বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
চিলেকোঠার ভুত
রকিব হাসান
----------------
(পর্ব ১)
‘কেমন জায়গা! গা ছমছম করে!’
কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বলল জুলিয়া। চিলেকোঠার দরজায় থমকে দাঁড়াল। ভাপসা গন্ধ। বিরাট ঘরটার দিকে তাকিয়ে মেরুদণ্ডে শীতল শিহরণ বয়ে গেল। চিলেকোঠা সাধারণত এত বড় হয় না। দিনের বেলাতেও অন্ধকার। একমাত্র জানালাটার পাল্লার ওপরে আড়াআড়ি তক্তা লাগিয়ে পেরেক ঠুকে আটকে দেয়া হয়েছে। অনেক দিন কেউ আসে না এখানে। ধুলো আর মাকড়সার জালে ভরা।
লালবাগের এই পুরনো বাড়িটাতে নতুন ভাড়া এসেছে ওরা। ওর বাবা সাংবাদিক, পত্রিকায় চাকরি করেন, মফস্বল থেকে সবে ঢাকায় বদলি হয়ে এসেছেন। বাড়ির মালিক তাঁর বন্ধু, জমিদারের বংশধর, বাপ-দাদার পুরনো আমলের ভিটেটা যেভাবে ছিল সেভাবেই রেখে দিয়েছেন, এখনও ভাঙেননি। তিনি থাকেন গুলশানে। জুলিয়ার বাবাকে বলেছেন, ‘যতদিন পারো, থাকো, ভাড়া দিতে হবে না। ভালো বাসা পেলে চলে যেয়ো।’
‘কিছু দেখেছিস?’কয়েক ধাপ নিচ থেকে জিজ্ঞেস করল ওর ভাই কামরুল। হাতে একটা মলাটের বাক্স। ‘আম্মা বলল, আজেবাজে জিনিস সব এখানে ফেলে রাখতে। কি অন্ধকার! উঁহ্, গন্ধ! ভূত নেই তো রে।’
ভূত! চমকে গেল জুলিয়া। আঠারো বছর বয়েস ওর। কলেজে পড়ে। এই বয়েসে ভূত বিশ্বাস করা উচিত নয়।
কামরুল হাসল, সে করে না। বোনের চেয়ে দুই বছরের বড়। বাবার সমান লম্বা হয়ে গেছে। ‘ভয় পাচ্ছিস? এমনি, একটু দুষ্টুমি করলাম।’
দাঁড়িয়ে আছে জুলি। ঘরটা যেন আটকে ফেলেছে ওকে। আলো সয়ে এসেছে চোখে। অন্ধকার কোণগুলো এখন দেখতে পাচ্ছে। সবখানে কেবল ছায়া। ভুতুড়ে লাগে।
বাক্স রেখে দেয়ালের দিকে তাকাল কামরুল, ‘সুইচটা কই?’
অনেক খুঁজেও সুইচবোর্ডটা পেল না সে। তার-টারও দেখল না। তার মানে এখানে বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা নেই। হেসে বলল, ‘দারুণ। এই না হলে চিলেকোঠা। যখনই আসো, হাতে করে একটা মোম কিংবা হ্যারিকেন নিয়ে আসতে হবে। টর্চের আলোও এখানে মানাবে না, কি বলিস?’
নিচ থেকে গোটা তিনেক মোম আর একবাক্স দেশলাই নিয়ে এলো সে। দুটো মোম ধুলোয় ঢাকা কাঠের তাকে রেখে দিয়ে একটা ধরাল। সেটাকে তাকের এক কোণে বসিয়ে দিয়ে বাক্সটা রাখল মোমগুলোর সঙ্গে। ‘এগুলো এখানে থাক। দরকার হলে জ্বালাতে পারব।’
মোমের আলোয় আরও ভীতিকর হয়ে উঠল ঘরের পরিবেশ। বড় বড় ছায়া নাচতে লাগল দেয়ালে। ঢোক গিলল জুলিয়া, ‘চলো, নেমে যাই।’
‘আরে দাঁড়া, দাঁড়া। ওই ট্রাংকটায় কি, দেখি।’এগিয়ে গেল কামরুল। তক্তার মেঝে মড়মড় করে উঠল।
কাত হয়ে ট্রাংকটার দিকে তাকাল জুলিয়া। অতি অতি সাধারণ চেহারা। অনেক পুরনো আমলের। হাত দিলেই যেন ভেঙে যাবে। ঘরের আর সব জিনিস এই যেমন বাক্স, সুটকেস, এমনকি দেয়ালে বসানো ফাটা গোল বড় আয়নাটার মতোই বাতিল আর পুরনো লাগল এটাকেও।
তবে কামরুলের কাছে অন্য রকম মনে হলো ট্রাংকটা। নুয়ে ভালো করে দেখল। ‘জুলিয়া, দেখ, সামনে কি লেখা। এস. আর.। কারও নামের আদ্যক্ষর, কি বলিস? পঞ্চাশ-ষাট বছরের কম হবে না পুরনো।’
‘আমার কি? চলো, এখান থেকে চলে যাই। ভালো লাগছে না।’চারপাশে তাকাতে গিয়ে নিজের অজান্তেই কেঁপে উঠল জুলিয়া। 'ভাইয়া, তোমার কেমন লাগছে জানি না, আমার সত্যি
খুব খারাপ লাগছে ঘরটা। কেমন ভার ভার। মনে হচ্ছে কিছু একটা আছে।’
শুধু এই চিলেকোঠা নয়, পুরো বাড়িটাই ভালো লাগেনি জুলিয়ার। অনেক বেশি পুরনো, অনেক বড়, আর অতিরিক্ত অন্ধকার। বেশির ভাগ ঘরই ধসে পড়া, জানালা-দরজার অবস্থা শোচনীয়। গোটা তিনেক ঘর আছে ভালো। চুনকাম করে নিলে বাস করা যাবে। কুমিল্লায় কত আরামে ছিল ওরা। খোলামেলা বাড়ি, নারকেল-সুপারির গাছ, পুকুর। সেসব ছেড়ে কেন যে আব্বাটা ঢাকার এই ঘিঞ্জি এলাকায় আসতে গেল!
কুমিল্লার বাড়ির কথা, কলেজের কথা, বন্ধু-বান্ধবদের কথা ভেবে চোখ ভিজে এলো তার।
আব্বা বলেছেন, ‘হঠাৎ বদ্ধ জায়গায় এসেছিস বলে অমন খারাপ লাগছে। কয়েক দিন যাক, দেখবি আস্তে আস্তে সয়ে গেছে। তখন এই জায়গাটাই ভালো লাগতে আরম্ভ করবে। মানুষ এক অসাধারণ প্রাণী, বুঝলি, সব পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে পারে।’
চিলেকোঠার অস্বস্তিকর অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ট্রাংকটার দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল জুলিয়া, খোদা করুক, আব্বার কথাই সত্যি হোক।
দুই
রাতে খাবার টেবিলে কামরুল বলল, ‘একটা খবর শুনে এলাম।’
ওর বাবা আফসার সাহেব ভাতে টমেটোর ভর্তা মাখাচ্ছেন। নীরবে মুখ তুলে তাকাল জুলিয়া। মা জানতে চাইলেন, ‘কি খবর?’
‘এই বাড়িটা সম্পর্কে।’
‘কি শুনেছিস?’
‘মুদি, কোণের চাওয়ালা, এমনকি বেকারির দোকানের লোকটাও একই কথা বলল।’
‘কি বলল?’
‘বললে বিশ্বাস করবে না।’
‘তুই করেছিস?’
‘না।’
'কি?'
‘এ বাড়িতে ভূত আছে।’
ভাত মুখে দিতে যাচ্ছিল জুলিয়া, মাঝপথে হাত থেমে গেল।
মা বললেন, ‘নতুন দেখেছে তো তোকে, ভয় দেখিয়েছে।’
‘হ্যাঁ, ওদের আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, শুধু শুধু ভয় দেখাতে গেছে,’ জুলিয়া বলল। ‘আব্বা, তোমার কি মনে হয়?’
‘বেশি টক।’
‘ভূত আবার টক হয় কি করে?’
‘ভূত না, টমেটো।’
‘ও, তুমি কিছুই শোননি। ভাইয়া বলছে, এখানকার লোকের বিশ্বাস আমাদের এ বাড়িতে ভূত আছে।’
‘ভূত বলে কিছু নেই,’ ডালের বাটিটা টেনে নিয়ে দুই চামচ ডাল নিলেন আফসার সাহেব। তাতে বেগুন ভাজি মাখাতে লাগলেন। ডালের সঙ্গে কয়েক ধরনের তরকারি মিশিয়ে খেতে পছন্দ করেন।
‘আব্বাকে জিজ্ঞেস করে কোন লাভ নেই। মাথায় নিশ্চয় এখন পত্রিকা ঘুরছে।’ কামরুলের দিকে তাকাল জুলিয়া, ‘ভাইয়া, বলো তো কি শুনে এসেছো? যা যা বলেছে ওরা, সব বলবে।’
‘দাঁড়া, মাছটা শেষ করে নিই। কাঁটা বাছার যে কি ঝামেলা। মাছ খেতে খেতে গল্প করা যায় না। সেজন্যেই তো বলি, বাঙালি খাবারের চেয়ে ইউরোপিয়ান খাবার অনেক ভালো। এই দেখ না, বার্গার কিংবা স্যান্ডউইচ খেতে খেতে গাড়ি চালানো হয়। আর আমাদের? মাছের মতো অত কাঁটাওয়ালা জিনিস। খাসি আর গরুর বিরিয়ানির মতো ভয়াবহ খাবার। হাড্ডির কুঁচি বাছতেই খাওয়ার রুচি শেষ...’
‘তুমি পারো না বলে ওরকম লাগে। সবাই তো কত মজা করে খায়। লেকচার বাদ দিয়ে আসল কথাটা বলো তো। দোকানদাররা কি বলল?’
‘নাহ্, পারলাম না! আমার সাধ্যের বাইরে,’মাছের অবশিষ্ট টুকরোটা পিরিচে ফেলে দিয়ে ডালের বাটি টেনে নিল কামরুল। ভাত মাখাতে মাখাতে বলল, ‘চল্লিশ বছর আগে তোর বয়েসী একটা সুন্দরী মেয়ে বাস করত এ বাড়িতে। নাম সবিতা রায়। আশীষ নামে একটা ছেলের প্রেমে পড়ল। বিয়ে হওয়ার কথা ছিল ওদের।’
খাওয়া শেষ করে হাত ধুতে চলে গেলেন আফসার সাহেব।
ভাত মুখে পুরল কামরুল। চিবিয়ে গিলে নিয়ে বলল, ‘বিয়ের দিন লাল বেনারসি পরে বসে রইল সবিতা। বড়লোকের একমাত্র মেয়ে। বিয়ে বাড়ি গমগম। সানাই বাজছে। রাত বাড়তে লাগল। লগ্ন পেরিয়ে যাচ্ছে। বর আর আসে না। উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল কনের বাড়ির সবাই। সবিতাও অস্থির।’
খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে জুলিয়ার। আগ্রহে গলা বাড়িয়ে দিয়েছে সামনে। ‘বর আসতে দেরি কেন?’
আবার ভাত মুখে পুরল কামরুল। গিলে নিয়ে বলল, ‘বর আর কোনোদিনই আসেনি। প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হলো হঠাৎ। বিয়ে বাড়ি তছনছ। সারারাত চিলেকোঠার খোলা জানালার ধারে দাঁড়িয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল সবিতা। একা।’
‘মেয়েটার জন্যে দুঃখ হচ্ছে,’ মা বললেন।
‘আসল কথাটা শোন, শোনইনি এখনও। সবিতা এত বেশি ভালোবেসেছিল আশীষকে, কিছুতেই ভুলতে পারল না ওকে। এরপর থেকে একটাই কাজ ছিল ওর, সারাক্ষণ জানালার ধারে দাঁড়িয়ে পথের দিকে তাকিয়ে থাকা। ওর ধারণা, একদিন না একদিন আশীষ ওর কাছে ফিরে আসবেই।
‘কিন্তু এলো না আশীষ। এসব ক্ষেত্রে যা করে মানুষ, আত্মহত্যা, তা করেনি সবিতা। কারণ তার বিশ্বাস ছিল, আশীষ ফিরে আসবেই। এসে ওকে না পেলে খুব দুঃখ পাবে।
‘আত্মহত্যা করল না বটে, তবে শরীরের ওপর অত্যাচার করায় শুকিয়ে শুকিয়ে হাড্ডিসার হয়ে মারা গেল সবিতা। কোনো ডাক্তারই কিছু করতে পারল না। সবিতার বাবা-মা আত্মীয়-স্বজন অনেক চেষ্টা করেছে ওর মন থেকে আশীষের ছবি মুছে ফেলতে, পারেনি। ও মারা যাওয়ার পর চিলেকোঠার জানালাটা সেই যে বন্ধ করা হয়েছে, আর খোলা হয়নি।
‘এই এলাকার লোকের ধারণা, আজও এ বাড়িতে বাস করে সবিতার প্রেত। পূর্ণিমার রাতে চিলেকোঠার জানালার দিকে চোখ পড়লে দেখা যায়, খুলে গেছে জানালাটা, এলোচুল পিঠে ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে অপূর্ব সুন্দরী এক মেয়ে। অনেকেই নাকি দেখেছে...’
বলা নেই কওয়া নেই, বিকট শব্দে বাজ পড়ল বাইরে। আকাশে যে মেঘ করেছে, ঘরের ভেতর বসে কিছুই বোঝা যায়নি। নিভে গেল বাতি। ইলেকট্রিসিটি ফেল করেছে। নিকষ কালো অন্ধকারে শোনা গেল সবিতার চিৎকার।
চমকে গেছে ভীষণ।
তিন
রাতে বিছানায় শুয়ে তার ভাইয়ের গল্পের কথা ভাবতে লাগল জুলিয়া। এ বাড়িতে ভূত আছে? অসম্ভব! বাবার মতো সে নিজেও ভূত বিশ্বাস করে না, তবে অতটা মনের জোর নেই বাবার মতো। ছায়া দেখলে কেঁপে ওঠে। পুরনো বাড়িতে ঢুকলে গা ছমছম করছে।
ইস্, বাতিটা গেল যে গেলই, আসার আর নাম নেই। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। রাতে আর বিদ্যুৎ আসবে কিনা কে জানে। মনের পর্দায় ভাসতে লাগল লাল শাড়ি পরা একটা সুন্দরী মেয়ের মুখ। এলোচুল। উদাস, শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনের রাস্তার দিকে...
কখন যে ঘুমিয়ে পড়ল, বলতে পারবে না। সকালে ঘুম ভাঙল বেলা করে। জানালা খুলে দিয়ে বাইরে তাকাল। উজ্জ্বল রোদ। সেদিকে তাকিয়ে রাতের কথা ভেবে হাসি পেল। ধুর, ভূত না ছাই!
নতুন কলেজে সেদিন ভর্তি হবার দিন। তাড়াতাড়ি তৈরি হতে চলল।
কলেজে সেদিনই দুজন বন্ধু জুটে গেল, সোমা আর শিউলি। বাংলার ক্লাস নেন যিনি, মিসেস লায়লা জামান, তিনিও খুব আন্তরিক ব্যবহার করলেন। নতুন কলেজে যাওয়ার অস্বস্তি সহজেই কেটে গেল ওর।
শিউলি জিজ্ঞেস করল, ‘বাসা কোথায় তোমাদের?’
বলল জুলিয়া।
চোখ বড় বড় হয়ে গেল শিউলির। ‘রায় বাড়ি! পুরনো ধসে পড়া জমিদার বাড়িটা?’
'কেন? চেন নাকি?'
মাথা ঝাঁকাল শিউলি। ‘ওটার কাছে একটা বাসায় দুই বছর ছিলাম আমরা।’
‘ও। তাহলে তো ওই এলাকা ভালো করেই চেনো।’
‘আমার আরেক বান্ধবী ওই বাড়িতে ছিল কিছুদিন, রীতা। হঠাৎ গায়েব হয়ে গেল একদিন।’
‘গায়েব!’ শুকনো লাগল জুলিয়ার মুখের ভেতরটা। অনড় হয়ে বসে রইল চেয়ারে। মনে হলো এই ক্লাসরুম, চেয়ার, টেবিল সব বিলীন হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
মাথা ঝাঁকাল শিউলি। নেচে উঠল খাটো করে ছাঁটা চুল। ওর বড় বাদামি চোখ দুটো গোল গোল হয়ে গেল। ‘আজব ঘটনা, জানো! কি হয়েছে কেউ বুঝল না। রীতা হারিয়ে যাওয়ার পর ওদের পরিবার আর দুটো হপ্তাও থাকল না ওই বাড়িতে, একদিন রাত দুপুরে মালপত্র গুছিয়ে তাড়াহুড়া করে চলে গেল। কোনোদিন আর দেখিনি ওদের কাউকে।’
বাড়ি ফিরে এসব কথা কাউকে কিছু বলল না জুলিয়া, কামরুলকেও নয়। বারবার নিজেকে বোঝাতে লাগল, সব বাজে কথা। যেহেতু পুরনো বাড়ি, এটা নিয়ে নানা রকম রোমাঞ্চকর গল্প ফেঁদেছে লোকে। কিন্তু কিছুতেই মাথা থেকে ভাবনাটা দূর করতে পারল না।
রাতে খাবার টেবিলে কামরুল বলল, ‘কাল রাতে চিলেকোঠায় নড়াচড়া শুনেছি আমি।’
জুলিয়ার মনে হলো পেটের মধ্যে কে খামচি দিয়ে ধরল।
‘কি সব ভূত-ভূত করছিস তোরা,’ আফসার সাহেব বললেন। ‘ভূত বলে কিছু নেই।’
মুচকি হাসলেন মা, ‘পোলাপানের কাণ্ড, করতে দাও।’
‘বিশ্বাস করলে না,’ মাকে বলে আড়চোখে বোনের দিকে তাকাল কামরুল। ‘রাত দুপুরে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। কারেন্ট আসেনি তো, ঘর পুরোপুরি অন্ধকার। সব চুপচাপ। প্রথমে বুঝলাম না ঘুমটা কেন ভাঙল, তারপর শুনি চিলেকোঠায় কে যেন কাঁদছে।’
‘সবিতা রায়!’ প্রায় ফিসফিস করে বলল জুলিয়া।
খাওয়ার পর বোনকে বলল কামরুল, ‘চল না, দেখে আসি, রাতের বেলা চিলেকোঠাটাকে কেমন লাগে?’
‘না না, আমি ওখানে যেতে পারব না!’ কিন্তু প্রচণ্ড কৌতূহল দমন করতে পারল না জুলিয়া। গা ছমছমে সেই চিলেকোঠায় আবার এসে ঢুকল।
মোম জ্বালল কামরুল। ছায়া নেচে উঠল দেয়ালে। খোলা দরজা দিয়ে বাতাস এসে দুলিয়ে দিল মাকড়সার জালগুলোকে। ট্রাংকটার দিকে এগিয়ে গেল সে। কিছুক্ষণ পর চিৎকার করে উঠল।
ফাটা আয়নাটার দিকে তাকিয়ে ছিল জুলিয়া। ভাইয়ের চিৎকারে ধড়াস করে লাফ মারল ওর হৃৎপিণ্ড। এতটাই চমকে গেল, মনে হলো দম আটকে যাবে। কি হয়েছে দেখার জন্যে ফিরে তাকাল।
ট্রাংকটা খুলে ফেলেছে কামরুল। ভেতরে একটা লাল বেনারসি। শাড়ির এক এক প্রান্ত হাতে তুলে নিয়ে মোমের আলোয় দেখছে সে।
বুকের মধ্যে দুরুদুরু করে উঠল জুলিয়ার। পায়ে পায়ে এগিয়ে এলো। ভাইয়ের মতোই বিমূঢ় হয়ে সেও দেখতে লাগল। একটা রুমাল বের করেছে কামরুল, এককোণে লেখা রয়েছে দুটো অক্ষর : এস. আর.। নামের আদ্যক্ষর। সবিতা রায়! সেকালে বাংলার চেয়ে ইংরেজি বেশি ব্যবহার করত লোকে, তাই সেটাই ব্যবহার করেছে এ ক্ষেত্রেও।
নিচু হয়ে শাড়িটা ধরতে গেল জুলিয়া। ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্ফুট শব্দ করে উঠল, যেন বিদ্যুতের শক খেয়েছে। অদ্ভুত এক ঠাণ্ডা অনুভূতি হলো হাতে, যেন লাশের গায়ে হাত দিয়েছে, অনুভূতি
ছড়িয়ে পড়ল শরীরে। মনে হলো কে যেন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
কাপড়টা ছেড়ে দিয়ে মুহূর্তে লাফিয়ে সরে গেল সে। ফিরে তাকাল।
কেউ নেই।
ট্রাংকটায় আরও অনেক কিছু পাওয়া গেল, নববধূকে সাজানোর কাপড় আর অন্যান্য সরঞ্জাম, ব্লাউজ, পেটিকোট, স্নো, পাউডার, আলতা, লিপস্টিক-সব পুরনো আমলের। সবই নতুন রয়েছে এত বছর পরও, যেন কেউ সযতনে মুছে মুছে পরিষ্কার করে রেখেছে ওগুলো, ব্যাপারটা বিস্ময়কর মনে হলো ওদের কাছে।
সবিতা রায়ের জিনিস এগুলো, কোনো সন্দেহ রইল না ওদের। মৃত্যু পর্যন্ত সযত্নে আগলে রেখেছিল জিনিসগুলো সে, তার পরও আর এই অভিশপ্ত জিনিসে হাত দেয়নি তার আত্মীয়-স্বজনদের কেউ। যেভাবে আছে, সেভাবেই ফেলে রেখেছে।
জুলিয়ার যে রকম অনুভূতি হলো, কামরুলের তেমন হলো না। জিনিসগুলো আবার ট্রাংকে রেখে দিতে দিতে বলল, ‘চল, এটা নিচে নিয়ে যাই। তোর ঘরে রেখে দিবি। মাকে দেখানো যাবে।’
‘আমার ঘরে!’
‘ওখানে আলো বেশি, ভালো করে দেখতেও পারবি।’
‘কিন্তু আমি নেব কেন?’
‘যেহেতু তুই মেয়ে। এই জিনিসগুলো মেয়ে মানুষের। পুরুষের হলে
আমি নিতাম।’
ঢোক গিলল জুলিয়া, ‘ভাইয়া, আমার ভয় লাগছে। থাক না এগুলো এখানেই।’
বোনের দিকে তাকিয়ে হাসল কামরুল। ‘ভূতটাও সঙ্গে সঙ্গে যাবে ভাবছিস? ঠিক আছে, অত ভয় পেলে থাক এখানেই, নেয়ার দরকার নেই। চল, নামি, অনেক রাত হয়েছে।’
হাত বাড়াল জুলিয়া, ‘আচ্ছা দাও, শুধু রুমালটা। ঘরে নিয়ে রাখি।’
হাসি বাড়ল কামরুলের, ‘দেখতে চাচ্ছিস, ঘরে নিলে কিছু ঘটে কিনা?’
(ক্রমশ)
-----------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now