বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন"
মেরি শেলি
অনুবাদ: সুনীলকুমার গঙ্গোপাধ্যায়
----------------------------
দুই
☆☆☆ডক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন☆☆☆
মধ্য-ইউরোপের তুষার-শৈলে ঘেরা শহরটি। ছোট্ট শহর, তার চেয়ে কম লোকজন। যেদিকে তবু জনমানবের বসতি আছে সেই দিকেই বাজার, সেই দিকেই হোটেল, খেলার মাঠ, সমাধিক্ষেত্র। দুরন্ত শীতে তার সব জায়গাই বরফে জমাট বেঁধে থাকে সব সময়ে।
একটু দূরে যেখানে মানুষের চলাচল প্ৰায় শেষ হয়েছে, যেখানে পর্বতশৃঙ্গ আরো উদ্যত হয়ে আকাশের উচ্চতা মাপবার জন্য প্রতিযোগীতা করছে—তারই একটি পাহাড়ের উপরে উঁচু-উঁচু পাইন চেরির জঙ্গলের ভিতর দিয়ে অপরিসর একটি পায়েচলা পথ এঁকেবেঁকে উঠে গেছে অনেকটা উপরে। সেইখানে দেখা যায় সুন্দর একটা বাড়ি।
ডক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের ল্যাবরেটরি।
ডক্টর ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাই তাঁর বসবার ঘরে নির্জীব পঙ্গুর মতো দাঁড়িয়ে রয়েছেন। হাতে একটি চিঠি—কিন্তু তাঁর দৃষ্টি সেই চিঠির ওপরে নেই, জানলার বাইরে কুয়াশার ভিতর দিয়ে দূরের অস্বচ্ছ তুষারমণ্ডিত পর্বতশ্রেণীর ওপর যেন তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ। চোখের কোণে ছোট্ট মুক্তোর মতো একফোঁটা জল যেন জমে আছে, ঝরে পড়তে পারছে না। পাছে সেই বেদনার্ত সময়ের সমাধি ভঙ্গ করে ফেলে।
এই নিথর নিস্পন্দ মূর্তির দিকে এখন তাকালে মনে হবে না যে ইনি সেই ডক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন—যিনি আজ পাঁচ বছর ধরে অক্লান্ত বিজ্ঞান-সাধনায় নিমগ্ন ছিলেন, যার প্রতিটি মুহুর্ত ছিল সজীব চঞ্চলতায় পরিপূর্ণ, কাজ-কাজ-কাজ ছাড়া আর যাঁর অভিধানে কোনো শব্দ ছিল না।
সেই বিমর্ষ বিধুরতা যেন একটু নাড়া পেল, ডক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের বুক থেকে অস্ফুট এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এসে সমস্ত ঘরকে যেন প্রবলভাবে নাড়া দিল। হাতের চিঠিটা আর একবার দেখবার চেষ্টা করলেন, চিঠির কয়েকটি রাইন তাঁর চোখে ভেসে উঠতে লাগল। চিঠির শেষটুকু তিনি আর একবার দেখলেন :
যাই হোক, তুমি বিশেষ চিন্তা কোরো না। তোমার কাজ যতদূর শীঘ্ৰ শেষ করে একবার অন্তত আমাদের দেখা দিয়ে যাও। যদিও আজ বাড়ির সকলে অত্যন্ত গভীর দুঃখে আচ্ছন, যদিও ভগবান ছাড়া আর কারো কাছ থেকে এই বেদনায় সাত্ত্বনার আশা করা যায় না, তবুও মনে হয় তুমি এলে বাড়ির চেহারা একটু বদলে যেতে পারে। ইতি। তোমার বাবা আলফোন্স ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন।
বাবার কথা মনে পড়ে যায় ডক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের। সেই জেনেভার শহরতলিতে সুন্দর ছোট বাড়ি, ছেলেবেলায় বাবার হাত ধরে পাহাড়ে পাহাড়ে বেড়ানো-প্রচুর অর্থ ব্যয় এবং ত্যাগ স্বীকার করে তাকে ইঙ্গলস্টট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানো আর তাঁর বিজ্ঞান-গবেষণার জন্য এই ল্যাবরেটরি তৈরি করে দেওয়া —প্ৰতিদানে তিনি বাবাকে কী দিতে পেরেছেন!! কতদিন বাবার সঙ্গে দেখা হয় না, কতদিন মা’র—
মা'র কথা মনে পড়তেই আবার চিঠির দিকে তাকালেন, চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এল;
আজ প্রায় পাঁচ বছর হল তোমার দেখা পাইনি। শুনে দুঃখিত হবে যে তোমার মা আজ সাতদিন স্কারলেট ফিভারে ভুগে মারা গেছেন। মৃত্যুর আগে তোমাকে একবার দেখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তারপর নিজে থেকেই বললেন—না থাক, তার কাজের অসুবিধা হবে।
তোমার ছোট দুই ভাই আর্নেস্ট আর উইলিয়মের খুব কষ্ট হয়েছে। বয়সে তো তারা তোমার থেকে অনেক ছোট। এলিজাবেথ যদিও প্রথমে ভেঙে পড়েছিল, তবু তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে সে শক্ত হয়েছে। সে আর আমাদের বাড়ির বৃদ্ধ পরিচারিকা জাস্টিন সকলের দেখাশুনা করছে। তোমার মা’র বড় ইচ্ছা ছিল, এলিজাবেথের সঙ্গে তোমার বিয়ে তিনি দেখে যাবেন।
মা-মা নেই। দিনের সূর্যকে যেন একনিমেষে নিবিড় কালো মেঘ ঢেকে ফেলল, সমস্ত পৃথিবী জুড়ে নিরন্ধ্র অন্ধকার, জমাট কুয়াশাভরা আকাশে যেন অমানিশার দুঃস্বপ্ন ঘুরে বেড়াচ্ছে! মা নেই—ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের মা নেই! এক অসীম শূন্যতা, এক নিঃসঙ্গ অসহায়তা ধীরে ধীরে তাঁর সমস্ত হৃদয় আচ্ছন্ন করে ফেলছে। কত বছর মাকে তিনি দেখেননি? পাঁচ বছর—তা হবে। মাকে তিনি এই সুদীর্ঘ পাঁচ বছর ভুলে ছিলেন, কিন্তু মা তাকে ভোলেননি। তাঁর কাজের অসুবিধা হবে বলে মৃত্যুর সময়েও মা তাকে দেখতে চাননি। মা, সোনামণি মা!
চোখের সামনে থেকে কুয়াশা যেন ধীরে ধীরে সরে যেতে লাগল। অন্ধকার ভেদ করে একফালি সোনালি রোদ নিঃসঙ্গ হৃদয়ে অনুরণন সৃষ্টি করল। মনে পড়ল ছোট্ট দুটি ভাই আর্নেস্ট আর উইলিয়মের কথা। দাদাকে তারা কত ভালোবাসে! দাদা তাদের বড় বৈজ্ঞানিক—এই গর্বে তারা বুক ফুলিয়ে হাঁটে। আর এলিজাবেথ! মা’র পালিতা কন্যা। একটার পর আর একটা ছোট ছোট ঘটনা তার চোখের সামনে ছায়াছবির মতো এসে সরে যেতে লাগল।
আমাদের এই দুঃখ ও বিপদের দিনে প্রভূত সাহায্য করেছে তোমার বন্ধু ক্লেরভাল। তোমার মা'র সেবা-শুশ্রুষা থেকে শুরু করে শেষ কাজ পর্যন্ত নির্বিয়ে সুসম্পন্ন সে করেছে। তার কাছে আমাদের ঋণ অপরিশোধ্য। আজও সে সমানে আমাদের দেখাশোনা করে।
হেনরি ক্লেরভাল! ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের আজন্ম সুহৃদ ও সহপাঠী। বিজ্ঞানঃ পড়ার ঝোঁক থাকা সত্ত্বেও তার বাবা তাকে পড়তে দেননি, পারিবারিক ব্যবসায়ে। প্রথম থেকেই ঢুকিয়ে দেন। ক্লের ভাল দেখাশোনা করছে—এই যা ডক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের সান্তুনা।
ডক্টর নীল এসে ঘরে ঢুকে একটু ভীত হয়ে উঠলেন। তাঁর গুরু ডক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের চেহারার এ কী পরিবর্তন!! আজি প্রায় পাঁচ বছর ধরে তিনি তাঁর সঙ্গে একত্র কাজ করছেন—প্ৰাণপ্ৰাচুৰ্যপূর্ণ ও সদাহাস্যময় এই ব্যক্তিকে কখনো এত অসুস্থ, এত উদ্যমবিহীন দেখেননি। বললেন--স্যার! আপনার কি অসুখ করেছে?
না—ডক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন উত্তর দিলেন—মা মারা গেছেন, চিঠি এসেছে।
—আপনার তো তবে একবার বাড়ি যাওয়ার দরকার।
বাড়ি!—একটা দীর্ঘনিশ্বাস চেপে ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন বললেন-হ্যাঁ, যাব। তবে আগে কাজ! মা মৃত্যুর আগে আমাকে দেখতে চাননি—আমার কাজের অসুবিধা হবে বলে। মা-র এতবড় অসুখ-আমাকে কেউ আগে খবর দেয়নি ডক্টর নীল— আমার কাজের অসুবিধা হবে বলে। ডক্টর নীল, কাজ-কাজ-কাজ! আমার আর অপেক্ষা করার সময় নেই। যে কাজ শুরু করেছি, তা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শেষ করতেই হবে। আজ কাজ ফেলে চলে যাব?
ডক্টর নীল বললেন—তা ঠিক। কিন্তু যদি কিছু মনে না করেন তো বলি—আপনি ঠিক কী কাজ করছেন-মানে--আপনি ঠিক কী বিষয় নিয়ে গবেষণা করছেন, আমি আপনার সঙ্গে এতদিন থেকেও ঠিক বুঝতে পারলাম না।
ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন বললেন—আমি যে কী করছি তা আমি কাউকে বলিনি। আপনি আমাকে এত সাহায্য করছেন, তবু আমি আপনার কাছে সেকথা গোপন করে রেখে গেছি। হয়তো আপনি আমাকে অনেক কিছু ভাবতে পারেন—বিশ্বাস করুন, আমার সমস্ত অন্তর একসঙ্গে সব কথা আপনাকে অনেকবার বলতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি—শুধু আপনি হাসবেন বলে। কারণ আমি জানি, আমি অসম্ভবের কল্পনা করছি—অসম্ভবকে সম্ভব করার সাধনা করছি। এই সাধনার জন্য সুদীর্ঘ পাঁচ বছর আমি ঘর-বাড়ি, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব ত্যাগ করে এই নির্জন নির্বান্ধব দেশে ল্যাবরেটরিতে আপনাদের দু-একজনকে নিয়ে পড়ে আছি। কতবার বাবা-মা'র কাছ থেকে চিঠি এসেছে, উত্তর দেওয়ার পর্যন্ত সময় হয়নি। আমার প্রাণের বন্ধু হেনরি ক্লেরভাল কতবার ছুটে এসেছে জেনেভা থেকে আমার খবর নিতে। কতবার সে জিজ্ঞাসা করেছে—কী আমার গবেষণার বিষয় যার জন্য আমি সব ভুলে বসে আছি? তার কাছে আমার কোনো কথা গোপন নেই, কিন্তু—কিন্তু তাকেও আমার গবেষণার বিষয় বলতে পারিনি। সে বিশ্বাস করবে না, উপহাস করবে—এই ভয়ে। আপনি বৈজ্ঞানিক, আমার সহকর্মী এবং এই গবেষণার চরম সাফল্যে আপনার দানও কম নয়—এই স্বীকৃতির জন্য আজ। আপনাকে আমি সব কথা খুলে বলব। হয়তো বিশ্বাস হবে না, মনে মনে হাসবেন—তবু কাউকে আমার কথা না বলে পারছি না। কিন্তু তার আগে আপনাকে কথা দিতে হবে যে, একথা আর কাউকে আপনি এখন জানাবেন না।
ডক্টর নীল বললেন—আপনি আমাকে সহকমী বলে বেশি সম্মান দিচ্ছেন। আমি আপনার শিষ্য, আপনার নগণ্য এক সহকারী মাত্র। আপনাকে অবিশ্বাস করলে এতদিন আপনার কাছে পড়ে থাকতাম না। আপনি আমাকে সব কথা নিৰ্ভয়ে বলতে পারেন; আমার কাছ থেকে কোনো কথা প্ৰকাশ পাবে না।
ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন বললেন—ছেলেবেলা থেকে আমার কলকব্জা এবং বিজ্ঞানের দিকে অত্যন্ত ঝোঁক। অবাক হয়ে দেখতাম কেমন দম দিলে রেলগাড়ি ছুটে চলে, ছোট পুতুল প্রভৃতি নাচে। দিন দিন বিজ্ঞানের ওপর আমার শ্রদ্ধা বেড়ে যেতে লাগল। তারপর যখন বড় হলাম, তখন এক চিন্তা আমাকে পেয়ে বসল—কলকব্জা দিয়ে যদি পুতুল চালানো সম্ভব হয়, মানুষ গড়া কি অসম্ভব হবে? মানুষ যদি মানুষের প্রাণ নিতে পারে, তবে চেষ্টা করলে কি প্রাণ দিতে পারে না? দিনরাত শুধু ভাবতাম, কী করে মানুষ তৈরি করব।
শুধু সেইজন্যই বাবার শত অমতে, বন্ধু ক্লেরভালের নিষেধ সত্ত্বেও মা'র চোখের জল অগ্রাহ্য করে। ইঙ্গলস্টাট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়তে গেলাম। আমার অধ্যাপকদের মধ্যে দুজন— প্রফেসর ক্রেম্প আর প্রফেসর ওয়ান্ডমান—ঠিক আমার মতোই অদ্ভুত প্রকৃতির ছিলেন। তাঁদের দুজনের কাছে আমি শুনতাম অ্যালকেমির যুগের অসাধ্যসাধনের প্রচেষ্টার কাহিনী, কত অলৌকিক ঘটনা—সে যুগের বিজ্ঞান যার কারণ দেখাতে পারেনি, অথচ অনেক বিস্ময়কর ঘটনা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে প্রফেসর ওয়ান্ডমান আমার; এই পাগলামির প্রধান সহায়ক হয়ে উঠলেন। পড়াশোনা শেষ হয়ে গেল, বাড়িতে ফিরে গেলাম—কিন্তু মাথায় সেই একই চিন্তা—কী করে মৃতে জীবন সঞ্চার করা যায়, কী করে নতুন মানুষ সৃষ্টি করা যায়—যে মানুষ জ্ঞানে, বুদ্ধিতে, কর্মশক্তিতে সাধারণ মানুষের চেয়েও বড় হবে। যাকে দিয়ে নতুন এক সুন্দর পৃথিবী সৃষ্টি করা যাবে।
তিনি বলে যেতে লাগলেন—এইজন্য কত বই পড়তে শুরু করলাম। কত জাদুকরের সঙ্গে আলাপ করেছি এবং তারপর নিজে কিছু কিছু জাদুবিদ্যা শিখতেও শুরু করলাম। মনে মনে অসম্ভব বল পেলাম। জাদুবিদ্যা এবং বিজ্ঞান এই দুই বিদ্যার সাহায্যে যে আমি মানুষ গড়তে পারব—সে বিষয়ে আমি একরকম নিঃসন্দেহ হয়ে গেলাম। ভেবেছিলাম আমার প্রাণের বন্ধু ক্লেরভালের সাহায্য নেব, কারণ একা একা সব করা সম্ভব নয়, কিন্তু ও পাগল ছেলে, ওর ধৈর্য নেই। তাই কী যে করব বুঝে উঠতে পারলাম না। কাজটা আমি গোপনভাবেই করতে চাই; তাই শবদেহ সংগ্রহও গোপনে করাই উচিত। কিন্তু একা যে-কী করে সম্ভব ভেবে উঠতে পারলাম না। এমন সময় আপনার সঙ্গে আলাপ। অর্থাভাবে আপনি বিজ্ঞানচর্চায় মন দিতে পারছিলেন না, সে অর্থাভাব আমি দূর করলাম—একটি শর্তে যে, আপনি বিনা-প্রতিবাদে আমার কথা শুনবেন। আজ পর্যন্ত আপনি আপনার শর্ত সম্পূর্ণ মেনে চলেছেন, যার জন্য আপনাকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ। তারপর আপনি শবদেহ সংগ্রহ করে আমার যে উপকার করেছেন, তা আমি জীবনে ভুলব না।
ডক্টর নীল বললেন--কিন্তু, মানুষ গড়া কি সত্যিই সম্ভব?
ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন বললেন—নয় কেন? আমার সব কাজ শেষ হয়ে এসেছে। শুধু আপনি আজ আর একটা কাজ করে দিন! আপনি সায়েন্স ইনস্টিটিউট থেকে শুধু একটি মানুষের ‘ব্রেন’ এনে দিন। অত্যন্ত গোপনে এবং লুকিয়ে আনতে হবে। তারপর আশা করি, এ ব্যাপারে আর আপনার দরকার হবে না।
ডক্টর নীল বললেন—বেশ, আজই আপনি তা পাবেন।
সায়েন্স ইনস্টিটিউট। ডক্টর রে উৎসুক ছাত্রদের বক্তৃতা দিয়ে চলেছেন। ডক্টর নীল ছাত্রদের মধ্যে আত্মগোপন করে আছেন। প্ৰকাণ্ড প্ৰকাণ্ড জারে ‘ব্রেন’গুলো রয়েছে অ্যালকহলের মধ্যে। ডক্টর নীলের গা ছম ছম করে উঠল। আজই বক্তৃতার পর ওরই একটি চুরি করতে হবে। যদি ডক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের আবিষ্কার সফল হয়. যদি তিনি মানুষ গড়তে পারেন. যদি অতিমানুষ মানুষের হাতে বন্দি হয়, যখন ইচ্ছা তাকে মারো, যখন ইচ্ছা বাঁচাও...তবে.তবে...? সমগ্র জগতে ছড়িয়ে পড়বে। ডক্টর ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের নাম—আর তার এককোণে ছোট্ট তারার মতো জ্বলবে তারও নাম। জগতের মনীষীদের মাঝে তাদের নাম থাকবে চিরস্মরণীয় হয়ে—এঁরা মানুষ সৃষ্টি করেছেন, এঁরা মানুষকে অজেয় করেছেন, ঐরা মানুষকে শক্তিমান করেছেন!
ডক্টর নীল লুব্ধদৃষ্টিতে অ্যালকহল রাখা ব্রেনগুলোর দিকে তাকিয়ে আছেন। ডক্টর রে যে কী বলছেন তা তার কানে যাচ্ছিল না। তিনি শুধু প্ৰতীক্ষা করছেন, কখন এই অভিনয়ের শেষ হবে-কখন শেষ হবে বক্তৃতা—কখন রঙ্গমঞ্চে নামবার আসবে লগ্ন!
ঢং ঢং ঢং...
ঘণ্টা বেজে গেল। বক্তৃতার সময় শেষ হয়েছে, এসেছে তাঁর রঙ্গমঞ্চে নামবার চরম মুহুর্ত। চোখের সামনে নাচছে প্ৰকাণ্ড প্রকাণ্ড জারগুলো। এক মুহুর্ত—শুধু এক মুহূর্তের জন্য চাই সময়! তারপর নতুন উদ্যমে এগিয়ে যেতে হবে সম্মুখের পথেবাধা নেই, বিঘ্ন নেই—আছে শুধু ছন্দ-হিল্লোলিত জীবনের আলোকিত পথ—আছে জীবনের গৌরবময় সাফল্য।
ডক্টর রে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলেন। ছেলেরাও চলে গোল ক্লাস থেকে। ডক্টর নীল এই সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ক্লাসটি নির্জন হতেই ছুটে গেলেন তিনি। কোনটা নেবেন ভাববার সময় পেলেন না। এক মুহুর্ত সময় নষ্ট করার অবকাশ নেই। কে কখন এসে পড়বে, কে কখন দেখে ফেলবে—তাদের সমস্ত পরিকল্পনা নিমেষে নষ্ট হয়ে যাবে। একটা জার থেকে একটা ব্রেন নিয়ে গোপনে বেরিয়ে গেলেন। ক্লাস থেকে।
যাক, এখন তিনি নিশ্চিন্ত। এখন আর ধরা পড়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। সকলের অজ্ঞাতসারে তিনি বেরিয়ে যেতে পেরেছেন।
ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন ব্ৰেনটা দেখে একটু চমকিয়ে উঠলেন-এ কি মানুষের ব্ৰেন! কিন্তু আর ভাববার সময় নেই। পাঁচ বছর প্রায় কেটে গেছে। এই মানুষটি গড়তে—আর অপেক্ষা করতে তাঁর ইচ্ছা ছিল না। অতিমানুষই তো তিনি সৃষ্টি করতে চলেছেন, তবে মিছে। এ ভয় কেন? আর যদি মানুষ গড়তে গিয়ে অমানুষ হয়ে যায়—তবে প্ৰাণ যখন দিয়েছেন, নিতেও পারবেন। যদি এ মানুষ না হয়, তবে এর প্রাণ নিয়ে আর একটি মানুষকে প্ৰাণ দেবেন। সে-ও যদি মানুষ না হয়, তবে দেবেন আর একজনকে। প্ৰাণদানের রহস্য যখন তিনি উদঘাটিত করতে পেরেছেন তখন আর ভয় কী? তাঁর সাধনা সফল করে তারপর তিনি নেবেন ছুটি।
নভেম্বরের মুত্যু-শীতল অন্ধকার নিশ্ছিদ্র রাত্রি। সমস্ত শহরটায় একটি প্ররয়-ললিা চলছে। কাছের বড় বড় গাছ কাঁপিয়ে শীতের ঝড়ো বাতাস হা-হা করে দরজা-জানালায় ধাক্কা দিচ্ছে, বৃষ্টির বড় বড় ফোটা মােটা কাচের সার্শির ওপর মাথা খুঁড়ছে। দূরের কাছের সমস্ত পর্বতশৃঙ্গে সাদা জমাট বরফের ওপর দীর্ঘ শীতল রাত্রি জমে আড়ষ্ট হয়ে রয়েছে।
ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের সামনে টেবিলের উপর শুয়ে রয়েছে একটি সুন্দর অতিমানুষ। কী সুন্দর তাকে দেখতে-কী সুন্দর তার মুদিত চোখ, কী সুন্দর তার নির্বক মুখ, আর কী সুঠাম তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ!
ওই সুন্দর মানুষটির দিকে তাকিয়ে ভাবছেন ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন। এখন আর বাকি শুধু প্ৰাণপ্ৰতিষ্ঠা। হয় মানুষ জিতবে, নয় ভগবান। আজ ভগবানের পরাজয় মানুষের হাতে প্রতিমুহূর্তে। শুধু এই মানুষ মরা-বাঁচার ব্যাপারেই এখনো তিনি অপরাজেয় হয়ে আছেন। যদি এই সাধনায় আজ তিনি জয়যুক্ত হন, তবে পৃথিবীতে দেবত্বের অবসান—মানবের জয়জয়কার। মানুষের এই বিজয়, মানবসমাজের যে কতখানি মঙ্গল করবে। এই ভেবে দেবতার নিজে থেকে পরাজয় স্বীকার করা উচিত।
সুদীর্ঘ রাতও ছোট হয়ে আসে। মোমবাতিটি গলে গলে প্রায় নিঃশেষ হয়ে এসেছে। ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন অপলকদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন সেই মূর্তিটির দিকে। কখন আসবে সেই মহেন্দ্ৰক্ষণ। কখন জগবে মানুষ—তাঁর সৃষ্টি এই অতিমানুষ।
(চলবে)
--------------
।। একাকী কন্যা ।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now