বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
এইতো জীবন!
লেখাঃ ফারজনা সিদ্দিকী নম্রতা
.
ইফতারের টেবিলে কটমট করে ইভানের দিকে তাকিয়ে আছে ওর বাবা রহমান সাহেব। আর মা রান্নাঘর থেকে ছেলের নামে একটানা বিচার দিয়েই যাচ্ছেন। ব্যবসায়ের কাজে রহমান সাহেব এতদিন ঢাকার বাইরে ছিলেন। আজ বাসায় এসেই ছেলের নামে এত এত নালিশ শুনে মেজাজ যেন সপ্ত আকাশ ছুঁই ছুঁই। সমস্যা ইভানের সারাদিন ঘরের বাইরে থাকা। ইভান ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই অনেক বেড়ে গিয়েছে। ঘরেই থাকতে চায় না। এই রোজায় তো তার এমন কাণ্ডকারখানার মাত্রাই ছাড়িয়ে গিয়েছে। বিশ রোজা ধরে বিকালে বের হয়ে যায়, ইফতারের কিছু আগে বাসায় আসে, আবার শরবতটা খেয়েই নিজের এবং বাড়তি ইফতার নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায়।
“এই ছেলে তোমার সমস্যাটা কি একটু শুনি তো?”
“কই? কিছু না তো”
“তর্ক না করে ঠিকমত উত্তর দাও। প্রতিদিন তুমি করটা কি বাসার বাইরে?”
“বন্ধুদের সাথে খেলি”
“খেল মানে? রোজা রেখে কিসের খেলাধুলা? খেল ভাল কথা। ইফতারের সময় কই যাও?”
“বন্ধুদের সাথে ইফতার করতে”
“কিসের এত বধু ফন্ধু? আগে তো এমন করতা না তুমি?”
“আগে করতাম না, এখন করি। বড় হয়েছি, নিজের মত চলতে পারি”
“এই বেয়াদব ছেলে। বাবার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেটাও ভুলে গিয়েছ? এই তোমার নতুন জুটিয়ে নেয়া বন্ধুর প্রভাব,না? কিসব ছেলেপেলের সাথে মিশ তুমি? আমাদের একটা ক্লাস আছে, সেটা মেইন্টেইন করে চলতে শিখ। খবরদার কালকে থেকে যদি তুমি প্রয়োজন ছাড়া বের হয়েছ। এখন ভার্সিটি অফ, একদম ঘরে বসে থাকবা। তোমার বেয়াদবি আমি ছুটাচ্ছি”
আর কোন কথা না বলেই ইফতার শেষ করে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে ঠাস করে দরজা লাগিয়ে দেয় ইভান। একবার মনে হয়েছে বাবা-মা’র সাথে কথা বলা উচিত। কিন্তু লাভ হবে না ভেবে আর কিছু বলে না। পরের দিন বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলেও বাবার জন্য আর মায়ের ইমোশনাল ভাবে অনুরোধ করা দেখে আর যায়নি।
২
সেদিন বাবা-মা’র কথামত ঘরের বাইরে না গেলেও বাসায় এখন অনেক চুপচাপ থাকে ইভান। প্রয়োজন ছাড়া খুব একটা কথা বলে না। সারাদিন নিজের ঘরের ভিতরেই থাকে। ঈদের আর দুই দিন বাকি। ইভানের মা, ইশরাত রহমান, খেয়াল করেন যে ছেলে এবার কিছুই কিনেনি ঈদ উপলক্ষে। অথচ ছেলে রোজার ঈদে কম করে হলেও তিনটা নতুন পাঞ্জাবি তো কিনেই প্রতিবার। ছেলের হঠাত এমন পরিবর্তনে কিছুটা চিন্তিতই দেখায় ইশরাত রহমানকে।
ইফতারের টেবিলে শপিং করার কথা জিজ্ঞেস করলে ইভান জানায় যে সে এবার কিছুই কিনবে না। ইভানের বাবা বুঝতে পারেন সেদিনের ব্যাপারটা নিয়েই এখনো ছেলের মন খারাপ, অনেকটা রাগও। রহমান সাহেব একজন নামকরা ব্যবসায়ী, আর স্ত্রী একটা নামকরা কলেজের টিচার। তাদের একমাত্র ছেলে ইভান। ঢাকার গুলশানে এক আলিশান ডুপ্লেক্স বাড়িতে থাকে। এলাকায় অন্যতম ধনী পরিবার, সমাজেও বেশ সম্মান ইভানের বাবার। একমাত্র ছেলে হওয়ায় ইভানকে কোন কিছুর অভাব কখনোই দেননি। যখন যা চেয়েছে তাই পেয়েছে। নিজেদের অঢেল সম্পত্তি থাকায়, দেশের পরিস্থির কথা ভেবে শুধু উনারা ছেলের এলাকার বন্ধুদের মাত্রাতিরিক্ত মেলামেশা নিয়ে ভয়ে থাকেন। ওই এলাকার পাশেই আবার ছোট একটা বস্তি আছে। কে জানে ওখানে কেমন মানুষ না থাকে! আজকাল পত্রিকা খুললেই কত কি দেখা যায়। ছেলেটা কেন যে এসব বুঝতে চায় না, এটা ভেবে প্রায়ই ইভানের বাবা-মা চিন্তায় অস্থির হয়ে ওঠেন।
ছেলে রাগ করুক আর যাই করুক, বছরের একটা ঈদে ছেলে নতুন কোন পাঞ্জাবি কিনবে না তা হয় নাকি? তাই রহমান সাহেব নিজেই চলে যান ছেলের জন্য ঈদের নতুম পাঞ্জাবি কিনতে। বেছে বেছে ইভানের জন্য সবথেকে সুন্দর আর দামী পাঞ্জাবিটাই কিনে নেন। নিজের এবং স্ত্রীর জন্যও কিছু কিনেন। জামাকাপড় কেনা শেষ হলে তিনি চলে যান কাঁচা বাজার করতে। দুইদিন পরেই যেহেতু ঈদ, এখনি সব কিনে ফেলা ভাল। সেখানে গিয়েই দেখা হয়ে যায় এলাকার মসজিদের ইমামের সাথে।
“আসসালামু আলাইকুম রহমান সাহেব। কেমন আছেন ভাই?”
“ওয়ালাইকুমুস সালাম ইমাম সাহেব। আল্লাহ রাখছে ভালই। আপনি কেমন আছেন?
“আলহামদুলিল্লাহ। আপনি এখানে? ঈদের বাজার করছেন বুঝি?”
“জ্বি। ঠিকই ধরেছেন”
“তা ভাই আপনার ছেলেটাকে তো অনেকদিন দেখি না। অসুস্থ নাকি?”
“আরেহ আর বলেন না ভাই, এলাকার উলটা পালটা ছেলেপেলের সাথে মিশে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই সেদিন অনেক বকা দিয়েছি। এখন বাসাতেই থাকে। আপনি হঠাত ওর কথা জিজ্ঞেস করছেন যে? কিছু হয়েছে নাকি?”
“উলটা পালটা? কি যে বলেন ভাই! আপনার ছেলে তো অনেক ভাল, ওর বন্ধুরাও। আমাদের এলাকার পাশের বস্তিতে অনেক ছোট ছোট সুবিধা বঞ্চিত ছেলেমেয়ে আছে। ইভান আর তার বন্ধুরা ওদের জন্য যা করছে তা সত্যিই প্রশংসার যোগ্য। এটাই তো রমজানের উদ্দেশ্য। এখনকার ছেলেপেলে নিজেদের নিয়েই এত ব্যস্ত থাকে যে বাবা-মা’র কথাই মনে রাখে না। আর ওরা যা করছে, আমি মুগ্ধ ”
“জ্বী আমি আসলে কিছুই বুঝলাম না আপনার কথা”
“আপনি জানেন না ভাই? এই রমজানের শুরু থেকেই ওই ছেলেমেয়েদের জন্য ওরা প্রত্যেকেই কাজ করে যাচ্ছে। কেও ওদের সাথে ফুল বিক্রি করছে, কেও কার্ড, কেও ইফতার আর মসজিদে চাঁদা নেয়া হচ্ছে। আজকে পর্যন্ত শেষ দিন ছিল। অনেক টাকা হয়েছে। এই টাকা দিয়েই ওদের জন্য নতুন জামাকাপড় কিনলাম। এখন বাকিটা দিয়ে চাল, ডাল, মসলা কিনতে আসলাম। ওই সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের জন্য আমাদের মসজিদেই ঈদের দিন একবেলা খাবারের আয়োজন করা হবে। দুই বেলা করা গেলে ভাল হত। কিন্তু টাকায় হল না। তাই ছেলেগুলা বলল রাতে এই আয়োজন করতে, দিনে ওরাই দেখবে। ইভান তো আসলো না। কিন্তু ভাই একটা কথা বলব, মাশাআল্লাহ আপনার ছেলেটা অনেক ভাল, অনেক বেশি ভাল। আপনারা অনেক ভাগ্যবান। আল্লাহ ওকে সবসময় ভাল রাখুক। এখন আসি ভাই, অনেক কিছু কেনার বাকি। আল্লাহ হাফেজ”
“আল্লাহ হাফেজ”
ইভানের বাবা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছেন। ছেলের এমন প্রশংশা শুনে তার কি যে ভাল লাগছে উনি তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবেন না। এই তাহলে ছেলের প্রতিদিন এত সময় ধরে ঘরের বাইরে থাকার রহস্য। ইশ! অযথাই ছেলেটাকে সেদিন বকা দিলেন। আর ইভানটাও কত বোকা, চুপচাপ বকা শুনল। বললেই হত সেদিন।
৩
ঈদের দিন নামাজ পড়ে এসে মায়ের অনুরোধে একটু সেমাই খেয়েই নিজের ঘরে চলে যায়। মনটা আজকেও তার ভাল না, জোর করে হাসছে যে তা স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে। গান শুনতে শুনতে কিছুটা তন্দ্রার মত এসে গিয়েছিল। হঠাত অনেক মানুষের কথার শব্দে ঘুম ভেঙ্গে যায়। প্রথমে ভাবে কোন মেহমান এসেছে। তাই আবার চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। কিন্তু এবার অনেক ছোট বাচ্চার গলা কানে আসে। বিছানায় উঠে বসে ভাবতে থাকে কে আসতে পারে। ঠিক ওই সময়ই ইভানের ঘরের দরজায় কে যেন অনেক জোড়ে জোড়ে ধাক্কা দিতে থাকে। দরজা খোলার সাথে সাথেই সে হতবাক হয়ে যায়। তার এলাকার বন্ধুগুলা সব এসে কোলাকুলি শুরু করে। তারা যে এভাবে আসবে ইভান জানত না। সকালে মসজীদে দেখা হয়েছিল, তখন তো কেও কিছু বলে নাই। ইভানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সবাই মিলে ওকে ধরে ড্রয়ই রুমে নিয়ে আসে। ড্রয়ই রুমে আসতেই ইভান যেন আকাশ থেকে পড়ে। চোখ কচলে নিজের চোখকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করে। বস্তির সেই সব ছেলেমেয়েগুলা নতুন জামা পড়ে সবাই মাটিতে চাদর পেতে বসে আছে। ইভানকে দেখা মাত্রই সবাই “ঈদ মুবারক ভাইয়া” বলে চিল্লিয়ে উঠে। ইভান কিছুই বুঝতে পারছে না। বন্ধুদের দিকে হা করে তাকিয়ে আছে।
“কিরে ওমনে তাকায়ই থাকবি না কিছু বলবি?”
“তোরা এখানে এদের নিয়ে?”
“ঘরের মধ্যে গাল ফুলায় বসে থাকলে বুঝবি কেমনে?”
“মানে কি?”
“মানে হল কালকে আঙ্কেল ফোন দিয়ে বলেছে আমরা সবাই যেন সব পিচ্ছিদের নিয়ে আজকে সকাল সকাল তোর বাসায় চলে আসি। আঙ্কেল সবার জন্য কালকেই বাজার করেছেন। আমরাও আর কিছু না ভেবে ব্যাটিলিয়ান নিয়ে চলে আসলাম। যদিও আন্টি বলেছেন তিনিই সব রান্না করবেন, তবুও আমরাও খাবার নিয়ে এসেছি। আজকে ভাল ভুরিভোজ হবে। আঙ্কেল-আন্টি না থাকলে কিভাবে যে কি ম্যানেজ করতাম। আয় এখন”
কথাগুলো শুনে কিছুক্ষণ উপচাপ দাঁড়িয়ে কি যেন ভাবে ইভান। “তোরা বস, আমি আসছি এখনি”, বলে বন্ধুদের বসিয়ে রেখে ডাইনিং রুমে বাবা-মা’র কাছে আসে ইভান। মিস্টার এবং মিসেস রহমান দুজন মিলে নিজেদের ছোটবেলার স্মৃতিচারণ করছে আর সবার জন্য খাবার রেডি করছেন। এসেই বাবা-মা কে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয় ইভান।
“আম্মু-আব্বু স্যরি। প্লিজ ফরগিভ মি”
“ধুর বোকা ছেলে। আমরা তো ভেবেছিলাম তুই উলটা পালটা কোন কিছু করছিস। আগে বললে কি হত?”
“বস্তির ছেলেমেয়েদের জন্য কিছু করছি, তোমরা কেমনে নিবা না নিবা বুঝি নি”
“এটা কেমন কথা রে পাগলা?”
“না বাবা আমরা তো অনেক রিচ। আমি ছোট থেকেই দেখছি যারা রিচ তারা গরীবদের খুব অবহেলা করে, নিচু মনে করে। তাদের সাথে মেলামেশাটা খারাপ মনে করে। তাই। আমিও আগে এমনটা ভাবতাম। কিন্তু রোজার আগে একদিন ক্রিকেট খেলার সময় বন্ধুদের এই প্ল্যানের কথা জানতে পারি। বন্ধুদের সাথে কিউরিসিটি থেকে ওদের জন্য সামান্য কিছু করার পর বুঝি জীবনটা কত সুন্দর। আমি সরি। এতদিন আরো বন্ধুদের বাবা-মা’কে দেখে তোমাদেরকেও ভুল বুঝেছিলাম”
“নারে বাবা, ভুলটা আমাদেরও। আমরা সবসময় নিজেদের কাজ নিয়ে এত ব্যস্ত থাকতাম যে তোকে কখনো ওভাবে সময় দেয়নি। আমি সবসময় স্ট্যাটাস মেইন্টেইন করে চলতে বলি, এখনো বলব যাতে কেও আঙ্গুল তুলে কথা না বলতে পারে। আর ভয়ের ব্যাপারটা তো আছেই। এর মানে এই না যে তুই মানুষের সাথে মিশবি না। ভাল কাজে কোন বাঁধা নেই, ছিলও না, থাকবেও না। থাক ওসব কথা বাদ। সাবাস বেটা”
পিঠ চাপরে দিয়ে একসাথে তিনজন ড্রয়িং রুমে এসে দেখে যা দেখেন তাতে আরো বেশি অবাক না হয়ে উপায় নেই। এপার্টমেন্টের আরো অনেকেই এসেছেন। এলাকার ছেলেদের এত সুন্দর আয়োজন দেখে তারা নাকি আর থাকতে পারেননি। তাই চলে এসেছেন। সবাই সাথে করে নিজদের রান্না করা খাবারও নিয়ে এসেছেন। হাসিমুখে ইভানের মা তাদের বরণ করে নেন। এ যেন বিশাল আনন্দ আয়োজনে রূপ নিল।
সবাই মিলে খেতে বসেছে। ছোট শিশুগুলা আর বাকি সবার কোলাহলে ঘরটা যেন কোন সপ্নপুরিতে পরিণত হয়েছে। পুরো ঘর জুড়ে শুধু উৎসবের আনন্দ। একেই বুঝি বলে ঈদের আনন্দ। ইভান অবাক হয়ে সব দেখছে। ইভান কখনোই ভাবেনি জীবনে এমন সুন্দর কিছু মুহুর্তের অংশ হতে পারবে। হঠাত করেই কোন কিছুতে এত খুশি হয়ে গেলে ঈদের দিনেও চোখের কোণে এক-দুই বিন্দু নোনা জল জমে যাওয়াটা দোষের কিছু না! টাকা পয়সা সবই তো আপেক্ষিক। মন থেকে চাইলে ওই বস্তি আর এই উচু দালানের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য থাকলেও, এই জায়গায় বাস করা মানুষগুলার মধ্যে অন্তত থাকে না। এই সুন্দর সময়গুলো ক্যামেরায় বন্দী করে না রাখতে পারলে ষোল আনা যে পূর্ণ হয় না। তাই খাওয়া শেষে সবাইকে নিয়ে সেলফি তোলায় মনোযোগ দেয় ইভান। সবার সাথে পিচ্চিগুলাও নিজেদের নায়ক-নায়িকা ভেবে নানা ঢঙ্গে ছবি তোলায় মন দেয়। আজ সবাই খুশি, সবার চোখে আনন্দ, কোথাও একটুও কোন ভেদাভেদ নেই। এইতো জীবন!
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now