বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ছত্রিশগড়ের ভাঙা গড়- ৮ম ও শেষ পর্ব

"ভৌতিক গল্প " বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X "ছত্রিশগড়ের ভাঙা গড়" মানবেন্দ্র পাল ---------------------- (৮ম ও শেষ পর্ব) ▪▪▪​অভিশপ্ত গড়▪▪▪ এই অঞ্চলে আদিবাসীরা পাল্কির মতো দোলায় এক একজন লোক চাপিয়ে দৌড়তে দৌড়তে দূর পথ পার হয়ে যায়৷ এরা এতই গরিব আর এতই অল্পেতে তুষ্ট যে, এই দোলায় নিয়ে যাবার জন্যে যে পারিশ্রমিক চায় তা নিতান্তই সামান্য। আমরা দুজনে দুটো দোলায় চেপে ভোররেলায় রওনা হয়ে সেই পাহাড়ের নীচে যখন পৌঁছলাম বেলা তখন বারোটা বেজে কুড়ি মিনিট। চারিদিক নিস্তব্ধ। মাঝে মাঝে জোর বাতাস বইছে৷ সেই বাতাসের ঝাপটায় গাছের পাতা খসে পড়ছে টুপটাপ৷ আশ্চর্য, পাতা খসার শব্দটুকু ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। এত গভীর জঙ্গলেও পাখির ডাক শুনতে পেলাম না। বেঁজি যদিও বা দুচারটে চোখে পড়ছে তাও তারা যেন সন্ত্রস্ত৷ এত ভয় কিসের ভয় কে জানে! দোলায় বাহকদের প্রচুর জলযােগের ব্যবস্থা করে আমরা পাহাড়ে উঠতে লাগলাম৷ যতই উঠতে লাগলাম ততই স্মিথ সাহেবের ডায়েরির কথা মনে পড়তে লাগল। তাতে জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের যে বর্ণনা পড়েছিলাম হুবহু মিলে যাচ্ছে৷ অথচ সে আজ কত বচ্ছর আগের লেখা। আমার আগে আগে কখনও হেঁট হয়ে, কখনও দু’ জানুর ওপর ভর দিয়ে, কখনও বা হামাগুড়ি দিয়ে উঠছো সুরঞ্জনবাবু। আমি ঠিক তার পিছনে। পাহাড়ে ওঠা সুরঞ্জনবাবুর অভিজ্ঞতা আছে কিনা জানি না। আমার যা আছে তা দেওঘরের নন্দন পাহাড়… বড়ােজাের গিরিডির খ্রিস্টানহিল পর্যন্ত। কিন্তু এ পাহাড় একেবারে অন্য জাতের। একেবারে বুনাে পাহাড়। সময়ে সময়ে গাছের শেকড় পর্যন্ত ধরে উঠতে হচ্ছে। উঠছি আর একবার করে মাথা তুলে দেখছি আরও কতটা উঠতে হবে ৷ কিন্তু সুরঞ্জনবাবু একমনে উঠেই যাচ্ছেন ৷ মাঝে মাঝে সতর্কভাবে এপাশ ওপাশ দেখছেন পাছে কোনো বুনাে জন্তুর সামনে পড়ে যান। এতক্ষণ যে তেমন কোনো জন্তু জানােয়ারের মুখোমুখি হইনি এটাই আশ্চয! প্রায় ঘণ্টাখানেক পর আমরা পাহাড়ের ওপর উঠলাম। না,নিতান্ত ছোটো পাহাড় নয় , একবার চারিদিক তাকিয়ে দেখলাম কেমন যেন খাঁ খাঁ করছে। সামনেই কালো পাথরের গড়টা তর্জনী তুলে যেন আমাদের সাবধান করে দিচ্ছে। গড়টা প্রায় গোটা পাহাড় জুড়ে ৷ সামনের দিকটা অক্ষত৷ কিন্তু স্মিথ সাহেব বর্নিত সিংহদ্বার দিয়ে দুপা ভেতরে যেতেই দেখা গেল পিছনের দিকটা ভেঙে ঝুলছে৷ অনুমান করলাম গুপ্তধন যদি সত্যিই কোথাও থাকে তা হলে ঐ ভাঙা অংশের কেল্লাটাতেই আছে৷ আর মিস্টার ভিরুবাগুর লোকজনদের যদি খুঁজতে হয় তাহলে ঐ দিকেই ৷ সিংহদ্বারের মধ্যে দিয়ে আমরা দুজন এগিয়ে চললাম। কয়েক পা যেতেই হঠাৎ টেস্পারেচারটা যেন হু হ করে নেমে গেল। অবাক হয়ে গেলাম ৷ এত ঠান্ডা ! মনে পড়ল স্মিথ তাঁর ডায়েরিতে এইরকম শীতের কথা লিখেছিলেন ৷ প্রকৃতির কোন খেয়ালিপনায় হঠাৎ জলবায়ুর এই পরিবর্তন তা আমরা বুঝে উঠতে পারলাম না৷ এই মুহুর্তে এমন একটি প্রাচীন গড়ে এসে ঢুকেছি যে গড়ের পাথরে পাথরে তাপমাত্রার বৈশিষ্ট্য আমাদের জ্ঞানের বাইরে। শুধু তাপমাত্রার বৈশিষ্ট্যই নয়, সামনের হলঘরটাব মধ্যে ঢুকতেই যে কী করে রাশি রাশি কূয়াশা চারিদিকের অলিন্দ ঘুলঘুলির মধ্যে দিয়ে আমাদের ঢেকে ফেলল তাও আমাদের জ্ঞানের বাইরে। আমরা সেই গাঢ় কুয়াশার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চললাম ৷ কোথায় কোন ঘরে বা বারান্দার দিকে চলেছি বুঝতে পারলাম না৷ এক সময়ে সুরঞ্জনবাবুকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে তার হাতটা ধরতে গিয়ে যখন তার অস্তিত্বটাই টের পেলাম না তখনই বুঝলাম আমরা দুজন দুদিকে ছিটকে পড়েছি৷ আর এই সময় গলা তুলে ডাকতে সাহস পেলাম না৷ নিঃশব্দেই এগিয়ে চললাম৷ হাত দিয়ে দেওয়াল ছুঁতে গিয়ে বুঝলাম অন্য একটা ঘরে আমি ঢুকে পড়েছি৷ আর এই ঘরে ঢোকামাত্র কুয়াশা কোথায় চলে গেল৷ আমি হাঁপ ছেড়ে বাচলাম৷ একবার এদিক ওদিক তাকিয়ে সুরঞ্জনবাবুকে খোঁজার চেষ্টা করলাম। কিন্তু কোথাও তার কোনো চিহ্ন পেলাম না৷ আমি গলার স্বর উচু করে ডাকালাম, সুরঞ্জনবাবু৷ পাথরের দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে আমার কন্ঠস্বর বাতাসে মিলিয়ে গেল৷ ভয় পেলাম। কোথায় গেল মানুষটা? আমি ঘরের দক্ষিণ দিকের অলিন্দে এসে দাড়ালাম৷ নীচে নিস্তব্ধ বনভূমির মধ্যে থেকে অনেক মিলিত কন্ঠের অস্পষ্ট গান শোনা গেল৷ কিন্তু কাউকে দেখা গেল না৷ অবাক হলাম ৷ এখানে কারা গান করছে? কালো পাথরের মোটা একটা থামের পাশ দিয়ে পাক খেয়ে সরু একটা বারান্দা আরও ভেতরে চলে গেছে৷ সুরঞ্জনবাবুকে খুঁজে বার করবার জন্য সেই পথ ধরে ভেতরের দিকে চললাম ৷ এখানেও একটা ঘর। তবে খুবই ছোটো৷ ভেতরে ঢুকতেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়লাম। দেখলাম মেঝের ওপর স্তুপ করে রাখা হয়েছে একরাশ মোটা মোটা সাদা মোমবাতি। এমনভাবে মোমবাতিগুলাে পড়ে আছে যেন মনে হচ্ছে এই মাত্র কেউ মােমগুলাে তৈরি করছিল, হঠাৎ লুকিয়ে পড়েছে৷ লুকিয়ে পড়েছে কাছেই কােথাও৷ কয়েক মুহূর্তের জন্যে আমি আবিষ্ট হয়ে পড়লাম ৷ এত মােম কে তৈরি করছিল? কেন করেছিল ? তখনই মনে পড়ল সেদিন গভীর রাতে হোটেল থেকে এই প্রাসাদের অলিন্দে অলিন্দে আলো জ্বলতে দেখেছিলাম বটে৷ এখন দেখছি সে আলো মোমের আলাে৷ আর এইখানেই তার সৃষ্টি। এত বড়ো গড়কে আলােকসজ্জায় সাজাতে কম বাতি লাগে না জানি… তা বলে এত বাতি ! কিন্তু.……যাক সে কথা। প্রশ্ন এখন কে এই বাতি তৈরি করছিল? শহর থেকে দূরে এই পরিত্যক্ত নির্জন প্রাসাদে নিশ্চয় কোনো সাধারণ মানুষ একদিন এত মোম তৈরি করতে পারে না। এখানের স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া কোনো একজনের পক্ষে এত মােম তৈরি করা সম্ভব নয়। তিনি যিনিই হন এতক্ষণ একমনে সেই কাজটিই করছিলেন। হঠাৎ অবাঞ্ছিত বাধা এসে পড়ায় তিনি আত্মগোপন করেছেন ৷ আত্মগোপন করার জন্য তিনি বেশি দুরে সরে যেতে পারেননি ৷ কাছেই কোথাও অন্ধকারে ঘাপটি মেরে আছেন। যে কোনো মুহূর্তে ঘাড়ের ওপর লাফিয়ে পড়তে পারেন ৷ এ কথা মনে হতেই আমার সারা গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আমি তাড়াতাড়ি দরজার দিকে দুপা পিছিয়ে এলাম৷ আর তখনই খুব কাছে শব্দ হল- ফোঁস!! চমকে উঠলাম। না, সাপের গর্জন নয়, কোনো জন্তুরও চাপা রোষ নয়-এ যেন কোনো অপার্থিব জীবের ক্রুদ্ধ শাসক্রিয়া কাছে… খুব কাছে। আমি প্রাণভয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম৷ তারপর ছুটতে লাগলাম৷ ছুটছি ……………… ছুটছি …………… ছুটছি ............ ঠিক কোন দিকে যাচ্ছি জানি না৷ একমাত্র লক্ষ্য এই গড় থেকে বেরিয়ে যাবার পথ খােজা৷ সরু বারান্দা। প্রত্যেকটা বারান্দার শেষে একটা করে ঘর। হঠাৎ একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লাম। কে একজন বন্ধ দরজার গায়ে ঠেসান দিয়ে দাড়িয়ে আছে। এগিয়ে যেতেই চমকে উঠলাম-সুরঞ্জনবাবু! সুরঞ্জনবাবু সাড়া দিলেন না৷ কোন একরকমভাবে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন৷ এ আবার কী ! আমি দু’ হাতে ধরে তাকে নাড়া দিলাম, সূরঞ্জনবাবু! এতক্ষণে যেন চমক ভাঙল তার। দুচোখ লাল। কপালের একটা শির ফুলে উঠেছে ৷ বোঝাই যায় প্রচণ্ড মানসিক চাপে শিরটা ফুলে উঠেহে৷ আমার দিকে তাকালেন৷ জিজ্ঞেস করলাম… কী হয়েছে? উনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত রুগির মতো বিকৃত স্বরে শুধু উচ্চারণ করলেন, যু-র-রা-জ কোথায় ? উনি হাত দিয়ে বন্ধ দরজাটা দেখিয়ে দিলেন। আমি বুঝলাম এ নিশ্চয় মানসিক বিকার ৷ নইলে কতবছর আগের সেই ছেদী রাজপরিবারের হতভাগা যুবরাজ, তিনি কী করে থাকবেন ঐ ঘরে? জীবিত তাে নয়ই মৃত অবস্থাতেও থাকা সম্ভব নয়৷ তা হলে কী দেখে সুরঞ্জনবাবুর মতো লোক বলতে পারলে যুবরাজ পাশের ঘরেই আছো! এক ধাক্কায় খুলে ফেললাম শাল কাঠ দিয়ে তৈরি দরজা৷ ছোট্ট ঘর-যেন কয়েদখানা৷ একটা পুরনো ভাঙা খাট। তারই সামনে খকথক করছে তাজা রক্ত। আর কিছু নেই। কোথায় যুবরাজ? আমি সুরঞ্জনবাবুর গা ধরে ঝাঁকানি দিলাম। উনি রক্ত দেখিয়ে বললেন, ঐ তো। ঐ তো উপুড় হয়ে পড়ে আছেন৷ ভুল… ভুল৷ শুধু চোখেরই ভুল নয়, মনেরও ভুল। সূরঞ্জনবাবু তখনও অপ্রকৃতিস্থ। সেই অবস্থায় তাকে ধরে ধরে কোনােরকমে বাইরে নিয়ে এলাম। বাইরে বেরােতেই সুরঞ্জনবাবু যেন সুস্থ হয়ে উঠলেন৷ খুব বেঁচে গেলাম, সোমেশ্বরবাবু। আমিও ৷ এবার তাড়াতাড়ি ফেরার পালা। আদিবাসী বেয়ারারা প্রস্তুত হয়েই ছিল৷ দোলায় ওঠবার আগে সুরঞ্জনবাবুকে বললাম, কিন্তু যে উদ্দেশ্যে আমাদের আসা, ভিরুবাগুদের দেখা পেলেন? সুরঞ্জনবাবু মাথা নাড়লেন। না। বললাম, তবে প্রাসাদের মধ্যে থেকেও অনেক নীচে আমি মিলিত কণ্ঠে গান ণ্ডনেছি৷ অস্পষ্ট৷ মনে হচ্ছিল যেন ওদেরই গলা l গান! ওরা গাইছিল? আমার তাই মনে হয়েছিল৷ বিস্মিত সুরঞ্জনবাবূ বললেন, চারদিন ধরে এখানে থেকে বেঁচেও যদি থাকেন গান করতে যাবেন কিসের আনন্দে ? বললাম, তা বলতে পারব না৷ তবে মিলিত গলায় গাইতে শুনেছিলাম। আদিবাসী বেয়ারা দুজন আমাদের কথা শুনে বলল, হ্যা সাহেবরাই সাত জন মিলে সেই তখন থেকে নেচে আর গেয়েই যাচ্ছে৷ কোথায়? কোন দিকে? পাহাড়র ঠিক পিছন দিকে ৷ ওরা কি মদ খেয়ে নাচছে? জিজ্ঞেস করলাম। আদিবাসীরা বলল, না বাবু, বোধহয় পাগল হয়ে গেছে ৷ শুনলাম চারদিন ধরে নেচেই যাচ্ছে৷ এ কি কোন মানুষ পারে? বলেই কাঁধে দােলা তুলে নিল। বললাম, ওদের সঙ্গে একবার দেখা করলেন না? দেখা করে সম্ভবত আর লাভ নেই৷ সদরে খবর দিয়ে এসেছি। পুলিশ এলে এখানে পাঠিয়ে দেব। (সমাপ্ত) ---------


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৮৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ছত্রিশগড়ের ভাঙা গড়- ৮ম ও শেষ পর্ব

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now