বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
ডিংডং ডিংডং করে ঘণ্টাটা বেজেই চলেছে। কতক্ষণ ধরে যে বেজে যাচ্ছে, দীপ তা ঠিক জানে না। আরে, জানবে কী করে? তখন তো সে ঘুমের মাঝে দারুণ একটা স্বপ্ন দেখছে।
স্বপ্নে দেখছে, সে কোনও একটা নাম না-জানা শহরের এক বিশাল হলঘরের প্রকাণ্ড সুসজ্জিত মঞ্চে একটা জমকালো চেয়ারে মধ্যমণি হয়ে বসে আছে। চারদিকে তার দারুণ দারুণ সব সুন্দরী মহিলা। তাদের রঙচঙে পোশাক। কারও হাতে ফুলের বোকে, কারও হাতে তার অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য ডায়েরি ও কলম। আবার কেউ কেউ হাতে ইয়া বড় বড় সব গোলাপ ফুল নিয়ে। তারা মৌচাকে রানি মৌমাছিকে ঘেরার মতো তাকে ঘিরে রেখেছে। কেউ কেউ এমন গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে যে তাদের সেই বিশেষ অঙ্গগুলো তার কাঁধে-পিঠে প্রায় লেপ্টে গেছে। নানারকম মিষ্টি সেন্টের গন্ধে বিভোর হয়ে সে কোনও এক অচেনা লোকে হারিয়ে যাচ্ছে। স্বপ্নের মাঝে নিজেই নিজের গায়ে চিমটি কেটে দেখল, এটা সত্যি কি না!
ছোটবেলা থেকেই কেন জানি না, দীপ একটু ইয়ে, মানে মহিলাদের প্রতি তার দুর্বলতা আছে, আর বন্ধুরা সেটা সবাই জানেও। সৌম্য, শ্যামল, বিপিন, রফিক, ডেভিড—সবাই বলে, “শালা, দীপটার না মাইরি হেব্বি আলুর দোষ!”
তারা হাসতে হাসতে আরও বলত, “হারামিটার কপাল দেখলে হিংসে হয়। আমরা শালা এই একুশ-বাইশ বছর হল একটাও মানে ইয়ে পটাতে না পেরে ফুল ডাল বেঁধে ঘুরে মরছি, আর ও শালা কেষ্ট হয়ে গোপিনীদের সঙ্গে রাসলীলা করছে। শালা, কত রাধিকাকে যে নৌকা পার করাল, তার হিসেব করতে গেলে নির্ঘাত এক রিম কাগজ আর ডজন দশেক কলম লাগবে!”
ব্যাপারটা যদিও ওরা একটু বাড়িয়েই বলেছে, তবে ওদের বেশি দোষ দেওয়া বোধহয় ঠিক হবে না। যে বয়সে অন্য সব ছেলেরা ডান্ডাগুলি, লাটাই-ঘুড়ি, হাডুডু-কাবাডি কিংবা সেই শচীন-সেহবাগ আর কপিল-আক্রামকে আইডল করে ক্রিকেট ব্যাট-বল নিয়ে ব্যস্ত, তখন সে বটতলার মহাভারত পাঠ আর বাঁশছোলা নিয়ে পি.এইচ.ডি. করতে ব্যস্ত।
আজ পর্যন্ত সে যত ইয়ে নিষ্কাশন করেছে, তা আমাদের পাড়ার কেরোসিন ডিলার অবনীবাবু সারা জীবনে অত লিটার কেরোসিন বেচেছে কি না সন্দেহ! প্রথম সান্টিংটা যখন সে করে, তখন তার বয়স ওই বারো-তেরো, ক্লাস সেভেনে পড়ে।
দীপদের বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে হেঁটে বড়জোর পাঁচ-সাত মিনিট। ওদের বাড়ির গলিতে ঢুকতে গেলে একটা মস্ত বটগাছ। তার পাশেই শিবমন্দির। বটগাছটার গোড়া সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। তবে সেই বাঁধনটা বেশ পুরোনো। কারণ, সেটা থেকে মাঝে মাঝে চাকলা উঠে গেছে। জনৈক সীতারাম বটব্যাল আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগে এই চাতালটা বানিয়ে দিয়েছিলেন। ফ্যাকাসে হয়ে গেছে পাথরের উপরে লেখা তাঁর নাম আর সাল।
এখানকার এই মন্দিরের স্বয়ম্ভূ শিব নাকি দারুণ জাগ্রত। তাই শুধু যে শিবরাত্রির সময় এখানে বিশাল ঘটা করে পুজো হয়, তা নয়। সারা বছরই এখানে কমবেশি লোকজন, অর্থাৎ বউড়ি-ঝিউড়িরা ওই শিবলিঙ্গে জল ঢালতে আসে। আর সে কারণেই যে সেটা আমাদের মতো উঠতি ছোঁড়াদের আড্ডার ঠেক হবে, তাতে কি সন্দেহের কোনও অবকাশ থাকে?
দীপদের বাড়ির দুটো বাড়ির পরে পাড়ার হালদারমশাইদের বাড়ি। একসময় এই হালদাররা নাকি এলাকার বেশ মালদার লোক ছিলেন। তবে এখন সে রামও নেই, আর সে অযোধ্যাও নেই। কী কারণে নাকি পাশের গ্রামের চাকলাদারদের সঙ্গে ত্রিলোচন হালদারের মামলা হয়। আর সেই মামলা চালাতে চালাতে মালদার থেকে হালদাররা একরকম সর্বস্বান্ত। এখন ওই কয়েকটা ঘর ভাড়া দিয়ে কোনওরকমে তাঁদের দুবেলা দুমুঠো জুটছে।
সেই হালদারবাড়িতে অলোকদা আর চামেলি বউদি এলেন ভাড়াটিয়া হয়ে। ওরা তখন নতুন বিয়ে করেছে। আর অলোকদা ও চামেলি বউদির বিয়েটা নাকি ইন্টারকাস্ট। তাই অলোকদার বাবা বা মা কেউ এই বিয়েটা মেনে নিতে পারেননি। তাই পাশের পাড়ায় নিজেদের বিশাল বাড়ি থাকা সত্ত্বেও এ পাড়ায় তাঁদের ভাড়া আসা।
অলোকদার বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ আর চামেলি বউদির একুশ-বাইশ। দুজনেই দেখতে ঝক্কাস। ওরা যখন পাড়ায় এল, পাড়ার গলির মুখের চায়ের দোকানে প্রথম প্রথম কদিন ওদের নিয়ে বেশ মুখরোচক আলোচনা। তারপর সেসব অবশ্য থিতিয়ে যেতে বেশি সময় লাগল না।
অলোকদার মতো সাদাসিধে ভালোমানুষ হয় না। কর্পোরেশন অফিসে না কোথায় যেন কাজ করে। বউদি অবশ্য চাকরি করে না। বউদির শিয়ালদা না চেতলা কোথায় নিজের বিউটি পার্লার। সে সময় বিউটি পার্লারের চলটা সবে শুরু হয়েছে।
পাড়ার যে কোনও অনুষ্ঠান, যেমন ধরো রবীন্দ্রজয়ন্তী বা স্বাধীনতা দিবস পালন, কিংবা কোনও গরিবের মেয়ের বিয়ে বা বাপের শ্রাদ্ধ-শান্তির অনুষ্ঠানে তাঁদের যেভাবে দরাজ হাতে দান করতে দেখেছি, তাতে এটা ভেবে নিতে কোনও অসুবিধা হয় না যে চামেলি বউদিও যথেষ্ট রোজগারপাতি করে। নইলে অলোকদা ও বউদি এত ফাটে থাকে কী করে?
তা যাক সে সব কথা। কারণ, পুরোনো কাসুন্দি ঘেঁটে কী লাভ! তার চেয়ে বরং যে কথাটা বলছিলাম, সেটাই বলি না কেন!
তো সেই অলোকদার বাড়িতে আমরা মাঝে মধ্যে সবাই যেতাম। দীপও আমাদের সঙ্গেই যেত। দীপ অবশ্য একটু বেশিই যেত। আমরা গিয়ে কখনও-সখনও চা-বিস্কুটও যে খাইনি, সেটা বললে নেমকহারামি করা হবে। তবে বেশিক্ষণ খুব একটা থাকতাম না। বিশেষ করে চামেলি বউদির পার্লারে কাজ করার মেয়েগুলো আসলে তো নয়ই।
চামেলি বউদির দোকানে কাজ করে অয়ন্তিকা নামের এক ধুমসি। যেমন তার চেহারা, তেমনই গায়ের রং। দুধে-আলতা শুনেছি, কিন্তু এ তো দুধে-আলকাতরা! সামনের মাড়ির দাঁতগুলোও কেমন উঁচু হয়ে বেরিয়ে আছে। কী করে যে কাস্টমার তার কাছে পার্লারের কাজ করায়, জানি না বাবা। আমার তো দেখলেই বুক ঢিপঢিপ করে!
কয়েকটা দিন ছিলাম না এখানে। বাঁশবেড়িয়ায় ছোট পিসির মেয়ে টুসির বিয়ের জন্য আমায় যেতে হয়েছিল। হয়তো আমি যেতাম না। কিন্তু দিন তিনেক আগে টুসি যখন নিজে ফোন করে কান্নাকাটি করে বলল, “শুভদা, তুমি না এলে আমি বিয়ের পিঁড়িতে বসব না কিন্তু, সে তুমি দেখে নিও। যদি না আসো, তবে ভাবব তুমি সেদিনের সেই ঘটনার রিভেঞ্জ নিচ্ছ।”
তা একথা শোনার পর আর কী না গিয়ে থাকা যায়!
গতকাল ফিরেছি অনেক রাতে। শীতের রাত। গত বছরের বোনাসের টাকায় কেনা নরম তুলতুলে কম্বলটা গায়ে দিয়ে শুয়ে আছি। রবিবার আজ, তাই অফিসে যাওয়ার ঝক্কিও নেই। দরজায় খিল দিয়েই শুয়েছি, যাতে দাদার বিচ্ছু দুটো জ্বালাতে না পারে।
এমন সময় দরজায় দুমদাম ধাক্কা। বিরক্তি নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকালাম—বেলা বারোটা। কে যে আমার আরামের ঘুমের বারোটা বাজাল, দেখব বলে দরজা খুলে দেখি শ্রীমতী অপরাজিতা, অর্থাৎ আমার বউদি, হাসিমুখে।
বললে, “ভাই, ওঠো ওঠো তাড়াতাড়ি। গতকাল তুমি অনেক রাতে ফিরেছ, তাই খবরটা তোমায় দেওয়া হয়নি। তুমি ছিলে না, আর এদিকে যে জব্বর খবর আছে!”
চোখ কচলে বলি, “খবরটা কী খবর শুনি?”
বউদি বললে, “আজ যে দীপের বিয়ে, বলি সে খবর কি তুমি জানো?”
“দীপের বিয়ে!” আমি আকাশ থেকে পড়লাম।
“আজ্ঞে হ্যাঁ মশাই, শ্রীমান দীপ চ্যাটার্জির বিয়ে আজ!”
“তাই নাকি? কই, আমি তো তিন দিন আগে যখন গেলাম, তখনও তো কিছু বললে না ওরা। তা হঠাৎ বিয়ে? কোথায় বিয়ে? কার সঙ্গে?”
“আরে দাঁড়াও দাঁড়াও! প্রশ্নের স্রোতে যে ভেসেই গেলাম, ভাই! হঠাৎই বিয়ে এবং কন্যাটি কে জানো? অয়ন্তিকা!”
শুনে সত্যিকারেই মূর্ছা গেলাম আমি।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now