বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
লেখক: হোসাইন মাহমুদ
বসন্তর প্রজাপতি????
কুয়াশা মোড়া সকাল থেকে শুরু হয়েছিল। শেষ হয়েছিল নীরব এক বিদায়ে। মাঝখানে ছিল শুধু দুটো চোখ, কিছু কল্পনা, আর অজস্র দোয়া।
এই গল্পটা সেইসব মানুষের জন্য, যারা কখনো কাউকে বলেনি, তবুও সারাজীবন মনে রেখেছে।
পড়ে কমেন্টে জানাও, তোমার প্রজাপতির গল্পটা কী?
০১.কুয়াশা মোড়া সকাল,
যেখানে লজ্জা আর সংকোচ দিয়ে শুরু:
গ্রামের সকালগুলো তখনো কুয়াশার চাদরে মোড়া থাকত। মাটির সরু পথ ধরে শিশিরভেজা ঘাসের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমি স্কুলে যেতাম। আমার নাম আবু হোসাইন। বয়স খুব বেশি ছিল না—মাত্র কয়েকটা বছর। কিন্তু সেই ছোট্ট বয়সেই বুকের ভেতর জন্ম নিয়েছিল এক অদ্ভুত সংকোচ, এক অকারণ লজ্জা।
আমার শৈশবটা ছিল রূপকথার মতো সরল। দুপুরবেলা বন্ধুদের সঙ্গে মাঠে দৌড়ঝাঁপ করতাম, বর্ষার জলে কাগজের নৌকা ভাসাতাম, আর সন্ধ্যা নামলে মায়ের ডাকে ঘরে ফিরতাম—এই ছিল আমার ছোট্ট পৃথিবী।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমার ভেতরের পৃথিবীটা কেমন যেন বদলে যেতে লাগল। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই আমি অন্যরকম হয়ে গেলাম। ক্লাসের ছেলেদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টা করতে পারতাম, কিন্তু কোনো মেয়ের সামনে গেলেই বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে উঠত। মনে হতো, একটা কথা বললেই সবাই আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করবে।
এই ভয়টা আস্তে আস্তে এমনভাবে আমাকে গ্রাস করল যে, মেয়েদের দিকে তাকিয়েও কথা বলতে পারতাম না।
প্রাইমারি স্কুলের ছোট্ট ক্লাসরুমটায় জানালার ধারে বসতাম আমি। স্যার যখন পড়াতেন, মন দিয়ে খাতায় লিখে যেতাম। কিন্তু পাশের বেঞ্চ থেকে মেয়েদের হাসির শব্দ কানে এলে বুকের ভেতর কেমন অস্থিরতা শুরু হতো। মাথা আপনাআপনিই নিচু হয়ে যেত। কেন এমন হতো, আজও জানি না।
তবুও জীবন তো আর থেমে থাকে না। প্রয়োজনে দু-একটা কথা বলতেই হতো। কখনো খাতা চাওয়ার জন্য, কখনো কলম। কিন্তু সেই সামান্য কথাটুকু বলার সময়ও গলার ভেতরটা কেঁপে উঠত। কথা শেষ করে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচতাম।
একদিন দুপুরবেলা ক্লাস শেষে স্কুলের মাঠে একা দাঁড়িয়ে ছিলাম। আকাশে তখন হালকা বসন্তের রোদ। গাছের পাতার ফাঁক গলে বাতাস এসে মুখে লাগছিল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা মেয়ের গলা ভেসে এলো—
“এই আবু, তোমার খাতাটা কি একটু দিবা?”
কণ্ঠটা কানে যেতেই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। খাতাটা শক্ত করে দুই হাতে চেপে ধরলাম। মনে হচ্ছিল, পুরো মাঠের সবাই যেন আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। নিঃশ্বাসটা আটকে আসছিল।
তারপর কাঁপা কাঁপা হাতে খাতাটা সামলে নিয়ে, বুকের ভেতরের সমস্ত সাহসটুকু জড়ো করে আমি ধীরে ধীরে মাথা তুলে তার দিকে তাকালাম।
সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে একটা নীল রঙের কলম। মুখে হালকা হাসি। চোখে কোনো ঠাট্টা ছিল না, ছিল শুধু সরল একটা অনুরোধ।
আমার গলা তখনও কাঁপছিল। তবুও কোনোমতে বললাম,
“নাও...”
খাতাটা ওর হাতে দিতে গিয়ে আঙুলগুলো একটু কেঁপে উঠল। সে খাতাটা নিয়ে “ধন্যবাদ” বলে একটা মিষ্টি হাসি দিল। সেই হাসিটায় কোনো লজ্জা ছিল না, ছিল না কোনো বিচার।
আমি কিছু বলতে পারলাম না। শুধু মাথা নেড়ে আবার মাঠের দিকে তাকালাম। বুকের ভেতরের ধড়ফড়টা আস্তে আস্তে কমে এল। বাতাসটা হঠাৎ করেই অনেক হালকা লাগছিল।
সেদিন বুঝেছিলাম, লজ্জা আর ভয় দিয়ে মোড়া আমার ছোট্ট পৃথিবীটার বাইরেও একটা জগৎ আছে। যেখানে মানুষ কথা বলে, হাসে, সাহায্য চায়—আর কেউ হাসে না।
০২.আমাদের মধ্যে কাকে ভালো লাগে?
সেই বুক কাঁপানো দিন:
আমার বয়স তখন খুব বেশি ছিল না। ক্লাস ফোরে পড়ি। ছোট্ট গ্রামের স্কুলটা তখন আমার কাছে একটা অদ্ভুত জগৎ মনে হতো—যেখানে প্রতিদিন নতুন ভয়, লজ্জা আর অচেনা অনুভূতি জন্ম নিত।
সেদিনের বিকেলটা ছিল আর পাঁচটা দিনের মতোই সাধারণ। ক্লাসরুমের জানালা দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকছিল। বাইরে কদম গাছের পাতাগুলো মৃদু হাওয়ায় নড়ছিল। ক্লাস শেষে সবাই যখন হৈচৈ করছিল, আমি তখন চুপচাপ নিজের খাতাগুলো গুছিয়ে বসে ছিলাম।
ঠিক তখনই ক্লাসের একটা মেয়ে হঠাৎ আমার সামনে এসে দাঁড়াল। চোখে দুষ্টুমি মেশানো সরলতা, মুখে হালকা হাসি। একদম স্বাভাবিক গলায় সে জিজ্ঞেস করল—
— “আমাদের মধ্যে কোন মেয়েকে তোর সবচেয়ে ভালো লাগে?”
কথাটা কানে যেতেই আমার বুকের ভেতর যেন বজ্রপাত হলো। মনে হলো পুরো ক্লাসরুমটা হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। চারপাশের সব শব্দ দূরে মিলিয়ে গেল। শুধু নিজের বুকের ধুকপুকানিটাই শুনতে পাচ্ছিলাম।
মুহূর্তেই কান গরম হয়ে গেল। মুখটা টকটকে লাল। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। কী উত্তর দেব, কিছুই মাথায় আসছিল না। তাই মাথা নিচু করে বসে রইলাম।
মেয়েটা হয়তো মজা করেই বলেছিল। কিন্তু আমার কাছে সেটা ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্ন। মাথার ভেতর শুধু একটা ভয়ই ঘুরছিল— “আল্লাহ… এই কথা যদি আম্মু জানে, তাহলে কী হবে!”
সেই বয়সে ভালো লাগা মানেই তো আমার কাছে বড় কোনো অপরাধের মতো ছিল। মেয়েদের সঙ্গে কথা বলতেই যেখানে ভয় পেতাম, সেখানে এমন প্রশ্ন আমার ছোট্ট পৃথিবীটাই এলোমেলো করে দিয়েছিল।
সন্ধ্যায় নাইট কোচিং ছিল। আমাদের স্কুলে ক্লাস ফোর থেকেই সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত কোচিং হতো। সেদিনও বই-খাতা নিয়ে কোচিংয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু পড়ায় মন বসেনি একটুও। স্যার কী পড়াচ্ছেন, বোর্ডে কী লিখছেন—কিছুই মাথায় ঢুকছিল না।
আমি শুধু বারবার বিকেলের সেই প্রশ্নটাই ভাবছিলাম।
“আমাদের মধ্যে কোন মেয়েকে তোর সবচেয়ে ভালো লাগে?”
প্রশ্নটা মাথার ভেতর ঘুরতেই থাকল। মাঝে মাঝে লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলতাম, আবার কখনো জানালার বাইরে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। মনে হতো, সবাই বুঝি আমার মনের কথা জেনে ফেলেছে।
সেদিন রাতটা খুব অদ্ভুতভাবে কেটেছিল। এমনকি পরের দুই-তিন দিনও নিজেকে স্বাভাবিক করতে পারিনি। পড়তে বসলে ওই কথাটাই মনে পড়ত। স্কুলে গিয়ে মেয়েটার সামনে পড়লে বুক আবার ধড়ফড় করত।
আর সেদিনই আমি প্রথম বুঝেছিলাম— লজ্জা নামের অনুভূতিটা একটা মানুষকে কতটা অসহায় করে দিতে পারে।
০৩.নতুন অধ্যায়
হাইস্কুল, SSC আর বড় হওয়ার চাপ:
দেখতে দেখতে প্রাইমারি স্কুলের শেষ ঘণ্টাটাও বেজে উঠল। ছোট্ট সেই মাঠ, টিনের ছাউনি দেওয়া ক্লাসরুম আর দুপুরের টিফিনের হৈচৈ—সবকিছু ধীরে ধীরে স্মৃতির পাতায় জমা হতে লাগল।
তারপর শুরু হলো জীবনের নতুন অধ্যায়—হাইস্কুল।
মা-বাবার চোখে তখন হাজারো স্বপ্ন। তাদের বিশ্বাস ছিল, আমি একদিন অনেক বড় হব। পড়াশোনা শিখে ভালো চাকরি করব, সংসারের অভাব ঘুচাব। গ্রামের সাধারণ বাবা-মায়ের মতো তারাও ভবিষ্যৎকে ঘিরে ছোট ছোট স্বপ্ন বুনতেন। আর আমি, সেই স্বপ্নগুলোর ভার নিজের অজান্তেই বয়ে বেড়াতে শুরু করলাম।
হাইস্কুলে পা রাখার পর পৃথিবীটা কেমন যেন বদলে যেতে লাগল। নতুন বন্ধু, নতুন পরিবেশ, নতুন চিন্তা—সবকিছু মিলিয়ে জীবনটা অন্যরকম হয়ে উঠল। তবে হাইস্কুল আমাকে যতটা ভালো শিখিয়েছে, তার চেয়ে হয়তো একটু বেশিই শিখিয়েছে অজানা অনুভূতির অন্ধকার দিকগুলো।
এই সময়টাতেই আমি আস্তে আস্তে নিজের লজ্জাটাকে জয় করতে শুরু করলাম। আগের মতো মেয়েদের কথা ভাবলেই আর মুখ লাল হয়ে যেত না। বরং মেয়েদের নিয়ে কৌতূহল জন্মাতে লাগল। যদিও প্রেম, ভালোবাসা কিংবা রোমান্টিকতা—এসবের আসল মানে তখনো আমার কাছে অস্পষ্ট ছিল।
আমি শুধু বড় ভাই-বোনদের মুখে শুনতাম— “ভালোবাসা বলে একটা জিনিস আছে।” সিনেমায় দেখতাম নায়ক-নায়িকার হাসি, অভিমান আর একে অপরের জন্য কাঁদা। কিন্তু সেসব আমার কাছে তখনো ছিল কল্পনার মতো।
একসময় আমার পৃথিবীজুড়ে ছিল শুধু মোটু-পাতলু, নাট-বল্টু, গোপাল ভাঁড় আর মিনা কার্টুন। সেই আমিই ধীরে ধীরে বদলাতে লাগলাম। নাটক আর সিনেমা, যেগুলো একসময় দুই চোখের বিষ মনে হতো, সেগুলোই একসময় হয়ে উঠল অবসরের সঙ্গী। বিশেষ করে রোমান্টিক দৃশ্যগুলো। অদ্ভুতভাবে সেগুলো আমার ভালো লাগতে শুরু করল।
ক্লাস সেভেন-এইটের সময়টায় আমার মধ্যে হঠাৎ এক অচেনা পরিবর্তন এলো। মেয়েদের হাঁটাচলা, কথা বলার ভঙ্গি, হাসি—সবকিছুই কেন যেন ভালো লাগতে লাগল। কখনো কখনো তাদের সৌন্দর্য দেখে বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হতো। কিন্তু আমি বুঝতে পারতাম না, এমন কেন হচ্ছে।
আমার আশেপাশের বন্ধুরা প্রায়ই বিভিন্ন মেয়েকে নিয়ে কথা বলত। কার কাকে ভালো লাগে, কে কার দিকে তাকায়—এসব নিয়েই তাদের আড্ডা চলত। আমি চুপচাপ শুনতাম, কিন্তু নিজের মনের কথা কখনো প্রকাশ করতাম না। কারণ সবার চোখে আমি ছিলাম “ভালো ছেলে”। আর ভালো ছেলেরা নাকি এসব করে না—কমপক্ষে আমি তাই বিশ্বাস করতাম।
এরপর এলো ক্লাস নাইনের নতুন কারিকুলাম। জীবনটা যেন আরও একধাপ বদলে গেল। আর ক্লাস টেনে উঠতেই সেই পরিবর্তনটা পূর্ণতা পেল। রোমান্টিকতার এক সূক্ষ্ম ছোঁয়া এসে লাগল আমার হৃদয়ের গভীর কোথাও। ভালো লাগুলো এবার স্পষ্ট হতে শুরু করল।
তখন সময়ের পাতায় ২০২৫ সাল। সামনে SSC পরীক্ষা। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক—সবাই একটাই প্রশ্ন করতে লাগল— “সাইন্স নিবা, নাকি আর্টস?”
আমিও দ্বিধায় পড়ে গেলাম। একসময় চারপাশের চাপ আর মানুষজনের কথায় সাইন্স বেছে নিলাম। শুরু হলো ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি আর ম্যাথের সঙ্গে যুদ্ধ। পুরো একমাস মন দিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু তারপর… একদিন বড় ভাইয়ের কয়েকটা কথায় যেন হঠাৎ বাস্তবতায় ফিরে এলাম। বুঝলাম, আবেগ দিয়ে সবকিছু হয় না। নিজের সামর্থ্যকেও বুঝতে হয়।
শেষ পর্যন্ত আর্টসকেই বেছে নিলাম। কারণ আমি জানতাম, ছাত্র হিসেবে আমি খুব বেশি মেধাবী নই। যদিও মাঝে মাঝে হঠাৎ করেই আমার মধ্যে পড়াশোনার এক অদ্ভুত জেদ চলে আসত। এমনভাবে পড়তাম যেন পৃথিবীর সবকিছু ভুলে গেছি। কিন্তু সেই জেদের পেছনে ছিল একটা গোপন রহস্য। একটা এমন কারণ— যেটা হয়তো আমি আর আল্লাহ ছাড়া আজ পর্যন্ত আর কেউ বুঝতে পারেনি।
আমার বন্ধুরা সবাই জানত, আমি কোনোদিন কোনো মেয়ের প্রতি ক্রাশ খাইনি। আর কথাটা একসময় সত্যিও ছিল। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, আর সময় লিখে অন্য কিছু।
ক্লাস টেনের মাত্র একটা মাসই সেই বিশ্বাসটাকে ভেঙে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।
আমি প্রথমবারের মতো বুঝতে শুরু করলাম— কখনো কখনো একজন মানুষ নিঃশব্দেই অন্য একজন মানুষের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ে। আর সেই দুর্বলতার শুরুটা হয় খুব অদ্ভুতভাবে…
আজ সেই গল্পটাই বলছি শোন...
০৪.নিঃশব্দ দেখা
যেদিন বোরকার আড়ালের দুটি চোখে মন আটকে গেল:
২০২৫ সালের জানুয়ারির শেষ দিক। শীত তখন ধীরে ধীরে বিদায় নিতে শুরু করেছে। আগের মতো হাড় কাঁপানো ঠান্ডা নেই, তবুও ভোরবেলা এখনো চারদিকে কুয়াশা নেমে আসত। কখনো পুরো দিনটা গুমোট হয়ে থাকত, আবার কখনো দুপুরের রোদে চারপাশ ঝলমল করে উঠত।
প্রকৃতির মতোই আমার মনটাও তখন বদলে যাচ্ছিল।
আমি তখন সদ্য ক্লাস টেনে উঠেছি। জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলোর একটা শুরু হয়েছে সামনে। SSC পরীক্ষার চাপ, ভবিষ্যতের চিন্তা, পরিবারের আশা—সব মিলিয়ে দিনগুলো খুব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছিল।
সাইন্স নেওয়ার পর থেকে জীবনটা আরও ব্যস্ত হয়ে উঠল। প্রতিদিন তিন-চারটা প্রাইভেট। শুক্রবার ছাড়া সপ্তাহের প্রায় প্রতিটা দিনই ৭-৮ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো। সকালে স্কুল, তারপর বিকেলে প্রাইভেট… জীবনটা যেন বই-খাতা আর ক্লান্তির মাঝেই আটকে গিয়েছিল।
এসব আমার একদম ভালো লাগত না। মাঝে মাঝে মনে হতো, মানুষ কি শুধু পড়াশোনা করার জন্যই বেঁচে থাকে? কিন্তু উপায় ছিল না। পড়তেই হবে।
একদিন ভাবছিলাম নতুন আরেকটা সাইন্স প্রাইভেট শুরু করব। তখনো সবগুলো শুরু করিনি, মাত্র একটা শুরু করেছি। দ্বিতীয়টা নিয়ে ভাবছি, ঠিক তখনই এক বন্ধুর সঙ্গে দেখা। ওর কথাতেই নতুন সেই প্রাইভেটে ভর্তি হলাম।
আর সেখান থেকেই শুরু হলো আমার জীবনের এক অদ্ভুত অধ্যায়।
প্রাইভেটটায় কয়েকজন ছেলে আর কয়েকজন মেয়ে পড়ত। তাদের মধ্যে দুই-তিনজন অন্য স্কুলের, বাকিরা প্রায় সবাই আমারই ক্লাসের। প্রথম দিনগুলো সব স্বাভাবিকই ছিল। কিন্তু এক-দুই দিন যেতেই আমার চোখে পড়ল একটি মেয়েকে।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো—আমি তখনো মেয়েটির মুখ ঠিকভাবে দেখিনি। তবুও তাকে আমার অসম্ভব ভালো লাগতে শুরু করল। কেন? তার উত্তর আমি নিজেও জানতাম না।
মেয়েটির কথা বলার ভঙ্গি, নম্রতা, হাঁটাচলার সরলতা—সবকিছু আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতির জন্ম দিচ্ছিল। মনে হতো ভেতরের কোথাও নরম একটা আলো জ্বলে উঠেছে।
এই অনুভূতিটা খুব নতুন ছিল। এর আগে কখনো এমন হয়নি।
যে ৭-৮ কিলোমিটার রাস্তা প্রতিদিন পাড়ি দিতে আমার বিরক্ত লাগত, সেই পথটাই এখন আনন্দের মনে হতে লাগল। ক্লান্তিটা যেন কোথায় হারিয়ে গেল। বরং এখন আমি প্রতিদিন একটু আগেই বের হতাম। আরও আগে প্রাইভেটে পৌঁছানোর জন্য। কেন যেন মনে হতো, একটু আগে গেলে হয়তো তাকে আরও কিছুক্ষণ দেখা যাবে।
ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতিও মনোযোগ বাড়তে লাগল। বই খুললেই এখন আর শুধু অক্ষর চোখে পড়ত না—মাঝে মাঝে সেই মেয়েটির কণ্ঠও কানে ভেসে উঠত।
আমি নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। এটা কি শুধুই ভালো লাগা? নাকি এর নাম অন্য কিছু?
তখনো আমি নিজের অনুভূতির নাম দিতে পারিনি। শুধু এটুকু বুঝতে পারছিলাম— কোনো একজন মানুষের উপস্থিতি আমার প্রতিদিনের জীবনটাকে অদ্ভুত সুন্দর করে তুলছে।
০৫.অসমাপ্ত স্মৃতি
যে প্রজাপতিটা এসে রঙ ছড়িয়ে আবার উড়ে গেল:
যে মেয়েটিকে আমার ভালো লেগেছিল, সে সবসময় বোরকা আর হিজাবে নিজেকে ঢেকে রাখত। পুরো শরীর কালো কাপড়ে আবৃত থাকত। শুধু তার দুটি চোখ দেখা যেত। আর হয়তো সেই চোখ দুটোই নিঃশব্দে আমার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল।
চোখ দুটোতে ছিল এক ধরনের শান্তি। এক ধরনের নম্রতা, যা শব্দ দিয়ে বোঝানো যায় না।
মাঝে মাঝেই ভাবতাম— “আমি যদি আরও ভালোভাবে পড়াশোনা করি, তাহলে হয়তো কোনোদিন সে আমার সঙ্গে পড়া নিয়ে কথা বলবে।”
কখনো কল্পনা করতাম, মেয়েটি হয়তো একদিন আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করবে। হয়তো আমার পাশে বসবে। হয়তো নাম ধরে ডাকবে।
আর এই ছোট ছোট কল্পনাগুলোই আমার ক্লান্ত দিনগুলোকে সুন্দর করে তুলত।
কিন্তু এই ভালো লাগার মাঝেও আমি নিজের ভয় আর বিশ্বাসটাকে ভুলিনি। প্রতিদিন নামাজের পর আল্লাহর কাছে দোয়া করতাম—
“হে আল্লাহ, আমাকে সঠিক পথ দেখান। ভালো ও মন্দের পার্থক্য বোঝার তাওফিক দিন। আর আমাকে হারাম ও অন্যায় কাজ থেকে দূরে রাখুন।”
হয়তো এ কারণেই আমি কখনো সীমা অতিক্রম করিনি।
হঠাৎ একদিন বাড়িতে সিদ্ধান্ত হলো—সাইন্স ছেড়ে আমাকে আর্টস নিতে হবে। প্রথমে খারাপ লেগেছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে বাস্তবতাকে মেনে নিলাম। পরিবারের কথা, নিজের সামর্থ্য—সবকিছু ভেবে শেষ পর্যন্ত আর্টস নিয়েই এগোনোর সিদ্ধান্ত নিলাম।
এর মানে ছিল— সাইন্সের সেই প্রাইভেটগুলো ছেড়ে দেওয়া। আর তার সঙ্গে দূরে সরে যাওয়া সেই মেয়েটির কাছ থেকেও।
যেদিন শেষবারের মতো সেই প্রাইভেট থেকে বের হয়েছিলাম, বুকের ভেতর কেমন এক শূন্যতা কাজ করছিল। কিন্তু আমি জানতাম, কিছু অনুভূতি মানুষকে নীরবভাবেই মেনে নিতে হয়।
নতুন করে আবার অন্য একটি প্রাইভেটে ভর্তি হলাম। কিন্তু সেখানে মন বসছিল না। পরে শৈশবের এক বন্ধুর কথায় আরেকটি নতুন প্রাইভেটে পড়া শুরু করলাম।
আর সেখানেই ঘটল জীবনের সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনাগুলোর একটি।
যে মেয়েটিকে আমি ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছিলাম— সেই মেয়েটিই সেখানে ছিল।
মুহূর্তের মধ্যেই আমার নিস্তেজ দিনগুলো যেন আবার রঙিন হয়ে উঠল। তখনই মনে ঠিক করলাম— “এই প্রাইভেটটা আর বদলাবো না।”
আর্টস নেওয়ার পর আমি মাত্র দুটি প্রাইভেট পড়তাম। কিন্তু দ্বিতীয় প্রাইভেটটাই আমার কাছে সবচেয়ে প্রিয় হয়ে উঠেছিল। কারণ সেখানে ছিল আমার নিঃশব্দ ভালো লাগা।
মেয়েটিকে দেখলেই কেন যেন পড়াশোনার আগ্রহ বেড়ে যেত। বইয়ের কঠিন বিষয়গুলোও সহজ মনে হতো। মাঝে মাঝে শুধু ভাবতাম— “ইশ… মেয়েটি যদি আমার সঙ্গে একটু কথা বলত!”
কিন্তু মেয়েটি সবসময় মাদ্রাসায় পড়ার কারণে হিজাব-নিকাব পরা থাকত। তাই আজ পর্যন্ত তার মুখ আমি স্পষ্টভাবে দেখিনি। তবুও তার নম্রতা, শান্ত স্বভাব আর হাঁটার ভঙ্গি আমার হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে গিয়েছিল।
একদিন হঠাৎ অস্পষ্টভাবে তার মুখ দেখেছিলাম। সেই এক ঝলক দৃশ্যই বহুদিন ধরে আমার অন্তরে ছবি হয়ে আঁকা ছিল।
এরপর সময় দ্রুত বদলে যেতে লাগল। দুই মাস চোখের পলকে কেটে গেল। তারপর প্রাইভেট ব্যাচে বিশৃঙ্খলা শুরু হলো। শিক্ষক অনুপস্থিত থাকতেন, পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট হয়ে গেল। একসময় ব্যাচটা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেল। আর সেই সঙ্গে হারিয়ে গেল মেয়েটিও।
এরপর আর কোনোদিন তাকে কাছে থেকে দেখা হয়নি। হয়তো কখনো রাস্তায় হঠাৎ চোখে পড়ত। কিন্তু নিশ্চিত হতে পারতাম না। শুধু তার হাঁটার ভঙ্গি দেখে অনুমান করতাম— “হয়তো এটাই সে…”
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো— আমি কোনোদিন মেয়েটির সঙ্গে নিজের ভালো লাগার কথা বলিনি। বলার চেষ্টাও করিনি। সুযোগ পেয়েও না। প্রেম তো অনেক দূরের বিষয়।
হয়তো এটাই ছিল আমার ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর দিক— যেখানে কোনো দাবি ছিল না, কোনো স্বার্থ ছিল না, ছিল শুধু নীরব এক অনুভূতি।
মানুষের জীবনে কিছু অনুভূতি আসে বসন্তের প্রজাপতির মতো। খুব অল্প সময়ের জন্য আসে, নিঃশব্দে হৃদয়ের বাগানে রঙ ছড়িয়ে দিয়ে আবার হারিয়ে যায় দূরে কোথাও। কিন্তু চলে গেলেও তারা স্মৃতি হয়ে রয়ে যায় আজীবন।
আমার জীবনেও সেই মেয়েটি হয়তো তেমনই ছিল— একটি অসমাপ্ত অনুভূতি, একটি নীরব ভালো লাগা, একটি পবিত্র স্মৃতি।
আর হয়তো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অনুভূতিগুলো সেগুলোই— যেগুলো কখনো প্রকাশ করা হয় না, কিন্তু হৃদয়ের গভীরে আজীবন বেঁচে থাকে....
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now