বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

একজন অভ্র এবং জনৈক পিতা (পর্ব-৩)

"উপন্যাস" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X একজন অভ্র এবং জনৈক পিতা (পর্ব-৩) আবুল ফাতাহ . জহির সাহেব বলতে লাগলেন,‘একটা ব্যাপার তুমি ঠিক ধরতে পেরেছ।আমার বাবা জানতে পেরেছিলেন সবই।আমি কোনো “লোক”কে লজ্জা না করলেও একটা লোকের ব্যাপারে সতর্ক থাকার দরকার ছিল।আমাদের ম্যানেজার।চুড়ান্ত বদলোক।আমার সব অপকর্মে অতি উৎসাহ নিয়ে সাহায্য করত। সেদিন রাতের ঘটনার পর আমি পরদিন অফিসে গিয়ে ম্যানেজারের কাছ থেকেই ইয়াসমিনের ঠিকানা নিয়েছিলাম।ব্যাপারটায় স্বাভাবিকভাবেই খটকা লাগে ম্যানেজারের মনে।তক্কে তক্কে থাকে। আমি ইয়াসমিনের সাথে দেখা করে ফেরার পরই আমার ড্রাইভারের কাছ থেকে জেনে নেয় সব ঘটনা।ইয়াসমিনের বাড়ি গিয়ে আমার দেখা করার ঘটনা সেদিন রাতেই গিয়ে আমার বাবাকে বলে দেয় হারামজাদাটা। বাবা সব শোনার পর যথেষ্ঠই অবাক হন।সেটাই স্বাভাবিক।আমার বাবা আমাকে যতটুকুই চিনতেন তাতেই বুঝতে পেরেছিলেন এধরনের আচরণ আমার সাথে যায় না।বুঝতে পেরেছিলেন,ইয়াসমিনকে আমি অন্য মেয়েদের চাইতে একটু ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছি।ঠিক তখনই আমার বাবার ক্ষুরধার মগজে খেলে যায় অন্যরকম এক পরিকল্পনা।পরেরদিন তিনি ইয়াসমিনের সাথে দেখা করে ওকে আমার সাথে প্রেমের অভিনয় করতে বললেন।’ থামলেন জহির সাহেব। আমি হতভম্বের মত তাকিয়ে রইলাম তাঁর দিকে।ঠিক শুনলাম তো? জহির সাহেবের বাবার মত ধনী একজন মানুষ এক বস্তির মেয়েকে নিজের ছেলের সাথে প্রেমের অভিনয় করতে বললেন?হজম করার মত কোনো কথা? ‘একাজ কেন করলেন আপনার বাবা?’ ‘এই প্রশ্নের সম্পুর্ন এবং সঠিক উত্তর আমার জানা নেই।তবে আমি একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছি।দেখো অভ্র,আমি তোমাকে আগেই বলেছি,ছোটবেলা থেকেই আমি মায়ের স্নেহবঞ্চিত।বাবাও,যাকে ভালবাসা বলে,সেটা দেননি কখনো।হ্যাঁ,আমাকে তিনি প্রাচুর্য দিয়েছিলেন।আর এই স্নেহ ভালবাসার অভাবেই বিগড়ে গিয়েছিলাম আমি।মেয়েদের ভোগের বস্তু ছাড়া অন্য কিছু ভাবতাম না।ভালবাসা বঞ্চিত আমি পরিণত হলাম ভালবাসা বর্জিত একজন মানুষে।বাবাও এসব জানতেন কিন্তু কখনো শুধরাতে যাননি,অন্তত আমি সেটাই ভাবতাম।কিন্তু আমি যেটা জানতাম না সেটা হল আমার দুরদর্শী বাবা বুঝতে পেরেছিলেন এত জল গড়িয়ে যাবার পর শাসন করে আমাকে পথে আনা সম্ভব নয়। আমাকে পথে আনতে প্রয়োজন ভালবাসার।যেটা বাবা আমাকে দিতে পারেননি কখনো। সেজন্যই তিনি আমার বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।ভেবেছিলেন স্ত্রীর ভালবাসা আমাকে শুধরে ফেলবে।কিন্তু বিয়ের প্রতি আমার অনীহা দেখে তিনি খুব দ্রুতই বুঝে ফেলেছিলেন,ছোটবেলা থেকে কোনো নারীর ভালবাসা না পাওয়ায় আমার মনেও মেয়েদের প্রতি কোনো ভালবাসা,শ্রদ্ধা জন্মেনি।যেটা জন্মেছে সেটাকে হয়ত করুণা বলা যেতে পারে।এমন পরিস্থিতিতে জোর করে বিয়ে দিলে আমার এবং আমার স্ত্রী,দুজনের জীবনই ধ্বংস করা হবে। সেজন্য চাপাচাপিও করতে পারেননি।এমন সময় ইয়াসমিনের প্রতি আমার মনোভাব জানতে পারলেন বাবা।বুঝতে পারলেন,ইয়াসমিনকে আমার সত্যি সত্যি ভাল লেগেছে।তখনই তিনি এই পরিকল্পনা করেন।ইয়াসমিনকে ভালবাসার অভিনয় করতে বলেন।তাতে করে আমার মধ্যে একটা উপলব্ধি অন্তত আসবে যে,নারীকে ভোগ নয়,ভালবাসতে হয়।ঘটলও তাই,আমি ইয়াসমিনকে ভালবেসে ফেললাম।সত্যিকারের ভালবাসা।’ ‘হুম,পরিকল্পনা খারাপ না।কিন্তু এরপর?আপনার বাবার দৃষ্টিতে একজন “বস্তির মেয়ে” নিশ্চয়ই তাঁর পূত্রবধু হবার যোগ্য নয়।’ জানতে চাইলাম আমি। ‘ওই যে বললাম,বাবার মূল উদ্দেশ্য ছিল মেয়েদের প্রতি আমার মনে শ্রদ্ধা এবং ভালবাসা জাগানো।তাঁর পরিকল্পনা ছিল এমন,আমি ইয়াসমিনকে যখন সত্যিকারের ভালবেসে ফেলব ঠিক তখন তিনি ইয়াসমিনকে আমার জীবন থেকে সরিয়ে দেবেন।এরপর যখন আমি মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ব ঠিক তখন বাবা নিজের পছন্দ করা কোনো নারীকে নিয়ে আসবেন আমার জীবনে।যে কিনা ভুলিয়ে দেবে ইয়াসমিনকে।’ আমি এই পর্যায়ে এসে আবার বা হাত ঢুকালাম।‘স্যার,আপনার ব্যাখ্যায় একটা ফাঁক দেখতে পাচ্ছি আমি। ঘটনা তো উল্টেও যেতে পারত।যেমন, আপনি ইয়াসমিনকে ভুলতে না পেরে কোনো অঘটনও তো ঘটিয়ে ফেলতে পারতেন।কিংবা আজীবন বিয়ে না করার সিদ্ধান্তও নিতে পারতেন।সেক্ষেত্রে আপনার বাবার প্ল্যান সম্পুর্ন মিসফায়ার করত।’ ‘হুম,সেটা হতে পারত,যদি ইয়াসমিন মারা যেত,কিংবা অন্য কোনোভাবে হারিয়ে যেত।কিন্তু বাবা চেয়েছিলেন ইয়াসমিনের প্রতি আমার মন বিষিয়ে দিতে।যাতে আমি ওকে ঘৃণা করতে শুরু করি।হয়ত ইয়াসমিনের গায়ে লেপ্টে দেয়া হত কুৎসিত কোনো কালিমা। যেমনটা এখন ঘটেছে।শাহনাজকে মূলত আমি বিয়ে করেছি ইয়াসমিনের প্রতি ক্ষোভ আর ঘৃণা থেকেই।ওকে নীচ মনের চোর ভাবতে শুরু করেছিলাম,যে কিনা বিশ হাজার টাকার লোভ সামলাতে পারেনি।’ ‘কিন্তু স্যার,ওই টাকাটা ইয়াসমিন ম্যাডামকে দেবার পরিকল্পনা আপনার ছিল।আপনিই টাকা দিয়েছিলেন তাকে,আপনার বাবা নয়।তারমানে কি আমি ধরে নেব তিনি সত্যিই টাকাটার লোভ সামলাতে পারেননি?’ ‘না!’প্রায় আর্তনাদের মত করে বললেন জহির সাহেব।মুখ লাল হয়ে গেল।যেন ঠিক হৃৎপিন্ডে খোঁচা খেয়েছেন।অবশ্য খুব দ্রুতই আবার নিজেকে ফিরে পেলেন।‘আই অ্যাম সরি।না না,ইয়াসমিন ওইরকম নয়।ও চুরি করেনি।এখানে অদৃষ্টের সামান্য উপহাসও ভূমিকা রেখেছে। বাবা চেয়েছিলেন আমাদের সম্পর্কটা আরো দীর্ঘস্থায়ী করতে।ইয়াসমিনের ভালবাসায় আমার একেবারে ডুবে যাবার অপেক্ষায় ছিলেন তিনি।কিন্তু বুঝতেও পারেননি,ডুবে আমি অনেক আগেই গিয়েছিলাম।এমন সময় আচমকা বিয়ে করে ফেলায় তাঁর সমস্ত পরিকল্পনা গুবলেট হয়ে যায়।বিয়ের ব্যাপারটা বিয়ের রাতেই তিনি বদ ম্যানেজারের কাছ থেকেই জেনেছিলেন।তখন তিনিও খানিক দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে পড়ে যান।ইয়াসমিনকে আমি বিয়ে করে ফেলব তা তিনি ভাবতেও পারেননি। বিয়ের পরদিন গভীর রাতে তিনি নিজে দলবল নিয়ে গিয়ে ইয়াসমিনকে পরিবার সমেত সরিয়ে দেন।না,জানে মারেননি।কিছু টাকা পয়সা দিয়ে আমার জীবন থেকে হারিয়ে যেতে বলেন তিনি ইয়াসমিনকে।হুমকি ধামকিও দেন।যেহেতু বাবার কথা মতই ইয়াসমিন আমার জীবনে এসেছিল সেহেতু বাবার হুমকি উপেক্ষা করবার মত সাহস ওর ছিল না। ইয়াসমিন হারিয়ে যায়। বাবার মনে যে গোপন পরিকল্পনা ছিল,ইয়াসমিনের গায়ে কলংকের কালি লেপে দেবার,সেটাকে মাঠে মারা পড়তে দেখে খানিক চিন্তিত হয়ে পড়েন।এমন সময় ইয়াসমিন সরল বিশ্বাসে বাবাকে আমার দেয়া টাকাটা দিয়ে বলে যে,টাকাটা যেন আমাকে ফেরত দিয়ে দেয়া হয়।নয়ত সারাজীবন ওর প্রতি ভুল একটা ধারণা নিয়ে বাঁচব আমি। বলাই বাহুল্য,বাবা আমাকে টাকাটা ফেরত দেননি।’একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন জহির সাহেব। ‘স্যার,’আমি বলে উঠলাম,‘ইয়াসমিন ম্যাডাম কেন রাজী হলেন আপনার বাবার এমন একটা প্রস্তাবে?আপনিই বা এতসব জানলেন কিভাবে?ইয়াসমিন ম্যাডাম এখন কোথায় আছেন? আর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন,তিনি যদি আপনার সাথে ভালবাসার অভিনয়ই করে থাকেন তাহলে কেন আপনাকে বিয়ে করলেন?এটা তো আপনার বাবার পরিকল্পনার মধ্যে ছিল না।আর যতদুর মনে হল,আপনিও তাকে খুব বেশি চাপ দেননি বিয়ের ব্যাপারে।’ জহির সাহেব মুচকি হাসলেন।‘অনেকগুলো প্রশ্ন করেছ।তোমার সব প্রশ্নের জবাব পাবে এটাতে,’বলে একটা ভাঁজ করা কাগজ বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। আমি অবাক হয়ে সেটা হাতে নিলাম।‘কী এটা,স্যার?’ ‘ইয়াসমিনের চিঠি।দিন দশেক আগে এসেছে।’ আমি কাগজটা হাতে নিলাম।কিছুটা দোমড়ানো।ধারণা করছি শতেকবার পড়া হয়ে গেছে।দুটো পাতা একসাথে করা।ভাঁজ খুললাম আমি।গুটি গুটি অক্ষরে লেখা।কেমন কেঁপে কেঁপে গিয়েছে হাতের লেখাটা।কোনো সম্ভোধন ছাড়াই আচমকা শুরুঃ আসসালামু আলাইকুম কেমন আছো?তুমি করেই বলছি।আমাদের সময়ে স্বামীকে আপনি করে বলার নিয়ম ছিল।দুনিয়া অনেক বদলেছে।এখন আর আপনি করে বলা যায় না,এজন্য তুমি করেই বলি।এতগুলো বছর আমার প্রতি যতটা ঘৃণা নিয়ে বেঁচে আছো সেটা হয়ত আরো খানিকটা বেড়ে যাবে এই চিঠিটা পড়ার পর।এরপরও আমি নিরুপায়,আমাকে বলতেই হবে। তুমি হয়ত অনেক ভেবেছো,আমি এভাবে হারিয়ে গেলাম কেন?কোথায়?কিভাবে? সবগুলো প্রশ্নের উত্তরই আজ পেয়ে যাবে।এরপর আমাকে যা ভাবার ভাবতে পারো,তবে তোমাকে যে অনুরোধটা করতে যাচ্ছি সেটা অন্তত রেখো। শুরু থেকেই শুরু করি।আমার জীবনের সবচাইতে ভয়াবহ সেই রাতের পরদিন তুমি যখন আমার বাড়িতে এলে তখন আমি কতটা অবাক হয়েছিলাম সেটা বলে বোঝাতে পারব না।এরপর যখন ফিরে যেতে বললে বিস্ময়টা বেড়ে গেল কয়েক মাত্রা।তোমার অনুরোধের কারণে আমি যতটা না ফিরে যেতে রাজি হয়েছিলাম তার চাইতে বেশি হয়েছিলাম তোমার ভয়ে।তখন পর্যন্ত আমার বিশ্বাস ছিল তুমি একটা পাঁড় লম্পট।এখন হয়ত করুণা করে ফিরে যেতে বলছ।তবে আমি রাজি না হলে করুণা ক্রোধে বদলে যেতেও সময় লাগবে না।আমি ভয়েই রাজি হয়ে যাই। কিন্তু এরপর দিনই আমার জীবনে বিভীষিকার মত তোমার বাবার আবির্ভাব ঘটে।আমাকে ডেকে পাঠান তিনি একটা জায়গায়।পরে জেনেছিলাম তোমার ম্যানেজার আমার ব্যাপারে তাকে জানিয়ে দিয়েছে। এরপর আমাকে তোমার ব্যাপারে সব খুলে বলে তোমার বাবা আমাকে অনুরোধ করেন তোমার সাথে প্রেমের অভিনয় করতে। শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম।সাফ মানা করে দিতেই তিনি বললেন,তোমাকে পথে ফিরিয়ে আনতে নাকি এর বিকল্প নেই। আমি তাঁকে বললাম,আমি না হয় আপনার ছেলের মনে ভালবাসা জাগিয়ে তুলব কিন্তু যদি সত্যি সত্যিই সে আমাকে ভালবেসে ফেলে তখন কী হবে? তোমার বাবা বললেন তুমি স্বাভাবিক হয়ে গেলেই তিনি আমাকে পরিবার সহ অন্য কোথাও পাঠিয়ে দেবেন।আমার পরিবারের বাকি জীবনের ভরণপোষনও তিনিই বহন করবেন।এরপর তোমাকে সামলানোর দায়িত্ব তাঁর। ভেবে দেখলাম,প্রস্তাবটাতে আমার কোনো ক্ষতিই হচ্ছে না।উপরন্তু আমার আকুল পাথারে পড়ে যাওয়া পরিবারের একটা গতি হবে,সেই সাথে আমার নিজেরও।তারপরও দোনোমনা করছিলাম,এমন সময় তোমার বাবা আমার হাত ধরে অনুরোধ করলেন।বৃদ্ধ মানুষটার অনুরোধ আমি ফেলতে পারিনি।তখন আমি খুবই অপরিনামদর্শী এক তরুণী।নয়ত আরেকটু ভেবে দেখার প্রয়াস পেতাম।এরপর শুরু হল তোমার সাথে আমার প্রেম কিংবা অপ্রেমের গল্প। তোমার সাথে অভিনয় করতে করতেই একপর্যায়ে আমি আবিষ্কার করে বসলাম আমি তোমার সাথে যা করছি তাকে আর যাই হোক অভিনয় বলা যায় না।আমি তোমাকে ভালবেসে ফেলেছি,অজান্তেই।আমি উপলব্ধি করতে পারলাম আমার প্রতি তোমার ভালবাসার গভীরতা।তখনই আমার মনে হল আমি তোমার সাথে এতদিন ধোঁকা দিয়েছি।এই ভয়ংকর খেলা বন্ধ করতে হবে।আমি যখন মনস্থির করলাম তোমাকে সব খুলে বলব ঠিক তখনই তুমি আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে বসো।আমার মধ্যে একটা অজানা ভয় জেঁকে বসে।সব কথা তোমাকে খুলে বললে তুমি আমাকে দূরে সরিয়ে দিতে পারো।ঘৃণাও হয়ত করবে।ভাবলাম,বিয়ের পর যদি আস্তে আস্তে সব খুলে বলি তাহলে হয়ত বুঝতে পারবে সব।সাময়িক রাগ করলেও আমাকে অন্তত তাড়িয়ে দিতে পারবে না।তখন একবারও ভেবে দেখিনি এই বিয়ে তোমার বাবা মেনে নেবেন কিনা। বিয়ের পরদিন যখন আমরা দুজন রঙ্গিন স্বপ্ন বুনে চলেছি তখনও জানতাম না দুঃস্বপ্ন কি প্রবল গতিতে ধেয়ে আসছে আমার জীবনে।সেদিন রাতে যখন আমি বাড়ি ফিরলাম তার কিছুক্ষন পরই তোমার বাবা দলবল নিয়ে হাজির হলেন।আমি কেন বিয়েতে রাজি হয়েছি সে জন্য অনেক শাসালেন।তারপর হুমকি দিয়ে বললেন আমি যদি পরিবার নিয়ে এই শহর ছেড়ে চলে না যাই তাহলে তিনি আমাদের অনেক বড় ক্ষতি করবেন। মামা-মামী আমার উপর যতই অত্যাচার করুন,আমার উপর তাদের অনুগ্রহ ভুলবার নয়।তাদের বিপদে ফেলতে চাইনি।তোমার বাবা সামান্য কিছু টাকা দিয়েছিলেন সেটা নিয়ে সে রাতেই পাড়ি জমালাম অজানার উদ্দেশ্যে। যাবার আগে তোমার দেয়া সেই টাকাটা তোমার বাবার হাতে তুলে দিয়ে অনুরোধ করি টাকাটা যেন তোমাকে ফিরিয়ে দেয়া হয়। নয়ত সারাজীবন একটা মানুষ,আমার সবচাইতে ভালবাসার মানুষটার কাছে অপরাধী হয়ে থাকতে হবে। জানি না,টাকাটা তিনি তোমাকে দিয়েছিলেন কিনা।যাইহোক,আমি মামা-মামীকে নিয়ে চলে যাই এই শহর ছেড়ে।এর কিছুদিন পর মামা অসুখে ভুগে মারা গেলেন।তোমার বাবার দেয়া সব টাকা বেরিয়ে গেল তার চিকিৎসায়।এর ক'দিন পর মামীও মারা গেলেন।আমি কিভাবে এতগুলো বছর টিকে ছিলাম সেটা এখন বলে আর তোমার সময় নষ্ট করতে চাই না।একবার চেয়েছিলাম তোমার সাথে যোগাযোগ করি।কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানলাম তুমি বিয়ে করে সংসারী হয়েছ।এরপরও তোমার সংসারে আগুন জ্বালাই কিভাবে?আজও এই চিঠিটা লেখার প্রয়োজন পড়ত না।কিন্তু লিখতে হচ্ছে। জানো না বোধহয়,আমাদের একটা মেয়ে হয়েছে।খুবই রূপবতী হয়েছে মেয়েটা।আমরা গত কয়েক বছর ধরে ঢাকাতে যেখানে বাস করছি সেখানে এতটা রূপবতী হওয়া মহা অপরাধ। এই ক'টা বছর আমি আগলে রেখেছিলাম আমাদের মেয়েকে,কিন্তু আর সম্ভব নয়।আমি আর খুব অল্প ক'দিনই আছি পৃথিবীতে।ভয়ানক অসুখ করেছে আমার।অসুখটা একটু একটু করে আমাকে শেষ সময়ের দিকে পৌঁছে দিচ্ছে।এই চিঠিটা যখন তোমার কাছে পৌঁছবে তখন ধরে নিয়ো আমি বিদায় নিয়েছি।তোমার সামনে যাবার মত মুখ আমার নেই। আমাদের মেয়ে সারাজীবন জেনে এসেছে ওর বাবা ছোটবেলাতেই মারা গেছে।ভেবেছিলাম ওকে একটা ভাল ছেলের হাতে তুলে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হব।অদৃষ্ট আমাকে সে সুযোগ দিল কই?এই শেষ মুহুর্তে আমি চাই না সব জেনে ও মা বাবাকে ঘৃণা করতে শুরু করুক।এজন্য তোমার ব্যাপারে ওকে কিছু বললাম না। আমার মৃত্যুর পর মেয়েটা কিভাবে এই জায়গাতে থাকবে ভাবতেও ভয় হচ্ছে।আমার অপারগতা,মেয়েকে আমি খুব বেশি পড়াশোনা করাতে পারিনি।ভাল কোনো চাকরি করবার মত সুযোগও দুর্ভাগা মেয়েটার সামনে নেই। তুমি যত দ্রুত সম্ভব ওকে এখান থেকে নিয়ে যাও।যদি তোমার বাড়িতে এখনো “বস্তির মেয়ের” প্রবেশাধিকার না থাকে তবে ওকে একজন রিকশাওয়ালার সাথে বিয়ে দিয়ে হলেও একটা আশ্রয়ের ব্যবস্থা কোরো। আর যদি সুযোগ পাও তাহলে সব ঘটনা খুলে বলে আমাকে দায় মুক্ত কোরো। আমি আর পারছি না।খুব কষ্ট হচ্ছে লিখতে।আমাকে তুমি ক্ষমা করে দিয়ো।তবে একটা কথা জেনো,আমি তোমাকে সত্যিই ভালবেসে ছিলাম। পুনশ্চঃঅবাঞ্চিত কারো হাতে পড়লে হয়ত চিঠিটা তোমার ব্যাক্তি জীবনে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।এজন্য কারো নাম ঠিকানা উল্লেখ করলাম না। আচমকাই শেষ হয়ে গেল চিঠিটা।আমি কয়েকমুহুর্ত চুপচাপ বসে রইলাম।চিঠিটা গভীর মনোযোগে দেখে যাচ্ছি।হাতের লেখা কাঁপাকাঁপা।বোঝা যায় এই পত্রের লেখিকা খুবই অসুস্থ অবস্থায় জীবনের এই শেষ চিঠিটা লিখেছেন।গোটা চিঠিটা জুড়েই যেন বিষাদ ছাপ ফেলছে।এই চিঠিটাই একজন মানুষের জীবনের শেষ চিঠি,ভাবতেই কেমন একটা শূন্যতা ঘিরে ফেলতে চায়। আমি মুখ তুলে তাকালাম জহির সাহেবের দিকে।তিনি দেয়ালে ঝোলানো একটা পেইন্টিং এর দিকে তাকিয়ে আছেন।একাকী এক মেয়ের প্রতিচিত্র।এই প্রতিচিত্রে কাকে খুঁজে ফিরছেন তিনি?প্রেয়সী নাকি মেয়েকে? ‘স্যার,আমাকে ঠিক কী করতে হবে?’ জহির সাহেব দৃষ্টি ফিরিয়ে আনলেন,‘এই চিঠিটা কিছুদিন আগে এসেছে।এরপর আমি নিজে অনেক খোঁজাখুঁজি করেছি কিন্তু আমার মেয়েকে খুঁজে পাইনি কোথাও।সেটা সম্ভবও না ঠিকানা ছাড়া।’ ‘ইয়াসমিন ম্যাডাম কেন ঠিকানা লেখেননি সেটার ব্যাখ্যা চিঠিতেই দিয়েছেন কিন্তু তিনি কিভাবে ভাবলেন নাম ঠিকানা ছাড়া একটা মেয়েকে এই গুমোট শহরে খুঁজে পাওয়া যাবে?’ ‘সেটা আমিও জানি না,অভ্র।গত এক সপ্তাহে পাগলের মত খুঁজে বেড়িয়েছি আমার মেয়েকে,পাইনি।এরপর কিছুদিন আগে আশফাকের কাছে শুনলাম তুমি নাকি ওর মেয়ের এক বান্ধবীকে খুঁজে বের করেছিলে,সেজন্য ভাবলাম তুমি হয়ত আমাকে সাহায্য করতে পারবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমি বোকামি করছি।প্রায় অসম্ভব একটা কাজ তোমাকে গছিয়ে দিতে চাচ্ছি। আমার জায়গাটা থেকে একবার ভাবো তো,অভ্র।একজন সন্তানহীন মানুষ যদি বিশ বছর পর জানতে পারে তার একটা মেয়ে অসহায়ের মত তার খুব আশে পাশেই আছে অথচ তাকে খুঁজে পাবার মত রাস্তা তাঁর জানা নেই।সে নিশ্চয়ই আমার মত খড়কুটো আকড়ে ধরতে চাইবে,তাইনা?তারউপর যদি সে এমন একজন মানুষ হয় যে কিনা বিশ বছর পর তাঁর স্ত্রীর প্রতি করা অন্যায়ের কিছুটা প্রায়শ্চিত্ব করতে চাইছে।’ আমি সম্পুর্ন ভেঙ্গে পড়তে দেখলাম জহির সাহেবকে।এতটুকু জানি,আঘাতের মাত্রা কতটা তীব্র হলে জহির সাহেবের মত মানুষ ভেঙে পড়তে পারে।এই বুড়ো মানুষটার প্রতি হঠাৎ করেই আমি একধরনের মায়া অনুভব করলাম।পৃথিবীতে সবকিছু উপেক্ষা করা যায়,মায়া নয়।আমি গলা খাকারি দিয়ে বললাম,‘স্যার,আমাকে কি একটু বিস্তারিত বলতে পারবেন চিঠিটার ব্যাপারে?’ আমার কন্ঠস্বরের দৃঢ়তা লক্ষ্য করে জহির সাহেব ঝপ করে মুখ তুললেন।অবাক হয়েছেন তিনি।তবে আমি হইনি।এইমাত্র আমি একটা অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।জহির সাহেবের মেয়েকে আমি খুঁজে বের করব।কিভাবে তা এখনো জানি না।তবে আল্লাহ সহায় থাকলে একজন অসহায় মেয়েকে তার বাবার কাছে পৌঁছে দেবার জন্য যা করতে হয়-আমি করব,যেখানে যেতে হয়-আমি যাব। ‘ঠিক কি জানতে চাইছো তুমি?’ ‘মানে,চিঠিটা কিভাবে এল,কার মাধ্যমে এল?’ ‘ও আচ্ছা,চিঠিটা হাতে হাতেই এসেছে আমার অফিসের ঠিকানায়।সেটাই স্বাভাবিক।আমার বাসা ইয়াসমিন চিনত না।লোক মারফত আমার অফিসের ঠিকানাতেই পাঠিয়েছে।’ ‘রিসিভ করেছিল কে?’ ‘আমার অফিসের পিয়ন বদরুল।’ ‘স্যার,আমি আপনার অফিসে একটু যেতে চাই।’ ‘নিশ্চয়ই।কিন্তু কেন?’ ‘বদরুলের সাথে একটু কথা বলতাম।’ ‘বদরুলের সাথে কথা বলবে মানে...তুমি আমার মেয়েকে খুঁজে বের করবে?’ অনেকখানি বিস্ময় ঝরে পড়ল জহির সাহেবের কন্ঠ বেয়ে। আমি কথা না বলে মাথা ঝাকালাম।সাথে সাথেই দেখতে পেলাম,জহির সাহেবের মুখে প্রত্যাশার এক আলো জ্বলে উঠল। ‘তোমাকে আমি আসলে ধন্যবাদ দিতে চাই না।কিছু কিছু মানুষের কাছে ঋণী থাকতে ইচ্ছে হয়।ঠুনকো ধন্যবাদ দিয়ে সেই ঋনকে হালকা করতে নেই।’ আমি হাসলাম। ‘আমি অনেকদিন ধরেই অফিসে তেমন একটা যাই না।ম্যানেজারই দেখাশোনা করে।নয়ত আমিই তোমাকে নিয়ে যেতে পারতাম।আমি ম্যানেজারকে বলে দেব তোমার যা প্রয়োজন ও দেখবে।’ ‘আমি তো প্রয়োজনে যাচ্ছি না।শুধু বদরুলের সাথে খানিক কথা বলব।যদি কোনো ফাঁক ফোঁকর পাওয়া যায় আরকি।বাই দ্যা ওয়ে,এখনও সেই বদ ম্যানেজারই আছে নাকি?’ ‘নাহ,ও অনেক যাবত এক্সিডেন্ট করে পঙ্গু হয়ে ঘরে পড়ে আছে,’ বলেই অদ্ভুত ভাবে হেসে উঠলেন জহির সাহেব। . (পরের পর্ব আজ রাত দশটায় প্রকাশিত হবে) . এই মেলায় অভ্র সিরিজের নতুন বই 'অভ্রত্ব' প্রকাশিত হয়েছে রোদেলা প্রকাশনী থেকে। প্রথম মূদ্রণ ইতোমধ্যেই শেষ, দ্বিতীয় মূদ্রণ আজ থেকে মেলায় পাওয়া যাচ্ছে। স্টল নাম্বার : ২১৩-১৫। অনলাইনে কিনতে আমাদের পেজে নক করুন।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১১৩০ জন


এ জাতীয় গল্প

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now