বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
চারদিক অন্ধকার নিস্বব্ধ কোন কোলাহল নেই।রাতের আঁধারে শুধু কয়েকটা কুকুর চিৎকার করে যাচ্ছে।মনে হয় কিছু দেখে চিৎকার করছে।একটা বাসা থেকে কুরআন তিলাওয়াতের মধুর ধ্বনি বেসে আসছে।রাতের এই আঁধারে ফারাহ ফজরের নামাজ পড়ে মধুর সুরে কোরআন তিলাওয়াত করছে।কিন্তু তার স্বামী তাওহীদ ঘুমের দেশে তলিয়ে আছে।এমন ভাবে ঘুমিয়ে আছে, যেন কোন চিন্তা নেই, কোন ভাবনা নেই।সে ফারাহকে অনেক ভালোবাসে কিন্তু তার পরেও ওর মনে একটা কষ্ট আছে।কারণ তাওহীদ ঠিকমত নামাজ পড়ে না, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করে না।তার মনে আর একটা চাপা কষ্ট আছে, সেটা হলো তাওহীদের মতের বিরুদ্ধে কিছু বললে তার শরীরে হাত তুলে।ফারাহ কুরআন তিলাওয়াত শেষ করে, তাওহীদের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
.
ফারাহ ছোট বেলায় স্বপ্ন দেখতো।বড় হলে কারো বউ হবে, একটা ঘর পাবে, সেই ঘরে সবাইকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে দিন কাটাবে।তার এই ইচ্ছা শুনে, সবাই হাসতো।তার হবু বরকে নিয়ে মজা করতো।যদি বরকে নিয়ে মন্দ কথা বলতো।তাহলে সে বলতো, আমার বর অনেক ভাল হবে, অনেক সুন্দর হবে এবং আমাকে অনেক ভালোবাসবে।যে ভালোবাসাটা কেউ কোনদিন পায়নি।ওর কথা শুনে, তারা হাসতো।এবং তাকে নিয়ে আরও মজা করতো।তাদের সাথে সেও মেতে উঠতো।পুরোনো স্মৃতি গুলো মনে হতেই চোখে পানি চলে আসে।হঠাৎ কলিং বেলের শব্দে স্মৃতির পাতা থেকে ফিরে আসে।ফারাহ অনুভব করে, তার চোখের কোণে পানি জমেছে।আবার তাওহীদের দিকে চোখ ফিরায়; দেখে এখনও সে গভীর ঘুমে তলিয়ে আছে।
•
ফারাহ জানে না, তাওহীদ কোনদিন ওর কথার মূল্য দিবে কিনা? জানে না, তাকে ভালোবেসে তার কথা গুলো মেনে নিবে কিনা? সে মনে করে, একটা মেয়ের জীবনে বিয়ে একবারেই আসে।তাই তো এত কষ্ট সহ্য করে তাওহীদের ঘরে পরে আছে।ফারাহ বিশ্বাস করে তাওহীদ একদিন তার কথার মূল্য দিবে।ঠিকমত নামাজ পড়বে, নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করবে।এবং তাকে আরও অনেক ভালোবাসবে।এই দিনটার অপেক্ষায় সে চেয়ে আছে।কিন্তু দিনটা কখন আসবে, সে জানে না।তার মনে যতই দুঃখ-কষ্ট লাগুক তাওহীদের মুখটা একবার দেখলে সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে যায়।মুখের হাসিটার দিকে তাকালে হাসির মাঝে হারিয়ে যায়।
.
তাওহীদ সরকারি চাকরি করে।মাস শেষে অনেক টাকা তার হাতে আসে।তাই সে বিলাশ বহুল জীবন-যাপন করে।হাসি আনন্দে মেতে থাকে।নামাজ কালামে পিছিয়ে থাকে।তাওহীদ বলতো, এখনও আমার সময় হয়নি; আরও কিছুদিন আনন্দ ফূর্তি করি।এখন যদি না করি কখন করব? বৃদ্ধ হয়ে নেই তারপর নামাজ কালাম পড়ব।এমন কথা শুনে ফারাহ শুধু অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতো।মনে মনে বলতো কোনদিন সে সঠিক পথে আসবে!
•
মাঝে মাঝে রাগে ফারাহ বলতো
- আপনার কখন সময় হবে?
তাওহীদ বলতো
- এখন তো আনন্দ করার সময়, যৌবনটাকে উপভোগ করার সময়।বুড়ো হয়ে নেই তারপর না হয় নামাজ কালাম হবে
এমন কথা শুনে ফারাহ ওর নয়নের দিকে তাকিয়ে থাকতো
- বুড়ো বয়সে কেউ নামাজ পড়া আরম্ভ করে?
- হ্যাঁ
- যৌবন কালেই তো আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করতে হয়।তাহলে আল্লাহ খুশি হয়।
রাগে তাওহীদ বলতো
- তুই বেশি বুঝছ? আমাকে জ্ঞান দিবি? তোর জ্ঞান দিতে হবে না, তোরটা তোর কাছেই রাখ।
- শুনেন!
- ঠাসসস(রাগে থাপ্পড় বসিয়ে দিতো)
ফারাহ ভেজা ভেজা চোখে শুধু তাকিয়ে থাকতো।
- বলছি কথা কম বলতে, তারপরেও কথা বলে! এখন ভালো হয়েছে না?
ফারাহ ওর মুখের তাকিয়ে থাকতো কিছু বলতো না।
.
তাদের বিয়ের বয়স আট-নয় মাস চলছে।বিয়ের প্রথম দিন থেকেই তাওহীদের অনিয়ম দেখে আসছে।এত করে বলতো, তারপরেও শুনতো না।উপহার হিসেবে গালি বা থাপ্পড় খেতে হতো।কিন্তু তারপরেও ওর মনে মায়া হতো না, মন যা চায়তো তাই করতো।যেভাবে ভালো লাগতো সেভাবেই চলতো।একবারও ফারাহর কথার দাম দিত না।চাকরির কারণে তারা শহরে থাকতো।তাদের বাবা-মারা গ্রামে থাকতো।তাই তাওহীদের স্বাধীনতাটা বেশি থাকতো।কারণ তাকে বলার মত কেউ নেই, শাষণ করার মত কেউ নেই।তাই ফারাহকে এত কষ্ট সহ্য করতে হতো।
•
ফারাহ সকালের নাস্তা তৈরি করতে রান্না ঘরে যায়।তার হাতে অনেক কাজ পড়ে আছে।কারণ দুই-তিন দিন পর থেকেই রোযা শুরু হবে।তাই রোযার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে।সেজন্য তার প্রতিদিন কিছু না কিছু করতেই হচ্ছে।
.
তাওহীদ ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সকালের সূর্য ওঠা দেখতে থাকে।প্রতিদিন এই সূর্যটা দেখে দিন-টা শুরু করতে চেষ্টা করে।কোনদিন পারে আবার কোনদিন পারে না।
.
তাওহীদ অফিসে যাওয়ার সময় রোযার মাসে কি কি লাগবে তার একটা লিস্ট হাতে ধরিয়ে দেয়।একটু রাগ-অভিমান দেখিয়ে চলে যায়।ফারাহ নাস্তা খেয়ে রোযার প্রস্তুতি নিতে থাকে।এটা সেটা করতে করতেই সারাটাদিন চলে যায়।
.
কফি খেতে খেতে সূর্য ডুবা দেখতে থাকে।মনে মনে ভাবে কতদিন পর সুখের দিন আসবে।সে ভেবে পায় না, তাওহীদ তার সাথে কেন এমন আচরণ করে? এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখে পানি চলে আসে বুঝতেই পারেনি।মাগরিবের আযান পড়তেই অযু করতে চলে যায়।নামাজ পড়ে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থেকে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে।
•
তাওহীদ অফিসের কাজ শেষ করে বাজারের লিস্টের সব কিছু নিয়ে বাসায় ফিরতে থাকে।হঠাৎ একটা স্বামী-স্ত্রীর খুনসুটি চোখ পড়ে যায়।একটু সময়ের জন্য স্মৃতির পাতায় হারিয়ে যায়।দৃশ্যটা দেখে তার মনটা খারাপ হয়ে যায়।মনে মনে বলে, কখনও কি আমাদের মাঝে খুনসুটি হয়েছে?
.
কলিং বেল বাজাতেই ফারাহ দরজা খুলে দেয়।ফারাহর দিকে তাকাতেই একটু অবাক হয়।কারণ অন্যদিনের মত তাকে লাগছে না।আজ একটু অন্যরকম লাগছে।কিছু বলতে গিয়েও বলেনি; রুমে চলে যায়।ফারাহ বাজারের ব্যাগটা নিয়ে রান্না ঘরে যায়।তাওহীদ ফ্রেশ হয়ে আসতেই খাবার বেড়ে দেয়।খেতে খেতে তাওহীদ বলে
- কি হয়েছে? আজ তোমাকে একটু অন্যরকম লাগছে।
- না তেমন কিছু না, শরীরে একটু জ্বর এসেছে।
- কিহ!
- হ্যাঁ
- আমাকে ফোন দিলে না কেন?
- এমনেতেই জ্বর তো বেশি না, আর আপনি শুধু শুধু টেনশন করবেন তাই দেইনি।
কথাটা শুনে ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।কিছুক্ষণ পর লক্ষ করে সে কিছু খাচ্ছে না।
- কি হল খাচ্ছ না কেন?
- খেতে ইচ্ছা করছে না?
- খেতে হবে, না হলে শরীরে অসুখ বাসা বাঁধবে।
- কি করব? মুখের তো রুচি চলে গেছে।
- চুপ করে বসো আমি খাইয়ে দিচ্ছি।
ফারাহ আর না করতে পারেনি; তাওহীদ খাইয়ে দিচ্ছে সে লক্ষী মেয়ের মতো খেয়ে নিচ্ছে।তাওহীদের এই আদর ভালোবাসার জন্য; সে হাজার কষ্ট করতেও রাজি।খেতে খেতে ফারাহর চোখের কোণে জল চলে আসে।
.
রাত ১ টা কি ২ টা বাজে।ফারাহর শরীরে কাপুনি দিয়ে জ্বর আসে। জ্বরের কারণে বিড়বিড় করে আবোল তাবোল বলতে থাকে।হঠাৎ তাওহীদের ঘুম ভেংগে যেতেই দেখে, ফারাহ শীতে কাঁপছে।আর বিড়বিড় করে বলছে
- ও কোনদিন আমার কথার মূল্য দিবে? আমাকে মন থেকে ভালোবাসবে? নিয়মিত নামাজ পড়বে কোরআন তিলাওয়াত করবে? আমি ওর সাথে শুধু দুনিয়াতে থাকতে চাই না জান্নাতেও থাকতে চাই! কেন সে বোঝে না।এভাবে আরও অনেক কথা বলে।
.
ফারাহর কথা শুনে মনে কষ্ট পায়।তার চোখে পানি চলে আসে।কপালে হাত দিয়ে দেখে, গরমে কপালটা পুড়ে যাচ্ছে।এত রাতে তাকে নিয়ে কোথায় যাবে? কি করবে? ভেবে পায় না।হঠাৎ মাথায় পানি ও জলপট্টি দেওয়ার কথা মনে আসে।তাড়াতাড়ি বালতি দিয়ে পানি এনে মাথায় পানি ঢালতে থাকে।ঘন্টা খানিক পানি দিতেই তাপমাত্রাটা কমে।কপালে হাত দিয়ে দেখে জ্বরটা অনেক কমে গেছে।
•
দূরের মসজিদ থেকে আযানের ধ্বনি ভেসে আসতেই ফারাহর ঘুম ভেংগে যায়।চোখ খুলে উঠতে যাবে দেখে, তাওহীদ তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে আছে।সে অনেক অবাক হয়।কারণ আজ পর্যন্ত তাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায়নি।হঠাৎ অনুভব করে তার মাথায় জলপট্টি দেওয়া।খাটের পাশে তাকাতেই দেখে, বালতি ভরা পানি।তার বুঝতে বাকি নেই রাতে যে জ্বর উঠেছিল।তাওহীদ তাকে সেবা করেছে! ভাবতেই পারছে না।তাওহীদ তার জন্য কষ্ট করেছে? রাত জেগে মাথায় পানি ও জলপট্টি দিয়েছে? এটা ভাবতেই তার মনটা আনন্দে ভরে উঠে।আনন্দে চোখ থেকে কয়েক ফোটা জলও পড়ে।উঠতে যাবে দেখে, তখনও তাওহীদ তাকে ধরে ঘুমিয়ে আছে।
.
কিছুক্ষণ পর তাওহীদের ঘুম ভাংতেই দেখে, ফারাহকে ধরে ঘুমিয়ে আছে।সে অনেক লজ্জা পায়।কারণ এভাবে তো কখনও ঘুমায়নি।ফারাহকে ছেড়ে দেতেই সে লজ্জা মাখা হাসি দিয়ে বলে
- কি! লজ্জায় বউকে ছেড়ে দিচ্ছেন? ঘুমের সময় মনে থাকে না?
তাওহীদ মুচকি হাসে, কিছু বলতে পারে না।একটু অভিমানের ভাব নিয়ে আবার বলে
- বউ এর আড়ালে বউকে সেবা করতে পারেন আবার আদর ও ভালোবাসাও দিতে পারেন।কিন্তু বউ এর একটা দুইটা কথা মানতে পারেন না।
তাওহীদ কি উত্তর দিবে! ভেবে পায় না।কিছুক্ষণ চুপ থেকে তাওহীদ বলে
- ফারাহ আজ থেকে তোমার সব কথা মানব।
এমন কথা শুনে জ্ঞান শক্তি হারানোর মত অবস্থা হয়ে যায়।
- কি হল কোথায় হারালে?
- হঠাৎ আপনার মুখে এসব কথা?
- গতকাল রাতে যখন তোমার জ্বর উঠেছিল।তখন আমার মনে হচ্ছিল তুমি আমার থেকে হারিয়ে যাচ্ছ।এ সময় আমার খুব কষ্ট হচ্ছিল।মনে হচ্ছিল আমি একা হয়ে যাচ্ছি।ফারাহ তুমি আমাকে একা ফেলে কোথাও যেয়ো না।তাহলে আমি বাঁচতে পারবো না।আমি আর তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করব না। কথা দিচ্ছি।তবুও আমাকে ছেড়ে যেয়ো না, কথা দাও!
ফারাহ কি বলবে? কিছু বলতে পারছে না।আনন্দে তার চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে।
.
ফারাহর চোখের পানি মুছে দিতেই; সে তাওহীদের বুকে মুখ লুকায়।তারপর দু-জন একসাথে অযু করে নামাজ পড়ে, কুরআন তিলাওয়াত করে।তাওহীদ সকালের সূর্য ওঠা দেখতে থাকে।আজ সাথে ফারাহও যোগ দিয়েছে।দু-জনের চায়ের কাপ থেকে ধোয়া উড়ছে, দু-জন এক মনে সূর্য ওঠা দেখছে।সূর্যের রশ্মি আর ধোয়া এক সাথে খেলা করে যাচ্ছে, দু-জন এক সাথে একটু পর পর চায়ে চুমুক দিচ্ছে।এভাবে সূর্য ওঠা দেখতে থাকে।নতুন ভোরের আলোর সাথে, আবার তাদের নতুন জীবন শুরু করে।
•
লিখাঃ MD Mahmudur Rahman Tauhid
(Ovimani Mrt)
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now