বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ঈশ্বরের রোষ ও মানুষের দোষ—এক ভূকম্পিত উপাখ্যান

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X মোহাম্মদ শাহজামান শুভ শহরটির নাম ছিল “বিশ্বাসপুর”—এক অদ্ভুত শহর, যেখানে যুক্তি ছিল অতিথি আর বিশ্বাস ছিল স্থায়ী নাগরিক। এখানে মানুষেরা ঘুম থেকে উঠে প্রথমে সূর্যের দিকে তাকিয়ে প্রণাম করত, তারপর নিজের ছায়াকে সন্দেহ করত। এই শহরের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা—সবকিছুর কেন্দ্রে ছিল একটি অদৃশ্য সিংহাসন, যার নাম “অলৌকিক সত্য”। আর সেই সিংহাসনের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন “মহামান্য গোঁড়ামি মহাশয়”। বিশ্বাসপুরের মানুষ খুব সহজে ভয় পেত, আর সেই ভয়কে তারা ধর্মীয় ভাষায় ব্যাখ্যা করতে ভালোবাসত। কেউ অসুস্থ হলে বলা হতো—“ঈশ্বরের পরীক্ষা”, কেউ দরিদ্র হলে বলা হতো—“পূর্বজন্মের পাপ”, আর কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে বলা হতো—“অবিশ্বাসী”। শহরের প্রতিটি গলিতে গলিতে ছড়িয়ে ছিল এইসব ব্যাখ্যার দোকান, যেখানে যুক্তির বদলে বিক্রি হতো ভয় আর ভক্তি। এই শহরে বাস করতেন এক অদ্ভুত মানুষ—নাম তার “প্রজ্ঞাপনাথ”। তিনি কোনো মন্দিরে নিয়মিত যেতেন না, আবার কোনো ধর্মকেও অস্বীকার করতেন না। তিনি শুধু প্রশ্ন করতেন। আর এই প্রশ্ন করাটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় অপরাধ। শহরের মানুষ তাকে দেখলেই ফিসফিস করে বলত—“ওই যে আসছে, যুক্তিবাদী!” একদিন হঠাৎ বিশ্বাসপুর কেঁপে উঠল। মাটির নিচে যেন কেউ রাগে গর্জে উঠল। ঘরবাড়ি ভেঙে পড়ল, মানুষ আতঙ্কে দৌড়াতে লাগল। এই ভূমিকম্প শহরের ইতিহাসে এক ভয়াবহ অধ্যায় হয়ে রইল। কিন্তু ঘটনার পরপরই শহরের মন্দির প্রাঙ্গণে এক বিশাল সভা বসানো হলো। সেখানে উপস্থিত হলেন “ধর্মবক্তা মহাশয়”, যিনি শহরের সবচেয়ে প্রভাবশালী বক্তা। তিনি গম্ভীর কণ্ঠে ঘোষণা করলেন—“এই ভূমিকম্প কোনো প্রাকৃতিক ঘটনা নয়। এটি ঈশ্বরের রোষ! আমরা পাপ করেছি, তাই ঈশ্বর আমাদের শাস্তি দিয়েছেন!” তার এই বক্তব্যে উপস্থিত জনতা প্রথমে স্তব্ধ হয়ে গেল, তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়তে শুরু করল। কারণ ভয় পেলে মানুষ যুক্তির চেয়ে সহজ ব্যাখ্যা খোঁজে। প্রজ্ঞাপনাথ সেই সভায় উপস্থিত ছিলেন। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “মহাশয়, যদি এটি ঈশ্বরের রোষ হয়, তাহলে নিরীহ শিশুরা কেন মারা গেল? তারা কী পাপ করেছিল?” তার এই প্রশ্নে সভায় এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হলো। ধর্মবক্তা একটু থেমে বললেন, “ঈশ্বরের বিচার আমরা বুঝতে পারি না।” প্রজ্ঞাপনাথ মৃদু হেসে বললেন, “তাহলে আপনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন যে এটি ঈশ্বরের রোষ?” এই প্রশ্নে জনতার মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো। কেউ কেউ অস্বস্তিতে এদিক-ওদিক তাকাতে লাগল, আবার কেউ কেউ প্রজ্ঞাপনাথের দিকে রাগান্বিত চোখে তাকাল। এরপর শহরে শুরু হলো এক অদ্ভুত পরিবর্তন। মানুষ দুই দলে বিভক্ত হয়ে গেল—একদল বিশ্বাস করে যে ভূমিকম্প ঈশ্বরের শাস্তি, আরেকদল মনে করে এটি প্রাকৃতিক ঘটনা। কিন্তু মজার বিষয় হলো, দুই দলই নিজেদেরকে “সত্যের রক্ষক” বলে দাবি করে। শহরের অর্থনীতি তখন ভেঙে পড়ছে। মানুষ কাজ হারাচ্ছে, খাবারের অভাব দেখা দিচ্ছে। কিন্তু এই বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান খোঁজার বদলে শহরের নেতারা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন “পাপ নির্ণয় কমিশন” গঠনে। তারা খুঁজতে লাগলেন—কোন পাপের জন্য এই শাস্তি এসেছে। কেউ বলল, “নারীরা বেশি স্বাধীন হয়ে গেছে”, কেউ বলল, “যুবকেরা ধর্ম থেকে দূরে সরে যাচ্ছে”, আবার কেউ বলল, “বিদেশি সংস্কৃতির প্রভাব বেড়েছে”—এইসব তত্ত্ব নিয়ে শহরে শুরু হলো এক ধরনের নৈতিক বিচার। অথচ কেউ ভাবল না, ভাঙা ঘরগুলো কীভাবে মেরামত হবে, ক্ষুধার্ত মানুষগুলো কীভাবে খাবার পাবে। প্রজ্ঞাপনাথ এই পরিস্থিতি দেখে গভীরভাবে বিচলিত হলেন। তিনি শহরের মানুষের জন্য একটি দীর্ঘ কবিতা লিখলেন—গদ্যছন্দে, যেখানে তিনি তুলে ধরলেন মানুষের ভণ্ডামি, ভয়, আর অজ্ঞতার ছবি। কবিতার প্রতিটি লাইনে ছিল এক ধরনের তীব্র ব্যঙ্গ, যা মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে। কিন্তু সেই কবিতা শহরের শাসকদের ভালো লাগল না। তারা বলল, “এটি মানুষের বিশ্বাসে আঘাত করছে!” ফলে কবিতাটি নিষিদ্ধ করা হলো। কিন্তু নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের কৌতূহল আরও বেশি। ফলে গোপনে গোপনে সেই কবিতা ছড়িয়ে পড়তে লাগল। ধীরে ধীরে কিছু মানুষ বুঝতে শুরু করল—ভূমিকম্প কোনো শাস্তি নয়, এটি একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। আর মানুষের দুর্ভোগের কারণ শুধু প্রকৃতি নয়, বরং তাদের নিজেদের অদূরদর্শিতা, দুর্বল অবকাঠামো, আর সামাজিক অব্যবস্থাপনা। কিন্তু এই উপলব্ধি সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল না। কারণ গোঁড়ামি মহাশয় এখনও তার সিংহাসনে বসে আছেন, আর তিনি জানেন—মানুষকে ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে সহজ। গল্পের শেষে বিশ্বাসপুর আবার স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। ঘরবাড়ি মেরামত হয়, মানুষ কাজে ফিরে যায়। কিন্তু শহরের ভেতরের দ্বন্দ্ব থেকে যায়। কেউ এখনও বিশ্বাস করে—ঈশ্বর রাগ করেছিলেন, আর কেউ মনে করে—মানুষই নিজের সমস্যার জন্য দায়ী। প্রজ্ঞাপনাথ একদিন শহর ছেড়ে চলে যান। যাওয়ার আগে তিনি শুধু একটি কথা বলে যান—“প্রকৃতি আমাদের শত্রু নয়, আর ঈশ্বর আমাদের শাস্তিদাতা নন। আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু হলো আমাদের নিজের অজ্ঞতা।”


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ৪ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ঈশ্বরের রোষ ও মানুষের দোষ—এক ভূকম্পিত উপাখ্যান

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now