বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

চকের ধুলায় আঁকা আন্দোলন

"শিক্ষা উপকরন" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান মোহাম্মদ শাহজামান শুভ (০ পয়েন্ট)

X – মোহাম্মদ শাহজামান শুভ ঢাকার আকাশে ভোরের আলোটা সেদিন যেন কেমন মলিন ছিল। শহরটা ঘুম থেকে জেগে উঠছে, কিন্তু কোথাও একটা ক্লান্তির রেখা যেন ঝুলে আছে বাতাসে। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে রাস্তায় সারি সারি মানুষ। হাতে ব্যানার, গলায় ঝোলানো ফেস্টুন, মুখে দৃঢ় সংকল্পের ছাপ। এরা কেউ রাজনীতিবিদ নয়, কেউ আন্দোলনের পেশাদার নয়। এরা দেশের সেই মানুষগুলো, যাঁদের হাতে থাকে কলম, যাঁদের কণ্ঠে শোনা যায় পাঠশালার সকালবেলার ডাক—“বই খোলো সবাই, নতুন পাঠ শুরু হোক।” আজ তাঁরা ক্লাসরুমে নেই, আজ তাঁরা রাস্তায়। কারণ, জীবনের পাঠশালায় তাঁরা শিখে নিয়েছেন—কখনও কখনও পাঠ দিতে হলে আন্দোলনেও নামতে হয়। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলনের আজ তৃতীয় দিন। ২০ শতাংশ বাড়ি ভাতার দাবিতে তাঁরা ঢাকার বুকে বসেছেন ন্যায্যতার দাবিতে। ভোর থেকেই রাস্তাটা ভরে গেছে নানা জেলার শিক্ষক দিয়ে—কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, যশোর, রাজশাহী, খুলনা, পঞ্চগড়, কক্সবাজার—সব জায়গা থেকে আসা মুখগুলোয় ক্লান্তি আছে, কিন্তু চোখে আগুনের মতো জেদ। কৃষি শিক্ষক আব্দুল্লাহ মিয়া মাটিতে বসে চায়ের কাপে শেষ চুমুকটা দিয়ে বললেন, —“তিন দিন হয়ে গেল ভাই, তবু মনে হয় লড়াইটা আজই শুরু হলো। ছাত্ররা ফোন দেয়, বলে—‘স্যার, আজ ক্লাস হবে না?’ আমি ওদের কী বলব? বলি, বাবা, স্যাররা আজও শেখাচ্ছে, শুধু জায়গাটা বদলে গেছে।” তার পাশে বসা রুবিনা আপা হেসে মাথা নাড়লেন। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, কিন্তু চোখের তলায় ক্লান্তির ছাপ যেন আরও পুরনো। তিনি বললেন, —“আমার মেয়ে কাল রাতে ফোনে কাঁদছিল। বলল, মা, তুমি রাস্তায় কেন? আমি বলেছি, মা, যদি আজ আমি রাস্তায় না বসি, তুই একদিন ক্লাসে বসতে পারবি না।” তাঁদের চারপাশে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বসেছে শিক্ষকরা। কেউ পোস্টার লিখছে, কেউ ব্যানার ধরে দাঁড়িয়ে আছে, কেউ মঞ্চে বক্তব্য দিচ্ছে। কিন্তু এ যেন কোনো উত্তেজনাপূর্ণ রাজনৈতিক সমাবেশ নয়; বরং ক্লাসের মতোই একটি পরিবেশ। এক শিক্ষক অন্যকে বলছেন, “শিক্ষা শুধু পাঠ নয়, এটা মানবতার চর্চা।” অন্যজন মাথা নেড়ে বলেন, “তাই তো, আজ আমরা মানবতার পাঠ পড়াচ্ছি।” দুপুরের দিকে রোদটা যেন প্রতিশোধ নিচ্ছে। তীব্র উত্তাপে রাস্তা গরম হয়ে উঠেছে, কিন্তু আন্দোলনকারীদের মুখে একফোঁটা অনুতাপ নেই। বরং স্লোগানের তালে তালে তাদের কণ্ঠে উচ্চারিত হচ্ছে দৃঢ়তা। —“২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা চাই, চাই, চাই!” —“শিক্ষক বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে!” একজন বৃদ্ধ শিক্ষক মাথায় ভেজা তোয়ালে রেখে চুপচাপ বসে আছেন। হাতে রবীন্দ্রনাথের ‘শিক্ষা ও সমাজ’ বই। পাশে বসা তরুণ শিক্ষক রিয়াদ বলল, —“স্যার, এই রোদে বই পড়ছেন?” বৃদ্ধটি মৃদু হেসে বললেন, —“এই বই পড়েই তো জানতে পারি, সমাজে শিক্ষকের জায়গা কোথায় ছিল আর এখন কোথায় নেমেছে। রোদে পোড়ার চেয়ে সেই সত্যটাই বেশি জ্বালায়।” তাদের আশপাশে তরুণ শিক্ষকদের দল গাইতে শুরু করে—“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি।” কণ্ঠগুলো ভেসে যায় বাতাসে, মিশে যায় শহরের ধুলায়। রিয়াদ বলল, “এই গান গাইলে বুকের ভেতর সাহস আসে স্যার। মনে হয় আমরা ইতিহাসেরই একটা অধ্যায়ে আছি।” বিকেলের দিকে আন্দোলনে যোগ দেয় একদল শিক্ষার্থী। হাতে ফুল, চোখে উদ্বেগ। এক ছাত্রী এগিয়ে এসে বলল, —“স্যার, আপনি রোদে বসে আছেন, আমরা তো লজ্জায় মাটিতে মিশে যাচ্ছি। আমাদের পড়ান, আমরা আপনাদের পক্ষে আছি।” শিক্ষকেরা তখন অবাক নীরব। কেউ কেউ চোখ মুছছে, কেউ ফুলটা বুকে চেপে ধরছে। একজন বলল, —“দেখলে রুবিনা আপা, আমাদের পাঠ এখানেই শুরু হয়েছে। ছাত্ররাই আজ আমাদের শিখিয়ে দিচ্ছে, মর্যাদা মানে কী।” সূর্য যখন পশ্চিমে হেলে পড়ছে, তখন কিছু কর্মকর্তা এলেন আন্দোলনস্থলে। তাঁরা বললেন, “বিষয়টি বিবেচনায় আছে। ধৈর্য ধরুন।” কথাগুলো বাতাসে উড়ে গেল। যেন পুরনো স্ক্রিপ্ট। শিক্ষকরা তাকিয়ে থাকলেন নিরুপায় চোখে। কেউ চুপ করে, কেউ ঠোঁটে শুকনো হাসি টানল। ফেনী থেকে আসা এক শিক্ষক বলল, —“আমরা তো ছাত্রদের সব সময় বলি, ধৈর্য ধরলে ফল মেলে। এখন নিজেরাই সেই পাঠ নিচ্ছি।” রাত নামার পর প্রেস ক্লাবের সামনে সেই আন্দোলন মঞ্চ বদলে গেল নিঃশব্দ পাঠশালায়। কেউ দোয়া পড়ছে, কেউ শুয়ে আছে রাস্তায়, কেউ চুপচাপ তারা দেখছে। একজন শিক্ষক নিজের ছেলেকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। ছেলেটি কাগজে আঁকছে—একটা ঘর, একটা গাছ, একটা স্কুল, আর একদল মানুষ—হাতে লেখা, “আমার স্যার আন্দোলনে।” শিক্ষকটি হেসে কাগজটা দেখে বললেন, —“বাবা, একদিন এই ছবিটাই ইতিহাস হবে।” ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, —“ইতিহাস মানে কী বাবা?” বাবা উত্তর দিলেন, —“ইতিহাস মানে, যারা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তাদের গল্প।” চারদিক নিস্তব্ধ। কেবল ব্যানারের দুলে ওঠা শব্দ, আর বাতাসে মিশে থাকা চকের ধুলার গন্ধ। সেই ধুলা হয়তো কোনো স্কুলের ব্ল্যাকবোর্ডে এখনো পড়ে আছে, যেখানে লেখা—“মানুষ হও সবচেয়ে আগে।” এই আন্দোলনের মানুষগুলো জানে, তাদের দাবি খুব বড় কিছু নয়—শুধু ২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা। কিন্তু তার ভেতরে আছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা—সম্মান। তারা চায় না দান, চায় না অনুগ্রহ, তারা চায় সমতা। রাতের গভীরে একজন বৃদ্ধ শিক্ষক ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলেন, —“আমরা ভিক্ষা চাই না, আমরা অধিকার চাই। আমরা শিক্ষক, আমরা সম্মান চাই।” তার কণ্ঠে ক্লান্তি ছিল, কিন্তু সেই ক্লান্তি যেন জয়গানের মতো বাজছিল বাতাসে। আকাশের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, তারারাও যেন এক মুঠো চকের ধুলা হয়ে ঝরে পড়ছে রাস্তায়। সকালের আলো যখন আবার ঢাকাকে ছুঁয়ে যাবে, তখন হয়তো শিক্ষকরা আবার গলা উঁচু করে বলবেন— “আমরা শিক্ষক, আমরা আলো দিই, আমাদের আলো নিভে গেলে, তোমাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭১ জন


এ জাতীয় গল্প

→ চকের ধুলায় আঁকা আন্দোলন

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now