পানি যোগ করে। দিনের শেষে মানুষ ভাবে, মাথা এত ভারী লাগছে কেন! অথচ সে একবারও গ্লাসটি নামায়নি। সবচেয়ে করুণ দৃশ্য দেখা যায় পারিবারিক আড্ডায়। একজনের গ্লাসে সন্তানের ভবিষ্যৎ। আরেকজনের গ্লাসে বাড়ির কিস্তি। তৃতীয়জনের গ্লাসে আত্মীয়ের সমালোচনা। চতুর্থজনের গ্লাসে প্রতিবেশীর সাফল্য। সবাই গ্লাস আঁকড়ে ধরে বসে আছে, কিন্তু কেউ পানি খাচ্ছে না। অথচ সেই পানির উদ্দেশ্য ছিল তৃষ্ণা মেটানো, কাঁধ ভাঙা নয়। একজন প্রবীণ ভদ্রলোককে একদিন জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি এত দুশ্চিন্তা করেন কেন?” তিনি শান্ত গলায় বললেন, “বাবা, আমি যদি চিন্তা না করি, তাহলে মানুষ ভাববে আমি বেকার।” কথাটা শুনে মনে হলো, আমরা বুঝি কর্মব্যস্ততার নয়, উদ্বেগের সমাজ গড়ে তুলেছি। এখানে মানুষ কাজের চেয়ে ক্লান্তির বিজ্ঞাপন বেশি দেয়। যে যত ক্লান্ত, সে তত সফল। যে যত উদ্বিগ্ন, সে তত গুরুত্বপূর্ণ। এদিকে গ্লাসেরও নিশ্চয়ই কষ্ট হয়। তাকে তো বানানো হয়েছিল প্রয়োজনমতো ব্যবহার করার জন্য। কিন্তু আমরা তাকে জীবনের স্থায়ী অলংকার বানিয়ে ফেলেছি। গ্লাস নিশ্চয়ই মাঝেমধ্যে বলতে চায়, “ভাই, আমাকে একটু টেবিলে রাখুন। আমারও বিশ্রাম দরকার।” কিন্তু মানুষ শোনে না। কারণ মানুষ একবার কোনো বোঝাকে নিজের পরিচয় বানিয়ে ফেললে সেটি আর নামাতে চায় না। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, যে সমস্যাগুলো নিয়ে আমরা সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তা করি, তার অধিকাংশই কখনো ঘটে না। কিন্তু না-ঘটা ঘটনাগুলোর জন্যও আমরা গ্লাস ভরে রাখি। যেন ভবিষ্যৎ বিপদ আগাম বুকিং দিয়ে রেখেছি। আমরা ভাবি, আগে থেকে কষ্ট পেলে বুঝি ভবিষ্যতের কষ্টের সুদ মাফ হয়ে যাবে। বাস্তবে হয় উল্টোটা। কষ্টও আসে, আগের দুশ্চিন্তাও থেকে যায়। আমি মাঝে মাঝে কল্পনা করি, যদি পৃথিবীতে একদিন “গ্লাসবাহী মানুষ দিবস” পালিত হয়, তাহলে সবাই হাতে অদৃশ্য গ্লাস নিয়ে মিছিল করবে। স্লোগান উঠবে—“গ্লাস নামানো চলবে না”, “দুশ্চিন্তা আমার অধিকার”, “হাসিমুখ জাতির জন্য ক্ষতিকর।” শেষে একজন প্রবীণ বক্তা ঘোষণা করবেন, “আমরা গর্বিত, কারণ আমরা কোনো সমস্যার সমাধান করি না; আমরা শুধু সমস্যাকে সম্মানের সঙ্গে বহন করি।” উপস্থিত সবাই হাততালি দেবে, যদিও হাততালি দেওয়ার জন্য গ্লাসটা একটু নামাতে হবে—এই যুক্তিটুকু কেউ খেয়াল করবে না। তবু আমি আশাবাদী। কারণ পৃথিবীতে এখনও কিছু মানুষ আছেন, যারা সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে জুতা যেমন খুলে রাখেন, তেমনি মনের গ্লাসটাও টেবিলে রেখে দেন। তারা জানেন, আগামীকাল নতুন সকাল আসবে, নতুন সমস্যা আসবে, নতুন কাজ আসবে। তাই পুরোনো গ্লাস সারারাত হাতে ধরে রাখার কোনো অর্থ নেই। তারা দুশ্চিন্তাকে অস্বীকার করেন না; তাকে স্থায়ী বাসিন্দাও বানান না। হয়তো জীবন আসলে এতটাই সহজ ছিল। আমরা নিজেরাই তাকে জটিল করেছি। পানির গ্লাসকে পাহাড় বানিয়েছি, সামান্য উদ্বেগকে আজীবনের পেশা বানিয়েছি, আর চিন্তাকে এমনভাবে বুকে জড়িয়ে ধরেছি যেন সেটিই আমাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। অথচ সত্যিটা খুব সাধারণ। গ্লাসের ওজন কখনো মানুষকে হারায় না; মানুষ হারে গ্লাসটি নামিয়ে রাখতে না জানার কারণে। যে মানুষ সময়মতো গ্লাস নামাতে পারে, সে শুধু হাতকে নয়, মনকেও বাঁচায়। আর যে নামাতে পারে না, সে একসময় বুঝতেই পারে না—তার জীবনের সবচেয়ে বড় বোঝা গ্লাসের পানি নয়, গ্লাস আঁকড়ে ধরে থাকার অভ্যাস।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৬ জন


এ জাতীয় গল্প

→ গ্লাসবাহী মানুষ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now