বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
দাউদাউ করে আগুন জলছে।বাড়িটার ভিতরে দুজন মানুষ এখনো বের হতে পারেনি।ফায়ার সার্ভিসের লোক পৌঁছে গেছে।তারা প্রাণপণ চেষ্টা করছে তিনজনকে বাঁচানোর।কালো ধোয়াতে আকাশের রংটা ভয়ংকর দেখাচ্ছে।ভিতরে থাকা দুইজনের তখন একটাই চিন্তা “ছেলেটার এখন কি হবে”...
.
- সাকিব,সাকিব উঠে পড়।দ্যাখ সকাল হয়ে গেছে।আর কতক্ষণ ঘুমাবি??
- এইতো আম্মু আর দশ মিনিট।
- আরে গরু,ছাগল ও একবার বললে কথা শোনে।আর তুই এক গাধা।কোনো কথায় শুনতে চাসনা।তোর কি হবে??কি করবি ভবিষ্যতে?
উঠে পড়লাম আমি।আর বেশিক্ষণ শুয়ে থাকলে আম্মু বকবক করেই যাবে।এই আম্মুরা কি আর কিছু পারেনা??শুধু শান্তি নষ্ট করতেই পারে??আমি হাতমুখ ধুয়ে নাস্তা করতে গেলাম।ঘড়িতে দেখলাম মাত্র ৭ টা বাজে।ফোনটা হাতে নিয়ে টিপছি।এমন সময় আম্মু এসে আবার শুরু করল।
.
- ঘুম থেকে উঠেই লেগে গেলি?আচ্ছা তোর কি আর কোনো কাজ নাই??হয় ফোন টেপা নাহয় ঘুমানো??
- আম্মু আবার শুরু করলে।
- হ্যা করলাম।এইচ এস সি পরীক্ষা দিয়ে খুব বড় কিছু হয়ে গেছিস তুই??সবাই এডমিশনের চিন্তায় অস্থির।আর তুই গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস।
- আমিও করব।চিন্তা কোরো না।
- চিন্তা হয় আমার।তুই কোনো কাজ ঠিকমত করিস না।গুছিয়ে কাজ করা শিখলি না এখনো।তোকে নিয়ে ভয় হয় আমার।একটু জীবনটাকে নিয়ে সিরিয়াস হবার চেষ্টা কর।
- ধুর।সবসময় এক কথা।গেলাম আমি।ভালো লাগে না তোমার এই বকবক।
বের হয়ে আসলাম সবসময় এভাবে কথা বলে কেন??অসহ্য লাগে আমার।কবে স্বাধীনতা পাব??আব্বু আম্মুর হাত থেকে মুক্তি পাব কবে??এইসব ভাবতে ভাবতে তানহাকে ফোন দিলাম।তানহা আমার ইয়ে মানে গার্লফ্রেন্ড আর কি।এইবার এস এস সি পরীক্ষা দিল।কলেজে ভর্তি হবে।
- হ্যা তানহা।কি করো??
- এইতো ঘুম থেকে উঠলাম।তুমি কি করো?
- বাসা থেকে বের হলাম।এখন দেখা করতে পারবা?
- কোথায় দেখা করবা?
- বক চত্বরে চলে আস।আমি আসছি।
- ওকে।বাই।
অনেক ভালো লাগছে এখন।কেন জানি মাঝে মাঝে নিজেকে অনেক লাকি মনে হয়।তানহার মত কাউকে পাওয়া সত্যি ভাগ্যের ব্যাপার।
.
তানহাকে সকালের ব্যাপারটা বললাম।আম্মু আব্বুর সারাদিন বকবক করার কথা বললাম।
- আচ্ছা আংকেল আন্টি তো তোমার ভালোর জন্য বলছেন এসব।যাতে তুমি জীবনে সেটল হতে পার।এগুলো এত নেগেটিভলি নেয়ার কোনো কারণ তো দেখছি না।
- তুমিও শুর করলে??আমি ভাবতাম অন্তত একজন আছে যে আমাকে সাপোর্ট করবে।
- সাকিব এতে সাপোর্ট করা না করার কি আছে।তুমি এডমিশনের চেষ্টা করবে পড়ালেখা করবে চাকরি করবে এগুলো তো নিজের বুদ্ধিতে।আমাদের সাপোর্ট টা তো শুধু উৎসাহ দেয়া।
- (নিশ্চুপ)
- আন্টি আংকেলের কথা কোনো ভুল নেই।
.
আমি চলে আসলাম।একবারের জন্য পিছন ফিরে তাকাইনি।সেদিন উঠে এসেছিলাম রাগে।প্রচন্ড রাগের কারণে ভর্তি হলাম একটা এডমিশন কোচিংএ।আল্লাহর রহমতে কোনোমতে চান্স পেয়েছিলাম ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে।আব্বু আম্মু অনেক খুশি হয়েছিল সেদিন।কিন্তু আমার বেপরোয়া ভাব তখনো যায়নি।আমি তানহাকে ইগ্নোর করতে থাকি।অনেক বড় জয় করার একটা ভাবনা আমার ভিতরে গড়ে ওঠে।সবাইকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতে থাকি।যখন ইউনিভার্সিটির পড়া প্রায় শেষ তখন আমি বিসিএসের কোচিং শুরু করি।
.
একদিন বিকেলে আমার চাচু আমাকে ফোন দিলেন।
- হ্যালো সাকিব।
- হ্যা চাচু বলেন।
- সাকিব বাবা তাড়াতাড়ি কুষ্টিয়া চলে আয়।তোর আব্বুর শরীরটা ভালো না।টুট টুট টুট...(ফোন কেটে দিলেন)
.
হঠাত আব্বুর কি হল??আর চাচু এভাবে বললেন কেন?আমাকে কোনো কথা বলতে দিলেন না।অজানা একটা আশংকা আমার ভিতরে দানা বাধল।আমি তখনি রেডি হয়ে কুষ্টিয়া রওনা দিলাম।
.
বাসার কাছে পৌছে গেছি আমি।দূর থেকে একটা কালো বাড়ি দেখলাম।আগুনে পুড়ে কালো হয়ে গেছে।ধোয়া উঠছে এখনো।আমি থমকে দাঁড়িয়ে গেলাম।বাসাটা আমাদের।জীবনের সবথেকে বড় শক নিয়ে আমি ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম।বাসার সামনে আসতেই আমার কিছু আত্মীয় আমাকে ধরে কাঁদতে লাগলেন।আমার বুঝতে বাকি রইল না কি হয়েছে।আমি একা হয়ে যাচ্ছি।একদম একা।মাথাটা একটু ঘুরে গেল।আমি কিছু চিন্তা করতে পারলাম না।চারদিক অন্ধকার হয়ে এল...
.
- সাকিব,সাকিব এই সাকিব।Are you ok??
কণ্ঠটা আমার খুব পরিচিত।একটা মেয়ের কণ্ঠ।কিন্তু চিনতে পারছি না।আমি চোখ টা খুললাম।আমার পাশে তানহা।
- তানহা তুমি??
- হ্যা আমি।
- আমি কোথায় এখন??আব্বু আম্মু কোথায়??
- তুমি এখন হাসপাতালে।চলো..
তানহা আমাকে হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নিয়ে গেল।একটা রুম দেখিতে দিল।
এক পা এক পা করে এগিয়ে গেলাম আমি।বেডে কেউ একজন শুয়ে আছে।তার সারা শরীর পুড়ে গেছে।চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল আমার।
- বাবা এসেছিস??
- হ্যা মা এসেছি।
- দ্যাখ তো তুই এলি আর আমি কোনো রান্না করতে পারলাম না??
- আম্মু ..
- চুপ।আমি জানি তুই কি বলতে চাচ্ছিস।কিচ্ছু বলা লাগবে না।
-(নিশ্চুপ)
- তুই মনে হয় জানিস না তুই এই হাসপাতালে হয়েছিলি।ছোট্ট ছোট্ট হাত পা নিয়ে আমার কোলে শুয়ে খেলা করছিলি।আজ কত বড় হয়ে গেছিস তুই।
শোন তোকে কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট হতে হবে।তোর কাছে আমার এই শেষ আবদার।
সাকিব কখনো কাউকে কষ্ট দিবিনা।আর হ্যা তানহাকে অনেক সুখে রাখবি।মেয়েটাকে পুত্রবধূ হিসেবে দেখে যেতে পারলাম না।এই একটা আফসোস।আজ থেকে তুই স্বাধীন।তোকে বকার জন্য আমি তো আর থাকব না।
.
আমি কি বলব বুঝতে পারিনি।আমার কান্না ঠেকাতে পারিনি আমি।আমার মায়ের শেষ কথাটা আমার বুকে তীরের মত বিধেছিল।সারাজীবন কত কষ্ট দিয়েছি মাকে।শেষবার আব্বুর সাথে কথাউ বলতে পারিনি আমি।
- সাকিব বাবা তোকে একটা অনুরোধ করি??
- বলো মা..
- তুই চলে যা।তুই আমাকে কবর দেয়ার সময়ও থাকিস না।তোর কাছে আমি জীবিত থাকতে চাই।তুই তানহাকে নিয়ে চলে যা।
আমি এবার নিজেকে সামলাতে পারলাম না।
-“ মা !”
কোনো সাড়া নেই ।
আবার ডাকলাম আমি ।
- “ মা !”
এবারো কোনো সাড়া নেই ।
আর পারছি না আমি । গলার ভেতর থেকে কি যেন একটা উঠে আসতে চাইছে । চেষ্টা করেও সেটা আঁটকাতে পারছি না । আমার মুক্ত সত্ত্বাটা হঠাত যেন মিলিয়ে গেলো কোথাও ।
- আমি এমন স্বাধীনতা চাইনি,সত্যি বলছি আমি,একবার বিশ্বাস করো,আমি সত্যিই এমন স্বাধীনতা চাইনি।
আমি মুক্তি চেয়েছিলাম।আমাকে আর কেউ বাঁধা দিবে না কোনো কাজে,আমি গোসলে সাবান না মাখলেও কেউ বলবে না,“ তোর শরীর থেকে তো ছাগলের গন্ধ বের হচ্ছে , যা গোসল করে আয় আবার।”
আমি ঘর না গোছালেও কেউ বলবে না , “ ঘরটাকে গোয়াল ঘর বানিয়ে রেখেছিস একেবারে,তুই কি কোনোদিনই মানুষ হবি না?”
যেখানে সেখানে প্রশ্ন ফেলে রাখলেও কেউ বলবে না,“ পরীক্ষা শেষ বলেই কি এগুলো ফেলে রাখতে হবে?পরের পরীক্ষার জন্য প্র্যাকটিস তো করতে পারবি ! ওগুলো গুছিয়ে রাখ!”
আমাকে আর কেউ বকবে না , আমি মুক্ত!এই অনুভূতিটা পাওয়ার ইচ্ছা নেই আমার।একদিকে আমার মুক্ত সত্ত্বা – অন্য দিকে তোমার আঁচল ধররে বেড়ে ওঠা ছোট্ট আমি’ সত্ত্বা – দুটোর পারস্পরিক দ্বন্দে আমি সত্যিই হারিয়ে গিয়েছিলাম ।
আমি এমন স্বাধীনতা চাই না ,যে স্বাধীনতা আমাকে তোমার বকুনি শোনার অধিকারটুকু কেড়ে নেয়।এমন জীবন চাই না আমি ,যা প্রতিটি মুহুর্তে আমার অসহায়ত্ব প্রমাণ করে ,চাই না এসব।
আমি পুরোনোতে ফিরতে চাই,আগের মত ভয় পেয়ে তোমার আঁচলে মুখ লুকোতে চাই।সত্যি বলছি আম্মু , আগের মত আবার তোমার বকুনি শুনে কানে ইয়ারফোন গুঁজতে চাই আমি , বিশ্বাস করো…….”..
.
জমানো কথাগুলো আর বলতে পারলাম না আমি । গলায় ওঠে আসা বাঁধাটা আমাকে বলতে দিচ্ছে না কিছু ।
কতক্ষণ এভাবে থাকলাম জানি না।যখন চোখ খুললাম দেখলাম আম্মুর চোখ বন্ধ।
আমি ডাকলাম আম্মুকে
- আম্মু.
- ....
- আম্মু...
- (নিশ্চুপ)
জড়িয়ে ধরলাম শেষবার আম্মুকে।অনেক কষ্ট দিয়েছি তোমাকে আমি।অনেক বেখেয়ালি ছিলাম।আজ বুঝলাম কি ছিলে তুমি আমার।আমার জীবনের সব ছিলে তুমি।তুমি চলে গেলে।কিন্তু আমাকে বুঝিয়ে দিয়ে গেলে জীবনের মানে। আমার চোখদুটো ঝাপসা হয়ে আসছে আবার।হাতের উপর কয়েকফোটা উষ্ণতাও টের পেলাম।পেছন থেকে আম্মু আমাকে ডাকলো না।আর কেউ না জানুক,আম্মু তো জানে,তার অগোছালো ছেলেটি এবার গোছালো হতে শিখছে।তার সেই ছন্নছাড়া অবাধ্য ভীতু পিচ্চিটি – যে কিনা সামান্যতেই শাড়ির আঁচলে মুখ লুকাতো,সেই পিচ্চিটি আজ হঠাত করেই বুঝতে শিখেছে,সে বড় হয়ে গিয়েছে।
তাকে এগিয়ে যেতে হবে সামনে।আমি আর পিছনে তাকাইনি।আম্মু আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে বলেছে।আমি এগিয়ে যাব।
আমি রুম থেকে বেরিয়ে এলাম।দেখলাম সবাই আমার জন্য অপেক্ষা করছে।তানহাকেউ দেখলাম।ওর চোখ ভেজা।পিছনে ডাক্তারদের হুটোপাটি লেগে গেল।
- কি হয়েছে সাকিব??
সবাই জিজ্ঞেস করল।
আমি হালকা নিষ্প্রাণ একটা হাসি দিয়ে বাইরে পা বাড়ালাম।কারোর মা বাবা মারা গেলে মানুষ কিভাবে হাসে সবাইকে তা ভাবিয়ে তুললো।শুধু তানহা আমার হাসির মানে বুঝেছিল।
বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়েছে।সবাই বৃষ্টি থেকে বাচার চেষ্টা করছে।কোথায় যেন পড়েছিলাম বর্ষার ১ম বৃষ্টিতে ভিজলে পাপ ধুয়ে যায়।আমি বাইরে পা বাড়ালাম।সবার দৃষ্টি উপেক্ষা করে চলে আসছি আমি।ভিজতে ভিজতে এগোচ্ছি আমি।পিছন থেকে তানহার কণ্ঠ শুনতে পেলাম।আমি দাঁড়ালাম।তানহার হাতটা শক্ত করে ধরলাম।কখনো ছাড়া যাবে না এই হাতটা।সামনে এগিয়ে যাচ্ছি আমি।আমি আর তানহা।
..বাদল মাসের প্রথম বৃষ্টিতে এগিয়ে যাচ্ছি দুইজন...এই যাত্রা শেষ হবার নয়।গন্তব্যহীন গন্তব্যে যে যাত্রা তা শেষ হবার কথা না।
গল্প-প্রথম বৃষ্টি
সাকিব হাসান---
উৎসর্গ-হুমায়ন আহমেদ।(এটা দেখে অনেকের ভ্রু কুচকাতে পারে।কিন্তু আমি মন থেকে গল্পটা স্যারকে উৎসর্গ করেছি।গল্পের শেষ লাইনটা তার গল্প থেকেই নেয়া।)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now