বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
জাতিস্মর কাকে বলে? সিনেমায় বা গল্পের বইতে যারা দাবি করে তার পূর্বজন্মের স্মৃতিকথা স্বরণে আছে। বাস্তবে জাতিস্মর হয়না মানে কখনো জাতিস্মর দেখিনি। এর সম্ভবনাটাই কোথায়? এই অবিশ্বাসের যুগে কেউ নিজেকে জাতিস্মর বলে পরিচয় দেয় সমাজের মানুষ যে তাকে কিরূপে গ্রহণ করবে, তার কোথায় স্থান দেবে তা আর না বলাই ভালো। এই সব ভাবতে ভাবতে অলস দুপুরে চোখে ঘুম চলে এসেছিল সেদিন। ঘুমের মধ্যে সেদিনও দেখেছিলাম সেই বাড়ি, রাস্তাঘাট তার পাশে গ্যাস বাতির স্তম্ভ আর একটা মেয়ে। আমি ছুটে চলেছি সে পথ দিয়ে, সাথে মেয়েটিও। গন্তব্য অজানা। ছোট থেকেই সপ্নে দেখেছি জায়গাটা। কিন্তু হাজার খুঁজেও বাস্তবে পায়নি কখনো জায়গাটা। আজ পেলাম, শুধু সেই বাড়িগুলো। নেই সেই রাস্তাঘাট, নেই সেই গ্যাস বাতিস্তম্ভ। মূর্তিমান জৌলুসহীন, ভগ্নাসার অবস্থায় দাঁড়িয়ে থেকে তখনকার খাস কলকাতার বাঙালীর বাবু আনা দাবি করা বাড়িগুলো কতই না স্মৃতি ধরে রেখেছে। হয়তো আমি কখনো কখনো এই পথ দিয়ে গেছি। দেখেছিলাম কোন এক মেয়েকে বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে। হয়তো প্রেমেও পড়ে গিয়েছিলাম তার। আমি তাকে দেখে হেসেছিলাম, সে লজ্জায় মুখ লুকিয়ে নিয়েছিল। তারপর থেকে সেও হাসতো, আমিও হাসতাম তাকে দেখে। একদিন সন্ধ্যাবেলা চিঠিপত্র বিলি করে ফিরছি। পথের অল্প আলোয় দেখছিলাম অন্ধকারে চাদর মুড়ি দিয়ে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে সবেগে গঙ্গার ঘাটের দিকে হেঁটে যাচ্ছে মেয়েটি। আমি দৌড়ে গিয়ে চেপে ধরলাম তার হাত। সে আঁতকে উঠলো, বলল -কে আপনি? আমার হাত ছাড়ুন, আমায় যেতে দিন। এভাবে আমায় আটকে রাখতে পারবেন না। আমি বললাম- কঙ্কণা, চিনতে পারলে না আমায়? সে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ভালো করে দেখে বলেছিল - ও আপনি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম - নিঝুম সন্ধ্যাবেলা এইভাবে কোথায় যাচ্ছো? তার উপরে শহরে দাঙ্গা লেগেছে, ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে জানো না। প্রত্যুত্তরে জবাব পেয়েছিলাম - আপনাকে বলবো কেন? লোক ডেকে পাছে আমাকে ধরিয়ে দেন। আমি তখন তার হাতটা ছেড়ে দিয়েছিলাম, বলছিলাম-ধরিয়ে দিতে পারতাম কিন্তু দেবো না। বোধ হয় তাতে তোমার উপকার করতে পারবো না। সে হেসে উঠেছিল। আমি বললাম- বেশ তাহলে এবার বলো কোথায় যাচ্ছো? সে বলল- জাহান্নামে। আমি তার পথ আটকে দাঁড়ালাম -তুমি জাহান্নামে যেতে চাচ্ছো, আমি জেনে বুঝেতো এমন হতে দিতে পারি না, আগে বলো তুমি কোথায় যাচ্ছো? - লক্ষীটি আমার পথ ছাড়ুন, আমায় যেতে দিন, বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছেন। আসছে মাসে আমার বিয়ে দেবেন। আমি হেসে উঠলাম -তাই তুমি পালিয়ে যাচ্ছো। পাত্র পছন্দ নয়? -না, আমি বিয়ে করতে চাই না। ওই যে মঠে এক সন্ন্যাসী আছেন, শুনেছি তিনি মহৎ মানবী। আমি তার কাছে থাকবো দীক্ষা নেব। আমি দেশের সেবা করতে চাই। শুনেছি তিনি বিপ্লবীদের গোপনে অনেক সাহায্য করেন। আমিও করতে চাই। আমি কিছুটা বিস্ময় হলাম, দেশের প্রতি সে এতটা সহৃদয় হতে পারে আমি ভাবতেই পারিনি। আমি কিছুটা নরম হয়ে জিজ্ঞেস করলাম- পথ চেন, সেখানকার? সে বলল- না, কাউকে জিগ্যেস করে নেব। -সে যদি না জানে বা সঠিক পথ না বলে? সে বাকরুদ্ধ হয়ে অন্তঃসার মুখ নিয়ে নিশ্পলক দৃষ্টিতে চেয়েছিল আমার দিকে আমার কথা শুনে। আমি বললাম- আমি ওই দিকেই যাবো, যেতে পারো আমার সাথে। সে আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি ভাবে হাসল, বলল- চলুন তাহলে যাওয়া যাক। আমরা হাঁটতে শুরু করেছিলাম। এখান থেকে গঙ্গার ঘাট বেশি দূরে নয়। আমি কিছুক্ষণ পরে বললাম- আমার উপর বিশ্বাস আছে তো আমি সঠিক পথে দিয়ে নিয়ে যাবো। মুচকি হেসে, সে বলল- হ্যাঁ, আপনার উপর বিশ্বাস আছে। সেদিন কিছুদূর যেতেই বাঁশির তীব্র আওয়াজ কানে ভেষে এসেছিল আমাদের। আমরা পিছন ফিরে দেখি পুলিশ আমাদের ধরতে আসছে। কঙ্কণা ভয়ে পেয়ে গিয়েছিল, বলল- পুলিশ কেন? আমি বললাম- আমি স্বদেশী করি। পরে সব বলছি, এখন পালাও। দুই জন্যই ছুটলাম সেই পথ দিয়ে। পুলিশও আমাদের পিছু নিল। বুঝেছিলাম আজ তাদের চোখে ধুলো দেওয়া মুশকিল হবে। পরের দিন বহু জায়গায় লুঠ করা হবে থানা, ইংরেজ কুঠি বাড়ি, জমিদার কাছারি বাড়ি। আজ পালিয়ে সবাই কে ঠিক খবর দিতে না পারলে, সেই পরিকল্পনা বিফলে যাবে। মেয়েটিকে বললাম- এই ভাবে পালানো যাবে না। তুমি গঙ্গা ঘাটের মন্দিরে গিয়ে লুকিয়ে পরো। সুযোগ বুঝে নৌকা ধরে ওপারে চলে যেও। - আর আপনি, ঘুর পথে গিয়ে আমি তোমার সাথে ওখানেই দেখা করবো। ' ইনক্লাব জিন্দাবাদ'। - আচ্ছা। সে দিন আমি সোজা গঙ্গার ঘাটে দিকে না গিয়ে বাঁ পাশের রাস্তাটা ধরে এগিয়ে গিয়েছিলাম। পুলিশও আমার পিছু নিয়েছিল। আমি সেদিন শাল বনের ভিতর দিয়ে লুকিয়ে সোজা গঙ্গায় ঝাঁপিয়ে পরেছিলাম। এটা মূল নদী নয়, তারই ছোট একটা শাখা, অপেক্ষাকৃত অনেক সংকীর্ণ তাই সাঁতরে পেরিয়ে যেতে অসুবিধা হয়নি। তারপর সাঁতরে যখন ওপারে উঠেছিলাম তখন আমার কানে ভেসে এসেছিল এক কোলাহল। উৎস স্থল ওপাড়ের গঙ্গা ঘাটের মন্দির। কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুনের লেলিহান শিখা মন্দিরটাকে গ্রাস করেছিল। চিন্তায় আমার সমস্ত কাঁপছিল। কঙ্কণা ওই মন্দিরেই ছিল। মুহুর্তের মধ্যে ওখানে থেকে গুলির শব্দ শোনা গিয়েছিল। বুঝতে অসুবিধা হল না, আমাকে খুঁজে না পেয়ে পুলিশ কঙ্কণাকে খুঁজতে ওই দিকে গিয়েছিল। দাঙ্গাকারিদের সামনে পরে আত্মরক্ষার জন্য গুলি চালিয়েছে। যে ইংরেজ শাসক নিজের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছিল আজ তার আঘাতেই জর্জরিত। পরে আর মেয়েটির সাথে দেখা হয়নি। পরে ওখানে গিয়ে তার খোঁজ করাতে কাউকে বলতে শুনেছিলাম দাঙ্গাকারিদের আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে, আবার কেউ কেউ বলেছিল পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গিয়েছে, আবার কেউ কেউ বলেছে মেয়েটি গঙ্গার ওপারে কোন আশ্রমে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। সত্যিটা সেই দিনও জানতে পারিনি আজও নয়। আজ ডাইরিতে তুলে রাখছি বিবর্ণ হয়ে যাওয়া সেই স্মৃতিকথা। কাছের মানুষ হারিয়ে যায়, স্মৃতিবিজড়িত স্থান বদলে যায়, সময় বয়ে যায়, রয়ে যায় কিছু বেদনা দায়ক স্মৃতি। এই ধরণের স্মৃতি নিয়ে আমার মতো কারুর জাতিস্মর না হওয়াই ভালো
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now