বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

গাংচিলের গদ্যছন্দ

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X গাংচিলের গদ্যছন্দ -------------------------- *** সিনি মনি *** কলেজের ধাপ পেরোনো ছিপছিপে ছেলেটিকে আমি প্রতিদিন আমার বাসার সামনে কাঠগোলাপ গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি । ছেলেটার চশমাপরা দুইচোখ তার চাপা আনন্দটাকে আড়াল করে রাখতে পারেনা কিছুতেই ; আর তার ঠিক একটু পরেই লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মুখে মিষ্টি চেহারার একটা মেয়ে একদম তার সামনে এসে দাঁড়ায় । অতঃপর ছেলেটির কিছুক্ষনের জন্য অপ্রস্তুত হয়ে যাওয়া আর মেয়েটির দুই চোখে লুকোতে চাওয়া হাসি । নিজের অজান্তেই আমার মনের মাঝে ভাল লাগার একটা অনুভূতি চলে আসে । এই ভাগ্যক্রমে পেয়ে যাওয়া একটা জীবনে কেন যে আমি এরকম চড়ুই চড়ুই ভালবাসায় বাঁচতে পারলামনা , এদের দুজনকে দেখতে পেলে সেই আক্ষেপটা নিজের অজান্তেই আমার উপর এসে ভর করে ! আর সেই আক্ষেপের সাথে আমার সামনে ফিরে আসে শায়ন নামের একটা ছেলে - অনেকদিন আগের শেষ অগ্রহায়নের সেই বিকেলটাকে সঙ্গি করে নিয়ে । নিজেকে কখনোই প্রকাশ করতে না পারা ব্যর্থ আমি সেদিনও নির্বিকার চোখে তাকিয়েছিলাম শায়নের দিকে । তাই বুঝি আমার হতাশাকে আরো দ্বিগুণ করে তুলতেই ও আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, “ তুমি চলে যাও , অতসী – অনেক দূরে চলে যাও । ঠিক যতটা দূরে চলে গেলে , অন্তত একটা জীবনে কোন দীর্ঘশ্বাস থাকেনা – ঠিক ততটা দূরে !” আমার ভেতর থেকে আসতে থাকা কষ্টটাকে গিলে নিয়ে আমি সেদিন চলে এসেছিলাম । শায়নের সাথে সেটাই ছিল আমার শেষ দেখা । তারপর এই একটা জীবন আমি তাকে ভালবেসেই শেষ করে দিলাম , ধ্বংসাবশেষ হয়ে টিকে রইলাম – তবুও সে কোনদিন জানতে চাইল না , “ অতসী , তোমার কি খুব একলা লাগে ?” আচ্ছা শায়ন, তুমি এখন কেমন আছে ? কোথায় আছো ? আমার কথা ভুলে যেতে তোমার ঠিক কতক্ষন লেগেছে – এক দিন , এক মাস – নাকি আরো কম ? ভুলে গিয়েও অতসী নামের কোন মেয়েকে তোমার যদি কখনো হঠাত করে মনে পড়ে যায় , তোমার কি খুব বেশি বিরক্ত লাগে ? তোমার কি কখনো জানতে ইচ্ছে করে , এই ছয় বছর ধরে চালিয়ে নেয়া একপাক্ষিক ভালবাসায় আমার কখনো ক্লান্ত লাগে কিনা ? নাহ , জানতে ইচ্ছে হবার কথা না । কেন শায়নকে দোষ দেই আমি - প্রথমটায় আমিও কি তাকে ভুলতে চাইনি ? অথচ “যা রে যা উড়ে যা” বলে কিছু অভিমানকে অনভ্যস্ত মুখে আওড়ালেও পাখিটা হয়ত একজনের খাঁচা থেকে কখনই উড়ে যায়না - ছেড়ে যায়না কোনদিন । অস্তিত্বের খুব সামান্য একটা অংশ হলেও কেউ যেন রোজ ভোরে অপেক্ষায় থাকে - এই বুঝি পাখিটা উড়ে এসে বসবে তার জানলায় ; হয়ত তাকে দুই হাতের মাঝে আঁকড়ে ধরেই মরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সে কাঁদতে চায় অঝোর ধারায় । কিন্তু কিছু কান্নাকে চুরি করে নিয়ে হৃদয়ের গহীন থেকে অচিনপুরে পাখিটার নিত্য ওড়াওড়ি , তবু সেই পাখি থাকে দূরে - কতই না দূরে ! শায়নকে আমি ঠিক কবে কিংবা কিভাবে ভালবেসে ফেলেছিলাম তার কোন উত্তর আমার জানা নেই ; কিন্তু আমি ছিলাম ওর প্রথম ভালবাসা । ওর কথা মনে করতে গেলেই কেন যেন সবার আগে আমার ওর দশম শ্রেনীতে পড়ুয়া প্রতিবিম্বের কথাটাই মনে হয় , যেদিন কিনা ও হুট করে পেয়ে যাওয়া সাহসে আমার পথ আটকে দাঁড়িয়ে বলেছিল , “ ছেলেদের প্রথম ভালবাসা প্রচন্ডরকম তীব্র হয় জানো ? শুধুমাত্র একটা ‘না’ শব্দে সেটা শেষ হয়ে যায়না !” সবকিছু নিয়ে ভয় পেয়ে যাওয়া আমি সেদিন এর উত্তর দিয়েছিলাম শায়নের অস্তিত্বকে প্রচন্ডভাবে আঘাত করে । “ তোমাকে আমার অসহ্য লাগে” – এই চার শব্দের কথাটি আমি ঠিক কতটা বুঝে বলতে পেরেছিলাম আমার জানা নেই, তবে এর ক্ষমতা নিশ্চয়ই অনেক বেশি ছিল ; অন্তত একজনকে তার প্রথম ভালবাসার অনুভূতি ভুলিয়ে দেবার মত যথেষ্ট ! তাই এতদিন পরে এসেও আমার মনে হয় , শায়নের কাছে পৌঁছাতে আমি বোধ হয় খুব বেশি দেরি করে ফেলেছিলাম । আর যখন পৌঁছেছি তখন দেখি সে আমার সমান্তরালে চলছে , আমি যতই এগোতে চাইনা কেন , এই মাঝের দূরত্বটুকু অতিক্রম করবার কোন ক্ষমতাই আমার আর নেই । স্কুলে পড়বার সময় শায়ন ছিল আমাদের ক্লাসের “মাম্মি’জ বয়” । লাফালাফি করা টাইপ মেয়ে ছিলাম বলে ক্লাসে অন্যদের সাথে আমার বেশ ভাল সম্পর্ক ছিল – শুধুমাত্র শায়ন বাদে । ওর শান্তশিষ্ট গুডি গুডি টাইপ চেহারাটাকে আমার কেন যেন “ ভাল ছেলে হওয়ার ভান করা” বলে মনে হত । ক্লাসে টিচাররা যখন হোমওয়ার্কের খাতা চেক করতেন , তখন কেউ গোলমাল করছে কিনা এই ব্যাপারটা দেখে রাখবার দায়িত্ব ছিল শায়নের । আর প্রত্যেকবারই বেশি কথা বলবার অভিযোগে তার কাছ থেকে আমিই ওয়ার্নিং পেতাম সবচাইতে বেশি । শায়ন বরাবরের মত প্রথম সারির ছাত্র হলেও আমার রেজাল্টে সে একটু অবাকই হত । কারন ব্যাকবেঞ্চার হিসেবে পড়াশোনায় আমি খুব একটা খারাপ ছিলাম না । একদিন ক্লাসশেষে ও আমার কাছে এসে বলল , “ অতসী, তোমার পেছনে বসে ক্লাস করতে সমস্যা হয়না ? সব পড়া বুঝতে পারো ?” বরাবরের মত ঝাল মেজাজের আমি বিরক্তভাবেই বলেছিলাম , “ শুধুমাত্র মেরিটলিস্টে প্লেস করবার জন্য ব্যাকবেঞ্চের বিনোদন থেকে সরে আসার দরকারটা সবার পড়েনা ।” ছেলেটা কি বুঝেছিল জানিনা ,কিন্তু পরদিন থেকে সে ক্লাসের আপামর জনতাকে অবাক করে দিয়ে ফিফথ বেঞ্চে বসা শুরু করে দিয়েছিল ! তবে তখনকার পর থেকে শায়নের সাথে আমার মাঝে মাঝে চোখাচোখি হত –আর তারপর দুজনের মাঝে আমিই আগে চোখ সরিয়ে নিতাম । টিনএইজের সেই শুরুর দিকের দিনগুলোতে এই সাধারন চোখে চোখ পড়াতেই কেমন যেন মনে হত , এভাবেও কেউ তাকায় ! একসাথে ক্লাস আর কোচিং করতাম বলে আমি চাইলেও শায়নকে কখনো এড়াতে পারতাম না । তবে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে মেয়েদের মাঝে যে প্রখর অনুভব ক্ষমতা থাকে , তাকে ব্যবহার না করেই কয়দিনের মাঝে আমি বুঝে ফেললাম , শায়ন নামের ছেলেটা সবকিছু ভেঙ্গেচুরে আমার প্রেমে পড়ে গেছে । তারপর ওকে ফিরিয়ে দেয়া , বারবার দূরে সরে যাওয়া – একবার নয় , দুইবার নয় বারবার । একসময় শায়ন হারিয়ে গেল । আমি ভেবে নিলাম , গল্পটা বুঝি এখানেই শেষ । কিন্তু গল্পটা শেষ হল না । শায়নের সাথে আমার দ্বিতীয়বার নতুন করে দেখা হল ভার্সিটির সেকেন্ড লেভেলে ওঠার পর । একই ক্যাম্পাসে একই ব্যাচের স্টুডেন্ট হবার পরেও তার দেখা পেতে আমার যে দুইটা বছর লেগে যাবে আমি সেটা ভাবতেও পারিনি । অবশ্য হুট করে চোখে পড়লেও তাকে চিনতে না পারলে আমাকে দোষ দেয়া উচিত না একটুও । কারন তখন আমি যে শায়নের মুখোমুখি হলাম , সেই শায়ন যেন আগাগোড়াই বদলে যাওয়া একটা মানুষ । একটা ক্লাবের মেম্বার হতে গিয়ে শায়নের মুখটা প্রথম চোখে পড়েছিল আমার । কিন্তু যে শান্ত চেহারার সুন্দর করে চুল আচড়ে আসা শায়নকে আমি আমার কৈশোরে চিনতাম, তার সাথে মুখের আদল ছাড়া আর কোনকিছুরই যেন মিল পাচ্ছিলাম না । তাছাড়া ও শায়ন হলে আমাকে এখানে দেখার পরেই এসে অন্তত হাই হ্যালো করার কথা । অথচ এই ছেলের মাঝে এরকম কোন বালাই দেখলাম না , আমাকে বারবার দেখেও সে দিব্যি শরীরে সিগারেটের গন্ধ মেখে চিউয়িং গাম চিবাতে চিবাতে আসা যাওয়া করতে লাগল । তাই অন্য কিছু না ভেবেই ছেলেটিকে আমি শায়নের “লুক অ্যালাইক” ধরে নিলাম । কিন্তু একদিন হুট করেই ক্লাব এক্টিভিটিস শেষ করার পর বাসায় যাওয়ার সময় বৃষ্টি নেমে গেল । সকাল থেকে কোন হাক নেই – ডাক নেই – মেঘের বংশও নেই – আমার ব্যাগে ছাতাও নেই , অথচ এই অসময়ে আউট অব নোহয়ার থেকে বৃষ্টি ! আমি যখন পোকার ফেস নিয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম কি করব , ঠিক তখনই পাশ থেকে কে যেন একটা ছাতা বাড়িয়ে দিল । আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি “শায়নের লুক অ্যালাইক” বিরক্ত চেহারায় একটা ছাতা আমার দিকে এগিয়ে দিয়েছে । আমাকে বিস্ফারিত চোখে চেয়ে থাকতে দেখে সে ভ্রু কুঁচকে বলল , “ তুমি তো দেখি আগের মতই ননসেন্স আছো । আমি ধন্যবাদ আশা করছিনা , ওকে ? ছাতাটা নিয়ে চুপচাপ রিক্সা খুঁজে বাসায় চলে যাও ।” “ শায়ন ?”, আমি কিছুতেই আমার গলা থেকে বিস্ময়কর ভাবটা দূর করতে পারলাম না । “কেন অন্য কাউকে মনে হয় ?” আমি ওর হাত থেকে ছাতাটা নিয়ে বললাম , “ থ্যাঙ্কিউ । অন্য একজন বলেই ভাবতাম এতদিন । কাউকে এর আগে এত চেঞ্জ হতে দেখিনি ।” শায়ন অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল , “ চেঞ্জ হইনি । পটেনশিয়াল আগে থেকেই ছিল , শো আপ করিনাই ।” এইটুক বলার পরে সে কিছুক্ষন থেমে আমার দিকে আবার তাকিয়ে বলল , “ শোনো মেয়ে – তুমি আবার ভেবে বসোনা , তোমার জন্যে আমার প্রেমের লাড্ডু এখনো ফুটেই আছে , ওকে ? আরেকটা নিউজ দিয়ে রাখি – আমার এখন গার্লফ্রেন্ড আছে , এবং আমার ওকে ছেড়ে দেয়ার বিন্দুমাত্র পরিকল্পনা নেই । সো ... আমাকে দেখেই “ আহা , বেচারাকে ছ্যাকা দিয়েছিলাম , আমাকে না পেয়ে কষ্টে আছে” ইত্যাদি ইত্যাদি ভাবার কোন দরকার নেই , ওকে ?” আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বললাম , “ তোমার কি কখনো মনে হয়না , তুমি ওভার-ইমাজিনেশানে ভুগছো ?” “একটুও না !” আমি রাগে- ক্ষোভে ছাতাটা ওর হাতে ফেরত দিয়ে বললাম , “ I don’t want it !” সেদিন একবারও চিন্তা না করেই আমি বৃষ্টির মাঝে বেরিয়ে গিয়েছিলাম । শায়নকে খুব অল্প বয়সে অভদ্রভাবে রিজেক্ট করেছিলাম বলে একটু ম্যাচিউরিটি আসার পর থেকে আমার নিজের কাছে নিজেকে খুব রুড মনে হত , মনে হত – আমি হয়ত ব্যাপারটা ফ্রেন্ডলি ওয়েতেই ম্যানেজ করতে পারতাম । কিন্তু এই ঘটনার পরে আমার মাঝ থেকে রিগ্রেটটাই চলে গিয়েছিল , সারাটা রাস্তা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আমি কেবল একটা কথাই ভেবেছি – শায়ন ছেলেটাকে আমি আসলে ঠিক কতটা ঘৃণা করি ? কিন্তু আমি ঘুনাক্ষরেও টের পাইনি , আমার এই অনেক ঘৃণার জায়গা থেকেই পরম ভালবাসা বেড়ে উঠবে একটু একটু করে । কখন যেন এই ঘৃণা করতে করতেই আমি খুব টিপিকাল লাভস্টোরির ন্যাকা নায়িকার মত প্রচন্ডভাবে শায়নের প্রেমে পড়ে গেলাম । আমার জীবনের একমাত্র ভালবাসা আমাকে কোনরকম সতর্ক হবার সুযোগটুকুও দেয়নি । কিন্তু এতকিছুর পরেও আমি অবশেষে বুঝে গিয়েছিলাম – ভালবাসা জিনিসটা কিরকম হয় । হয়ত মাঝখান দিয়ে আমার বেশ খানিকটা সময় লেগে গিয়েছে , কিন্তু তবুও ! তাই বুঝি হাজার খানেক বার শুনে ফেলা গানগুলো আবার শুনতে গেলে নতুন নতুন মনে হত । অথবা পথ চলতে গিয়ে হঠাত আমার অন্য প্রান্ত থেকে আমি যখন তার পরিচিত অবয়বটিকে হেঁটে আসতে দেখতাম , তখন চমকে উঠতাম অকারনে – ভুলে যেতাম আমার গন্তব্য কোথায় ছিল । তাকে দেখে বুকের মাঝে চাপা ঢিবঢিব শব্দটা যেন আরো প্রকট হয়ে সবাইকে জানিয়ে দিতে চাইত , সেও ভালবাসতে শিখে গেছে ! হুট করেই ভালবেসেছিলাম কিনা জানিনা, শুধু এতটুকু বুঝি – আমার মত দিনেদুপুরে লাফালাফি করা মেয়েটাও অবাক রকম শান্ত চোখে জানলার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা শিখে গিয়েছিল । অথচ যার কারনে আমি এরকম আগাগোড়া বদলে গিয়েছিলাম , তার এই ব্যাপারে কোন বিকারই ছিলনা । সে নিতান্তই “কেয়ার করিনা” টাইপ চেহারা নিয়ে ক্যাফেতে এসে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বলত , “ ওইপাশে সরে বস তো । কাটায় কাটায় এক মিটার দূরে গিয়ে বসবে , আমার কিন্তু গার্লফ্রেন্ড আছে !” আমি কিচ্ছু না বলেই দূরে সরে যেতাম – এক মিটার নাহ , কাটায় কাটায় কয়েক মিটার ! সরে যাওয়া ছাড়া আমার যে কোন উপায় নেই , শায়নের পাশে জায়গা হওয়ার সুযোগ আমি অনেক দিন আগেই নিজের হাত দিয়ে শেষ করেছি । তাই আক্ষেপ করবার মত কোন এক্সকিউজও আমার আর ছিলনা । ক্যাম্পাসে আমি যতক্ষণ থাকতাম , ততখন আমার চোখ শুধুমাত্র শায়নকেই খুঁজে বেড়াত । খুব বেশি খুঁজতে হতনা , ক্যাফে- হাফওয়ালের আশেপাশে থাকলেই আমি তাকে দেখতে পারতাম । কিন্তু যতটা সময় তাকে দেখতাম , ইচ্ছে করত মরে যাই । আমি শায়নকে ঘৃণা করতাম , একইসাথে ভালও বাসতাম , আর ভালবাসতে গেলে মনে হত -এর চেয়ে মরে যাচ্ছি না কেন ! এরকম বিচ্ছিরি ভালবাসা আমি কেমন করে বাসতে শিখেছিলাম আমি ঠিক জানিনা পাঠক - আমি বলতে পারিনা । একদিন আমাকে স্বভাবমতোই টিজ করে যাবার মুহূর্তে প্রচন্ড রাগে আমি শায়নকে ওর শার্টের হাতা টেনে আটকে দিলাম । চোখ মুখ শক্ত করে বললাম , “ তোমার যা ইচ্ছে তাই করছ আমার সাথে , তাইনা ? কিন্তু এতকিছু করেও কি অস্বীকার করতে পারবে আমাকে ? আমি তোমার প্রথম ভালবাসা , শায়ন ! তোমার কনফেশানের প্রত্যেকটা শব্দ আমি মনে রেখেছি – পারবে অস্বীকার করতে ? তুমি কেমন করে আমাকে আর ভালবাসতে পারনা ? কেমন করে পারনা, শায়ন ?” শায়ন আগের চেয়েও শীতল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিল , “ আমিতো কোনকিছুই অস্বীকার করিনা । কিন্তু একটা কথা বলি তোমাকে - ওকে ? অতসী, তুমি আমার প্রথম ভালবাসা, তোমাকে ভালবাসতে বাসতে আমি নিজেকে শেষ করে দিয়েছিলাম – এটা আমার দোষ ! কিন্তু তুমি আমার শেষ ভালবাসা হতে পারনি – এটা তোমার দোষ ! এখানে আমাকে ইনভল্ভ করোনা , ফাইন ?” আমি মুহূর্তেই পাথরের মত থমকে গিয়েছিলাম , শায়ন যখন এই কঠিন কথাগুলো বলা শেষ করল , আমি তখন হাসছি – পাগলের মত হাসছি । হাসি শেষ হলে বলেছিলাম , “ ইনভল্ভ করবনা ? আচ্ছা করব না । কিন্তু শায়ন, কাউকে ভালবাসাটা একটা স্বাধীনতা , রাইট ? বাকি থাকল আমার ফিলিংস –they won’t bother you, I know that damn truth ! So ignore me, okay?” আমার চোখদুটো জ্বলছিল ভীষণ , তাই হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে এক চোখ চেপে ধরতেই আমি হঠাত করে অনুভব করি , শায়ন আমার অন্য হাতটা ধরে আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে । আমি হতবিহবলের মত ওকে ফলো করতে থাকি , ও আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে সেই কোশ্চেন করার ক্ষমতাও আমার তখন ছিলনা । আমি যখন বিস্ময়ের শেষপ্রান্তে পৌঁছলাম , ঠিক সেই মুহূর্তে শায়ন থেমে দাঁড়াল । আমি সামনে তাকিয়ে দেখি আমাদের থেকে কিছুটা দূরত্বে বিশাল কাল চুলের ধবধবে সাদা পরীর মত একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে । শায়ন আমার হাত ছেড়ে দিয়ে সেই মেয়েটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায় । অবচেতন মনেই আমি বুঝে ফেলি এই মেয়েটির সাথে শায়নের সম্পর্কটা কি । আমি দাঁতে দাঁত চেপে পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকি । মেয়েটা শায়নকে পাশ কাটিয়ে আমার সামনে এসে বলল , “ কি আশ্চর্য , তুমিই অতসী তাইনা ? আমি পরিধি – তোমাকে কিন্তু আমি চিনি !” আমি ক্লান্তভাবে হেসে বললাম , “ সত্যিই চেনো কি ? আমি কিন্তু কিচ্ছু লুকোবো না , আমি তোমার রিভাল । ওই যে দেখছ তোমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ,I love that man incredibly! এখনো আমার সাথে কথা বলার ইচ্ছে হচ্ছে তোমার ?” শায়ন পরিধির কাঁধে হাত রেখে বলল , “ পরিধি , কেন তুমি ওকে দেখতে চাইলে ?” পরিধি কোন উত্তর না দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল । ওর হাসি যেন আমাকে বলে দিচ্ছে, কিসের এত বড়াই আমার ? যেখানে শায়নের মনের শতভাগের একটা অংশও আমার কথা ভাবেনা । আমি আমার ছলছল চোখে ঝড়ের আভাস পেলাম – তাই নিজেকে সামলে নিয়ে শেষবারের মত পরিধিকে বললাম , “ পরিধি , ইট সিমস লাইক, তুমিই শায়নের ওয়ান এন্ড অনলি – আর আমার এতে কোন সমস্যা নেই , একদম না । কিন্তু শুধুমাত্র ও আমাকে ভালবাসেনা বলে আমার অনুভূতি আমি শেষ করে দিব - আমার কাছ থেকে এই আশাটা কখনো করোনা প্লিজ ! আমি দুরেই থাকব , কিন্তু আমার কাছে আসলে তুমি আমার চোখে শায়নকে দেখবে , সো – ইগ্নোর মি , ওকে ? আর তুমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারো , শায়ন আমাকে চায়না , একটাবারও চায়না !” আমার বোঝার ভুল ছিল কিনা জানিনা , কিন্তু পরিধি মেয়েটা কোনদিন আমাকে ঘৃণা করেনি । বরং আমার চেয়ে কমপক্ষে বছর তিনেক ছোট মেয়েটি মাঝেমাঝেই ক্যাম্পাসে এসে আমার জন্য অপেক্ষা করত । আমি শায়নকে ভালবাসি জানার পরেও জোর করে শায়নকে ধরে আমার সামনে নিয়ে আসত । একদিন আমিই বলে ফেলি , “ পরিধি , এই যে তুমি আমার কাছে শায়নকে হারানোর ভয়টুকু পর্যন্ত পাওনা , আমার কি এতে মন খারাপ করা উচিত ? আমার তো দেখছি রিভাল হওয়ার যোগ্যতাটুকুও নেই ।” শায়ন ভয়ংকর নিষ্ঠুরভাবে উত্তর দিত , “পরিধি , তুমি কেন অতসীর সামনে আমাকে নিয়ে আসো বারবার ? অতসীর ব্যাপারে তোমারতো জেলাস হবার কোন কারন নেই ।” পরিধি কখনোই এসব কথার কোন উত্তর দিত না , মুখ ফিরিয়ে নিয়ে অনেকদূরে তাকিয়ে কি যেন ভাবত । আমি একদিন খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে দেখি – ওর সেই দৃষ্টিতে অসহায়ত্ব । ভীষণ রকম অসহায়ত্ব । মেয়েটাকে আমি পছন্দ করতাম , এরকম একটা মেয়েকে শায়ন কেমন করে না ভালবেসে পারবে ? কিন্তু পরিধির সেই অসহায়ত্বের দৃষ্টি আমি একদিন বুঝতে পারলাম – অথচ সেদিন দেরি হয়ে গিয়েছে অনেক । ঠিক এতটাই দেরি যে, আমি আর কিছুতেই মেয়েটার কাছে পৌঁছাতে পারিনি কোনদিন । কে ভাবতে পেরেছিল , এরকম পরীর মত মেয়েটা কটমটে ইংরেজী নামের ভয়ংকর একটা অসুখকে চুপিচুপি পুষে যাবে নিজের ভেতরে – তারপর একদিন হঠাত করে হারিয়ে যাবে ! পরিধির এরকমভাবে হারিয়ে যাওয়ার পর আমি প্রচন্ড ভয়ে টানা কয়েকদিন শায়নের মুখের দিকে তাকাইনি । আমার কেবলই মনে হত , এই বুঝি শায়ন ভেঙ্গে পড়বে । কখনোই ছুয়ে দিতে পারার অধিকার না পাওয়া এই আমি তখন কেমন করে ওকে ভেঙ্গে পড়তে দেখব ? নিজের সাথে প্রচন্ড যুদ্ধ করেই একদিন দেখা করতে গেলাম শায়নের সাথে । কিন্তু যে মানুষটাকে একবার দেখার জন্য আমি নিজের মাঝে হাজারবার করে মরে যাচ্ছিলাম, আমাকে দেখবার পর সেই শায়নের প্রথম কথাটা ছিল , “কি দেখতে এসেছ – বেঁচে আছি কিনা ? পরিধি মারা যাওয়ার তো একমাসও হয়নি – তার মাঝেই শুন্যস্থান পূরণ করতে চলে এসেছ ?” আঘাতটা বেশি ছিল , তবু আমি বিশাল একটা শ্বাস নিয়ে বলি , “ তোমার সত্যিই মনে হয় , সেই যোগ্যতা আমার আছে ?” -“ তাহলে কেন এসেছ ? অতসী , পরিধি তো মরে গেছে – তুমি কি করেছিলে ? তুমি নিজে বেঁচে থেকে আমাকে মরে যাওয়ার কষ্টটা দিয়েছিলে , মনে নেই ? সেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে যাওয়া আমাকে আজ পর্যন্ত কে বাচিয়ে রেখেছে জানো ? পরিধি ! আর আজ তুমি বলতে এসেছ – ভালবাসো ? সেলুকাস !” -“ আমি কিছু বলতে আসিনি , শায়ন । তোমার এখানে আমি অনেক শখ করে আসতেও চাইনি , নিজের সাথে ভয়ংকর যুদ্ধ করে হেরে গিয়েছিলাম । তাই এসেছি । সেই হেরে যাওয়ার শাস্তিটা বোধ হয় পাওয়া হয়ে গেল আমার !” - “ রূপকথার গল্প শুনিয়োনা প্লিজ – আমি ভীষণ ক্লান্ত ।” - “ আমিও – নিজের সাথে যুদ্ধ করে করে ক্লান্ত । অনুশোচনায় যখন আমি তৃষ্ণার্ত তখন এক দুপুরে আমার বারান্দায় সমুদ্র তোলা ঝড় । আমি সেই ঝড়ে কান পেতে থাকি । জানতে ইচ্ছে করে , এই আমাকে তুমি কেমন করে ভুলে থাকতে পার ? কষ্ট হয়না ? একটুও না ? আচ্ছা, এই পৃথিবীতে তো প্রতিদিন সহস্র মানুষের জীবনে ভালবাসা আসে , আমি বাসতে গেলেই ঝড় উঠতে হবে কেন ?” শায়ন হকচকিত হয়ে কিছু একটা বলতে চাইল , আমি ওকে থামিয়ে দিয়ে বলি, “তার চেয়ে ভাল – আমাকে বরং তুমি ভুলেই যাও । পারলে তোমার সবটুকু দিয়ে আমাকে ভুলে যাও । পারলে আমাকে ভুলে গিয়ে মনের ভুলে এসে বলে যাও – অতসী তোমাকে আমার আর মনে পড়েনা , একটুও না ! আমি সেইদিন থেকে তোমার অপেক্ষায় থাকা ছেড়ে দেব – দেখে নিও !” -“ ভুলে যাব । কিন্তু আমি ভুলে যাওয়ার আগেই তুমি চলে যাও , অতসী – অনেক দূরে চলে যাও । ঠিক যতটা দূরে চলে গেলে , অন্তত একটা জীবনে কোন দীর্ঘশ্বাস থাকেনা – ঠিক ততটা দূরে !” সেই আমি অনেক দূরে চলে এসেছি , শায়ন । কিন্তু কি মজার কথা বলতো , তোমাকে ভুলতে চাইবার জন্য শুধুমাত্র দূরত্বই আমার কাছে যথেষ্ট হল না । আমি রোম্যান্টিক মুভি দেখা ছেড়ে দিয়েছি , গানের সুর আমার মাঝে অনেকদিন হল নেই । তারপর অনেকগুলো বিকেল পেরিয়ে যাবার পর আমি বুঝতে পারলাম , আমার মাঝে ভালবাসা শব্দটির আর কোন অস্তিত্ব নেই । আমি ভালবাসতে ভুলে গেছি , শায়ন । একদিন নিজের সবটুকু দিয়ে ভালবাসবার পরেও তুমি যেমন বলেছিলে, আমি নাকি ভালবাসতে পারিনা – সেই আমি আজ সত্যিই পারিনা ! আরেকবার সামনে এসে একই কথাটা বলে যাবে কি ? শেষবারের মত নিজেকে একবার পরীক্ষা করে দেখি ? তবুও ভেবোনা আমি জিতে গেছি । দিনশেষে অতসী নামের মেয়েটি এখনও পরাজিত । আমিতো কেবল ভালবাসতেই ভুলে গেছি , তোমাকে ভুলতে পারলাম কই ? মেঝ ভাইয়ের বিয়ের কারনে সাত বছর পর আমি যখন দেশে ফিরলাম , তখন বদলে গেছে অনেককিছুই । আমার চারপাশ , চারপাশের মানুষগুলো কিংবা আমার প্রতি তাদের চিন্তাচেতনা – বদলে গেছে সবই । জানতে পারলাম , দেশ ছাড়ার সময় আমি নাকি একজনকে বিয়ে করে পালিয়েছিলাম , আমার ফ্যামিলি সেটাকে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছে – আর তাই নাকি আমার এখনো বিয়ে হয়নি । হাসি পেল , আমি সব শুনি আর আমার কফিমগটা নিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকি চুপচাপ । ভোরে ফজরের নামাজ শেষ হলে আমি বাবার কাছে বসে দুনিয়ার সব বিষাদ এক করে বলি , “বাবা , আমার উপর তোমার রাগ হয়না কেন ?” বাবা হেসে আমার মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলে , “ তোর এইটুক জীবনেই শত বছরের বটগাছের সমান কষ্ট । আমিও যদি রাগ করি , তুই তো আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারবিনা !” আমার চোখ থেকে অঝোরে পানি পড়তে থাকে , আমি একটুও গলা না কাঁপিয়ে বলি , “ বাবা , ছোটবেলা থেকে কেন শিখিয়েছিলে , মনের বিরুদ্ধে কিছু না করতে ? আমি আজো পারিনা মনের বিরুদ্ধে যেতে !” বাবা কিছু না জেনেই আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় । আর আমার মনে হতে থাকে , কতদিন পর আমি ভালবাসা জিনিসটাকে অনুভব করছি ! কয়েকদিন পর এক বিকেলে আমাদের বাসায় কাঁচাপাকা চুলের একজন ভদ্রমহিলা আসেন । পাঁচ মিনিটও হয়ত থাকেন নি , কেবল আমার হাতে মাঝারি সাইজের একটা কাঠের বক্স ধরিয়ে দিয়েই বিদায় নেন । যাবার আগে বলে যান , তিনি পরিধির মা । পরিধি মারা যাবার আগে তাঁকে অনুরোধ করে গিয়েছিল , এই বক্সটা আমাকে পৌঁছে দেবার জন্য । তাঁর অনিচ্ছাকৃত দেরির জন্য তিনি দুঃখিত । আমি বক্সটা হাতে নিয়ে পাথরের মত দাঁড়িয়ে থাকি । বক্সটার মাঝে ছোট ছোট স্টিকি নোটের মত অনেকগুলো কাগজ । পরিচ্ছন্ন অক্ষরে সহজ সরল অনুভুতিগুলোকে লিখে রেখেছে মেয়েটা । সাথে আছে পরিধির ছোটবেলা থেকে তোলা রাশি রাশি ফটোগ্রাফ । ভাল করে তাকালেই বোঝা যায় , সেসব ছবিতে পরিধির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি শায়ন । পরিধির লেখা অনেকগুলো লাভ লেটার পেলাম , এগুলো হয়ত শায়নকে সে কোনদিন দেয়নি । শায়নের লেখা কিছু চিঠিও পেলাম , যেখানে সে বারবার পরিধিকে রিজেক্ট করেছে , আর প্রত্যেকবার রিজেক্টের কারন ছিলাম শুধুমাত্র আমি ! স্তব্ধ হয়ে এভাবে অনেকগুলো চিঠি পড়বার পর আমি আমার জন্য লেখা একটা চিঠি পেলাম । “প্রিয় অতসী আপু , কয়েকদিন আগেও আমি তোমাকে চেহারায় চিনতাম না । কিন্তু কখনো না দেখেও একটা মানুষের উপস্থিতি সর্বোচ্চ ঠিক যতখানি বুঝতে পারা যায় , তোমার ব্যাপারে আমার অনুভূতি অনেকটা ঠিক সেরকমই । আমাকে তোমার কেমন লাগে ? খুব ভাল মেয়ে ভাব আমাকে, তাইনা ? আমাকে হয়ত পছন্দও কর, কিন্তু আমি তোমাকে বলছি , আমি তোমাকে ঘৃণা করি । ছোটবেলা থেকে শায়ন আর আমি নেক্সট ডোর নেইবার , একসাথে বড় হয়েছি । আমি ওকে খুব ভালবাসতাম - যতটা তুমি ওকে কোনদিন বাসোনি , ততটা ! কিন্তু ব্যাড টাইমিং ফ্যাক্টরটা দেখ , তুমি ওর জীবনে আসবার পরে আমি ওকে এই কথাটা জানালাম । আর ঠিক তখন থেকে আমি তোমাকে চিনি , কারনে অকারনে চিনি । তুমি শায়নকে না করে দেয়ার পরে ভাবলাম , ঘুড়ি এখন আমার আকাশে । হ্যা , ঘুড়ি আমার আকাশে এলো ঠিকই , কিন্তু তার নাটাই ? সেটা যে তখনও তোমারই হাতে । সেই ঘুড়ি আমি ওড়াবো কেমন করে ? ডিসেন্ট শায়ন তখন স্মোক করে , ওর জেন্টল ভয়েস ততদিনে রাফ এক্সেন্ট শিখে নিয়েছে । এরকম একটা সময়ে আমি জানতে পারলাম আমার অসুস্থতার কথা , আমার একটু একটু করে শেষ হয়ে যাওয়ার কথা । আমি শায়নকে বললাম , খুব বেশিদিন না । আমার মৃত্যু পর্যন্ত শুধু ভালবেসো ? শায়ন উঠে গিয়েছিল আমার সামনে থেকে । দুইদিন পর ফিরে এসে বলেছিল , ভালবাসি । আমাকে ও ভালবাসতে পারেনি । যে অনুভূতিটা তোমার জন্য ওর মাঝে সারাজীবন থাকবে , সেখানে আমি শুধুমাত্র সিম্প্যাথি পর্যন্তই টিকে থাকব । এই সিম্প্যাথি ব্যাপারটাই আমি নিতে পারতাম না আগে । কিন্তু এই শেষ সময়ে এসে আমি বুঝি সত্যিটা মেনে নিতে পারলাম । তোমার উপর আমি হয়ত আজীবন জেলাস থেকে যাব । তুমি বলেছিলে , সে নাকি তোমাকে কোনদিন চায়না । ওর চোখের দিকে তাকিয়েছ কখনো ? ওর চোখ কখনো আমার কথা বলেনা , আমিতো তবুও তাকাই । নির্লজ্জের মত তাকিয়ে দেখি , সেখানে তোমার জন্য ওর ভালবাসা । কাল সাহস করে জানতে চাইলাম , “ Do you still love her ?” সে কি বলেছে জানো ? “ Don’t believe my soul.. such a stupid hopeless soul I bear .. such a helpless man I am ! ” অ্যাট লাস্ট , আই গিভ আপ অন হিম । কিন্তু অতসী আপু, তুমি শায়নকে ছেড়ে যেওনা প্লিজ । আমাকে ঘৃণা কর ! বাট হি ইজ হেল্পলেস । হেল্প হিম , স্টিক উইথ হিম । ওকে ? -পরিধি ।” আমি হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে চিঠিটা হাতে নিয়ে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাই । শায়নকে আমার প্রয়োজন । খুব বেশি । কলিংবেল বাজানোর দুমিনিট পর দরজা খুলেই শায়ন যেন ২০০ ভোল্টের শক খেল । কেউ তাকালে হয়ত দেখতে পারত - দরজার একপাশে এলোমেলো চুলের একটা মেয়ে ষাঁড়ের তাড়াখাওয়া মানুষের মত হাঁপাচ্ছে , আর অন্যপাশে অসহায় চোখে তাকানো ছেলেটি ধপ করে হাটু ভেঙ্গে মেঝেতে বসে পড়েছে । ভেতরে ঢুকে অনেক্ষন পরে শায়নকে বলা আমার প্রথম কথাটা ছিল , “ তুমি আমাকে স্টুপিড , শেমলেস যা খুশি তাই বলতে পারো । শায়ন , সাতটা বছর কেটে গেছে । আই স্টিল কান্ট গিভ আপ অন ইয়ু । আমি যে শেমলেস স্টুপিড পাঙ্ক , আমার সেই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই ।” আমি আবিষ্কার করলাম, চিৎকার করে কান্না করা ছাড়া আমি একটা কথাও বলতে পারছিনা । শায়ন আমার কাঁধে হাত রেখে আস্তে করে বলল , “ It’s okay .. It’s okay .. I am a stupid man too” পরিশিষ্টঃ “অতসী , এই একটা জীবনে তোমাকে না পেয়ে আমার খুব জন্মান্তরে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হত , তুমি কি সেটা জানো ? মনে হত , এই জন্মে তুমি আমার নও তো কি হয়েছে , পরের জন্মে ঠিক পাব । আরেক জীবনে তোমাকে ঠিক সাইকেলের পেছনটায় বসিয়ে আমি আমার জেনে রাখা সব ঠিকানা ভুলে যাব আর তুমি আমাকে পেছন থেকে একদম শক্ত করে ধরে রাখবে । আমাদের সেই জীবনে তুমি আমাকে একটুও কষ্ট দেবেনা । এরকম আরেকটা জীবন কি সত্যিই পাব না , অতসী ? সত্যিই পাব না ?” অতসী স্থির চোখে শায়নের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে বলে, “ তোমার কথাগুলো আমার কেন যেন খুব পরিচিত লাগছে জানো ? মনে হচ্ছে আগেও হয়ত শুনেছি । কে জানে , প্রতি জন্মেই তুমি হয়ত আমাকে ঠিক একই কথা বলেই পাশ কাটিয়ে গিয়েছ !” ঠিক এক মুহূর্ত পরে অতসী টের পায় , শায়ন শক্ত করে তার হাতটাকে মুঠোবন্দী করে নিয়েছে । অতসীর অবাক দৃষ্টির সামনে তাকিয়ে শায়ন মুচকি হেসে বলল , “ অনেক হয়েছে , আর কোন পুনর্জন্ম থিওরির উপর ভরসা করে রিস্ক নিতে পারব না ।” অতসী টের পেল , তার জীবনটা ছন্দ ফিরে পাচ্ছে , একটু একটু করে ।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৫ জন


এ জাতীয় গল্প

→ গাংচিলের গদ্যছন্দ
→ গাংচিলের গদ্যছন্দ

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now