বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
দুঃস্বপ্নের সতেরো দিন (সত্য ঘটনা অবলম্বনে)
লিখেছেনঃ স্বঘোষিত কবি।
=================
: রেশমা ! ঘরে আয় মা । বেলা পড়ে গেলো তো ! : আসছি মা । : আর কতো খেলবি তোর পুতুলের সাথে । এবার ঘরে এসে মুখে কিছু দিয়ে নে । সেই দুপুরে খেয়েছিস্ ! কুসুমের গায়ে শাড়িটার শেষ প্যাঁচ দিয়ে উঠে পড়ে রেশমা । কুসুম ওর পুতুলের নাম । দু-বছরের পুরনো মলিন পুতুলটি ওর প্রতিদিনের খেলার সঙ্গী । নিজের পড়নের মতো তেমন নতুন কিছু না থাকলেও কুসুমকে প্রায় প্রতিদিনই কাপড়ের টুকরো ছিঁড়ে নতুন নতুন শাড়ি বানিয়ে পড়ায় । আরেকটা ছেলে পুতুল থাকলে ভালো হতো । বিয়ে দেয়া যেতো কুসুমের । বেচারীকে রোজ কাল্পনিক বরের সাথেই বিয়ে দিতে হয় । পুকুর-পাড় থেকে হাত-মুখ ধুয় ঘরে এসে দুটো শুকনো মুড়ি মুখে দিয়ে পড়তে বসে । জোরে জোরে শব্দ করে অনেকক্ষণ পড়ে সে । রাতে খেতে বসে মায়ের কাছে বায়না ধরে । : মা ! কাল মেলার থেকে আমারে একটা পুতুল এনে দিবি ? ছেলে পুতুল ? কিছুক্ষণ নিঃস্পলক মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে রেশমার মা । : আচ্ছা দিবোনে । এখন চুপচাপ খাওয়া শেষ কর তো ! বাপহারা মেয়েটির অনেক আবদারই পূরণ করতে পারেন না তিনি । শেষ কবে একটা জামা কিনে দিয়েছেন মনে নেই । কাঁথা সেলাই করে কিছু টাকা এসেছে হাতে । বাজার-সদাই করে পুতুল কেনার মতো কিছু টাকা থাকবে । কাল মেয়েকে নিয়ে মেলায় যাবেন তিনি । অনেকক্ষণ ঘুরাঘুরি করে একটা পুতুল আর কিছু বাতাসা কিনে দিবেন । খাওয়া শেষ করে মায়ের বুকে গুটি-সুটি হয়ে শুয়ে পড়ে রেশমা । মেয়ের চুলে বিলি কেটে ঘুম পারিয়ে দেন তিনি । বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ চারিদিকে । কড়াৎ শব্দে বাজ পড়ছে অবিরত । মনে হচ্ছে মাথার উপরের টিনের চালটা এই বুঝি ভেঙ্গে পড়বে । ঘুম ভেঙ্গে গেলো রেশমার । চারদিকে অন্ধকার । বাতাসে কেমন একটা গুমোট ভাব । বিছানা থেকে উঠে বসতে চেষ্টা করে সে । এ-কি ? সে-তো ফ্লোরে শুয়ে আছে ! ধুলোময়, শীতল পাকা ! হঠাৎ উঠে বসতে চাওয়ায় কান ঝাঁ ঝাঁ করছে । মাথার একপাশে তীব্র ব্যাথা । জোরে শ্বাস নিতে গিয়ে কেশে উঠলো । চারিদিকে শুধু ধুলো আর ধুলো । কোথায় আছে মনে করার চেষ্টা করলো । মনে পড়লো, কাজ করতে গার্মেন্টস এ এসেছিলো সে । বিল্ডিং এ ফাঁটল দেখা দেওয়ায় কাজ করতে চায়নি অনেকেই । তবু জোর করে বাধ্য করা হয়েছে । কি একটা কাজে নিচে এসেছিলো সে । হঠাৎ বিকট শব্দ করে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়লো সব ! তারপর আর কিছু মনে নেই । আচ্ছা, কতটা সময় পেরিয়েছে ? সে-কি আজকে কাজ করতে এসেছিলো নাকি আরো আগে ? এখন কি দিন না রাত ? বুঝা যাচ্ছে না কিছু । চারিদিকে কালি-গোলা অন্ধকার । হঠাৎ বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পেরে দম বন্ধ হয়ে এলো তার । আট-তলা বিল্ডিঙের নিচে চাপা পড়ে আছে সে । আশে-পাশে কেউ আছে কিনা সন্দেহ । এই মৃত্যুপুরী থেকে বেরোতে পারবে কখন বা আদৌ পারবে কিনা ঠিক নেই । তীব্র আতঙ্কে জ্ঞান হারালো রেশমা । : একটু পানি দে না ! মা । কই তুই ? একটু পানি দিয়ে যা না ! তেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে । মেয়ের চিৎকার শুনে দৌড়ে এলো রেশমার মা । মেয়েটা পানির জন্যে কাতরাচ্ছে । ঘরের কোণে রাখা কলসী থেকে পানি এনে খাইয়ে দিলেন । রেশমা শান্ত হয়ে চোখ বুজলো । মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন তিনি । দু-দিন ধরে মেয়েটার জ্বর । টাকার জন্য ঔষধ খাওয়াতে পারছেন না । হাতে অনেক কাজ থাকায় মেয়েটার একটু খেয়াল ও রাখতে পারছেন না । সুস্থ থাকলে ঘরের কাজগুলো সামাল দিতে পারতো । অল্প বয়সেই অনেক বড় হয়ে গেছে তার মেয়ে । শেষ আবদার ছিল ছ-সাত বছর আগে চাওয়া সেই পুতুল-খানাই । পুতুল আর কুসুম এখন ঘরের কোণে বর-বধু রূপে শোভা পায় । নাহ্ । মেয়ের কাছে বসে থাকলে হবে না । হাতে অনেক কাজ ।, ,প্রচন্ড তৃষ্ণা নিয়ে ঘুম ভাঙ্গলো রেশমার । চারিদিক আগের মতোই অন্ধকার । কিছুই ঠাহর করা সম্ভব হচ্ছে না । ধীরে ধীরে চোখ সয়ে আসায় চারদিকের মোটামুটি আন্দাজ পাওয়া গেল । সময় নিয়ে একটু একটু করে অনেক কষ্টে উঠে দাড়ালো । ক্ষুধা তেষ্টায় বুক জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে । অনেক কষ্টে খুঁজে কিছু খাবার পাওয়া গেল । সবকিছুতেই ধুলোর আস্তরণ পড়ে আছে । এখন ওসব দেখার সময় নেই । অল্প অল্প করে খেয়ে নিলো । এখানে কতদিন আটকা থাকতে হবে ঠিক নেই । এই পরিস্থিতিতেও কীভাবে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে পারছি ভেবে অবাক হলো নিজেই । পেটে কিছু পড়তেই দেহে যেন একটু প্রাণ ফিরে এলো । ধীরে ধীরে চারপাশ ঘুরে দেখতে লাগলো । চারিদিক বদ্ধ । একপাশে কিছু ছোট ছোট ফুটো থেকে আবছা আলো আসছে । ফুটোতে চোখ রেখেও কিছু বোঝা গেল না । কেউ আছেন । : এই যে ! কেউ শুনছেন ? আমি এখানে আটকা পড়ে গেছি ! শুনছেন কেউ ? ওপাশে কোন সারাশব্দ নেই । কেউ নেই বোধহয় । এখন ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই । : আর কতো জ্বালাবি তুই আমারে ? এতো বড় হইছিস্ তারপরেও মাথায় বুদ্ধিশুদ্ধি হয়নাই ? তুই আমার কাছে এখন একটা বোঝা ! আর কতো বসিয়ে বসিয়ে খাওয়াবো তোকে ? কোনো কাজ কাম খুঁজতে পারিস্ না ? অকর্মন্যের ধাড়ি কোথাকার ! আর কিছু না পারলে কারো গলায় ঝুলে পড়ে আমাকে উদ্ধার কর ! হাঁড় জ্বালিয়ে খাচ্ছে আমার ! রেশমা মাথা নিচু করে চুপচাপ তরকারী কুটে যাচ্ছে । মা ইদানীং একটু খিটখিটে স্বভাবের হয়ে গেছে । এই বকাবকি তার নিত্যদিনের কাজ । রোজ একবার না বকলে তার খাবার হজম হয়না । ঠিকই তো আছে ! আর কতো সইবে ? সেই ছোটবেলা থেকেই মাকে কষ্ট করতে দেখে আসছে সে । আর কতো ? সে এখন বড় হয়েছে । অনেক কিছুর সাথে এটাও বোঝে যে এভাবে দিন চলবে না । ছোটোবেলা থেকে মা তাকে লালন করে আসছে । এখন মাকে লালন করার সময় তার । কিছু একটা করতে হবে ! এভাবে আর না ! শরীর ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে । সময়ের কোনো ধারণা নেই । একঘেয়েমী নির্জনতায় আকাশ-কুসুম চিন্তা করে । পুরনো স্বৃতি হাতড়াতে গিয়ে একসময় চেতনা হারায় । হঠাৎ আবার প্রচন্ড অবসাদ নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখে জেগে ওঠে । অনেক কষ্টে, অল্প কিছু মুখে দিতে হয় বাধ্য হয়ে । অনেক খাবারই পঁচে নষ্ট হয়ে গেছে ! একটু পানিও মুখে দিতে হয় চিন্তা ভাবনা করে । নিতান্তই বাধ্য না হলে মুখে কিছু দেয়া হয়না । রসদ ও অফুরন্ত নেই ! কখন ফুরিয়ে যায় ঠিক নেই ! মাঝে মাঝে মনের সমস্ত শক্তি একজোট করে উঠে দাঁড়ায় । মুক্তির পথ খুঁজে পাওয়ার বৃথা চেষ্টা চালায় । ফোকড়গুলোর পাশে যেয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করে । শক্তি নেই । গলা দিয়ে খুব কমই আওয়াজ বেরোয় । ওপাশ থেকে সাড়া দেয়না কেউই । : তুই কি সত্যিই চলে যাবি ? থাকবি না ? যেতেই হবে ? : হুম্ । ব্যাগের ভেতর কাপড় গোছাতে গোছাতে জবাব দেয় রেশমা । আর কিছু না বলে দরজার সামনে গিয় বসে রেশমার মা । চৌকাঠে মাথা ঠেস দেয় । ছোটবেলা থেকেই বাপ ছাড়া বড় হয়েছে মেয়েটা । এখন মাকেও ছেড়ে চলে যাচ্ছে । দিনরাত কুসুমকে নিয়ে খেলা করা সেই ছোট্ট রেশমা এখন স্বাবলম্বী হতে যাচ্ছে । চোখের সামনেই কখন এতো বড় হয়ে গেলো বোঝাই যায়নি । মাকে ছাড়া কী করে একা একা থাকবে মেয়েটা ? মেয়েকে ছেড়ে সে নিজেই বা কীভাবে থাকবে ? ব্যাগ গোছানো শেষ করে মায়ের পাশে এসে বসে রেশমা । মায়ের কাঁধে মাথা মাথা রেখে চোখ বোজে । আর পারেনা রেশমার মা । মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠে । : আমায় ছেড়ে যাসনে মা ! কি করে থাকবি ? আমি কি করে থাকবো ? দরকার হয় আমি আরেকটা কাজ জোগাড় করবো । আগের চাইতে বেশি করে কাঁথা সেলাই করবো !, ,ভাতের কষ্ট থাকবেনা দেখিস্ ! মা মেয়ে ভাগ করে খাবো । এক থালে খাবো । তুই যাসনে ! রেশমার চোখ দিয়ে অঝর ধারায় অশ্রু নির্গত হয় । তবু সে কিছু বলে না । মায়ের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায় । দেরী করা যাবে না । একটু পরই ঢাকাগামী বাসটি ছেড়ে যাবে । চেতনা এখন একদম নেই বললেই চলে । আধো-ঘুম আধো-জাগরিত অবস্থায় বুঝতে পারে খাবার আর বেশি অবশিষ্ট নেই । পানি আগেই ফুরিয়ে গেছে ! অনেকক্ষণ যাবৎ কতক্ষণ ধারণা নেই, কয়েক ঘন্টা, হয়তো কয়েকদিন ধরে উপরে ভারী মেশিনের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে । লোকজনের কথাবার্তার আধো-আধো শব্দ কানে এলো । আশা ! উঠে দাঁড়ানোর শক্তি নেই শরীরে । কোনমতে হাপুড় পেরে এগিয়ে যায় । হাত নাড়ে । ফোকড়ের কাছে মুখ নিয়ে চিৎকার করে । তেমন একটা শব্দ হয়না । তবু সে প্রাণপনে চিৎকার করতে থাকে । হঠাৎ বাইরে থেকেও চিৎকার শোনা যায় । একটা ফোকড় বড় হতে থাকে । আলো বাড়তে থাকে । ফোকড় বড় হয় ! আলো বাড়ে ! আশা ! [বিঃ দ্রঃ লেখাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক । বাস্তবতার একটুখানি ছোঁয়া নিয়ে তৈরি । কল্পনাপ্রস্রুত লেখা হওয়া স্বত্তেও আমি যখন লিখছিলাম তখন শিহরিত হচ্ছিলাম । এক বসায় লিখেছি । অন্য কোনদিকে কেন যেন যায়নি মন । সম্পূর্ণ সময়টাতেই শরীরে ছিলো শিহরণ ।]
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now