বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন"
মেরি শেলি
অনুবাদ: সুনীলকুমার গঙ্গোপাধ্যায়
-----------------------------
পাঁচ
☆☆☆তারপর☆☆☆
ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন ফিরে এলেন সাজসরঞ্জাম নিয়ে। এসেই তার মাথাটা ঘুরে গেল। এ কী হয়েছে! ডক্টর নীল ঘাড় গুজে পড়ে আছেন। গলার উপর কালো পাঁচটা আঙুলের দাগ—আর সেই দৈত্যটা নেই। খোলা জানলাটা যেন তার বোকামির জন্য বিদ্রপ করছে। এত করেও শেষপর্যন্ত এত ভুল! একটি ভুলের জন্য ডক্টর নীলের মৃত্যু হয়েছে, না জানি আরো কত বড় মাশুল দিতে হবে।
সমস্ত শরীর তাঁর ঝিমঝিম করে উঠল। উহ্ কী ভুলই তিনি করেছেন দৈত্যটাকে ভালো করে না-বেঁধে রেখে। মুক্ত হয়ে এখন দৈত্যটা যে কী না করবে। বুঝে উঠতে পারলেন না তিনি।
এই ল্যাবরেটরিতে এখন তিনি নিঃসহায়, একা। একা তিনি আর কী করতে পারেন? যদি দৈত্যটা আসে তাকেও হত্যা করতে, একা। তিনি কী করে আত্মরক্ষা করবেন?
একবার মনে হল, হয়তো আর সে ফিরবে না। উত্তুঙ্গ পর্বতশিখরে, দেবদারু, পাইন, চেরি, পিচের বনে, বড় বড় বাড়ির ছাদে, কুয়াশার ভিড়ের মধ্যে হয়তো সে নিজেকে হারিয়ে ফেলবে। তারপর যখন আলো ফুটবে, যখন পথে লোকজন চলাফেরা করবে, তখন ওই অপমূর্তিকে দেখে সকলে প্রাণের ভয়ে ছুটোছুটি করবে, সমস্ত দেশে একটা হৈ-চৈ শুরু হবে। আর পিশাচটা নরহত্যা করে সুন্দর পৃথিবীর বুক রক্তে রাঙা করে দেবে।
ভয়ে আর চিন্তায় তিনি দিশেহারা হয়ে গেলেন। তাড়াতাড়ি উঠে। মৃত ডক্টর নীল এবং বেয়ারাকে তারই বাগানে কবরস্থ করলেন। তারপর সমস্ত দরজা-জনিলা বন্ধ করে তিনি বসে রইলেন।
বাইরে বেরোতে সাহস হচ্ছে না, কী জানি কোথায় সেই দানবমূর্তি লুকিয়ে আছে। খাওয়ার কথা মনে এল না। একটা ইজিচেয়ারে শুয়ে তিনি ভাবতে লাগলেন তাঁর গবেষণার ব্যৰ্থতার কথা, সমস্ত জীবনের সাধনার ধূলিসাৎ হওয়ার কথা। মৃত্যুকে তিনি প্ৰাণে সঞ্জীবিত করেছেন সত্য, কিন্তু এ কী নিদারুণ পরাজয়! অতিমানবের পরিবর্তে এ কী এক রক্তপিশাচের সৃষ্টি! তাঁরই অদূরদর্শিতার জন্য দুই নিরীহ লোকের রক্তপাতে পৃথিবী এখনই কলুষিত হয়ে উঠেছে। মনের মধ্যে এক গ্লানি ধূমায়িত হয়ে উঠছে—ডক্টর নীল আর সেই বেয়ারার মৃত্যুর জন্য তিনিই কি দায়ী নন? হত্যাকারী কি শুধু সেই পিশাচটি? না-না—তিনি—তিনিই প্রকৃত হত্যাকারী!!
দুপুর, বিকেল, রাত-একইভাবে কেটে গেল উদ্বিগ্ন চিন্তায়। ভোর হল, টিপটপ করে বৃষ্টি পড়ছে, সারা আকাশ মেঘে ছেয়ে রয়েছে। ঘরের দরজা খুলতে তার সাহস হল না। কে জানে যদি সেই দানবটা আবার আত্মপ্ৰকাশ করে!
এক অনিশ্চিত আশঙ্কায়, এক দুঃসহ অসহায়তায়, এক অস্থির উদ্বিগ্নতায় ল্যাবরেটরির সমস্ত দরজা-জানলা বন্ধ করে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের দিন কাটে। নিঃসঙ্গ সময় বিরাট পাথরের মতো চেপে বসে থাকে-নড়ে না। এক অনিশ্চিত সংশয় বাজপাখির মতো পাখা মেলে সমস্ত আকাশ কালো করে রয়েছে, তার ক্রুর শ্যেনদৃষ্টি তাঁর ওপর নিবদ্ধ। একটু সুযোগ পেলেই সে যেন ঝাঁপিয়ে পড়বে তার ওপর।
দিনের সূর্য পশ্চিমে যাওয়ার সময় দীর্ঘ ছায়া ফেলে। ছায়া দীর্ঘতর হয়। তারপর হঠাৎ সমস্ত পৃথিবী জুড়ে ছায়া, সমস্ত আকাশে অন্ধকার। তার মাঝে এই ল্যাবরেটরি এক দৈত্যপুরী, রূপকথার চিরন্তন রাজপুত্রের মতো ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন নিষ্ঠুর করাল দৈত্যের পদধ্বনি শুনে যান। অন্ধকার রাত্ৰি যেন কাটে না। চারদিকে বিভীষিকার ছোটাছুটি, চারদিকে ভয়...ভয়..। সেই অন্ধকার ভেদ করে কখন বেরিয়ে আসবে হিংস্ৰ কদাকার রক্তলোলুপ্ত পৈশাচিক এক মুখ, নিঃশব্দ অন্ধকার ভেঙে সাদা দাঁত বের করে খটখটু করে বলবে—আমি এসেছি; রক্ত চাই আমি। হে আমার স্রষ্টা, আমার বিজু-কঠিন হাতে একবার ধরা দাও।
এইভাবে একের পর এক সুদীর্ঘ দিন, সুদীর্ঘতর রাত কেটে যায়। একই উৎকণ্ঠায়, একই আতঙ্কে ডক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের নিঃসঙ্গ দিন কেটে যায়। মনে হয়, দূরে কোথাও এক অশরীরী ছায়া ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু সেই দৈত্যকে তিনি স্বচক্ষে দেখেননি। মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে, এই তুষার-ঝরা কঠিন শীতের রাতে আশ্রয়হীন, বন্ধুহীন সেই দানবটি হয়তো ঠাণ্ডায় জমে বিনষ্ট হয়েছে। একটু আশার আলোয় মুখ উদ্ভাসিত হওয়ার পরমুহুর্তেই সংশয়ের কালো ছায়া এসে তাকে ঘিরে ফেলে। একা নির্বান্ধব এই সংশয়ে দিনের পর দিন থাকায় তাঁর আত্মবিশ্বাস শিথিল হয়ে পড়েছিল।
সেদিন সকাল থেকে ঝড়! আকাশ থেকে অবিশ্রান্ত তুষার ঝরে পড়ছে। এমন সময় মনে হল—কে যেন দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন চমকে উঠলেন। তবে কী-তবে কী-?
সমস্ত শরীরের রক্ত জমাট হয়ে উঠল যেন!
আবার...আবার দরজায় ধাক্কা! মনে হল একবার চিৎকার করে ওঠেন: কিন্তু এই জনমানবহীন বিজন প্রদেশে কে তাঁর চিৎকারে সাড়া দেবে?
—ভিক্টর! ভিক্টর!!
কারা যেন নিচ থেকে গলা শোনা যায়! ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন উৎকৰ্ণ হয়ে উঠলেন।
—ভিক্টর! ভিক্টর!!
হ্যাঁ—এ যে ক্লেরভালের কণ্ঠস্বর! ক্লেরভাল-তাঁর চিরসুহৃদ এসেছে। আড়ষ্ট শরীর একমুহূর্তে যেন সচল হয়ে উঠল। ছুটে গিয়ে তিনি সদর দরজা খুললেন।
ক্লের ভাল ঘরে ঢুকেই চমকে উঠলেন; বললেন—এ কী হয়েছে বন্ধু তোমার? চেহারা কেমন করে এমন বিশ্ৰী হল?
গলা, হাত এবং পা কাঁপছিল ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের। মনে হল যেন একটুও দ্বিধা না। করে এই মুহুর্তে সব কথা প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত তিনি তাকে বলে এই ভারাক্রান্ত হৃদয়কে একটু হালকা করে ফেলেন, কিন্তু শেষপর্যন্ত সাহস হল না। শুধু অস্ফুটস্বরে বললেন—কাজের চাপে শরীরের ওপর অত্যাচার হয়েছে যথেষ্ট। তাই—।
বন্ধুকে বসবার ঘরে নিয়ে যেতে সাহস হচ্ছে না। যদি সেই বিকট মূর্তির সঙ্গে আবার দেখা হয়। তাঁর যে শাস্তি হবার তা তো হয়েছেই, মিছিমিছি কোন বন্ধুর সুখ-শান্তি হরণ করবেন? ক্লেরভালকে সেখানে বসিয়ে রেখে সিঁড়ি দিয়ে ভয়ে ভয়ে তিনি উপরে উঠে গেলেন। কান পেতে যেন কিছু শুনতে চাইলেন। কিন্তু না, সেখানে কোনো শব্দ নেই। বসবার ঘরের খোলা দরজা দিয়ে ভিতরটায় একবার উকি মারলেন। না, সে নেই। সে নেই-ইচ্ছা হল, মনের আনন্দে একবার প্রাণ খুলে হাসেন, কিন্তু পারলেন না। চোখের কোণে শুধু অশ্রু জমে উঠল। সে কি আনন্দে, না বেদনায়? তাঁর সৃষ্ট প্রথম অতিমানবের বিভীষিকাময় উপস্থিতির অভাবের স্বস্তিতে, না তাকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলার ব্যথায়?
ক্লেরভালকে নিয়ে বসবার ঘরে এলেন তিনি। মনের উদ্বেগকে চাপাবার জন্য অফুরন্ত কথা বলে যেতে লাগলেন, কিন্তু সবই যেন অবান্তর এবং সবই যেন অসঙ্গত প্ৰলাপ বলে নিজেই বুঝতে পারছিলেন। তবু এতদিন পর একটু কথা বলার সুযোগ পেয়ে তিনি আর থামতে পারছেন না।
ক্লেরভাল প্রশ্ন করলেন—তোমার কী হয়েছে? চোখমুখের অবস্থা এমন হয়েছে কেন? তুমি অত কথা বলছি কেন?
কিছুই না, এমনি হয়তো।—ম্লানমুখে জবাব দেন। তিনি। একসময় ক্লেরভাল জিজ্ঞাসা করলেন—তোমার রিসার্চের কতদূর? আর ডক্টর নীল-ই বা গেলেন কোথায়!
মুহূর্তের মধ্যে তাঁর মুখের সমস্ত রক্ত অন্তৰ্হিত হয়ে গেল। মনে হল যেন সেই বিরাটকায় দৈত্য তাঁর সামনে দুহাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে বলছে—হে প্ৰভু আমার, এবার তোমার পালা; তুমি এসো! তুমি এসো!
ভয়ে তিনি চিৎকার করে উঠলেন—আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও। হেনরি, আমি আর সহ্য করতে পারছি না!
জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে গেলেন তিনি।
ক্লেরভালের শুশ্রুষায় একবার বোধহয় তাঁর জ্ঞান হয়েছিল—একটু একটু যেন মনে পড়ে। ক্লান্তি ও শ্রান্তিতে চোখের পাতা ঘূমে জড়িয়ে এসেছিল। অনেকক্ষণ পরে তিনি ঘুম থেকে উঠলেন, কিন্তু বড় দুর্বল বোধ করতে লাগলেন।
আচ্ছন্ন অচেতনতায় এরপর কেটে গোল কয়েকটি সংজ্ঞাহীন দিন—এক নিঃসীম তুষার-মেরুর ভেতর দিয়ে তিনি যেন চলেছেন রাত্রিদিন নিঃসঙ্গ, একাকী। কোনোদিন আর বোধহয় সেই মরুভূমি পার হয়ে সবুজ মাটির সন্ধান তিনি পাবেন। না; পাবেন না। তিনি আর কোনো পরিচিত মুখের দেখা। নির্জন নিম্পাদপ তুষারের মধ্যে তাঁর নিম্প্রাণ দেহ পড়ে থাকবে, সূর্যের ক্লান্ত রোদে তাঁর অস্থি। এতটুকু উষ্ণতা বোধ করবে না।
দিনরাত ক্লেরভাল পড়ে রইলেন তাঁর বন্ধুর পাশে। বন্ধুর অবিচ্ছিন্ন বিজ্ঞান-সাধনাকে তিনি কোনোদিনই স্বাগত জানাতে পারেননি। দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ঘরবাড়ি ছেড়ে, আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে দূরে এক বিজন প্রদেশে ল্যাবরেটরির মধ্যে একা একা কাজে ডুবে থাকার ফল যে শেষপর্যন্ত ভালো হতে পারে না—তা তিনি জানতেন। তবু মাঝে মাঝে তিনি এখানে এসেছেন, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করেছেন, তর্ক করেছেন, বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য জেদ করেছেন—শেষপর্যন্ত ফিরিয়ে নিয়ে যেতে না-পেরে রাগ করে। চলেও গেছেন। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের মা'র মৃত্যুর পর সংবাদ পেয়েও যখন দেখলেন যে তিনি বাড়িতে এলেন না, তখন ক্লেরভালের রাগের আর সীমা ছিল না। কিন্তু বন্ধুর পরিবারের সকলের বেদনাকর পরিস্থিতি আর করুণ অসহায়তার কথা মনে করে তাদের ঠিকমতো কোনো ব্যবস্থা না করে বন্ধুর সঙ্গে এর শেষ মীমাংসা করার কথা ভাবতে পারেননি। প্রথমেই যখন সময় পেলেন তখনই তিনি বন্ধুর কাছে ছুটে এলেন; কিন্তু তাঁর চিরদিনের ভয় ততদিনে ফলিষ্ণু হয়েছে। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের অস্থিরচিত্ততা ও অসংলগ্নতা দেখে তাঁর ধ্রুব বিশ্বাস হল যে অত্যধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণায় তাঁর মস্তিষ্কবিকৃতি ঘটেছে। বন্ধুর এই শোচনীয় পরিণতিতে তাঁর মন সহানুভূতিতে ভরে উঠল, চোখদুটি সজল হয়ে উঠল। মনে মনে স্থির করলেন, একটু সুস্থ হলেই তাঁকে তিনি ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাবেন।
ক্লেরভালের সেবা-শুশ্রুষা ও পরিচর্যায় বেশ কয়েক দিন পরে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন সুস্থ হয়ে উঠলেন। ক্লেরভাল বন্ধুর সঙ্গে অত্যধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার কুফল নিয়ে তর্ক করার চেষ্টা করা মাত্ৰই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন বলে উঠলেন—তোমার সঙ্গে তর্ক করব না। বৈজ্ঞানিক গবেষণা করা ভালো, না মন্দ—সে সম্বন্ধেও একটা কথা বলব না। তবে আজ আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি যে আর আমি গবেষণা করব না। আমি পরাজিত। প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলাম, জয়ের নেশায় আমি কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ করিনি; কিন্তু শেষপর্যন্ত আমি সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব, পরাজিত ও বিধ্বস্ত। এতখানি আত্মগ্রানি নিয়ে আর গবেষণা করা সম্ভব নয়। তোমাকে কথা দিচ্ছি। বন্ধু—এই শেষ। তুমি চলে যাও, আর কয়েকদিন পরে এই ল্যাবরেটরির একটা ব্যবস্থা করে আমিও দেশে ফিরে যাব।
জেনেভাতে ক্লেরভালের অনেক কাজ পড়ে ছিল। তাই বাধ্য হয়ে বন্ধুর কথায় বিশ্বাস করে ক্লের ভাল একা ফিরে গেলেন।
ক্লেরভাল চলে গেলে পর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের একে একে মনে পড়ল আগেকার সমস্ত কথা। তাঁর সৃষ্টি সেই অপার্থিব বীভৎসতা। ক্লেরভাল কি তার খবর জানে? তাকে কি সে দেখেছে? কপালে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমতে লাগল। কিন্তু পরীক্ষণেই তাঁর মনে হল, না-ক্লের ভাল নিশ্চয়ই দেখেনি, দেখলে সে তাঁকে এ-কথাটা জানাত।
ঘরের থেকে বেরিয়ে তিনি একবার বাইরের দিকে তাকালেন। দূরে পাহাড়ের মাথায় মাথায় তুষার-মুকুট সোনালি রোদে ঝকমক করছে, পপলার গাছগুলো মাথা দুলিয়ে তাঁকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। সমস্ত পৃথিবী রঙিন হয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানাচ্ছে।
চারদিক ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন তিনি, কোথাও সেই দুষ্ট রাহুর চিহ্ন নেই। এক প্ৰসন্ন শান্তিতে তাঁর মন ভরে উঠল। মনে হল যেন তিনি আবার নতুন করে জীবন লাভ করলেন। আর বোধহয় সেই বিকট উপদ্রব এখানে মুখ দেখাতে আসবে না। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস হল যে নিশ্চয়ই এই দুঃসহ শীতে বাইরে জমে সে মারা গেছে। একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে তিনি বাঁচলেন।
এই কথা মনে হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বাড়িতে এত তাড়াতাড়ি ফিরে যাওয়ার সদিচ্ছা তাঁর মন থেকে ধীরে ধীরে মুছে যেতে লাগল। দেশে ফিরে যাওয়ার দিন একটু একটু করে পিছিয়ে দিতে লাগলেন।
একদিন তিনি বেড়িয়ে ফিরে দেখলেন যে বাইরের ঘরে টেবিলের উপর তাঁর বাবার একটা চিঠি পড়ে আছে। একনিমেষে তাঁর আবার মনে পড়ে গেল বাবা, উইলিয়ম, আর্নেস্ট ও এলিজাবেথের কথা। বাড়ির সুন্দর জীবনের কথা আবার নতুন করে মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, তাই ভালো—সেখানেই চলে যাবেন। তিনি। সকলের সঙ্গে একত্র থাকলে এই অনিশ্চিত বিভীষিকার হাত থেকে অনায়াসে আত্মরক্ষা করা যাবে। আর তা ছাড়া মা'র মৃত্যুর পর একবার সকলের সঙ্গে দেখা করাও প্রয়োজন!
কিন্তু চিঠিখানা খুলে তিনি নিশ্চল হয়ে গেলেন। হাত থারথার করে কাঁপতে লাগল। তিনি পড়তে লাগলেন:
প্রিয়তম ভিক্টর,
ক্লেরভালের কাছ থেকে জানলাম যে তুমি শীঘ্রই দেশে ফিরে আসছ। তুমি ফিরে এলে তোমাকে আনন্দের সঙ্গে অভ্যর্থনা জানাব—একথা যদি মনে করে থাকে, তা ভুল-ভুল। তুমি এসে আমাদের হাসিমুখ দেখবে। যদি মনে করে থাকো তো আশ্চর্য হবে আমাদের চোখে জল দেখে। ভিক্টর, তোমাকে কী করে আমাদের এতবড় সর্বনাশের খবর দেব? ভিক্টর, উইলিয়ম মারা গেছে। সত্যকথা বলতে গেলে উইলিয়মকে কে যেন হত্যা করেছে। তোমাকে সাস্তুনা দেব না, শুধু ঘটনাটা আমি লিপিবদ্ধ করছি। গত বৃহস্পতিবার আমি, এলিজাবেথ আর তোমার দুই ভাই উইলিয়ম ও আর্নেস্ট বেড়াতে গেছিলাম। জায়গাটা এত সুন্দর যে ফিরতে আমাদের সন্ধ্যা হয়ে গেছিল। ফেরার সময় উইলিয়াম ও আর্নেস্টকে দেখতে পেলাম না। ওদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পরে আর্নেস্ট ফিরে এল। জিজ্ঞাসা করল যে আমরা উইলিয়ামকে দেখেছি কি না। সে জানাল যে তারা দুজনে লুকোচুরি খেলছিল। উইলিয়ম দৌড়ে গিয়ে কোথায় যে লুকোল, আর্নেস্ট তাকে খুঁজে পায়নি।
একথা শুনে আমরা শঙ্কিত হয়ে উঠলাম। রাত অন্ধকার হয়ে না-আসা পর্যন্ত আমরা তন্নতন্ন করে খুঁজলাম, কিন্তু তাকে খুঁজে পাওয়া গেল না। এলিজাবেথ বলল, হয়তো সে বাড়ি ফিরে গেছে। আমরা ছুটে এলাম বাড়িতে, কিন্তু সেখানেও সে নেই। আবার আমরা আলো নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সেই শীতের রাতে অন্ধকারে একা না-জানি সে ভয়ে কী করছে। ভোর প্রায় পাঁচটার সময় তার খোঁজ পেলাম-সুন্দর ফুটফুটে উইলিয়াম ঘাসের উপর নিঃসাড় হয়ে পড়ে আছে। তার গলায় হত্যাকারীর আঙুলের চিহ্ন তখনো জ্বলজ্বল করছে। তোমার মা’র ছবি মীনে-করা সোনার লকেটটা তার গলায় ছিল, সেটি পাওয়া গেল না। সেই সোনার লকেটের লোভে ফুলের মতো সুন্দর ছেলেটিকে দাস্যু হত্যা করেছে। এলিজাবেথ শোকে পাগল হয়ে উঠেছে। আর্নেস্টের ধারণা: সে-ই তার ছােটভাই-এর মৃত্যুর জন্য দায়ী, কারণ সে লুকোচুরি খেলতে না চাইলে উইলিয়মের এভাবে মৃত্যু হত না। আমাদের এরকম সুখের বাড়িতে আজ গভীর বিষাদের ছায়া সকলের জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে। হত্যাকারী আজও ধরা পড়েনি; কিন্তু আমাদের চেষ্টার ক্রটি নেই। আমাদের সকলের সম্মিলিত অনুসন্ধানে তার ধরা পড়তেই হবে। ভিক্টর, তুমি তাড়াতাড়ি এসো। তুমি ছাড়া এলিজাবেথকে আর কেউ সাস্তুনা দিতে পারবে না। তুমি এলে আমরা সকলেই মনে বল পাব। ইতি—
তোমার হতভাগ্য বাবা
উইলিয়মের মৃত্যু-সংবাদ শুনে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন শোক-বিমূঢ় হয়ে গেলেন। আর দেরি করলেন না, সেইদিনই তিনি জেনেভার পথে বেরিয়ে পড়লেন। এখানে থাকতেও তাঁর ইচ্ছা হচ্ছিল না, একা থাকবার খুব সাহসও ছিল না—কখন আবার সেই বিরাটাকার দানব সামনে এসে দাঁড়াবে। তা ছাড়া, মনে মনে ভাবলেন তিনি, উইলিয়মের হত্যাকারী সেই দৗসুকে ধরে উপযুক্ত শাস্তি বিধান করাও প্রয়োজন।
কিন্তু সে যাত্রা কী বেদনাময়। প্রথমে তাঁর মনে হয়েছিল যে যত শীঘ্য পারা যায় তিনি যাবেন, কিন্তু যতই তিনি যেতে লাগলেন ততই মনের কোণে বিষাদ জমে তার গতিকে মন্থর করে তুলতে লাগল। চারদিকে তিনি তাকিয়ে দেখলেন, শুধু তুষার আর তুষারের পাহাড়। আকাশ থেকে আরম্ভ করে মাটি পর্যন্ত সমস্ত যেন তুষারের সাদা চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। আকাশে পাহাড়ে গাছপালায়—সব জায়গায় যেন তিনি শুনতে পাচ্ছেন এক করুণ আর্তনাদ। আকাশের আলো যেন নিভে আসতে লাগল।
অতীতে কতবার তিনি এই পথ দিয়ে যাওয়া-আসা করেছেন, তার সুখকর স্মৃতি মনে পড়ল; কিন্তু মাত্র এই একটি আঘাত কেমন করে যেন এক বিরাট পরিবর্তন এনেছে। সর্বত্রই যেন তিনি নাম-না-জানা বিভীষিকা দেখতে পাচ্ছিলেন, ভয়ে সমস্ত শরীর যেন তাঁর পঙ্গু হয়ে যাচ্ছিল।
দুদিন অপেক্ষা করলেন তিনি সুজানে।
(চলবে)
-----------
।। একাকী কন্যা ।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now