বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"ছত্রিশগড়ের ভাঙা গড়"
মানবেন্দ্র পাল
----------------------
(পর্ব ২)
▪▪▪অদৃশ্য হাতের চাপ▪▪▪
ঘরের তালা খুলে নিজে হাতে ঝাড়ন দিয়ে বিছানা, চেয়ার, টেবিল, ড্রেসিং আয়না পরিষ্কার করে আমার সযত্নে ঘরে অধিষ্ঠান করিয়ে দিয়ে সুরঞ্জনবাবু যখন নীচে অফিস ঘরে চলে গেলেন তখন সরে দুপুর গড়িয়ে বিকেল। আশ্বাস দিয়ে গেলেন সন্ধেবেলায় আবার আসবেন। আমি ব্যাগ থেকে হালকা একটা চাদর বার করে বিছানায় পেতে নিলাম ৷ টর্চটা রাখালাম বালিশের পাশে ৷
একটা পুরনো বাড়ির ঘর আর কত ভালো হতে পারে…তবু চারদিক খোলা উত্তরমুখী ঘরটা ভালােই৷ সে আমলের মোটা মোটা গরাদ আর খড়খড়ি দেওয়া বড়ো বড়ো জানলা দিয়ে আলো বাতাসের অবাধ খেলা চলছে।
বাড়ির মতো টেবিল চেয়ারও পুরনাে। টেবিলের পায়া বোধহয় ভেঙে গিয়েছিল৷ সম্প্রতি নতুন একটা পায়া লাগানো হয়েছে। ঘরের লাগােয়া বাথরুমে একটা শাওয়ার আছে বটে তবে জল পড়ে না। বাথরুমের জানলার শার্শি বিপজ্জনকভাবে ভাঙা। বিপজ্জনক এই কারণে যে, পাশেই যে আমগাছটা ডাল মেলে দিয়েছে হোটেলের ছাদের ওপর, সেই ডাল ধরে যে কেউ বাথরুমের জানলাটার নাগাল পেয়ে যাবে। তারপর ভাঙা শার্শির মধ্যে দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ছিটকিনি খুলতে অসুবিধে হবে না।
ঠিক কললাম সন্ধ্যায় সুরঞ্জনবাবু যদি আসেন তা হলে কালকেই যাতে নতুন কাচ বসানো হয় সে কথা ওঁকে বলব৷ আর সেই সঙ্গে জিজ্ঞেস করব হোটেল করার আগে বহুদিনের এই বাড়িটা কার ছিল? অর্থাৎ আজ থেকে পনেরো বিশ বছর আগে এই সব জায়গায় কচ্চিত লোক বাস করলেও পাকা বাড়ি তৈরি করে কোনো ধনী দুঃসাহসী লোক ছেলেপুলে নিয়ে থাকত এমন তো বিশ্বাস হয় না৷
বেলা সাড়ে চারটের সময় হোটেলের বেরায়া বেশ বড়ো কাপে চা আর প্লেটে খানকয়েক বিস্কুট দিয়ে গেল। তার সঙ্গে ভার জমাবার জন্যে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম কী?
বিরস মুখে উত্তর দিল, মহেন্দ্র সেনাপতি ৷
দেশ কোথায়?
ভুবনেশ্বর।
তার মানে ওড়িয়া ?
হ ৷
তা এত দূরে এলে কেন? কাছেপিঠে কি খুঁজলে কাজ পেতে না ?
মহেন্দ্র তার উত্তর না দিয়ে নীচে নেমে গেল৷ বুঝলাম ছোকরা আলাপী না। অবশ্য তার ট্রেতে আরও কয়েক কাপ চা আর বিস্কুট ছিল ৷ অন্য বোডার্রদের বোধহয় এখনি দিতে হবে।
চা খেয়ে সামনের খোলা বারান্দায় পায়চারি করতে লাগলাম। আমার ঘরের ডান দিকে আরও তিনখানা ঘর। আলাপ করার মতো তেমন কেউ আছেন কিনা দেখৰার জন্য ওদিকে গিয়েছিলাম৷ কিন্তু দেখলাম তিনটে ঘরেই তালা ঝুলছে৷ বুঝলাম ঘরগুলোতে বোর্ডার নেই৷ অগত্যা চুপচাপ নিজের ঘরের সামনের বারান্দায় পায়চারি কারতে লাগলাম৷
পায়চারি করতে করতে কত কথাই মনে হতে লাগল। কোথায় কলকাতা আর কোথায় এই ছত্রিশগড়।
কিছুকাল আগেও কেউ ছত্রিশগড় এর নাম শোনেনি৷ শোনবার কথাও নয়। ভারতবর্ষের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো প্রদেশ ছিল মধ্যপ্রদেশ। চার কোটি পনেরাে লক্ষের মতো লোক বাস করত। তার মধ্যে বাঙালিই ছিল দু লক্ষ পঁয়ত্রিশ হাজারের কাছাকাছি। তারপর এই সেদিন মধ্যপ্রদেশের বিরাট শরীর থেকে বেশ কিছু অংশ কেটে হাল্কা করে দিয় তৈরি করা হল আলাদা একটা রাজ্য। যার নাম হল ছত্রিশগড়৷ এর মধ্যে ঢুকল বিলাসপুর, সুরগুজা, রায়গড়, রায়পুর, দ্ৰুগ, স্যাডোল আর বস্তারের মতো ভালো ভালো জেলাগুলো৷
ছত্রিশগড় ! পুরাতত্ত্ব বিভাগের তথ্য অনুযায়ী বুদ্ধদেবের সময়ে আজকের এই ছত্রিশগড়েরই নাম ছিল নাকি মহাকােশল।
তাহলে কােশল থেকে ছত্রিশগড় নাম হল কী করে ?
দুটো নামের মধ্যে তো এতটুকু
মিল নেই।
এই সব প্রশ্ন নিয়ে ভাবতে আমার বেশ ভালো লাগে ৷
আসলে ইতিহাসবিদরা শুনিয়েছেন অন্য কথা। এক সময়ে ঐ মহাকােশলে রাজত্ব করতেন ছেদী বংশের রাজারা ৷ তাদের নাম থেকেই 'ছেদিসগড়’-তা থেকে হয়ে দাড়াল ছত্রিশগড়।
বহু প্রাচীন জায়গা এই ছত্রিশগড় বা ছেদিসগড় ৷ তাই মনে হতে লাগল চারিদিকে এই যে শাল সেগুনের গভীর অরণ্য, দূরে ঐ যে অস্পষ্ট পাহাড়ের রেঞ্জ, এই যে পুরনো পুরনো ভাঙা বাড়ি-এসবের মধ্যে লুকিয়ে আছে না জানি কত ইতিহাস-কত ভয়ংকর কাহিনি।
এখন শরৎকাল ৷ বেলা ছোটো হয়ে এসেছে। বড্ড তাড়াতাড়ি সন্ধে হয়ে আসছে ৷ এখনও দূরে বাতাসে কাশফুলের মাথাগুলাে দুলতে দেখা যাচ্ছে৷
হঠাৎ দুরে ঘোর কালো কী একটা বস্তু যেন দৈত্যের মতো মাটি ফুঁড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে বলে মনে হল। এতক্ষন ওদিকটায় মেঘ ছিল বলে ওটা দেখা যায়নি। এখন মেঘ সরে যাওয়ার জিনিসটা চোখে পড়ল।
কী ওটা ? ছোটো একটা পাহাড় ? অথবা দুর্গের আকারে কোনো উঁচু বাতি?
যাই হোক, কেস জানি না ঐ দিকে বেশীক্ষণ তাকানাে যায় না৷ কেমন যেন ভয় করে। তাই ঘোর অন্ধকারে ওটা দৃষ্টির আড়ালে অদৃশ্য হবার আগেই আমি ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। কিন্তু…
কিন্তু বারে বারেই সেই বস্তটার দিকে তাকাবার জন্যে মনের মধ্যে উথালপাথাল করতে লাগল ৷ সেই তীব্র আকর্ষণের কাছে আমাকে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতেই হল। ঘরের দিকে আমি দুপা এগােই আর একবার করে পিছনে ফিরে দেখি।
এক সময়ে আমার এমনও মনে হল ঐ বিশ্রী পাহাড়টা অন্ধকারে গা মিলিয়ে দুলতে দুলতে যেন আমাদের হোটেলটার দিকেই এগিয়ে আসছে৷
কেন এরকম মনে হল তার কোনো কারণ আজও খুঁজে পাই না৷ তখনও জানতাম না একটু পরেই আরও কিছু অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হবে৷
আমি যখন ঘরের সামনে এসে দাড়ালাম তখন অন্ধকার হয়ে গেছে ৷ খোলা বারান্দায় পায়চারি করতে আসার আগে আমি ঘরের দরজায় শেকল তুলে এসেছিলাম৷ এখন দরজা খােলৰার জন্যে শেকলে হাত দিতে গিয়ে আঁতকে উঠলাম৷ লোহার মতো একটা কঠিন হাত শেকলটা মুঠোর মধ্যে ধরে আছে যেন দরজা খুলতে দেবে না৷ আমি চেচিয়ে উঠলাম, কে ?
সঙ্গে সঙ্গে সেই অপরিচিত হাতখানি অদৃশ্য হয়ে গেল। শেকলটা ঝনাৎ করে আপনিই খুলে গেল৷
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে গাঢ় অন্ধকারের মধ্যে আমি বিভ্রান্ত হয়ে পড়লাম৷ কোন দিকে সুইচ, কোন দিকে আমার বিছানা, কোন দিকে ড্রেসিং টেবিল সব যেন গুলিয়ে গেল। এদিকে বুকের মধ্যে হৃৎপিন্ডটা লাফালাফি করছে। এই শরতের সন্ধ্যােতে কপালে বিনবিনে ঘাম৷ এখন সর্বাগ্রে দরকার আলো ! কিন্তু সূইচটা কোন দিকে?
বেশ কয়কবার এদিক থেকে ওদিক ঘুরে, দেয়ালে বার কতক ঠোক্কর যেয়ে সুইচটা খুঁজে পেলাম৷ আলো জ্বলে উঠল, এতক্ষণে আমি হাঁপ ছেড়ে বাচলাম৷
পুরো এক গেলাম জল খেয়ে আমি বিছানায় বসলাম। তারপর শুয়ে পড়লাম।
এবার ভাবতে লাগলাম, ব্যাপারটা কী হল? আমি শহর কলকাতায় থাকি ৷ এই ধরনের অলৌকিক, অবৈজ্ঞানিক ব্যাপার মোটেই বিশ্বাস করি না৷ তা হলে একটু আগে এই বা ঘটল তার ব্যাখ্যা কী ? প্রথমটার কথা ছেড়েই দিলাম। ওটা না হয় পরিবেশের প্রভাবে মনের ব্যাপার, কিন্তু শেকল চেপে ধরেছি৷ যে হাতটা সেটা তো শুধুই মনের ব্যাপার নয়। ‘কে?’ বলে চিৎকার দিতেই হাতটা যে সরে গেল সে ব্য৷পারটাকে তো 'কিছু না’, ‘মনের ভুল’ বলে উড়িয়ে দিতে পারব না ৷ তাছাড়া ঝনাৎ করে শেকলটার খুলে পড়া? আমি তো খুলিনি।
এই সব ভাবছি, এমনি সময়ে সিঁড়ির দিকে দরজায় শব্দ হল ঠুক ঠুক ঠুক।
কে আবার এল এখন ? মনে পড়ল সুরঞ্জনবাবুর আসার কথা। উনি এলে ভালোই। কিন্তু ও'কে কি এই যা সব ঘটল, যার কোনো প্রমাণ নেই, তা বলা যাবে?
(ক্রমশ)
---------
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now