বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
৩
আহমদ মুসা গাড়িতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। গেটে দাঁড়িয়েছিল দুজন সিকিউরিটির লোক।
হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউন বেরিয়ে এল বাড়ির ভেতর থেকে।
হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা দুজনেই তাকাল আহমদ মুসার দিকে। দুজনেরই প্রথম প্রতিক্রিয়া হলো, গেটের ওপারে গাড়ির উপর ঠেস দিয়ে দাঁড়ানো লোকটি অস্বাভাবিক চরিত্রের কোন মানুষ নয়। নিজের অজান্তেই তাদের মন যেন প্রসন্ন হয়ে উঠল। তবে অবাক হলো আহমদ মুসার সুন্দর কাটিং-এর স্যুটকে ধুলি ধুসরিত দেখে।
ভেতরে দাঁড়িয়েই হাইম বেঞ্জামিন সিকিউরিটির লোকদের উদ্দেশ্য করে বলল, ‘ওঁকে আসতে দাও।’
হাইম বেঞ্জামিনের পাশে দাঁড়ানো বারবানা ব্রাউনের চোখে-মুখে একটা চাঞ্চল্য নেমে এল। সে বলল সিকিউরিটিদের উদ্দেশ্য, ‘সার্চ করে দেখো কোন অস্ত্রপাতি আছে কিনা।’
আহমদ মুসা গেটে এসে দাঁড়ালে একজন সিকিউরিটি তাকে সার্চ করল। তার সার্ট কোর্ট-প্যান্টের পকেট, কোমর, শোল্ডার হোলস্টার পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকল। সার্চ করে কোন অস্ত্র পেল না।
আহমদ মুসা ভেতরে প্রবেশ করল।
আহমদ মুসা কিছু বলার আগেই হাইম বেঞ্জামিন বলে উঠল, ‘গুড ইভনিং, মি............। ওয়েলকাম।’
‘গুড ইভনিং। ধন্যবাদ। আমি আইজ্যাক দানিয়েল। নামটা বোধ হয় আগেও বলেছিলাম।’ মুখ ভরা হাসি টেনে বলল আহমদ মুসা।
হাসল হাইম বেঞ্জামিনও। বলল, ‘স্যরি। একটু পরীক্ষা করলাম যে, যাঁর সাথে কথা বলেছি তিনিই এসেছেন কিনা।
হাইম বেঞ্জামিন ও আহমদ মুসা হ্যান্ডশেক করল।
হ্যান্ডশেক করেই হাইম বেঞ্জামিন বারবারা ব্রাউনের দিকে ইংগিত করে আহমদ মুসাকে বলল, ‘ইনি আমার বন্ধু ও আমাদের পরিবারের শুভাকাংখী।’
বারবারা ব্রাউন হাত বাড়াল আহমদ মুসার দিকে হ্যান্ডশেকের জন্য।
আহমদ মুসার হাত না বাড়িয়ে উপায় ছিল না। কারণ, বলা যাবে না বাধাটি কি।
আহমদ মুসা ও বারবারা ব্রাউন হ্যান্ডশেক করল। এই সাথে বারবারা ব্রাউন বলল, ‘আমি বেঞ্জামিনের কাছে সব শুনেছি। ওয়েলকাম। আমি মনে করি, আপনার সাথে বেঞ্জামিন পরিবারের এই সাক্ষাত গুরুত্বপূর্ণ।’
‘ঈশ্বর আমাদের সাহায্য করুন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আসুন বলে ভেতরে যাবার জন্যে হাঁটা শুরু করল হাইম বেঞ্জামিন।
হাইম বেঞ্জামিন আগে আগে হাঁটছিল।
পেছনে পাশাপাশি আহমদ মুসা ও বারবারা ব্রাউন।
তিনজন এসে ড্রইংরুমে বসল।
পাশাপাশি এক সোফায় বসল হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউন। তাদের সামনে এক সোফায় বসল আহমদ মুসা।
বসে একটু সপ্রভিত হেসে হাইম বেঞ্জামিন বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘একটা অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করি মি. দানিয়েল?’
‘অবশ্যই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আপনার কোট-প্যান্ট ধুলি-ধুসরিত হবার চিহ্ন দেখছি। পরার সময় এমনটা থাকার কথা নয়।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
আহমদ মুসা হেসে উঠল। বলল, ‘ঠিক ধরেছেন। পরার সময় এমনটা থাকার কথা নয়। ছিলও না।’
‘তাহলে?’ জিজ্ঞাসা করল হাইম বেঞ্জামিন।
‘পথে আত্মরক্ষার জন্যে লড়াই করতে হয়েছে। সেজন্যে ধুলায় গড়াগড়িও খেতে হয়েছে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি ব্যাপার?’ প্রশ্ন করল দুজনেই বিস্ময়ে চোখ কলাপে তুলে।
আহমদ মুসা পথের সব ঘটনা বিস্তারিত তাদের জানাল।
‘সর্বনাশ। সাংঘাতিক কিছু ঘটতে পারতো। অলৌকিকভাবে আপনি বেঁচে গেছেন। ঈশ্বর আপনাকে সাহায্য করেছে।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন। তার কন্ঠে রাজ্যের উদ্বেগ ঝরে পড়ল।
বারবানা ব্রাউন নিরব। তার মুখ মলিন হয়ে উঠেছে। বুঝতে পারল, ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থাই এটা করেছে। কেন তারা করবে? ড. হাইম হাইকেলের পরিবার যদি কারও সাথে সাক্ষাত করতে চায়, তাহলে তাতে বাধা দেয়া হবে কেন? তাছাড়া তাদের গোয়েন্দা বিভাগ এ মিথ্যাচার কেন করল? বেঞ্জামিন নিশ্চিত হয়েছে এবং সেও নিউইয়র্ক পুলিশে অফিসে টেলিফোন করে জেনেছে ইয়র্কভিল ডিস্ট্রিক্ট-এ কিংবা নিউইয়র্কের কোন পুলিশ জোনেই এ্যালেন শেফার নামে কোন পুলিশ অফিসার নেই। তাহলে তাদের ইহুদী গোয়েন্দা সংস্থা মহামিথ্যাচার কেন করল? এসব ঘটনার পিছনে কি তাহলে আরও ঘটনা আছে যা বারবারারা জানে না? কিন্তু যাই থাক, ড. হাইম হাইকেলের পরিবারের সাথে মিথ্যাচার কেন? এ্যালেন শেফার যদি মিথ্যা হয়ে থাকে, তাহলে তার বলা সব কথাই মিথ্যা হয়ে যায়। মিথ্যা হয়ে যায় ড. হাইম হাইকেল সর্ম্পকে সে যা বলেছে তাও!
বারবারা ব্রাউনের চিন্তায় ছেদ নামল আহমদ মুসার কথার শব্দে। আহমদ মুসা বলছিল হাইম বেঞ্জামিনের কথার উত্তরে, ‘হয়তো মেরে ফেলাই তাদের টার্গেট, কিন্তু আপাতত তারা আটক করতেই চেয়েছিল আমাকে।’
‘তাদেরকে কি আপনি চেনেন? তারা কেন আপনাকে আটক করত চেয়েছিল? বেঞ্জামিন বলল।
‘না তাদের কাউকে আমি চিনি না। আমি এখানে আসতে না পারি, আমি আপনাদের সাথে কথা বলতে না পারি, সেই ব্যবস্থাই তারা করতে চেয়েছিল।’ বলল আহমদ মুসা।
হঠাৎ বিদ্যুত চমকের মত হাইম বেঞ্জামিনের মনে পড়ল তার সাথে দেখা করতে আসা নিউইয়র্কের সেই ভূয়া পুলিশ অফিসার বলে প্রমাণিত এ্যালেন শেফারের কথা। তিনি বলেছিলেন যে, ড. হাইম হাইকেলের শত্রুরা আমাদের বাসার উপর চোখ রেখেছে। তারা আমাদের সাথেও দেখা করতে চেষ্টা করবে। তাহলে আইজ্যাক দানিয়েল কি সেই দেখা করার পক্ষ এবং তাকে কি এ্যালেন শেফারের লোকেরাই বাধা দিয়েছিল! এ্যালেন শেফার যে ভূয়া তা প্রমাণিত হয়েছে। তাহলে আইজ্যাক দানিয়েল কি ঠিক পক্ষ? এ প্রশ্নের জবাব তার কাছে নেই।
হাইম বেঞ্জামিন মনোযোগ দিল আহমদ মুসার দিকে। আহমদ মুসার কথার উত্তরে বলল, ‘আপনি ওদের চেনেন না। কেন তাহলে ওরা আপনাকে বাধা দেবে এখানে আসতে?’
‘লোক হিসাবে ওদের চিনি না বটে, কিন্তু ওরা কারা আমি জানি। আমি নিউইয়র্কে এসে যেদিন থেকে ড. হাইম হাইকেলের কেন কিভাবে অন্তর্ধান ঘটল, তাকে উদ্ধারের জন্যে কি করা হয়েছে, কিভাবে তার সন্ধান পাওয়া যাবে, ইত্যাদি ব্যাপারে সন্ধান শুরু করেছি, সেদিন থেকেই ওরা আমার প্রতি পদে বাধার সৃষ্টি করেছে। প্রথম দিনেই রাব্বানিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. হাইম হাইকেলের বন্ধু ড.জ্যাকব যখন ড. হাইকেলের অন্তর্ধানের ব্যাপারে আমাকে তথ্য দিচ্ছিলেন, সে সময় ড. জ্যাকবকে হত্যা করার জন্যে তার উপর হামলা হয়। অস্ত্র ও বোমা সজ্জিত ছিল বলে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকেরা তাকে ধরতে পারেনি।’ এই কাহিনী দিয়ে কথা শুরু করে আহমদ মুসা কিভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্টের বাড়িতে গিয়েছিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট, তাঁর মেয়ে নুমা ইয়াহুদ ও পি,এ লিসা কিভাবে সহযোগিতা করতে এগিয়ে এসেছিলে, এই সহযোগিতা করতে গিয়ে লিসা কিভাবে ওদের হাতে নিহত হয় এবং সবশেষে বলল বালক জুনিয়ার প্যাকারের কাহিনী ও তার গুলীবিদ্ধ হবার কথা।
হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউনের মন্ত্রমুগ্ধের মত মুসার কথা শুনছিল। বিস্ময় ও উদ্বেগে তাদের চোখে-মুখে নেমে এসেছিল অন্ধকারের একটা ছায়া। আহমদ মুসা থামলেও ওরা কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না। ওদের চোখ আঠার মত লেগেছিল আহমদ মুসার উপর।
একটু সময় নিয়ে হাইম বেঞ্জামিন ধীর কন্ঠে বলল, ‘এত কিছু ঘটে গেছে? আহত-নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে? কিন্তু ...............।’
হাইম বেঞ্জামিন কথার মাঝখানে আহমদ মুসা বলে উঠল, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ড. আয়াজ ইয়াহুদ অথবা তাঁর মেয়ে নুমা ইয়াহুদের কাছে টেলিফোন করে বিষয়টা আরো একটু জানুন। আমার অনুরোধ।’
আহমদ মুসা থামতেই বারবারা ব্রাউন বলে উঠল, ‘আমি নুমা ইয়াহুদকে চিনি। সে গত বছর ফিলাডেলফিয়া ক্যাম্পিং-এ এসেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রপস নিয়ে। পনের দিন আমরা একসাথে ছিলাম। আমি তাকে টেলিফোন করতে পারি। আমার মোবাইলে তার নাম্বার আছে।’
বলেই বারবারা ব্রাউন কথা বলার জন্যে একটু আড়ালে চলে গেল।
দশ মিনিট পর বারবারা ব্রাউন ফিরে এল হাসিমুখে। বসতে বসতে বলল আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে, ‘মি. দানিয়েল, নুমা ইয়াহুদ আপনার যেভাবে প্রশংসা করল তাতে মনে হলো আপনি ওর হৃদয় সিংহাসনের অবিসংবাদিত হিরো।
‘ওসব কথা পরে বলো। এখন কাজের কথায় এস।’ বারবারা ব্রাউন থামতেই কথা বলে উঠল হাইম বেঞ্জামিন।
‘বল কি! কাজের কথাই তো শুরু করেছি। বুঝতে পারছি না, নুমা ইয়াহুদ ও ড. আয়াজ ইয়াহুদের কাছে যিনি শার্লক হোমস ও আলেকজান্ডার শেয়ার্জনেগার এর যোগফল, তাঁর সম্পর্কে ওঁরা আর কি বলতে পারেন?’ বলল বারবারা ব্রাউন।
‘তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ড ড. আয়াজ ইয়াহুদ স্যারের সাথে কথা বলেছ?’ হাইম বেঞ্জামিন জিজ্ঞাসা করল।
‘হ্যাঁ। তিনিও লিসা নিহত হওয়া, ড.জ্যাকব ও বালক আহত হওয়ার বিষয়টি কনফার্ম করলেন। বললেন যে, তাঁর কাছ থেকেই তোমাদের বাসার ঠিকানা নিয়েছেন। তিনি আরও বললেন, যতটা পারা যায় আইজ্যাক দানিয়েলকে সাহায্য করা উচিত। তিনি জানালেন, একটি চক্র, যাদেরকে তিনি চেনেন না, ড. হাইম হাইকেলের অনুসন্ধান, তার সম্পর্কে কাউকে কোন তথ্য দেয়া, এমনকি তার সম্পর্কে আলোচনাতেও বাধা দিচ্ছে। এদের ভয়েই ড. হাইম হাইকেলের সন্ধানে কোন কিছুই তারা করতে পারেনি। প্রথমবারের মত আইজ্যাক দানিয়েলই নির্ভীকভাবে এপথে এগিয়েছেন। এখনও কোন বাধাই তার পথরোধ করতে পারেনি।’ বলল বারবারা ব্রাউন।
‘এই যদি হয় ব্যাপার, তাহলে আমরা পুলিশকে খবর দিতে পারি। আমরা তাদের সাহায্য নিতে পারি।’ হাইম বেঞ্জামিন বলল।
‘হ্যাঁ ও ব্যাপারেও ড. আয়াজ আংকেল বলেছেন। তিনি বললেন, পুলিশ তাদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করেনি। পুলিশকেও তারা নিস্ক্রিয় করে রেখেছে।’ বলল বারবারা ব্রাউন।
‘তাহলে উর্ধতন পুলিশ কর্তৃপক্ষকে বিষয়টা জানাতে পারি।’ সোজা হয়ে বসে জোরের সাথে বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘দেখুন মি.হাইম বেঞ্জামিন, ড. হাইকেলের সুস্থ ও জীবিত উদ্ধার করা আমাদের টার্গেট হওয়া উচিত। পুলিশের সর্বস্তরেই ওদের লোক আছে। পুলিশ যখন জোরে-শোরে এ্যাকশনে যাবে, পুলিশের মাধ্যমেই ওরা খবর পেয়ে যাবে। যদি দেখে ওরা ধরা পড়ে যাচ্ছে, তাহলে অভিযুক্ত হওয়া থেকে বাঁচার জন্য ওরা ড. হাইম হাইকেলকে চিরতরে গায়েব করে ফেলতে পারে।’ আহমদ মুসা বলল।
আহমদ মুসার শেষ কথায় কেঁপে উঠল হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউন দুজনেই। উদ্বেগ-আংতকে পান্ডুর হয়ে গেল তাদের মুখ। বলল হাইম বেঞ্জামিন, ‘তাহলে কি করা যাবে?’ তার কণ্ঠে অসহায় সুর।
আহমদ মুসা বলল, ‘এগুতে হবে সন্তর্পনে। এমন কি পুলিশকেও না জানিয়ে। কৌশলে বা যে কোন মূল্যে ড. হাইম হাইকেলের অবস্থান জানতে হবে। তারপর তাঁকে উদ্ধার।’
‘কিন্তু কঠিন দায়িত্ব কে নেবে? আমরা পারব?’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘সেজন্যে আমি আপনাদের কাছে এসেছি। আমি আপনাদের সাহায্য চাই।’ আহমদ মুসা বলল।
‘কি সাহায্য?’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘ড. হাইম হাইকেলকে ওরা কোথায় রেখেছে, এই তথ্য জানতে হবে। পুলিশ অফিসার ছদ্মবেশে ওরা আপনাদের কাছে এসেছিল। আমার বিশ্বাস ওরা আবারও আসবে। ওরা চেষ্টা করবে হাইম হাইকেলের পরিবারের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে। আর এই সুযোগ নিতে হবে হাইম হাইকেল পরিবারকে।’ আহমদ মুসা বলল।
হাইম বেঞ্জামিন তাকাল বারবারা ব্রাউনের দিকে। তারপর আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে প্রশ্ন করল, ‘মি. আইজ্যাক দানিয়েল, আপনি এত বড় দায়িত্ব নেবেন কেন? আপনার কোন পরিচয় আমরা জানি না।’
প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গেই জবাব দিল না আহমদ মুসা। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,‘সংগত প্রশ্ন করেছেন। পরিচয় ছাড়া একসাথে চলা যায় না। কিন্তু পরিচয় দিতে সময় লাগবে। তার আগে আপনাদের আস্থা আমার উপর বাড়তে হবে, আমার আস্থাও বাড়তে হবে আপনাদের উপর। আমি ভয় করি আমার পরিচয় যদি ওরা পেয়ে যায়, তাহলে আমাদের ক্ষতি করতে পারে ওরা নানাভাবে। আপাতত পরিচয় ছাড়াও আমরা একসাথে এগুতে পারি। আপনি চান আপনার পিতা উদ্ধার হোক, আমিও চাই ড. হাইম হাইকেল উদ্ধার হোক।’
‘মাফ করবেন। আগের প্রশ্নটাই আবার করছি। আমার পিতা উদ্ধার হলে আপনার কি লাভ? প্লিজ, কোন সন্দেহ করে আমি এ কথা বলছি না। আমার কৌতূহল।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
এবারও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না আহমদ মুসা। গম্ভীর হয়ে উঠেছে আহমদ মুসা। একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘আমি কেন ড. হাইম হাইকেল উদ্ধার হোক চাই, এটা জানতে হলে জানা প্রয়োজন ওরা কেন ড. হাইম হাইকেলকে আটক রাখতে চায়।’
হাইম বেঞ্জামিনের চোখ দুটি উজ্জল হয়ে উঠল। বলল, ‘হ্যাঁ, সেটা তো অবশ্যই জানার বিষয়।’
‘মি. হাইম বেঞ্জামিন আপনি জানেন, আপনার পিতা অতীতের বিশ্বাস ও আচরণ পরিত্যাগ করেছেন। তার............।’
হাইম বেঞ্জামিন আহমদ মুসার কথার মাঝখানে বলে উঠল, ‘এ বিষয়টা আমরা সকলেই জানি। কিন্তু কেন এই পরিবর্তন, সেটাই আমাদের সকলের প্রশ্ন।’
‘আমি যতদূর জানি, ড. হাইম হাইকেল তার জাতির কোন বিশেষ কাজ এবং কাজের পন্থাকে মেনে নিতে পারেননি। শুধু মেনে নিতে পারেননি নয়, জাতির ঐ পন্থারই তিনি বিরোধী হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তার নিজ অতীতের তিনি বোধ হয় প্রতিবিধানও করতে চেয়েছিলেন। জাতির একটা বিশেষ গোষ্ঠী এটা মেনে নেয়নি এবং নিশ্চিত হয়েছে যে, ড.হাইকেলের এই পরিবর্তন এবং তার প্রতিবিধান করার মনোভাব তাদের ক্ষতি করবে। এরাই ড. হাইম হাইকেলকে আটক করে রেখেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
ভ্রুকুঞ্চিত হয়ে উঠল হাইম বেঞ্জামিনের। পুলিশ অফিসার এ্যালেন শেফারের কথা মনে পড়েছে তার। বলেছিল সে, শত্রুরা ড. হাইম হাইকেলকে দিয়ে কিছু তথ্যের ব্যাপারে কনফেশন করাতে চায়, যা ইতিহাস কে বদলে দেবে। এই কনফেশনই কি মি. আইজ্যাক দানিয়েলের ভাষায় আব্বার প্রতিবিধানমূলক কাজ? মি. আইজ্যাক দানিয়েল কি সেই কনফেশন বা প্রতিাবধানের সুবিধাভোগী পক্ষ? হাইম বেঞ্জামিন তাকাল আহমদ মুসার দিকে। বলল, ‘ওদের ক্ষতির সুবিধাভোগী পক্ষ কি আপনি বা আপনারা? আপনারা কি কনফেশন করাতে চান আব্বাকে দিয়ে?’
‘কনফেশন শব্দে বিস্মিত হলো আহমদ মুসা। মনে পড়ল ‘স্পুটনিক’-এর নেয়া ড. হাইম হাইকেলের কনফেশন স্টেটমেন্টের কথা। হাইম বেঞ্জামিন নিশ্চিত এই ‘কনফেশন’-এর দিকেই ইংগিত করেছেন। কিন্তু হাইম বেঞ্জামিনের তো এটা জানার কথা নয়। হতে পারে পুলিশ অফিসারের ছদ্মবেশে আসা এ্যালেন শেফার কোন ফর্মে এই কথা হাইম বেঞ্জামিনকে বলেছে। বলল আহমদ মুসা হাইম বেঞ্জামিনকে উদ্দেশ্য করে, ‘মি. হাইম বেঞ্জামিন, কনফেশন করাবার প্রশ্ন নেই। আতীতের প্রতিবিধান হিসাবে নিজেই স্বতঃস্ফুর্তভাবে কোথাও কনফেশন করেছেন। এটাই ওদের কাছে তার সবচেয়ে বড় অপরাধ। আর সুবিধাভোগীর কথা বলছেন! ড. হাইম হাইকেল কারও সুবিধার্থে এই কনফেশন দেননি, সত্য প্রকাশের স্বার্থেই তিনি এটা করেছেন। আর সত্য প্রকাশ হলে এবং মিথ্যার ভার অপসৃত হলে কারও না কারো তো উপকার হবেই।’
‘বুঝলাম। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আব্বা যদি কনফেশন করে ফেলেই থাকেন, তাহলে সবই তো শেষ। আটকে রেখেছে কেন আব্বাকে তাহলে তারা?’ জিজ্ঞাসা বেঞ্জামিনের।
‘আমার মতে এর দুটো কারণ। এক, কনফেশনে সত্যের একটা অংশের মাত্র প্রকাশ ঘটেছে, সত্যের সবটা নয়। অবশিষ্ট সিংহভাগ সত্যকে তারা ড. হাইম হাইকেলকে আটক রাখার মাধ্যমে চেপে রাখতে চায়। দুই. ওরা মনে করে ড. হাইম হাইকেলের সেই কনফেশন তারা উদ্ধার করে এনেছে। এর কোন কপিই আর বাইরে নেই। সুতারাং ড. হাইম হাইকেল এখন আটক থাকলে সত্য প্রকাশ হওয়ার আর ভয় নেই। কিন্তু তারা জানে না যে, কনফেশনের মূল কপিই বাইরে রয়ে গেছে। তারা যা উদ্ধার করেছে এবং আরও যেগুলো ধ্বংস করেছে সেগুলো মূলটার নকল কপি মাত্র।’ আহমদ মুসা বলল।
বিস্ময় ভরা চোখে হাইম বেঞ্জামিন বলল, ‘সত্যটা’ কি মি. আইজ্যাক দানিয়েল? কনফেশনে কি আছে? সত্যটা প্রকাশ হলে এমন কি ঘটবে?’
‘এ প্রশ্নগুলোর উত্তর আজ থাক।
আপনার আব্বাই এর উত্তর ভালো দিতে পারবেন। আপনার আব্বা উদ্ধার হওয়া পর্যন্ত এটুকু অবশিষ্ট থাক।’ আহমদ মুসা বলল।
‘আরও কিছু অবশিষ্ট থাকল। আপনার পরিচয় এখনও আমরা পাইনি।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘পরিচয়ের ব্যাপারটা এমন কিছু নয় যে, সেজন্যে উন্মুখ হয়ে থাকতে হবে।’ আহমদ মুসা বলল।
হাসল হাইম বেঞ্জামিন। বলল, পরিচয়ের মধ্যে ‘এমন কিছু’ না থাকলে পরিচয় প্রকাশে ভয় করতেন না মি. আইজ্যাক দানিয়েল।’
‘আসুন, কাজের কথায় আসি। আমাকে আপনারা সাহায্য করবেন কিনা?’ বলল আহমদ মুসা।
গম্ভীর হলো হাইম বেঞ্জামিন। বলল, ‘এ জিজ্ঞাসা বরং আমাদের। আমরা আপনার সাহায্য চাই মি. আইজ্যাক দানিয়েল।’
‘ধন্যবাদ। আমি সাহায্য নিতে এবং সাহায্য দিতেই এসেছি মি. হাইম বেঞ্জামিন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘বলুন আমাদের কি করণীয়?’ জিজ্ঞাসা হাইম বেঞ্জামিনের।
‘এ্যালেন শেফার মানে আপনার আব্বার আটককারীরা যে আপনাদের সাথে যোগাযোগ করেছে, এটা খুবই আনন্দের খবর। এখন ওদের সাথে আপনার সর্ম্পক বৃদ্ধি করতে হবে এবং জেনে নিতে হবে, আপনার আব্বাকে ওরা কোথায় রেখেছে।’ আহমদ মুসা বলল।
খুশি হয়ে উঠল হাইম বেঞ্জামিন। বলল, ঠিক পরামর্শ। আব্বার নিকটবর্তী হবার এটাই সবচেয়ে সহজ পথ। ইতিমধ্যেই ওরা প্রস্তাব করেছে যে, আমাদেরকে আব্বার কাছে নিয়ে যাবে। তবে দূর থেকে দেখাবে মাত্র, কথা বলতে দেবে না এবং তার সাথে সাক্ষাতও করাবে না।’
আহমদ মুসা দারুন খুশি হয়ে উঠল। বলল, ‘থ্যাংকস গড। ওটুকু যথেষ্ট। উনার থাকার লোকেশানটা জানতে পারলেই হলো।’
‘নাম, ঠিকানা না জানলেও আমরা এটুকু জানতে পেরেছি, আংকেল ড. হাইম হাইকেলকে একটা মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।’ বলল বারবারা ব্রাউন।
‘মানসিক হাসপাতালে? ওরা বলেছে?’ বলে উঠল আহমদ মুসা।
‘জি হ্যাঁ। তিনি নাকি অপ্রকৃতিস্থ।’ বলল বারবারা ব্রাউন।
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘মানসিক হাসপাতালে রেখেছে, এটা সত্য। কিন্তু অপ্রকৃতিস্থ, এই কথা ডাহা মিথ্যা।’
‘আপনি এটা মনে করেন? আপনার কথাকে ঈশ্বর সত্য করুন।’ প্রার্থনার সুরে বলল হাইম বেঞ্জামিন।
‘সুস্থ ড. হাইম হাইকেল নিউইয়র্কের যে মানসিক ডাক্তার কৌশলগত কারণে মানসিক হাসপাতালে রাখার পরামর্শ দিয়েছিল, আমি সে ডাক্তারের বাড়িতে গিয়েছিলাম। কিন্তু পাইনি তাকে। যা বুঝেছি, নিউইয়র্ক থেকে তাকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।’
এরপর আহমদ মুসা বলল ডাক্তারের বাড়িতে ওদের লোকেরা তাকে বন্দী বা হত্যা করার চেষ্টা করেছিল এবং সংঘর্ষে ওদের দুজন লোক মারা যায়।
বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলে বারবারা ব্রাউন বলল, ‘ইতিমধ্যে ওদের দুজন লোক মারা গেছে আপনার হাতে?’
‘আমি দুঃখিত। না মারতে পারলে ওখানে আমাকেই লাশ হয়ে পড়ে থাকতে হতো।’ আহমদ মুসা বলল।
হাইম বেঞ্জামিন একথায় অংশ নিল না। সে আগের প্রশ্নই আবার করল, ‘আপনি নিশ্চিত মি.দানিয়েল যে, আব্বা অপ্রকৃতিস্থ হননি?’ হাইম বেঞ্জামিনের কণ্ঠ কান্নার মত ভারী।
‘আমি নিশ্চিত মি. হাইম বেঞ্জামিন। আমি যে বালক প্যাকারের কথা কিছুক্ষণ আগে বলেছি, সে বালকের মা মিসেস প্যাকার ঐ মানসিক ডাক্তারের একজন প্যাসেন্ট ছিলেন। তিনি নিজ কানে ডাক্তারকে এ বিষয়ে আলাপ করতে শুনেছেন। তাছাড়া আমি রাব্বানিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট আয়াজ ইয়াহুদসহ অনেকের সাথে আলোচনা করে বুঝেছি, ড. হাইম হাইকেল সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। তাঁর মানসিক রোগের কথা ওরা ছড়িয়েছে তাঁর অন্তর্ধানকে যুক্তিসংগত করার জন্যে।’ আহমদ মুসা বলল।
‘থ্যাংকস গড। আপনার প্রতিটি কথা ঈশ্বর সত্য করুন।’ বলল হাইম বেঞ্জামিন। তার দুচোখ খেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল।
‘বারবারা ব্রাউন বেঞ্জামিনের কাঁধে হাত রাখল তাকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্যে।
সান্ত্বনার সুরে নরম কণ্ঠে আহমদ মুসা বলল, ‘ধৈর্য্য ধরুন। সব ঠিক হয়ে যাবে মি. হাইম বেঞ্জামিন। ড. হাইম হাইকেলের মত সৎ-সজ্জন ব্যাক্তির কেউ ক্ষতি করতে পারবে না। ঈশ্বরও তো আছেন।’
আহমদ মুসা একটু থামার পরেই আবার বলে উঠল, ‘মি. হাইম বেঞ্জামিন, আমি চলে যাবার পর থানায় একটা ডাইরী করাবেন এই বলে যে, ‘একজন অপরিচিতি লোক আমাদের বাসায় এসেছিল। মনে হয় সে ড. হাইম হাইকেলের অন্তর্ধান ঘটনার সাথে জড়িত। তার থেকে পরিবারের আরও ক্ষতির আশংকা করছি।’
‘আপনার বিরুদ্ধে এই ডাইরী?’ বলল হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউন একই সাথে।
‘হ্যাঁ। যাতে এ্যালেন শেফাররা বুঝে যে আপনারা তাদের সাথেই আছেন। আমি এলেও আমার সাথে ফলপ্রসু আলোচনা আপনাদের হয়নি।’ আহমদ মুসা বলল।
বিস্ময়ে চোখ কপালে তুলেছে হাইম বেঞ্জামিন ও বারবারা ব্রাউন। বলল, ‘এই সুবিধার জন্যে আপনার মাথায় এতবড় বিপদ ডেকে আনবেন?’
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল, এ সময় বাইরে হৈচৈ-এর শব্দ শোনা গেল।
হৈচৈটা দ্রুত এগিয়ে আসছে। বলতে বলতে ভেতরে ঢুকে গেল।
আহমদ মুসারা তিনজনই উঠে দাঁড়াল।
হাইম বেঞ্জামিন কয়েক ধাপ এগিয়ে গেল ব্যাপার কি দেখার জন্যে। কিন্তু বেশি দূর যেতে হল না।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now