বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

একটা আলোর ভোর

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X “আমাকে একটা ছোট্ট কেক দিবেন প্লিজ? আর একটা মোম? ম্যাচ ও লাগবে। আচ্ছা আপনি আমাদের বিয়ের গল্পটা শুনবেন? বিয়েটা হয়েছিল আমাদের বাসায়, হঠা ৎ করে ... আমি ক্লাস শেষে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরেছি তখন। সাধারণত আমি বাসায় এসে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেই। গোসল করে ঠাণ্ডা হয়ে তবেই বের হই। ঐদিন মা বাবা দুজন মিলে দরজা খুলল, এবং হড়বড় করে কথা শুরু করল, দুজন ... - আজ ক্লাস কেমন হল? - খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে, খেয়েছিস কিছু? - কি দিয়ে এসেছিস? বাস? না সি এন জি? - বিয়ে টিয়ে সব তো আল্লাহর হাতে, না? - আসলে একটা সময় মানুষ কে বিয়ে করতে হয়, তাই না? দুজনের কথার তোড়ে কারো কথারই উত্তর দিতে পারছিলাম না, বুঝতে পারছিলাম না দুজন মিলে এত অসংলগ্ন কথা কেন বলছে ... দুজন কে সরিয়ে দিয়ে বললাম, আমি গোসল করে আসি দাঁড়াও, তারপর শুনছি। ঘরে ঢুকতেই দেখি ছোট বোন বীথি মিটিমিটি হাসছে, এমনিতেই দেখতে পরীর মত সুন্দর, সেজেগুজে আছে, ইন্দ্রাণীর মত লাগছে ... - কাহিনীটা বুঝতে পারছ না আপা? - না। কি কাহিনী? - তোমার বিয়ে ... - যাহ ... - সত্যি..... ছেলের বাবা গত সপ্তাহে বাবার অফিসে এসেছিল, ওদের তোমাকে খুব পছন্দ। বাবা খোঁজখবর নিতে গিয়ে দেখে, ছেলের চাচা বাবার ছোটবেলার বন্ধু, ছেলেটা ও খুব ভালো। বুয়েটের, বাইরে এম এস করতে যাবে। বাবা মা ও রাজি হয়ে গেছে ... - মানে কি? আমাকে জিগ্যেস করবে না? - ওমা, তুমি না সেদিন মাকে বললে তাদের পছন্দেই বিয়ে করবে ... মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল, ঐদিন এমনি এমনি কথার কথা বলেছি। জাহিদ কি ফেলনা নাকি? সেও বুয়েটের, বাইরে না হলে বাংলাদেশে এম এস করবে, তো কি হয়েছে? আমি ভেবেছিলাম, আর কিছু দিন যাক, তারপর না হয় ... আমি গজগজ করতে করতে মার রুমে গেলাম, -এসব কি মা? তোমাদের পছন্দে বিয়ে করব বলে আমাকে জিগ্যেস পর্যন্ত করবে না? কোথাকার কে, চিনি না জানিনা ... - চিনবিনা কেন? আমি তো শুনলাম, ছেলেটা কে তোর অপছন্দ না ... অন্তু ইকবাল ... - যেই ইকবাল ই হোক আমি ... কথা বলতে বলতে থেমে গেলাম, অন্তু ইকবাল, মানে জাহিদ? ? ? ? ? ? কেমনে কি? মা বাবার সামনে দাঁড়িয়ে আমি লজ্জায় লাল, নীল, বেগুনি হতে থাকলাম ... ঘরে এসে বীথিকে একচোট নিলাম, - এই ফাজিল, বলবি না আমাকে তুই ... মার সামনে আমি... ধুউউর ... - সারপ্রাইজড? ? ? - অনেক, দাড়া জাহিদ কে ফোন দেই। - জাহিদ ভাইকে এখন পাবে না, খুব ব্যস্ত ... - বিয়ের দিন ঠিক করেছে? জিগ্যেস করতে লজ্জা লাগছিল, তবু করেই ফেললাম ... - আপাআআ ... - কি? - আজকে রাতে। তোমাকে মা বলেনাই? ? ? আমি ধপ করে বসে পড়লাম ... কালকে দুপুরেও জাহিদের সাথে রিকশায় করে ঘুরছিলাম, ক্যাফে ফোর এর ক্রিমি অরেঞ্জ নিয়ে, আর আজকে রাতে আমি হয়ে যাব ওর বিবাহিতা স্ত্রী ... কি সেকেলে একটা শব্দ কিন্তু আমার মনে হল পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর শব্দ ... মনে হল এই এক মুহূর্তের বিনিময়ে কেউ যদি আমার পৃথিবীটা চায়, আমি দিয়ে দিব। আমি হতভম্ব হয়ে বসে আছি, এখন দুপুর দুইটা বাজে, একটু পর রাত হয়ে যাবে ... একটু পর? বীথি আমার দিকে ঝুঁকে এলো, - কেমন লাগছে আপা? আমি কিছুই বললাম না ... - বলনা আপা কেমন লাগছে তোমার? - বুঝতে পারছিনা বিথু ... - জানো আপা, তোমাকে দেখে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হচ্ছে ... আমি আয়নার সামনে দাঁড়ালাম, নিজেকে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলাম, এক মুহুর্তেই নিজেকে কেমন অন্যরকম লাগছে ... সুন্দর লাগছে কিনা জানি না, তবে অবশ্যই সুখী লাগছে ... মা ঘরে এলো তখন, ‘ইশি মা আয় তোকে তেল দিয়ে দেই, চুল গুলোর কি হাল করে রেখেছিস ... আর তুই বোকার মত দাঁড়িয়ে আছিস কেন বীথি? তোর নীলা আপুকে ফোন কর, আমার মেয়েকে মেহেদী দিয়ে দিবে না? ’ আমার চোখে পানি এসে পড়ল। এত সামান্য কথায় কেন এমন লাগছে জানিনা ... মা শুধু মাথায় তেল না, গায়ে হলুদ ও মেখে দিল, পহেলা ফাল্গুনের শাড়ি দিয়ে আমি হলুদ করলাম তেল মাথায় ... এর মাঝেই আমার বান্ধবিরা এসে হাজির ... স্কুলের, কলেজের, ইউনিভার্সিটির ... এদের কে খবর দিয়েছে কে জানে? সবাই হলুদ লাগাচ্ছে আর আমি ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছি, এমন গায়ে হলুদ আর কোথাও হয়েছে কি না কে জানে? এর মাঝেই অপালা ক্যামেরা বের করে ছবি তুলে একাকার, আমি ওকে সমানে শাসিয়ে যাচ্ছি, খবরদার একটা ছবি যদি ফেসবুকে দিয়েছিস তো তোর মাথা ভেঙে ফেলব। তেল মাথায় আমি কোনদিন ঘরের বাইরে যাই না আর সেখানে আমার হলুদের ছবিতে আমার মাথায় তেল! কি ভয়ংকর! আমাদের চারজনের ছোট্ট বাড়িটা মানুষ জনে গিজগিজ করছে ... মা আমাকে গোসল করিয়ে দিল, খুব ছোটবেলায় বালতিতে বসে থাকতাম, আর মা গোসল করিয়ে দিত, এত বছর পর আবার ... মনে হচ্ছিল নতুন জন্ম হচ্ছে আমার ... কেমন যে লাগছিল ভিতর টাতে, অদ্ভুত এক আনন্দ আর কষ্টের সংমিশ্রণ। শুনতে অনেক সাধারণ লাগে, কিন্তু এই অনুভূতি একটা মেয়ে ছাড়া আর কেউ কখনো বুঝবে না, প্রিয় মানুষের সাথে নতুন সংসার শুরু করার উত্তেজনা আর এত দিনের বাবা মা, ভাই বোনের বন্ধন ছিঁড়ে যাওয়ার কি চাপা কষ্ট! গোসল থেকে বেরুতেই দেখি আমাকে পার্লারে নিয়ে যাওয়ার জন্য এক দল রেডি। আমি বীথি আর অপালা শুধু পার্লারে গেলাম... ঘরে যখন ফিরলাম, তখন সন্ধ্যা হয়েছে ... আমার গায়ে নীল বেনারসি ... বিয়েতে মানুষ লাল পড়ে, আর জাহিদ রা পাঠিয়েছে নীল বেনারসি, শাড়ির বক্স খুলতেই একটা নীল খাম পেয়েছিলাম। তাতে সবুজ কাগজে লেখা, আজকে গাড় নীল বেনারসি ... এর পর হলুদ আর রিসিপশন এও কিন্তু নীল শাড়িই পাবে ... আমি আগে থেকেই জানি নীল রঙের প্রতি ওর অনেক দুর্বলতা, তাই বলে সব প্রোগ্রামে আমি নীল পরব নাকি? যাই হোক এইটা নিয়ে পরে ব্যবস্থা করব ঠিক করলাম ... ঢাকায় যত আত্মীয় আছে চলে এসেছিল, বংশের প্রথম মেয়ের বিয়ে বলে কথা ... ওরা আসল রাত ৯ টায় ... জাহিদ কে খুব দেখতে ইচ্ছা করছিল, খুউব ... বীথি অবশ্য বলে গেছে ফিসফিস করে ‘জাহিদ ভাই একটা নীল পাঞ্জাবি পরে আসছে ...’ জাহিদের মা হঠা ৎ ঘরে আসলেন, সাথে আরও কিছু মহিলা। মা আমাকে ইশারা করলেন সালাম করার জন্য, আমি জাহিদের মায়ের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলাম, বাকিদের করব কি না বুঝতে পারছিলাম না। উনিই পরিচয় করিয়ে দিলেন, জাহিদের খালা এবং মামি। তারপর পুরানো দিনের সিনেমার মত করে নিজের হাতের বালা দুইটা খুলে পরিয়ে দিলেন, আমার মাথায় হাত রেখে বললেন, আমার ছেলেটা খুব এলোমেলো, আর অগোছালো মা। তোমার মানিয়ে নিতে কষ্ট হবে হয়ত। কিন্তু তুমি পারবে আমি জানি ... আমার উনাকে মোটেও ডাইনি বুড়ি শাশুড়ি মনে হল না, মন থেকেই মনে হল মায়ের মত কেউ ... এই আদর মোটেও লোক দেখানো মনে হয়নি ... অপালা, নীলারা একটু পর এসে এসে ধারা বিবরণী দিয়ে যাচ্ছে জাহিদ কি করছে, কি হচ্ছে এখানে ... আমি ফিক করে হেসে ফেলছি, আবার চুপ হয়ে যাচ্ছি, মা কানে কানে বলে গেছিল, ‘ একদম হাসাহাসি করবি না। মুরুব্বি রা আছে। বেয়াদব ভাববে ...’ আমি মোটেও বেয়াদব না, তাই চুপ করে আছি। আর লুকিয়ে লুকিয়ে হাসছি ... এক ফাঁকে বীথি একটা ছবি তুলে নিয়ে আসল জাহিদের, ওকে হালকা করে ঝাড়ি দিলাম, ‘ এসব ঢং এর মানে কি? এই ছবি দিয়ে আমি কি করব? যত্তসব ...’ বলে ছবিটা দেখতে লাগলাম ... আমার সোনাটা ... তখন কালো পাঞ্জাবি পরা একটা মোটা লোক ঢুকলেন, পিছনের আরও অনেক মানুষ ; তিনি আসলেন, কি সব বলছিলেন শুনতে পাচ্ছিলাম না কিছু, শুধু মনে আছে, গলার কাছে একটা কি যেন ঢেলা আটকে আছে, চোখে অনর্গল পানি আসছে, এক হাত ঘোমটা দেয়া, তাই কেউ দেখতে পাচ্ছিলো না। সবাই চারপাশ দিয়ে গুতাচ্ছিল, বল ...। বল না... মা পিছন থেকে আমার একটা হাত ধরলেন, আমি মার হাতে শক্ত করে ধরলাম, নখ বসে গেল, মা বুঝতে পারছিলেন আমি কি ভাবে কাঁপছি থরথর করে, মা চাপা গলায় বলল, বল ইশিতা। ভয় কিসের? আমি মার হাত ধরে রেখে বললাম। সেই শব্দটা ... আমার কষ্টে বুক টা ভেঙে যাচ্ছিল, কাঁপা কাঁপা হাতে আমি সাইন করলাম ... তখনো মার হাত ছাড়িনি। মা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই আমি কেঁদে ফেললাম। বাচ্চাদের মতন ভেউভেউ করে ... আমি বুঝতে পারিনি মাও কাদছিল। ভেউভেউ করেই ... সব শেষ হতে অনেক রাত হল। রাত একটার কাছাকাছি। আমাকে আমার ঘরে পাঠিয়ে দিল, সবাই মেঝেতে বিছানা করেছে, কেউ যাবে না এবং রাতে ঘুমাবেও না। সারা রাত নাকি আমাদের জবালাবে ... আমার বিছানা টা নীল গোলাপ আর বেলি ফুলে সাজানো, নীল গোলাপের মৃদু গন্ধ টা ঠিক বোঝা যাচ্ছিল না ... তবে বেলি ফুলের তীব্র ঘ্রাণ অনুভূতিকে অবশ করে দিচ্ছিল ... আমার সবচাইতে পছন্দের ফুল বেলি। জাহিদ একটু পর ই এলো। আমি ওকে দেখলাম। জাহিদ - তাকে আমার সম্পদ বলি আর সম্পত্তি – ও ই সব কিছু ... - কেমন আছ নীল পরী? বাসর ঘরে বিয়ের পর তাহার প্রথম কথা। আমার কেন যেন চোখে পানি চলে এলো ... আমি যে কি! একটু কিছু হলেই চোখে পানি চলে আসে... কিছু বলার আগেই দরজা নক করল কেউ ; আমি জানি বীথি। গত ১৯ বছর ধরে ওর সাথে থাকি এই ঘরে, প্রতিটা পায়ের শব্দও চিনতে পারি। দরজা খুলতেই আমাকে পেস্তাবাদামের শরবত দিয়ে গেল। জাহিদ অন্ধকারে এগিয়ে আসল আমার দিকে। দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রইলাম অনেক ক্ষন। ঘর অন্ধকার, জানালা দিয়ে চাঁদের আলো আসছে খুব, বৃষ্টি হয়েছে সন্ধ্যায়। বসন্তের অদ্ভুত বাতাস ... কিছু বলার ভাষা পাচ্ছিলাম না দুজন, বোধ হয় অনেক কিছু বলার থাকলে কিছুই বলা যায়না ... কালকে রাতে ওর সাথে ফোনে গল্প করার সময় এক বার ও কি ভেবেছিলাম আজকে ... এই দিন টা কেমন করে এলো আমার জীবনে ... নিজের ভাগ্যে নিজের ঈর্ষা হচ্ছিল। অকারণে চোখে পানি আসছিল ... জাহিদ আমার হাত টা খপ করে ধরে ফেলল, ‘দেখো ইশিতা আমার হাত কেমন কাঁপছে ... আগে কখনো কোন মেয়ের হাত ধরিনিত ...’ আমি চোখে পানি নিয়ে হেসে দিলাম, এই কথাটা প্রথম দেখা হবার দিন জাহিদ বলেছিল রিকশায় বসে .... সেই প্রথম দিনের কথা, কয়েক বছর আগের ... - এই জাহিদ, একটা কাজ করবে? - কি - চল চিঠি পড়ি ... - চিঠি? - হুম ... এই যুগেও আমরা কম করে হলেও কয়েকশ চিঠি চালাচালি করেছি ... জাহিদের চিঠি গুলো কোন কোনটা বিশাল বিশাল আবার কোন কোনটা ছোট, ‘ তুমি ক্লাসে, আমি বাসায় একা, সময় কাটছে না ... কখন দেখব তোমাকে? ’ – এই টাইপ ... বিশাল একটা সবুজ চিঠি নিয়ে দুজন পড়া শুরু করলাম, ভেবেছিলাম ছোট বেলার আবেগ নিয়ে দুজন হাসাহাসি করব, কিন্তু উল্টা টা হল ... দুজনের চোখে কেমন পানি চলে আসছিল ... ও আমার হাত থেকে চিঠি টা নিয়ে আমার টেবিলে রেখে বলল, থাক চিঠি পড়া লাগবে না ... - কি করব তাহলে? - কিছু করা লাগবে না। আসো দুজন পাশাপাশি বসে থাকি সারা রাত ... - কি নিয়ে গল্প করব বুঝতে পারছি না ... - কোন কিছু নিয়ে গল্প করতে হবে না ইশিতা ... শুধু বসে থাকি ... আমরা কিছুক্ষন চুপচাপ বসে থাকলাম ... দেয়ালে হেলান দিয়ে জাহিদ বসেছিল, জাহিদে গায়ে হেলান দিয়ে আমি, তীক্ষ্ণ চোখে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম, তখনো কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না যে আমাদের সত্যি সত্যি বিয়ে হয়ে গেছে ... আমি নীর বতা ভেঙে বললাম, একটা কথা বলি? মাত্র একটা ... - বল ... - আমাকে কোনদিন ছেড়ে যাবানা বল... - দূর পাগলী! ছেড়ে যাওয়ার জন্য বিয়ে করলাম? - না তুমি তা ও বল। আমার গা ছুঁয়ে বল ... - এই পচা এই! - হু? - কোনদিন যাবনা। কখনোও না ... ও আমার কপালে একটা চুমু খেল, তারপর হঠা ৎ গুনগুন করে সুর ভাজতে লাগলো, ও খুব সুন্দর গান গাইতে পারে, প্রায়ই রিকশায় করে আমরা যখন ঘুরতাম ও গান গেয়ে শোনাত ... ‘’ একটু বাতাস যদি হয়ে যায় ঝড়, সেই ঝড়ে ভেঙে যায় যদি বাঁধা ঘর ... আবার নতুন ঘর বাঁধতে পারি, যদি তুমি পাশে থাকো ...’’ তারপর সারা রাত আমরা সত্যি সত্যি জেগে কাটিয়ে দিলাম, ভোরের প্রথম আলো যখন ঘরে আসল, আমারা জানালার সামনে দাঁড়ালাম, দুহাত বাড়িয়ে দিলাম আকাশের দিকে ... মনে হল নরম রোদ তার মায়াময় স্পর্শে আমাদের ছুঁয়ে দিচ্ছে, সেই মুহুর্তে দুজন দুজন কে ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম, যতদিন বেঁচে থাকব দুজন এভাবে হাত ধরে প্রতিটা নতুন সকাল শুরু করব ... সেদিন ছিল চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস, ১৪ ই মার্চ। ডক্টর, আজকে কত তারিখ? ১৪ই মার্চ ; তাই না? আমাকে একটা কেক দিবেন? আজকে সেই দিন। আজকে আমাদের বিয়ের দিন। আমি কেক কাটতে চাই ... ’’’’ *** আমার সম্বিত ফিরে পেতে একটু টাইম লাগলো, আমি ডঃ আহসান আহমেদ। এই হাসপাতালে নতুন জয়েন করেছি, এইটা একটা মেন্টাল হসপিটাল। আজকেই প্রথম নাইট ডিউটি। আমি এই মেয়েটাকে চিনিনা। বৌ এর সাথে ঝগড়া করে ফোন অফ করে রেখেছি ... বসে বসে বোর হচ্ছিলাম তাই ভাবলাম একটা রাউন্ড দিয়ে যাই। ঘুরতে ঘুরতে ১৪৩০ নং রুমের দিকে চোখ পড়ল, একটা মেয়ে আমাকে হাত বাড়িয়ে ডাকছে... সবার গায়ে সাদা ড্রেস, হসপিটালের। শুধু এই মেয়েটার পরনে একটা মলিন নীল শাড়ি ... তাই একটু কৌতূহলী হয়ে এগিয়ে গিয়েছিলাম। মেয়েটা আমাকে দেখে শান্ত কিন্তু অস্থির গলায় ডাকল, “আমাকে একটা ছোট্ট কেক দিবেন প্লিজ? আর একটা মোম? ম্যাচ ও লাগবে। আচ্ছা আপনি আমাদের বিয়ের গল্পটা শুনবেন? ...’’ আমি কতক্ষন ধরে শুনছিলাম জানিনা, মনে হয়নি একজন মানসিক রোগীর গল্প শুনছি। মনে হয়েছে কাছের কোন বন্ধু গল্প করছে, মেয়েটার কেবিনের বাইরে লেখা, “ ইশিতা ইকবাল, পেশেন্ট নং -১৪৩০ ; বয়স – ২৮ ’’... মেয়েটা আকুল হয়ে আমাকে বলল, একটা কেক দিবেন প্লিজ? আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম, আমি কেক নিয়ে আসছি ... রুমে এসে ডিউটি নার্স দিবা কে ডাকলাম। - ১৪৩০ নং রুমের মেয়ের কাহিনী কি? - স্যার আমি ঐ ফ্লোরের ডিউটিতে না। তবে শুনছি মেয়েটা কারো সাথে কোন কথা বলে না। দিনের পর দিন ঐ ঘরে থাকে, বের ও হয় না। - মেয়েটা নীল শাড়ি কেন পড়ে আছে? সাদা ড্রেস কেন দেয়া হয়নি? - সাদা ড্রেস দেয়া হয়েছিল, কিন্তু ছিড়ে ফেলে। তাকে নীল শাড়ি ছাড়া অন্য কোন কাপড় দিলে ছিঁড়ে ফেলে... কোন শব্দ করে না, ছিঁড়ে ফেলে। তা ই প্রথম থেকে তাকে নীল শাড়িই দেয়া হয়। - আমাকে ১৪৩০ এর ফাইল টা এনে দাও, কুইক ... - ওকে স্যার। আমি ঝড়ের বেগে ফাইল টা উল্টাতে থাকলাম। যে মেয়ে এত সুন্দর করে গুছিয়ে ডিটেইলস এ এত কাহিনী বলে গেল, সেই মেয়েটা গত তিন বছর ধরে এখানে ভর্তি? কেন? ‘ ইশিতা রায়হান। ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে মাইক্রোবায়োলজির ছাত্রী। অবস্থাসম্পন্ন পরিবারের বড় মেয়ে। প্রেম করে এবং সবার সম্মতি তে বিয়ে হয় অন্তু ইকবাল জাহিদের সাথে। তারপর ইশিতা রায়হান হয়ে যায় ইশিতা ইকবাল। সুখেই কাটে তাদের সংসার। দুজনের ছোট্ট সংসার। বিয়ের তিন বছর পর একদিন ইশিতা জানতে পারে জাহিদের আর একটা সম্পর্কের কথা ; ঐশী নামের একটা মেয়ের সাথে, ঘুণাক্ষরেও বুঝেনি ইশিতা, জাহিদ এইটা করতে পারে। সব জেনে অনেক চিল্লাচিল্লি, তারপর কান্নাকাটি করেও ফিরাতে পারেনি জাহিদ কে। অবশেষে তীব্র ভালোবাসার কাছে হার মেনেছিল ইশিতা। সব মেনে নিয়েও থাকতে চেয়েছিল জাহিদের সাথে। ‘ আমার মাথায় দপ করে আগুন ধরে গেল, একটু আগে দুজনে ভালোবাসার গল্প শুনলাম, চিনিওনা ভালো করে তবু সহ্য করতে পারছিলাম না ... এই মেয়েটা কেমন করে পেরেছে ... একটু স্থিত হয়ে আবার ফাইলে চোখ বুলালাম, ‘ ইশিতা সব মেনেও সংসার করতে চেয়েছিল, সাথে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু জাহিদ পারেনি, ইশিতা কে ডিভোর্স দিয়ে চার মাসের মাথায় ঐশীকে বিয়ে করে। ধীরে ধীরে অসুস্থ হতে থাকে ইশিতা, একসময় এখানে ভর্তি করা হয়। ব্যাবহার অস্বাভাবিক। কারো সাথে কথা বলেনা। ঘর থেকে বের হতে চায় না। নীল শাড়ি ছাড়া অন্য কোন কাপড় গায়ে রাখতে চায় না। কোন এগ্রেসিভ বিহেভিয়ার নেই। ঘরে একটা ইমাজিনারি পারসন কল্পনা করে কথা বলে, হাঁটাহাঁটি করে। অস্বাভাবিকতা – কোন ক্যলেন্ডার নেই ঘরে অথচ গত দুই বছরই ঠিক ১৪ ই মার্চ এই জানালার সামনে এসে যাকেই দেখে কাছে ডাকে আর বলে, আজকে ১৪ই মার্চ না? চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস। একটা কেক দিবেন কেউ প্লিইজ? ফাইল টা বন্ধ করলাম, আরও অনেক পেজে অনেক কথা, ধারণা করা হয়েছে স্কিটজোফ্রেনিয়া ... এইটা এক্সজেনাস ডিপ্রেশন থেকে হয়েছে বোধ হয়। কেন যেন খুব রাগ হচ্ছে, জাহিদ ছেলেটাকে সামনে পেলে নির্ঘাত ভর্তা করে ফেলতাম। আবার ১৪৩০ এ গেলাম আমি। আমাকে দেখে ইশিতা ছুটে এলো, কোমর ছোঁয়া দীর্ঘ চুলে অযত্নের ছাপ। - আমার কেক কোথায়? - কেক দিয়ে কি করবে ইশিতা? - ওমা, কি বললাম আপনাকে ডক্টর? আজকে না আমার বিয়ের দিন? আমি কেক কাটব না? - আমাকে বলতো কি করে জানলে আজকে ১৪ মার্চ। - ও বলেছে ... হাত দিয়ে কোন এক অদৃশ্য মানুষের দিকে ইশারা করল ইশিতা, আমি ঠাণ্ডা গলায় বললাম, - মৃত সম্পর্ক নিয়ে উৎসব হয় ইশিতা? ইশিতা তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল, অসুস্থ মানুষের দৃষ্টি, অথচ সুস্থ মানুষের চাইতেও সুন্দর করে কথাটা বলল, - সম্পর্কের মৃত্যু হয়। মানুষের মৃত্যু হয়। ভালোবাসার হয় না। আজকে আমার ভালোবাসার জন্মদিন। আমি আমার ঘরে এসে ফোন অন করে মীরা কে ফোন দিলাম। এক রিং এই ফোন টা ধরল মীরা। ফোঁপাচ্ছে এখনও। - তোমাকে কষ্ট দেয়ার জন্য আমি স্যরি মীরা। - ইটস ওকে ... - রাগ করে আছ? - না, তুমি জানো আমি রাগ করি না তোমার উপর। শুধু কষ্ট পাই। - আই এম স্যরি এগেইন। - বলেছি তো ইট স ওকে। - একটা সমস্যা। আই নিড ইওর হেল্প। - বল কি হেল্প। - আমার একটা কেক লাগবে। সকাল ১০ টার মাঝেই লাগবে ... সংক্ষেপে সব ওকে বললাম। ভোর পাঁচ টায় আমার ঘরে আসল মীরা। হাতে কেক, এবং একটি প্যাকেট। তখন ও সুর্য ওঠেনি। নিজে ড্রাইভ করে এসেছে মীরা। - সকাল ১১টার আগে কোন দোকান খুলে না। আর এখানে ভালো কেকের দোকান আছে বলে আমি জানি ও না। নিজে একটা চকলেট কেক বানিয়ে নিয়ে এসেছি। জানি না কেমন হয়েছে। - তোমার কেক দোকানের কেকের থেকেও ভালো হয়। - চলো যাই। মেয়েটাকে খুব দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে। - থ্যাংকস মীরা। - হয়েছে, চল তো ... কেক টা পেয়ে এত খুশি হল ইশিতা ইকবাল কিংবা ইশিতা রায়হান কিংবা পেশেন্ট ১৪৩০ ... কিন্তু আমাদের দিকে ফিরেও তাকাল না, কেক নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল ... আমি নিজে মোম জ্বালিয়ে দিলাম ... তারপর ঘর থেকে বের হয়ে একটু দূরে এসে দাঁড়ালাম। দূর থেকে দেখলাম, ইশিতা ভালোবাসার জন্মদিন করছে ... একটু একটু করে আকাশ সাদা হয়ে আসছে ... ইশিতা ছুটে জানালার কাছে গেল, দুহাত বাড়িয়ে দিল আকাশের দিকে ... ‘’ভোর হচ্ছে, ভোর ...’’ আমি আর মীরা নিচে খোলা আকাশের দিকে গেলাম। অদ্ভুত সুরেলা গলায় গান করছে কেউ, “ একটা ছেঁড়া দিন, বুকের মাঝে কষ্ট ... একটা ছেঁড়া রাত স্বপ্ন গুলো নষ্ট ... তবু একটা আলোর ভোর, আমার পাশে তুই; একটা রোদের ডাকে আকাশ টা ছুঁই .........’’ মীরার চোখে পানি। আমি শেষ কবে কেঁদেছি জানিনা। আমার ও চোখে পানি আসছে। আমার কি হল জানি না, মীরার হাত ছুঁয়ে ফিসফিস করলাম, “কোনদিন যাব না। কখনো না। “ ***


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২২৯ জন


এ জাতীয় গল্প

→ একটা আলোর ভোর

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now