বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
একজন ব্যর্থ মানুষ
---------------------
বাসজার্নির প্রতি একসময় যে একটা অদ্ভুত ভালোবাসা ছিল তার কোনকিছুই আর অবশিষ্ট নেই এখন আফসার সাহেবের। প্রতি মাসের এই একলা রুটিনমাফিক বাস ভ্রমণটা তাই নিতান্তই বিরক্তিকর লাগে। জানালার বাইরের চলন্ত দৃশ্যাবলী একঘেয়ে মনে হয়। অথচ একটা সময় ছিল যখন বাসে করে একটা লম্বা ভ্রমণের কথা প্রায়ই ভাবতেন আফসার সাহেব। ভাবতেন সাথে থাকবে প্রিয় কেউ, হয়তো থাকবে নিলু।
পুরনো হিন্দি গান বাজছে বাসের ভেতর- "কাভি কাভি মেরে দিল মে খায়াল আ তা হ্যায়..."- "মাঝে মাঝে আমার মনে হয়..."। দীর্ঘ একঘেয়ে ভ্রমণ স্মৃতির ডালাকে যেন উপচে ধরে। পুরনো কথা মনে পড়ে যায়। নিলুর কথা মনে পড়ে। আফসার সাহেবের কাছে অঙ্ক বুঝতে আসত নিলু। বড় বড় চোখের পাতায় কি অনুভূতি লুকানো ছিল তা কে জানতো! তবুও আফসার সাহেব নিলুকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে ভালবাসতেন। শুধু নিলু না, আফসার সাহেব সবকিছু নিয়েই স্বপ্ন দেখতে ভালবাসতেন। সবচেয়ে ভালবাসতেন দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে, একটা স্বাধীন দেশকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে।
ঘটনাগুলো কেমন যেন খুব তাড়াতাড়ি ঘটে গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তশিষ্ট ছেলে আফসার একসময় নিজেকে আবিষ্কার করেন মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্পে। খুব বেশি ভালোবাসা নাকি মানুষকে সাহসী করে দেয়। তাই বোধহয় পুরনো কিছু থ্রি-নট-থ্রি রাইফেল নিয়ে পাকিস্তানী জন্তুগুলোর সামনে দাঁড়াতে একটুও ভয় করেনি। যে আফসার আজীবন বিলাসী ছিলেন, সেই আফসারকে যুদ্ধ আমূল বদলে দেয়। পোকায় ধরা মোটা চাল খেতে একটুও বাধেনি। কাদায় মাখামাখি হয়ে অ্যামবুশের সময় নরম বিছানার কথা কেন যেন একবারও মনে পড়েনি। রাইফেলের জোরে নয়, বরং ভালোবাসা আর স্বপ্নের জোরেই যেন নয় মাসের মাথায় সেই বহু প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা আসে।
চোখে এক রাশ স্বপ্ন আর এক বুকভর্তি ভালোবাসা নিয়ে যে দেশটার জন্য নয়টা মাস যুদ্ধ করলেন, স্বাধীনতার পর সব কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেল! যুদ্ধের বাজারে এক দল মানুষ কিভাবে কিভাবে যেন বড়লোক হয়ে উঠেছিল। এই সব অর্থলোভী মানুষেরাই দেশের অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করলো। স্বাধীনতার পর রাজনীতিতে যে কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি শুরু হল তা থেকে আফসার সাহেব নিজেকে শান্তভাবে সরিয়ে নিলেন। যে সময়টা ছিল দেশকে নতুন করে গড়ে তোলার, একটা শক্ত ভিত্তি গড়ার তখনই শুরু হল হানাহানি। সরকার তখন মুক্তিযোদ্ধাদের সনদ প্রদান শুরু করে। আফসার সাহেব খুব অবাক হয়ে দেখেন কিছু মানুষ গিরগিটির মত ভোল পালটে এই সনদ নিচ্ছে। এমনকি এলাকার শান্তি কমিটির প্রধানের পকেটেও আসে একটা মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট। আদর্শবাদী আফসার প্রত্যাখান করেন এই সার্টিফিকেট। তিনি ভেবেছিলেন পরের প্রজন্ম এইসব স্বার্থপর ক্ষমতালোভীদের চিনে নেবে। এদের ভিড়ে আফসার সাহেব হারিয়ে যেতে চাননি। খুব সম্ভবত এটাই আফসার সাহেবের জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।
বাড়ি ফিরে আবিষ্কার করেন যুদ্ধের এই দামামায় নিলুকে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়েছে। স্বপ্নভঙ্গের কষ্ট অবশ্য বেশিদিন সহ্য করতে হয়নি। পড়ালেখা শেষ করার পর যে ইঁদুর দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু হয় তাতেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন। খুব অবাক হয়ে আবিষ্কার করেন কিছু রাজাকার শ্রেণীর লোক মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট দেখিয়ে তরতর করে এগিয়ে গেল। পেছনে পরে রইলেন আফসার সাহেব। একটা মাত্র কাগজের অভাবে জীবনের নয়টা মাস যেন একেবারেই মুছে গেল।
সমাজের চাহিদা অনুযায়ী এক সময় বিয়ে করেন বাবা মায়ের পছন্দের পাত্রীকে। রাহেলা যখন প্রথমবার শোনে যে মুক্তিযোদ্ধা হয়েও কোন সার্টিফিকেট তুলেন নি তিনি, তখন খুব অদ্ভুত চোখে তাকিয়েছিল। সেই অদ্ভুত দৃষ্টি কখনো বদলায়নি। যদিও তিনি তখন একটা এন জি ও তে চাকরি করেন তবুও রাহেলার ঐ দৃষ্টি প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিত যে তিনি হয়তো আরো ভাল জায়গায় থাকতে পারতেন। সেই অদ্ভুত দৃষ্টি অপরাধীর দৃষ্টিতে পরিণত হল যখন তাদের ছেলেরা বড় হল। প্রতিটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তখন মুক্তিযোদ্ধা কোটা খোলা হয়েছে। আফসার সাহেবের ছেলেরা এই সুবিধা ভোগ করতে পারেনি। রাহেলার সাথে তখন তার দুই ছেলে যুক্ত হয়। রাহেলা তখন শুধু দৃষ্টিতে না প্রতিটি কথায়ও বুঝিয়ে দিত যে আফসার সাহেবের বোকামীর জন্য তাদের এই অবস্থা। তিনি চাইলেই তারা আরও ভালো অবস্থানে থাকতে পারত। শুধু আদর্শের বুলি কপচালেই যে পেট চলে না রাহেলা তা বুঝিয়ে দিয়েছিল হাড়ে হাড়ে। প্রচন্ড অভিমানে আফসার সাহেব এন জি ও-র কাজ নিয়ে চলে আসেন ঢাকার বাইরে।
তারপর থেকেই দায়িত্বের খাতিরেই প্রতি মাসের এই বাস যাত্রা। মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নাম ছিল না, হাতে কোন সার্টিফিকেটও ছিল না, শুধু মাথার ভেতরের স্মৃতিতে উজ্জ্বল ছিল ঐ নয়টি মাস। সংসারের জাঁতাকলে ঐ স্মৃতিটুকুও মলিন হয়ে যেতে লাগলো। এককালের মুক্তিযোদ্ধা আফসার সাহেবের আশেপাশের সবাই ভুলে গেছে তার অতীত। তিনি নিজেও বোধহয় মাঝে মাঝে ভুলে যান। শুধু এইসব দীর্ঘ ভ্রমণে অতীত উঠে আসে, নিলু উঠে আসে, উঠে আসে একাত্তর। আফসার সাহেব এক দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে থাকেন....
- সিনথিয়া ইসলাম
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now