বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
দন্ত্যস রওশন
জান্নাতুল জাহান। বয়স উনআশি বছর। বিধবা। স্বামী মারা গেছেন একুশ বছর আগে। তার চার ছেলেমেয়ে। সবারই আলাদা সংসার। তাদের পরিবারে অসচ্ছলতা বলে কিছু নেই। তবে জান্নাতুল জাহান অসচ্ছল। স্বামী তাকে কিছু দিয়ে যাননি। না বাড়ি। না ঘর। না জমিজমা।
তার স্বামী ইকবাল ভূঁইয়া তখন শয্যাশায়ী। একদিন স্বামী স্ত্রীকে খাটের পাশে বসিয়ে বললেন, ‘তোমাকে আমি কিছু দিয়ে যেতে পারলাম না। আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো।’
স্ত্রী বললেন, ‘হায় হায়। একি কথা বলছ। আমার চার সন্তানই আমার সব। টাকাপয়সা ধনদৌলত দিয়ে আমি কী করব। আমি যেমন ওদের সবই, ওরাও ঠিক আমার সব।’
ইকবাল ভুঁইয়া মারা যাওয়ার পর তিনি বুঝতে পারলেন, জীবন একাকিত্বের হতে পারে। যদিও ভূঁইয়া সাহেবের সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে খেঁচাখেঁচি মাঝেমধ্যেই হতো। এরপর তিনি ছিলেন স্বামী। সার্বক্ষণিকের সঙ্গী। সব কথা, সব অনুভূতির অংশীদার। যার সঙ্গে সব ধরনের খুঁটিনাটি কথা হতো। তিনি চলে যাওয়ার পর তার এসব বন্ধ হয়ে গেল।
দুই ছেলে বিবাহিত। নাতি-নাতনিদের নিয়ে সময় কাটানোর চেষ্টা করলেন। একরকম মিশেও গেলেন তাদের সঙ্গে। জান্নাতুল জাহানের একমাত্র আনন্দের উৎস হলো তিন নাতি-নাতনি। তুবা, আনিকা ও দীপ্ত। সারা দিন তাদের নিয়ে থাকেন।
একদিন রাতের খাবারের সময় মেজ ছেলে শাহিন বলল, ‘আমাদের ফ্ল্যাট তো তৈরি হয়ে গেল। এখন উঠতে হয়।’
বড় ভাই আহসান বলল, ‘যা, ভালোই হলো। ঢাকা শহরে একটি ফ্ল্যাট থাকা যে কতটা জরুরি।’
এক সপ্তাহের মধ্যে মেজ ছেলে উঠে গেল নতুন ফ্ল্যাটে। জান্নাতুল জাহান মনে মনে গোছগাছ করছিলেন। একটি ব্যাগের মধ্যে কিছু জরুরি জিনিস ভরেও ছিলেন। কিন্তু ছেলে তাকে কিছুই বলল না। মা আশা করেছিলেন, ছেলে তাকে জোর করে নিয়ে যাবে। কই। তেমন কোনো কথা উঠল না।
যাওয়ার সময় মেজ বউমা বলল, আম্মা, এখন আর আপনার বোর হতে হবে না। যখন ইচ্ছে আমার বাসায় চলে আসবেন।’
বাসা থেকে বের হওয়ার সময় নাতনি তুবা বলল, ‘দাদি যাবে না বাবা? দাদি তো ব্যাগ গুছিয়েছিল।’
বাবা বললেন, ‘পরে যাবে তোমার দাদি।’
তুবা দাদিকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল। দাদি জান্নাতুলও কেমন আবেগপ্রবণ হয়ে গেলেন। বললেন, ‘আজিমপুর থেকে মীরপুর তো খুব কাছে। দেখবে আমি তোমার বাসায় চলে এসেছি।’
‘মেজ ছেলে তিনজনের সংসার নিয়ে মীরপুর চলে গেলেন।
ইচ্ছেমতো তারা স্বামী–স্ত্রী মিলে সংসার সাজালেন। ঝকঝকে তকতকে সংসার। এক বছর লেগে গেল তাদের বন্ধুবান্ধবদের দাওয়াত করে বাসা দেখাতে। তারা ফ্ল্যাটের ভূয়সী প্রশংসা করলেন।
একদিন মেজ ছেলে বলল, ‘মা তুমি তো এখানে এসে থাকতে পার। যদিও তেমার এখানে খুব একটা ভালো লাগবে না। আমি সকালে যাই, ফিরি রাতে। তোমার বউয়েরও একই অবস্থা। তোমার হয়েছে মুশকিল।’
জান্নাতুল বলতে চেয়েছিলেন, ‘আমাকে একদিন নিয়ে যাস। কয়েক দিন থেকে আসব।’ কিন্তু মায়ের সেটা আর বলা হলো না।
সেদিন রাতে বেশ গরম পড়েছে। দুবার ইলেকট্রিসিটিও চলে গেল। জান্নাতুল জাহান ডাকলেন, ‘বড় বউমা, আমার হাতপাখাটা দিয়ে যাবে?’
বউমা পাশের ঘর থেকে বললেন, ‘আম্মা, ওটা দিয়ে আপনার ছেলে বাতাস খাচ্ছে।’
কথা শুনে বড় ছেলে বলল, ‘আশ্চর্য। মায়ের চেয়ে কি আমার বাতাস খাওয়া বেশি হয়ে গেল নাকি? যাও। পাখাটা মাকে দিয়ে আস।’
বড় বউ বললেন, ‘মায়ের জন্য দরদ শুধু তোমার উছলে পড়ে। আর তো কেউ মাকে নিয়ে ভাবে না। তোমার একটু কম ভাবা উচিত।’
জান্নাতুল জাহান আবার বললেন, ‘কইরে। পাখাটা একটু পাঠিয়ে দে না।’ এ কথাটি ছেলেকে বলা। তবে ছেলে গেল না।
বড় বউ আবার বললেন, ‘তোমার মেজ ভাই তো এসি কিনেছে। কই, আমার শাশুড়িকে তো একবারও ওখানে যেতে বলল না।’
‘ঠিক আছে, আমরাও এসি কিনব।’ বড় ছেলে রাগ করে বলল।
পরের দিন দুপুর বেলা এসি বসানোর লোক এল।
বড় ছেলে বললেন, ‘পুরো বাড়িতে এসি বসাব।’ কথা শুনে বড় বউ আকাশ থেকে পড়লেন।
‘কী বলছ তুমি। এসির খরচ দেবে কে? তোমার বাকি দুই ভাই তো এখনো নিজের ভাত নিজেরাই জোগাড় করতে পারে না।’
শেষমেশ একটি ঘরেই এসি লাগানো হলো। প্রথম দিন জান্নাতুল জাহান এসির ঘরে থাকলেন ঘণ্টাখানেক। কিন্তু ছেলে–বউয়ের ঘরে কেমন করে বসে থাকে! বউ একবার জামাও চেঞ্জ করলেন। তার মধ্যে কেমন একটা অস্বস্তি হলো।
বড় ছেলে বলল, ‘মা, তোমার যখন ইচ্ছে তখন তুমি এ ঘরে চলে আসবে।’
এই প্রথমবারের মধ্যে তিনি এসি ঘরে এক ঘণ্টা কাটালেন। খুব ভালো লাগল তার। শরীরটা জুড়িয়ে গেল। সারা দিনরাতই বড় বড় এসি রুম বন্ধ রাখে। ঠান্ডা বাতাস নাকি বাইরে চলে যায়।
সেদিন মেলা রাত হয়েছে। তার ঘুম আসছে না। বাঁ হাতটা পিঠের নিচে দিয়ে দেখলেন ঘামে জবজবে হয়ে গেছে। তিনি বিছানা থেকে উঠে বড় ছেলের ঘরের সামনে গিয়ে টোকা দিলেন।
দরজা খুলে বড় বউ বললেন, ‘আম্মা, কিছু বলবেন?’
তিনি বলতে চেয়েছিলেন, ‘তোমাদের রুমটায় একটু বসি।’ কিন্তু সেটা আর তিনি বলতে পারলেন না। ফিরে এলেন নিজের ঘরে।
পরের দিন আনিকা এল দাদির ঘরে। ক্লাস টুতে পড়ে। দাদিকে বলল, বাবা-মাকে বলবে।
‘কী বলব?’
বলবে, ‘তোরা তো দুজনই অফিসে এসিতে থাকিস। তোরা দুজন তোদের রুমটা আমাকে দিয়ে দে।’
জান্নাতুর জাহান তাই বললেন। ছেলে বলল, ‘তুমি যে কি বলো না। তোমার বয়স বাড়ছে। আর তোমার বুদ্ধি কমছে। তোমার বউমা ছোটবেলা থেকেই এসিতে থেকে বড় হয়েছে। কষ্ট তো আর তার কম হলো না।
রাতের খাবার টেবিল। সেজ ছেলে বলল, ‘ভাইয়া, আমার কানাডা যাওয়ার সবকিছু ঠিক হয়ে গেল। আগামী মাসে চলে যাব।’
জান্নাতুল জাহান বললেন, ‘কেন, কুষ্টিয়া যাবি কেন?’
বড় বউমা বললেন, ‘আম্মা, দিন দিন আপনার শ্রুতিশক্তি কমে যাচ্ছে। একটা বললে আরেকটা শোনেন।’
সেজ ছেলে আবির জোরে বলল, ‘মা আমি বিদেশে চলে যাচ্ছি। কানাডাতে। এক বছর পরেই আমি তোমাকে নিয়ে যাব।’
‘ভাবি কি কিছু বললে?’
‘আমি যা বলেছি, তা তুমি হয়তো ঠিকই শুনতে পেয়েছ।’ ভাবি আর কোনো কথা বলল না।
সত্যি সত্যি মেজ ছেলে চলে গেল বিদেশে। কেমন খালি খালি হয়ে গেল বাসাটা।
আনিকা এসে বসে দাদির কাছে। ‘দাদি বাসাটা খালি হয়ে যাচ্ছে। মেজ কাকু চলে গেল। সেজ কাকুও চলে গেল। মা বলেছে সেজ কাকুর ঘরে অ্যাকুয়ারিয়াম রাখবে। নীলক্ষেত থেকে নাকি আজই মাছের অ্যাকুয়ারিয়াম নিয়ে আসবে।’
তাই হলো। সন্ধ্যায় লোকজন এসে মাছের অ্যাকুয়ারিয়াম রাখল সেজ ছেলের ঘরে।
আনিকা অনেক রাত পর্যন্ত দাদিকে মাছ চেনাল। জান্নাতুল জাহান বেশ খুশি। তিনি অ্যাকুয়ারিয়ামের নানা রকমের মাছ দেখত থাকলেন। বড় ছেলে বলল, ‘মা, আসো তোমাকে মাছ চিনিয়ে দিই। এটা হলো গোল্ডফিস...।’
মা বললেন, ‘নারে। আমার মাছ দেখতে ভালো লাগছে না।’ তিনি দেয়ালের ছবির দিকে তাকিয়ে রইলেন। দেয়ালে টাঙানো আছে তার স্বামীর ছবি। সেজ ছেলের ছবি। একটি গ্রুপ ছবিও আছে। যে ছবিতে চার ছেলে আর স্বামীও আছে। ছবিটার দিকে তাকিয়ে তিনি কেঁদে ফেললেন। মনে মনে বললেন, একে একে সবাই আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
হ্যাঁ, তাই হচ্ছে। এরই মধ্যে ছোট ছেলে ইরতাজ একদিন বিয়ে করে আলাদা হয়ে গেল।
(সমাপ্ত)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now