বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
》》 স্বপ্ন খাদক
আজ আমার বিয়ে। আমার দ্বিতীয় বিয়ে।
ইচ্ছে না থাকা সত্বেও বাবার শর্ত মেনে নিয়ে বাধ্য হয়ে এই বিয়েতে রাজী হতে হয়েছে।
অনু, আমার প্রথম স্ত্রী। আমার একবছরের ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে ফুফিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছে।
অনু আমার প্রথম স্ত্রী। সবাই জানে অনুকে আমি ডিভোর্স দিয়েছি। কিন্তু... আমি যে তা কিছুতেই করতে পারবো না।
অনু আমার প্রথম প্রেম, প্রথম ভালোবাসা। প্রথম বৌ, প্রথম সন্তানের মা। তাকে কি করে ত্যাগ করতে পারি।
আমার দাম্ভিক পিতা আমার উপর যেমন তার মতামত চাপিয়ে দিয়েছেন তেমনি আমি সবার সাথে প্রতারণা করতে বাধ্য হয়েছি।
অনুর অনেক অপরাধ... অনু দেখতে একদম কালো। তবে সে আমার চোখে বিশ্বসুন্দরী। তার উপর বাবা মা মরা মেয়ে।
আর আমি হলাম আমার বড়লোক বাবার একমাত্র সন্তান। কোথায় অনু আর কোথায় আমি।
অনুর সাথে আমার প্রথম পরিচয় হয়েছিলো... সেবার আমি ফুফুর বাসায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। ফুফুর দুরসম্পর্কের আত্মীয়ের মেয়ে অনু।
বাবা মা নেই তাই হয়তো ফুফু নিয়ে এসেছিলো বাসার কাজে কিছুটা সাহায্য হবে আর দেখেশুনে একটা বিয়েও দিয়ে দিবে।
কিন্তু... সেই কালো মেয়ের প্রেমে পড়ে গেলাম আমি।
আমি যথেষ্ট সুন্দর আর হ্যান্ডসাম ও। কি করে অনুর মত এতো কালো একটা মেয়েকে ভালোবেসে ফেলেছি নিজেও বুঝে উঠতে পারি নি।
সম্পর্কটা গোপন থাকে নি। ফুফুসহ সবার কড়া নিষেধ... এই মেয়ের কাছ থেকে যেন সবসময় দূরে থাকি।
চালচুলোহীন এই মেয়েকে আমার বাবা কখনোই মেনে নিবে না।
ফুফু বাবাকে কিছু একটা ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।
এদিকে অনুকেও তার বড় বোনের বাড়ীতে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
বাবা তড়িঘড়ি বিয়ের পাত্রী দেখা শুরু করলেন।
কিন্তু... প্রেম মানে না কোন বাঁধা।
অনুর বড় বোনের ঠিকানা যোগাড় করে ফেললাম।
সেখান থেকে একদিন... অনুকে নিয়ে গিয়ে বিয়ে করে ফেললাম আমরা।
বুঝতে পারছিলাম... অনু খুব ভয় পেয়েছিলো।
কিন্তু আমি তার সব ভয়কে জয় করে নিলাম।
অনু কালো সেটা তো তার দোষ নয়, অনুর বাবা মা মারা গেছেন সেজন্য তো অনু দায়ী নয়।
অনুকে যেহেতু আমি ভালোবাসি আর বিয়েও করেছি তাই আমার কাছে এগুলো কোন ব্যাপার না।
কিন্তু.. আমার বাবার সমাজে এসব অনেক বড় ব্যাপার। আমাদের বিয়েতে তার মান - সম্মান সব ডুবে গেছে।
আমার উপর দিয়ে অনেক ঝড় বয়ে গেলো। বাড়ী থেকে বের করে দেয়া হলো আমাকে।
অনুকে নিয়ে আপাতত তার বোনের কাছে উঠলাম।
বন্ধুদের সহযোগিতায় একটা ছোটখাটো কাজ ও যোগাড় করে ফেললাম কিছুদিনের মধ্যে।
নিজেরা একটা ছোট বাসা নিয়ে সেখানে থাকতে শুরু করলাম।
বাবার এক কথা... আমার বাড়ীতে ঢুকতে হলে সেই মেয়েকে ত্যাগ করতে হবে।
আমি তাতে কিছুতেই রাজী হলাম না।
কিছু মাস কেটে গেলো। একদিন অনু সুখবর দিলো... অনু মা হতে চলেছে।
এসময় মেয়েদের একটু বাড়তি কেয়ার করতে হয়।
কিন্তু... অভাগা মেয়েটা এমন কপাল নিয়ে এসেছে না পেলো মায়ের মমতা না পেলো শ্বাশুড়ীর আদর ভালোবাসা।
সারাদিন অনেক পরিশ্রম করে রাতে এসে অনুকে অনেক সময় ঘুম থেকে উঠিয়ে নিজ হাতে ভাত খাইয়ে দিতাম।আমি আসতে দেরী হলে..
অনু অনেক সময় না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়তো।
যতটুকু পেরেছি নিজে অনুর কেয়ার করেছি। কারণ... আমার সন্তান তখন অনুর গর্ভে।
যা খেতো হড়হড়িয়ে বমি করে দিতো।
দেখতে দেখতে নয়মাস কেটে গেলো।
একদিন অনুর পেইন উঠলো।
অনুকে নিয়ে ছুটলাম... হাসপাতালে।
এতো টাকা পাবো কোথায়?
সরকারী হাসপাতালে জন্ম নিলো আমার ছেলে।
মায়ের কাছে গেলাম। শত হলেও মায়ের মন। আমার সাথে অনেক গল্প করলো কিন্তু বাবা আবারো বাড়ী থেকে বের করে দিলেন। তার মন গলাতে পারলাম না ছেলের কথা বলেও।
ফিরে এলাম অনুর কাছে।
অনুর আর ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে সব দুঃখ ভুলে গেলাম।
নিজেদের মত থাকতে শুরু করলাম।
এর কিছুদিন পর... বাবা আবারো মায়ের কান্না দেখে খবর পাঠালেন... অনু আর সন্তানকে ত্যাগ করে যেন বাড়ী ফিরে যাই।
বাবা অনেক ভালো ঘরের মেয়েকে আমাকে বিয়ে করাবেন।
আমি তাতেও সায় দেয় নি। কি করেই বা দিতাম?
এর মাস ছয়েক পরে অনুর খুব শরীর খারাপ হতে থাকে।
বিভিন্ন ডাক্তার দেখাই। কোন ঔষধ ই কাজ করে না।
অনুর বোন তখন অনুকে নিয়ে একজন ভালো ডাক্তার দেখান এবং কিছু টেষ্ট করান।
টেষ্টে ধরা পড়ে অনুর ক্যান্সার।
আমার তখন খুব অসহায় লাগছিলো। অনুর চিকিৎসার খরচ যোগানো প্রায় অসম্ভব।
যে ছোট একটা চাকরী করি তাতে কোনমতে ডাল ভাত খেয়ে দিন পার করি। সন্তানের দুধ কিনতে ও হিমশিম খেতে হয়।
এদিকে অনুর অসুখের কথা শুনেও কিছুই করতে পারছিলাম না। ঔষধটাও ঠিকমত কিনতে পারছিলাম না বাকী চিকিৎসা তো দূরের কথা।
এর কিছুদিন পর একদিন আবার বেহায়ার মত মায়ের কাছে গেলাম। তাদের শর্ত একটাই। অনুকে ছেড়ে আসলেই সব আবার ফেরত পাবো।
অনুর অসুখের খবরটা তাদেরকে আর দিলাম না।
তবে বলে আসলাম... আমি খুব ক্লান্ত। ভেবে তাদেরকে জানাচ্ছি।
সেখান থেকে ফিরে অনুকে তার বোনের কাছে রেখে বাড়ী ফিরে গেলাম আর বললাম... অনুকে ডিভোর্সের সব ব্যবস্থা করেছি।
কয়েকদিনের মধ্যে হয়ে যাবে।
উকিলকে টাকা দিতে হবে।
এতো টাকা এখন আমার কাছে নেই জেনে মা তাড়াতাড়ি বাবার কাছ থেকে অনেকগুলো টাকা আমাকে এনে দিলেন।
আর বললেন... তাড়াতাড়ি যেন সব ঝামেলা মিটিয়ে ফেলি। উনারা আমার জন্য পাত্রী দেখা শুরু করেছেন।
টাকাগুলো হাতে পেয়েই ছুটলাম অনুর কাছে। কিছু টাকা দিয়ে তার জন্য ঔষধ কিনলাম। আর ছেলের জন্য দুধের কৌটা।
আবার ফিরে এলাম বাড়ী।
বাবা মাকে জানালাম... সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আগামী সপ্তাহে অনুর কাছে নোটিশ যাবে।
বাবা পাত্রী দেখছেন তোড়জোড় করে।
পাত্রী পেয়েও গেছেন। ছেলেদের এতো দোষ নেই।
আবেগে ভুল করে বিয়ে করেছে। বাচ্ছা হয়েছে তাতে কি?
বড়লোক বাপের ছেলে কত সুন্দরী মেয়েদের পিতা তৈরি আছেন তার মেয়েকে বিয়ে দিতে।
কয়েকদিন পর জানালাম... অনুর সাথে ডিভোর্স হয়ে গেছে।
অনুর শারীরিক অবস্থা তখন আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে।
অনেক টাকার প্রয়োজন কিন্তু.. আমার বিয়ে না হওয়া পর্যন্ত কোন কিছুই আমার হাতে দিবে না। বাবার ব্যবসার দায়িত্ব বিয়ের পর আমার হাতে দিবে এর আগে না।
তাই বাধ্য হয়ে অনুকে বাঁচাতে বিয়ে করা।
অনুকে আমি ঠকাতে পারবো না। পরে অন্য কারো কাছে জানলে অনু আমাকে ভুল বুঝবে তাই আমি নিজেই বিয়ের ব্যাপারটা অনুকে জানিয়েছি।
অনু কোন কথা বলছে না... শুধু কাঁদছে।
অনুকে শান্ত্বনা দিলাম। দেখো অনু তুমি ভালো হয়ে উঠলে আমি সেই মেয়েকে ডিভোর্স দিয়ে দিবো। আমি তাকে স্পর্শ ও করবো না।
যদিও জানি না অনুকে বাঁচানো যাবে কিনা। প্রথম স্টেপে ক্যান্সার ধরা খায়নি। এখন লাষ্ট স্টেপ তারপরেও ডাক্তার বলেছেন উন্নত চিকিৎসা করালে হয়তো বাঁচানো যেতে পারে।
অনুর বাঁধ ভাঙ্গা কান্নাকে উপেক্ষা করে, ছেলেকে কোলে নিয়ে আদর করে দিয়ে ফিরে এলাম বাড়ী।
এছাড়া যে আমার আর কোন পথ খোলা নেই।
নির্দিষ্ট দিনে... বিয়ে হয়ে গেলো। পাত্রী যথেষ্ট সুন্দরী।
বাবার কোন এক বন্ধুর মেয়ে। বিয়ের সব ঝামেলা সেরে বাসর ঘরে যেতে যেতে রাত তিনটা।
ইচ্ছে করেই একটু দেরীতে গেলাম।
বৌ আমার বসে আছে। বুকটা ফেটে যাচ্ছিলো। কি হতে কি হয়ে গেলো।
নতুন বৌয়ের কাছে গিয়ে বললাম.. আমি খুব টায়ার্ড।
ঘুমিয়ে পড়ো। বৌ হয়তো বুঝে গিয়েছিলো অনুকে মন থেকে সরাতে পারছি না আমি। কোন কথা না বলে ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়লো।
আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে একটার পর একটা সিগারেট শেষ করে যাচ্ছি।
আর ভাবছি... অনুকে নিয়ে বিদেশে যেতে পারলে হয়তো ভালো চিকিৎসা করাতে পারবো।
রাতটা এভাবেই কেটে গেলো।
পরদিন বৌয়ের বাড়ী থেকে আত্মীয়রা আসলো। সাথে করে নতুন বৌকে নিয়ে গেলো।
আমি গেলাম না। আমি গেলাম অনুর কাছে।
পরদিন গিয়ে নতুন বৌকে নিয়ে আসলাম।
সবাই বুঝতে পেরেছিলো আমার ব্যাপারটা।
আমি কোন কথাই কান না দিয়ে বাবার ব্যবসায় হাত দিলাম।
মা বাবা মনে করলো... সময় গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
এদিকে বিয়েতে যত টাকা আর গহনা পেয়েছি সেগুলো বিক্রি করে অনুর চিকিৎসা চলছে।
বাবাকে একটা ব্যবসা শুরু করার কথা বলে কিছু টাকা নিয়ে অনুর চিকিৎসা করাতে থাকলাম।
এদিকে নতুন বৌ আমার উদাসীনতায় বাবার বাড়ী চলে গেছে।
সবাই তাকে শান্ত্বনা দিচ্ছে... কিছুদিন গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
একদিন... অনুর বোন ফোন করে বললো... আমি যেন তাড়াতাড়ি যাই। অনুর অবস্থা খুব ই খারাপ।
আমি এম্বুলেন্স নিয়ে গেলাম। অনুকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটলাম।
অনুর বোন ও আর দুলাভাইও আমার সাথে। ছেলেকে নিয়ে।
হাসপাতালে পৌঁছতেই ডাক্তার অক্সিজেন লাগালেন।
অনুর শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো।
তারপরেও অক্সিজেন মাস্ক খুলে আমার সাথে কথা বলতে চাইল।
নার্স এসে খুলে দিলো।
অনু বললো... তোমার উপর কোন অভিযোগ নেই আমার।
আমার ছেলেটিকে শুধু দেখে রেখো। ভাগ্যিস, সে দেখতে আমার মত হয় নি।
তাহলে তোমার পরিবার তাকেও অবহেলা করতো। তোমার ছেলে তোমার মতই হয়েছে।
কতোটা অভিমানে অনু কথাগুলো বলছে আমি বেশ বুঝতে পারছি।
আমি বার বার অনুকে কথা বলতে নিষেধ করছি।
কিন্তু অনু আজ আর শুনছে না আমার বারণ।
অনুর শেষ কথা ছিলো... আমি খুব ভাগ্যবতী। তোমার মত স্বামী পেয়ে। কজন মেয়ের সৌভাগ্য হয় তার স্বামীর কোলে মাথা রেখে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করতে।
কখনো কোন ভুল হলে আমাকে ক্ষমা করো।
আমার বুকে মাথা রেখে অনু শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলো।
আমি আমার অনুকে বাঁচাতে পারলাম না।
আমার ছেলেটা কেঁদে চলেছে।
অনু আমাকে একা করে চলে গেলো।
আমার এতো আয়োজন অনুকে ঘিরে। কি প্রয়োজন ছিলো এসবের।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now