বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
একুশ উৎসব
রাজনীন ফারজানা বর্ষা
.
সপ্তাহখানেক হোল জারার আম্মুর মুখ ভার। কারন আর কিছুইনা জারার বাবা কিছুতেই পার্টি থ্রো করতে রাজি হচ্ছেনা। জারার বয়স চার, একটা নামী ইংলিশ মিডিয়ামে প্লে তে পড়ে। স্কুলের ভাবীদের সবার নতুন শাড়ি কেনা হয়ে গেছে। জারার মাও ৪০০০ টাকা দিয়ে ওদের সাথে গিয়ে একটা কিনেছে। ম্যাচিং গয়না, ক্লাচ, জুতো সব কেনা শেষ। দিনের বেলা ভাবীদের সাথে ঘুরে এসে রাতে ওনার বাসায় ডিনার পার্টি করার ইচ্ছা ছিলো। জারার আম্মু রাতের পার্টিতে পরার জন্য সাদা কালো ব্রান্ড থেকে তিনজনের জন্য ম্যাচিং পোশাকও কিনেছে। শাড়ি পরে শহীদ মিনারে ফুল দেওয়ার ছবি প্রোফাইল পিকে দেওয়ার আর তিনজনের ছবি কাভার ফটোতে দেওয়ার প্লান সব রেডি। এখন জারার বাবা এই পাঞ্জাবী পরতে বা পার্টি দিতে কোনটাতেই রাজি না। সাফ জানিয়ে দিয়েছে জারার আম্মু যা ইচ্ছা তাই করতে পারে কিন্তু সে জারাকে নিয়ে ভোরবেলা বেরিয়ে যাবে। কারন হিসেবে বলেছে জারার দাদীর অসুস্থতা।
২১ শে ফেব্রুয়ারি ভোর পাঁচটায় জারাকে ঘুম থেকে তুলে রাকিব একটা সাধারণ খাদির ফতুয়া পরে নিলো। মেয়েকেও সাধারন বেড়াতে যাওয়ার একটা পোশাক। কিন্তু দুজনের পোশাকেই কালো ব্যাচ পিন দিয়ে আটকে দিতে ভুললোনা। জারা ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে শুধু জিজ্ঞাসা করলো ওরা কোথায় যাচ্ছে আর আম্মু যাবেনা ওদের সাথে। রাকিব ওকে বললো যে আজ ওরা দাদীর বাড়ি যাবে। আম্মুর কাজ আছে তাই আম্মু যাবেনা। জারা আর ওর আব্বু ওদের টবের গাছ থেকে দুটো গোলাপ ছিঁড়ে নিলো। গাড়িটা রেখেই গেলো জারার আম্মুর জন্য।
বাপ মেয়ে হাটতে শুরু করলো। পথে শাহবাগমুখি একটা ফাকা বাস পাওয়ায় ওরা উঠে পড়লো। জারা তো অবাক। কারন ও বাসে ওঠেনি কখনো। যাই হোক ছোট মানুষ বাবার কোলে ঘুমিয়ে গেলো দ্রুতই। গুলশান থেকে শাহবাগ পৌঁছুতে ২০ মিনিটও লাগলোনা রাস্তা এতোই ফাকা। কিন্তু ওখান থেকে ঠিকই ভীড়ের শুরু। মেয়েকে কোলে নিয়ে রাকিব এগোচ্ছে ভীড়ের সাথে সাথে। এতো মানুষ আর রঙ বেরঙএর সাজগোজ, ফুল, ভীড়, হৈচৈ, মাইকে ভেসে আসা উচুস্বরের গান সব দেখে জারার ঘুম ছুটে গেছে। ও অবাক হয়ে দেখছে। দুএকজন ওদেরও অবাক হয়ে দেখছে হয়তো সাদা কালো পোশাক না পরায়।
জারা তো শহীদ মিনার কি জিনিস বুঝতেই পারছিলোনা। বাবা বলেছে ওরা শহীদ মিনার যাচ্ছে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। কিন্তু ও তো চারদিকে শুধু মানুষ আর মানুষ দেখতে পাচ্ছে। শহীদ মিনার কোথায়। প্রচণ্ড ভীড়ের মাঝে বাবা ওকে দূর থেকেই লম্বা লম্বা পিলারের মতো ফুলে ঢাকা কি যেন দেখিয়ে বললো ওটাই শহীদ মিনার। জারা আর ওর বাবা ফুল দেওয়ার লাইনে দাঁড়ালো। ভীড়ের চাপে ধাক্কা খেতে খেতে এগোচ্ছে। কেউ কেউ ওদের হাতের তুচ্ছ দুটো গোলাপের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি দিচ্ছে। জারা ভাবলো ওর হাতে কেনো ফুল দিয়ে বানানো বড় ওই গোলমতো জিনিসটা নাই। রাকিব আর ওর মেয়ে ফুলদুটো শান্তভাবে রাখতেও পারলোনা। ভীড়ের চাপে ছুড়ে ফেলার মতো করে ফেলতে হোল শহীদ মিনারের সিঁড়িতে। রাকিব ভাবলো মেয়েকে নিয়ে অন্য কোনদিন আসবে শহীদ মিনার চেনাতে অন্তত একুশ ফেব্রুয়ারি নয়।
বাস ছুটে চলেছে মাওয়া ঘাটের দিকে। ফোন বেজে উঠলো রাকিবের। নটা প্রায় বাজে, ঈশিতা ফোন দিয়েছে ঘুম থেকে উঠে ওদের না দেখতে পেয়ে। রাকিব জানালো ওরা রাতে ফিরবে না পারলে কাল ভোরে। জারা বাবার কোলে লেপ্টে ঘুমে অচেতন। ঈশিতা কিছুক্ষণ দ্বিধায় ভুগলো কি করবে না করবে তাই নিয়ে। বের হবে কি হবেনা। যদি না হয় বা পার্টি ক্যানসেল করে তাহলে ভাবীদের সামনে মুখ দেখাতে পারবেনা। কেটারিং সার্ভিসকে বলাই আছে। সব ক্যানসেল করতে হবে। রাকিবটা যে কি। মানসম্মান সব শেষ করে দিলো। বিদেশ থেকে ডিগ্রী নিয়ে আসা ইঞ্জিনিয়ার তাও ফালতু আবেগ মুছে ফেলতে পারলোনা এখনো। বিয়ের ছয়বছর হতে চললো তাও বদলাতে পারলোনা। প্রথম প্রথম তাও মান অভিমান দেখিয়ে এসব পার্টিতে নিয়ে যেতো। জারার বয়স তিন হওয়ার পর থেকে আর পারেনা। কোন না কোন অজুহাত দেখিয়ে মুনশিগঞ্জ চলে যায় পহেলা বৈশাখ, একুশে ফেব্রুআরি আসলে। এবারই প্রথম জারাকেও নিয়ে গেলো। একবার ভাবলো সব ক্যানসেল করে নিজেও চলে যায় মুনশিগঞ্জ। গিয়ে দেখে আসুক বাবা মেয়ে কি দেশোদ্ধার করছে। কিন্তু ড্রেসিং টেবিলের দিকে চোখ পড়তেই মন বদলালো ওর। ড্রেসিং টেবিলের সামনের টুলে ব্লাউজ পেটিকোট আর টেবিলের উপর গয়নাগাটি সব সাজানো। পাশেই রাখা আড়ং থেকে নতুন কেনা সাদা কালো স্যান্ডেল। এতোকিছু কিনলো। সবকিছুর একটা ছবি পোস্ট করেছিলো গতকাল। এখন যদি পরে না বের হয়, এতো মানুষকে কি বলবে। ঈশিতা বিছানা ছেড়ে শাওয়ার নিতে ঢুকলো। ফিরে এসে শাড়ি বের করতে যেয়ে দেখলো বাবা মেয়ের পোশাক যেমন কেনা তেমনই পড়ে আছে, ভাজও খোলেনি। রাকিবের গোয়ার্তুমির জন্য নির্ঘাত আজ লোকজন ওদের দেখে হাসবে। গ্রামেও এখন সবাই স্পেশাল দিবস উপলক্ষে স্পেশাল কাপড় পরে। যা ইচ্ছা করুক, ও তো আর সাথে নাই। আর রাকিবের অতো ফেসবুকে ছবি দেওয়ার অভ্যাস নাই দেখে রক্ষা। সাজগোজের মাঝেই সব ভাবীদের সাথে কথা হয়ে গেলো। সবাই বেরিয়ে পড়লো। শাহবাগের দিকের ভীড়ে কেউ যাবেনা আজ আগেই ঠিক হয়েছিলো। ওনারা বরং উত্তরার দিকে গেলো। যাওয়ার পথে একটা শহীদ মিনার পড়ায় সেখানে নেমেফুল দিলো। আসার পথেই বনানী থেকে বড় বড় ফুলের বুকে সংগ্রহ করা হয়েছিলো। এক ভাবীর কলেজপড়ুয়া ভাগ্নে তার ডিএসএলআর ক্যামেরা নিয়ে এসেছে। সবার ছবি উঠলো ফটাফট। সেইসাথে চললো নানা ভঙ্গীমায় সেলফি তোলা আর সাথে সাথে ফেসবুকে ছবিসহ চেকইন। ডিয়াবাড়ির দিকে যেয়ে আরো কিছু ছবি তোলা চললো। দুপুরে সবাই মিলে দামী রেস্টুরেন্টের আলোছায়ায় মাঝে লাঞ্চ সারতে গেলো। লাঞ্চ শেষে ওয়েটার জানালো একুশে স্পেশাল আমের পুডিং আছে ডেজার্টে, ওনারা টেস্ট করতে চান কিনা। সবাই উতসাহের সাথে হ্যা বললো। একুশ উদযাপনের এমন সুযোগ মিস করা যায়না। ডেজার্ট আসলো বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী মাটির বাসনে। খাওয়ার আগে চললো ছবি তুলে আপলোড দেওয়া। ভিন্নভাবে একুশ উদযাপনের এই সুযোগ সোশাল মিডিয়ায় জানানোর সুযোগ মিস করতে কেউই রাজি না। লাঞ্চ শেষে সবাই যে যার মতো বাসায় ফিরে গেলো রাতে রেডি হয়ে জারাদের বাসায় আসতে হবে আবার। ডিএসএলআর ক্যামেরাধারী ভাগ্নেও দাওয়াত পেলো।
সকালের মন খারাপ ভাব দূর হতে সময় লাগলোনা ঈশিতার যখন ফেসবুকে লাইক কমেন্ট পেতে থাকলো। জারার আব্বু একবারও কল করেনি, ঈশিতাও না। কিন্তু রেস্টুরেন্টে থাকা অবস্থায় সব ভাবীরা ঈশিতাকে দেখেছিলো জারার বাবার সাথে কথা বলতে। জারার বাবা নাকি জমি সংক্রান্ত কি জরুরী দরকারে গ্রামে যাচ্ছে। জারা কান্নাকাটি করায় জারাকেও সাথে নিয়ে যাচ্ছে। সবাইকে স্যরি বলেছে রাতের প্রোগ্রামে থাকতে না পারায়। পরে কখনো অন্য কোন পার্টিতে দেখা হবে সবার সাথে। রাকিব আর ওর মেয়ের অভাব রাকিবের শশুর-শাশুড়ি, শালী, সম্বন্ধী আর তাদের বাচ্চারা এসে পূরণ করে দেবে।
রাতের পার্টির বুফে ডিনারের চর্বচোষ্যের ছবি আর স্পেশাল ২১ লেখা কেক কাটার ভিডিও সবই সোশাল মিডিয়ায় চলে যাচ্ছে মুহূর্তের মাঝে। আর ওদিকে জারা ওর দাদীর বুকের ওম ওম গন্ধ নিয়ে হাজার বছরের রুপকথার গল্প শুনতে শুনতে ঘুমানোর চেষ্টা করছে।
কিছুদিন পরে রাকিবের ফেসবুক আইডিতে একটা ভিডিও আপ্লোডেড হোল যেখানে জারা ওর দাদার সাথে পদ্মানদীতে ঝাপাঝাপি, হুটোপুটি করছে। আর একটা ভিডিও আসলো যেখানে জারা উঠোনময় একপাল মুরগী আর হাসের পিছে ছুটছে। জারার মুখের অনাবিল আর প্রাণখোলা হাসি ডাকসাইটে ইঞ্জিনিয়ার থেকে শুরু করে সবার মুখেই স্মিত হাসি ফোটাচ্ছে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now