বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
একদিন সম্রাট আকবর দরবারের সমবেত সকলকে নিয়ে খোশ-আলাপ করছিলেন। হঠাৎ সবাইকে অবাক করে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “ সে ব্যক্তিকে কি সাজা দেয়া হবে যে আমার গোঁফ টানবে?” কেউ বললো বেত্রঘাত। কেউ বললো, “ ব্যাটাকে শূলে চড়ান”। কেউ বললো শিরোচ্ছেদ। বীরবল চুপচাপ ছিলো। সম্রাট জিজ্ঞেস করলেন, “ কি বীরবল, তুমি কি বল?” বীরবল বললো, “জাহাপনা, তাকে মিষ্টি খেতে দিন!” সম্রাট রেগে উঠলেন। “তোমার মাথা খারাপ হয়েছে? যে ব্যাটা আমার গোঁফ টানবে তাকে মিষ্টি খেতে দেবো?” বীরবল ধীরে সুস্থে বললো, “হুজুর, আমার মাথা ঠিকই আছে। এই পৃথিবীতে আপনার পৌত্র ছাড়া আর কোন ব্যাক্তির সাহস হবে আপনার গোঁফে টান দিতে? জাহাপনা, আপনিই বলুন, আপনার গোঁফ টানার জন্যে নাতীকে মৃত্যুদন্ড নাকি মিষ্টি দিবেন?” সম্রাট বীরবলের সুক্ষ চিন্তায় আবারো খুশী হলেন।
-
একবার সম্রাট আকবর বীরবলকে আদেশ দিলেন তাঁর রাজ্যের সবচেয়ে বেশী চারজন বোকা লোককে ধরে নিয়ে আসতে। বীরবল সময় চেয়ে বোকা লোক খুঁজতে দরবার হল থেকে বের হয়ে গেল। রাস্তায় বের হতে বীরবল দেখলো একজন মস্ত পুরুষ বিরাট কাঁসার বাসনে করে কিছু ঝলমলে কাপড়-চোপড়, পান ও মিষ্টি নিয়ে যাচ্ছে। কৌতুহলী মনে বীরবল লোকটিকে জিজ্ঞেস করলো, “তুমি এসব জিনিস নিয়ে কোথায় যাচ্ছো? লোকটি বললো, “আমার স্ত্রী আমাকে তালাক দিয়ে অন্য একজন পুরুষের সাথে বের হয়ে গেছে। তাদের একটা সন্তানও হয়েছে। তাদের জন্যে এই উপহার নিয়ে যাচ্ছি।” বীরবল ভাবলো এই হতভাগাটার মতো দ্বিতীয় কোন বোকা লোক এই রাজ্যে বোধহয় আর নেই। বীরবল তার নাম-ঠিকানা রেখে পথ চলতে লাগলো।
কিছুটা পথ পার করে বীরবল দেখলো এক লোক মহিষের পিঠে চড়ে যাচ্ছে এবং লোকটার মাথায় বিরাট একটা ঘাসের বোঝা। বীরবল জিজ্ঞেস করলো, “তুমি মহিষের পিঠে যাচ্ছো, কিন্তু ঘাসের বোঝা নিজের মাথায় বইছো কেন?” লোকটা বললো, “ আজ্ঞে মহাশয়, আমার মহিষ গর্ভবতী। তার পিঠে বেশী ওজন দেয়া ঠিক হবেনা। আমাকে পিঠে নিয়ে হাটতেই মহিষটার কষ্ট হচ্ছে। তাই ঘাসের বোঝা মহিষের পিঠে না দিয়ে আমার মাথায় করে নিচ্ছি”। বীরবল ভাবলো এই মহেষ ওয়ালা আরেক বোকার হদ্দ। তার নাম-ঠিকানা নিয়ে বীরবল চলে গেল।
কয়েকদিন পরে বীরবল এই দু’জন লোককে নিয়ে আকবরের দরবারে হাজির হলো। বললো, “হুজুর আপনার রাজ্যে বাস করা বোকাদের দরবারে নিয়ে আসলাম”। সম্রাট বললেন, “ এখানেতো মাত্র দু’জন। আমি বলেছিলাম চারটে বোকা ধরে আনতে”। বীরবল দু’হাত জোড় করে বললো, “জাহাপনা, বোকাদের খুঁজে খুঁজে ধরে আনতে আমি হয়েছি তৃতীয় বোকা। আর বোকাদের ধরার আদেশ দিয়ে আপনি হলেন চতুর্থ বোকা। সব মিলে আমরা হলাম চার বোকা।“ বীরবলের কাছে ধৃত দু’জন বোকার কাহিনী শুনে সম্রাট আকবর হেসে ফেললেন।
-
সম্রাট আকবর একদিন হঠাৎ বীরবলকে ডেকে পাঠালেন দূত মারফত। শাসন ব্যাপারের গুরুতর কার্যে বীরবল বিশেষ ব্যস্ত থাকা সত্ত্বেও হস্তদন্ত হয়ে এসে দাঁড়ালেন। বীরবলের বিরুদ্ধে নানা দুষ্ট লোকের কথা বাদশার কানে উঠেছিল। তিনি ডেকে পাঠিয়েছি, তোমার সঙ্গে বিশেষ কথা আছে।’ তমুখে বীরবল বললেন, “আদেশ করুন প্রভু, কী কথা?” ‘দুটি এমন জন্তুকে তুমি আমার সামনে এনে হাজির করবে, তার মধ্যে একটি হবে স্বভাবকৃতজ্ঞ, আরেকটি হবে জাত-কৃতজ্ঞ! যাও— শীঘ্ৰ নিয়ে এসো।’ বীরবল তবু দাঁড়িয়ে। বাদশ ক্রুদ্ধকষ্ঠে পুনরায় বললেন, শুনতে পেয়েছ? আগামীকালই দুটি জন্তুকে তুমি ধরে আনবে মনে থাকে যেন। মুখ তুলে বীরবল, এ আমার পক্ষে সম্ভব নয় হুজুর, আমি অপারগ।” ‘সে-কথা আজ শুনতে চাই না। কাল যদি না আনতে পারো, তবে মৃত্যুদণ্ডের জন্য তুমি প্রস্তুত হয়ে এসো। বাদশা এ-কথা বলে হনহন করে সেখান থেকে চলে গেলেন, অন্দরমহলের দিকে। তৎক্ষণাৎ খবর রটে গেল চারদিকে। রাজদরবারে বীরবলের ওপর যত বিদ্বেষপরায়ণ জেনে খুশি হলেন মনে মনে। বীরবল তাদের পথের কাঁটা। অনেকে বাড়ি ফিরে আনন্দ উৎসবে মত্ত হলেন। বীরবলের আর রক্ষা নেই। এবার বীরবল কুপোকাত হবেনই। বাদশা যা আদেশ দিয়েছেন তা জোগাড় করা অসম্ভব! বীরবল নিশ্চয়ই পারবেন না।’ এই বলে সভাসদরা পরস্পরের মুখের পানে চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলেন ও মনে মনে আনন্দিত হয়ে সভা ত্যাগ করে চলে গেলেন। বীরবল রাজসভা থেকে বেরিয়ে সোজা বাড়ি না গিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন। অবশেষে কোনও সুরাহা করতে না পেরে বাড়ি ফিরে না খেয়ে সমস্ত রাত জেগে অসীম দুশ্চিন্তা নিয়ে কাটালেন। সেদিন ছিল জামাইষষ্ঠী। বীরবলের জামাই এসেছে, ভাল ভূরিভোজের আয়োজন হয়েছে তার ঘরে, অনেক উপহার আর পরিচ্ছদ আনা হয়েছে জামাইয়ের জন্য বাড়িতে এত উৎসব-আয়োজন কিন্তু বীরবলের মনে কোনও আনন্দ নেই। কেবল দুশ্চিন্তা আর দুশ্চিন্তা অনেক ভেবেচিন্তে পরদিন রাজদরবারে যাওয়ার সময় বীরবল জামাইকে ডেকে বললেন,‘ বাবাজি, একবার আমার সঙ্গে চলো তো যাই।’ জামাই সেজেগুজে সঙ্গে চলল। যাওয়ার সময় বীরবল তার পোষা কুকুরটিকেও সঙ্গে নিতে ভুল করলেন না। বাদশার খাস দরবার আজ লোকে লোকারণ্য। বীরবলের পরাজয় এবং মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞা স্বচক্ষে দেখবার জন্য অনেক ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি উদগ্রীব হয়ে প্রতীক্ষা করছিলেন। এমন সময় দরবারে এসে প্রবেশ করলেন বীরবল। সিংহাসনে বাদশা বসে ছিলেন। কুকুরটা এসে ঢুকতেই তিনি অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বীরবলের কাছে কৈফিয়ত তলব করলেন, “এ কী, এ কী বীরবল!’ দূর থেকে বীরবল তার উদ্দেশ্যে লম্বা কুর্নিশ জানিয়ে বললেন, ‘হুজুর আপনার আদেশমতো এই দুটি জন্তুকে এনে হাজির করেছি আপনার এই রাজসভায়।’ “জন্তু!—বাদশা উচ্চকণ্ঠে বললেন, “আমার সঙ্গে এমন বেয়াড়া তামাশা? আমাকে অপমান করার স্পর্ধা তোমার কী করে হল ?’ বীরবল বললেন, ‘প্রসন্ন হন জাঁহাপনা—এ আমার তামাশা নয়। আপনাকে অপমান করার স্পর্ধা সত্যিই নেই আমার। সত্যিই বলছি, দয়া করে শুনুন। এই দুটি জন্তুর একটি হল আমার জামাই। পৃথিবীতে যা কিছু শ্রেষ্ঠ উপহার, শ্রেষ্ঠ খাদ্য, শ্রেষ্ঠ পরিচ্ছদ ওকে দিন, তবু ওর লোভ মিটবে না, তবু কৃতজ্ঞ থাকবে না কোনওদিন। এত বড় জাত-অকৃতজ্ঞ জন্তু পৃথিবীতে আর, কেউ কি আছে সম্রাট? কিন্তু এই কুকুরটির দিকে চেয়ে দেখুন—মূর্তিমান কৃতজ্ঞতা। আপদেবিপদে, সম্পদে, সমানে প্রভুর পাশে দাঁড়িয়ে আছে আকাশ ভেঙে পড়ুক, ঝড়-বৃষ্টি হোক, ভূমিকম্প হােক, যদি ও বেঁচে থাকে সমস্ত বাঁধা-বিপত্তি মাথায় নিয়ে ও আপনার কাছ থেকে যাবেই না, বা সঙ্গ ছাড়বে না প্রভুর কোনওদিন। । সামান্য একটু আহার হলেই ও খুশি থাকবে।’ সম্রাট আকবরের মুখ প্রসন্ন হল। রাজসভা একেবারে স্তব্ধ। দুষ্ট ব্যক্তিদের মুখ মলিন হয়ে গেল, কী হতে কী হল! বাদশা তখন জল্লাদকে হুকুম করলেন, অকৃতজ্ঞ ব্যক্তির ঠাঁই এ রাজ্যে নেই। তুমি বীরবলের জামাইকে নিয়ে যাও, ওকে কোতল করে ওর ছিন্ন মুণ্ড নিয়ে এসো।’ ‘দাঁড়ান সম্রাট!—হেসে বীরবল সভয়ে বলে উঠলেন, আপনি পৃথিবীর ঈশ্বর, আপনার হুকুম পৃথিবীর সকল অকৃতজ্ঞ ব্যক্তিরই জন্য। কিন্তু জাঁহাপনা, আমরা যে প্রত্যেকেই কারও না কারওর জামাই, সে-কথা ভুললে চলবে কেন? সম্রাট উচ্চহাস্যে এই কৌতুকরস উপভোগ করলেন এবং বীরবল প্রচুর পরিমাণে পারিতোষিক পেয়ে বাড়ি ফিরলেন সেদিন। সম্রাট যারপরনাই খুশি হয়ে বীরবলকে বাহবা দিলেন। জামাইয়ের মুখও প্রসন্ন হল।
-
একবার দিল্লির দরবারে এক পণ্ডিত বাদশা আকবরকে বললেন, ‘শাহেনশা, আমি বিভিন্ন রাজ্যের পণ্ডিতদের তর্কশাস্ত্রে পরাজিত করে নিরানব্বইটি সোনার পদক লাভ করেছি! এখন আপনার দরবারের পণ্ডিতদের কাছে তিনটি প্রশ্ন করব। এগুলির যদি কেউ যথার্থ উত্তর দিতে না পারেন তাহলে মাত্র একটি সোনার পদক দাবি করব। সেটাই হবে আমার একশতম পদক। আর যদি আপনার সভাসদদের মধ্যে কেউ প্রশ্ন তিনটির উত্তর দিতে পারেন তাহলে আমি আমার নিরানব্বইটি পদকই তাকে দিয়ে দিব।’ এই প্রস্তাবে বাদশা রাজি হলেন। এবারে পণ্ডিত দরবারে প্রশ্ন তিনটি একে একে উত্থাপন করলেন। তার প্রথম প্রশ্ন, স্বপ্নে আমি একজন স্ত্রীলোককে দেখেছিলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, সে কে ? সে বলল, “আমি বুদ্ধি৷” কোথায় থাক? তার উত্তর “মগজে থাকি।” এখন আপনাদের মধ্যে কেউ কি বলতেপারেন, মগজ থেকে বুদ্ধি বেরিয়ে যায় কার? দ্বিতীয় প্রশ্ন : ‘আমি আর একটি মেয়েকে স্বপ্নে দেখলাম। তার নাম জিজ্ঞেস করে জানলাম “শক্তি।” কোথায় থাকে জিজ্ঞেস করতে বলল, “বাহু আর শরীরে আমার স্থান।” এখন আপনারা কি বলতে পারবেন, বাহু আর শরীর থেকে শক্তি চলে যায় কার? সভাসদরা কেউই পন্ডিতের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেন না। আকবর বাদশাএইসব প্রশ্ন গুন নিজেও কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলেন। সত্যি সত্যি কি কেউই এর জবাব দিতে পারবে না? তৃতীয় প্রশ্ন ; আমি আর একটি মেয়েকে দেখলাম। তার নাম জিজ্ঞেস করতে সে বলল, “হিম্মত।” কোথায় সে থাকে জিজ্ঞেস করাতে বলল, “হৃদয়ে থাকি!” এবারে আপনারা বলুন হৃদয় থেকে হিম্মত চলে যায় কি? যখন কেউ উত্তর দিতে পারল না, বীরবলের উত্তর তখন শোনা গেল, ‘প্রথম প্রশ্নের উত্তর— অহনিশি যারা স্বপ্নজাল বোনে তাদের বুদ্ধি মগজ থেকে বেরিয়ে যায়।’ দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর—মানুষ যখন বৃদ্ধ হয় তখন তার বাহু আর শরীর থেকে শক্তি চলে যায়।’ তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর—‘মানুষ যখন ভীরু কাপুরুষ হয়ে পড়ে তখন তার হিম্মত হৃদয় থেকে চলে যায়।’ পণ্ডিত লজ্জায় লাল হয়ে পরাজয় তদ্দন্ডে স্বীকার করে নিয়ে প্রতিজ্ঞা করলেন, আর কখনও কোথাও জ্ঞানের বড়াই করবেন না। অঙ্গীকার অনুাযায়ী বীরবলকে তিনি তাঁর নিরানব্বইটি পদকই দিতে গেলেন। কিন্তু বীরবল তা গ্রহণ না করে উদারতার পরিচয় দিলেন। বাদশাকে অনুরোধ করে আর একটি পদকও জোগাড় করে দেন তিনি।
-
একবার পারস্যের রাজা তাঁর দেশের পরিব্রাজক ও সওদাগরদের কাছ থেকে মোগল সাম্রাজ্যের কাহিনী শুনলেন। সন্দেহ নিরসনের জন্য আকবরের কাছে একজন দূত মারফত তিনি আকবরের এক মন্ত্রীকে তার রাজ্য পরিদর্শন করতে আমন্ত্রণ জানালেন এই ভেবে যে, তার কাছ থেকে মোগল সাম্রাজ্য সম্পর্কে বিস্তারিত খবর তিনি পাবেন। আকবর এই আমন্ত্রণে বীরবলকেই উপযুক্ত মনে হওয়ায় তাকেই পারস্যের রাজার কাছে পাঠিয়ে দিলেন। তিনি জানতেন কেন পারস্যরাজ মন্ত্রী পাঠাতে চেয়েছেন। নিশ্চয়ই তার রাজ্যের সমৃদ্ধির কথা মন্ত্রীর মুখ থেকে শুনতে চান। একমাত্র বীরবলই এর উপযুক্ত। তিনি কোনও ভাবনাচিস্তা না করেই বীরবলকে পাঠালেন। বীরবল পারস্যে আসার পর সে রাজ্যে মহা ধুমধাম পড়ে গেল ওই আমোদ-প্রমোদের আয়োজনও হল রাজ্যে। পারস্যরাজের অতিথি হয়ে বীরবল সারা দেশ ভ্রমণ করলেন। পারস্যের রাজা একদিন কথায় কথায় বীরবলকে প্রশ্ন করলেন, আপনি তো বিভিন্ন দেশ ঘুরেছেন। আপনি কি বলতে পারেন, অন্যান্য রাজার তুলনায় আমি কীরূপ? বিশেষ করে বাদশা আকবরের তুলনায়? বীরবল উত্তর দিলেন, “মহামান্য রাজন, আপনি পূর্ণ চন্দ্র অন্যান্যরা আপনার কাছে জোনাকি মাত্র। আকবর অর্ধচন্দ্রের মতো।’ পারস্যের রাজার প্রতি বীরবলের এই প্রশস্তিমূলক কথাটি অচিরেই বীরবল দিল্লি যাওয়ার আগেই আকবরের কানে উঠল লোকপরম্পরায়। তিনি মনে মনে বিরূপ না হয়ে পারলেন না বীরবলের প্রতি। বীরবল যখন দেশে ফিরলেন প্রচুর উপঢৌকন নিয়ে, তখন আকবর পারস্যের রাজার দেওয়া উপহার সামগ্রীর দিকে নজরই দিলেন না। রাজাকে পূর্ণচন্দ্র এবং আমাকে অর্ধচন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করে তুমি কী ইঙ্গিত করতে চাও? এর ফলে কি তুমি আমার অবমাননা ও আমার সঙ্গে বেইমানি করোনি বলতে চাও? তোমাকে কে অধিকার দিয়েছে আমাকে অর্ধচন্দ্রের সঙ্গে তুলনা করতে? বীরবল জানতেন যে, অতিথি হিসেবে পারস্যের রাজার এইরকম প্রশস্তি করা উপযুক্তই হয়েছে ; কিন্তু বাদশা তার মর্ম বুঝবেন না। সভাসদগণের ঈর্ষায় বীরবলের ওপর তাতিয়ে দেওয়ায় তিনি এত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন যে, বীরবলের যুক্তি শুনতেও রাজি ছিলেন না। তখন কিন্তু বীরবলের উপস্থিত বুদ্ধি সে যাত্রা বীরবলকে বাঁচাবার পথ দেখিয়ে দিল। তিনি বললেন, শাহেনশা, আমি আপনাকে কী করে অপমান করতে পারি—আপনি আমার অন্নদাতা। পূর্ণচন্দ্র দিনে দিনে হ্রাস পায় কিন্তু অর্ধচন্দ্র দিনে দিনে বৃদ্ধিলাভ করে। এ-কথা কি আপনি জানেন না, আপনার জন্যই আমি এমন কথা বলেছি। আকবর বাদশা বললেন, চালাকি করার জায়গা পাও না? তুমি আমাকে বোকা পেয়েছ, যা বুঝিয়ে দিলে আমি তাই বুঝে গেলাম!’ তবে শুনুন, আপনার খ্যাতি দিনে দিনে বাড়ছে, এবং আপনার তুলনায় পারস্যের রাজার খ্যাতি দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে, এ-কথা কি আপনি জানতে চান না? না, আমি মিথ্যে কথা বলিনি।’ বীরবলের উত্তর শুনে তার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও বিচারশক্তির ওপর আস্থা আরও দৃঢ় হল আকবরের। জল হয়ে গেল বাদশার রাগ। তিনি বীরবলের ওপর যেমন ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন সে রাগ আর রইল না। তখনই বীরবলকে বহু পুরস্কার দিয়ে বিদায় দিলেন। সভাসদদের মুখে চুনকালি। কোথায় হেয় হবে বীরবল তা না, পেয়ে গেল একেবারে দ্বিগুণ পুরস্কার।
-
কৈশোরে মৌলভীর কাছে বীরবল ফারসি লিখতে গিয়েছিলেন। একদিন পড়া বলতে না পারায় মৌলভী সাহেব তার ওপর খুব রেগে গেলেন। বললেন জানো তোমার বয়সে বাদশা হুমায়ুন প্রতিদিন দশ ঘণ্টা করে লেখাপড়া করতেন, আর তুমি?
বীরবল সবিনয়ে জানাল_ জী আপনার মতো বয়সে হুমায়ুন বাদশা হয়ে ভারত শাসন করেছিলেন, আর আপনি আমাদের মতো ওঁছা ছাত্রদের ভাঙা মাদ্রাসায় বসে পড়াচ্ছেন।
-
একদিন গ্রীষ্মকালের স্নিগ্ধমধুর প্রভাতে বায়ু সেবনের জন্য বীরবলকে সঙ্গে নিয়ে সম্রাট প্রাতভ্রমণে বেরিয়েছিলেন। অনেকদূর পর্যন্ত কথা বলতে বলতে চলে গিয়েছিলেন তাঁরা। ফেরার সময় বেশ রৌদ্র উঠল, এবং আবার অসহ্য গরম পড়ে গেল। সম্রাট বললেন, উঃ বড্ড গরম লাগছে! অনেক বেলা হয়ে গেছে। তুমি আমার ভারী জামাটা কাঁধে নেবে বীরবল ?’ “যে আজ্ঞে।’ বীরবল সম্রাটের সেই জামাটা কাঁধে ফেলে ধীরে ধীরে চললেন। অনেকটা দূর গিয়ে সম্রাট একবার মুখ ফিরিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘খুব ভারী মনে হচ্ছে? নিশ্চয়ই তোমার কষ্ট হচ্ছে? এই বোঝা কতটা ভারী হবে বলো তো?” বীরবল জবাব দিলেন, তা একটা গাধার বোঝা হবে বইকী।’ সম্রাট স্তব্ধ হয়ে বীরবলের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর পথ চলতে লাগলেন এবং রাজদরবারে পৌছে গেলেন। রাজদরবারের মাঝখানে সিংহাসনে বসে সম্রাট আকবর প্রশ্ন করে বসলেন, “বলো তো বীরবল, সত্য ও মিথ্যার মাঝখানে ব্যবধান কতটুকু? সবাই চুপ। বীরবল এদিক-ওদিক তাকিয়ে পরিষ্কার কন্ঠে জবাব দিলেন, ‘মাত্র চার ইঞ্চি হুজুর। এর বেশি কোনওমতেই হতে পারে না।’ ‘চার ইঞ্চি !’ সম্রাট অবাক! তিনি বললেন, সে কী কথা? তুমি ঠিক বলছ তো? হ্যাঁ, হুজুর। মাত্র চার ইঞ্চি! আমরা দুই চোখে যা দেখি তা সত্য। কিন্তু দুই কানে যা শুনি তা অনেক সময়ে সত্য নয়, অনেক সময় মিথ্যা। চোখ দিয়ে দেখা এবং কান দিয়ে শোনা, এ দুইয়ের মধ্যে ব্যবধান, চার ইঞ্চির বেশি নয় সম্রাট সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যও ততটুকু। জবাব শুনে সম্রাটের মুখ প্রফুল্ল হয়ে উঠল। সম্রাট সমঝদার ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বীরবলকে বললেন, ‘সত্যি, তোমার তুলনা তুমিই।
-
আকবর বাদশার পুত্র সেলিমের সঙ্গে মন্ত্রিপুত্রের প্রগাঢ় বন্ধুত্ব জন্মেছিল। সবসময়ই তারা একসঙ্গে থাকতেন, হাস্য পরিহাস করতেন। একেবারে এক আত্মা, এক প্রাণ। দু’জন দু’জনকে ছেড়ে থাকতে পারতেন না। খাওয়া, ওঠাবসা সবসময়ই করতেন একসঙ্গে। কিন্তু ওঁদের এত বন্ধুত্ব বাদশার ভাল লাগত না। একদিন তিনি বীরবলকে ডেকে বললেন, ‘বীরবল, সেলিমের সঙ্গে মন্ত্রিপুত্রের এত ভাব আমার ভাল লাগছে না। তুমি ওদেরকে যে কোনও প্রকারে আলাদা করে দাও। বীরবল বললেন, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন জাঁহাপনা, আমি ওদের বন্ধুত্ব নষ্ট করে দিচ্ছি। এর জন্য আপনাকে কোনও ভাবনাচিস্তা করতে হবে না।’
সেলিম ও মন্ত্রিপুত্র একদিন বসে গল্প করছিলেনভ বীরবল গিয়ে সেলিমের কানের কাছে মুখ নিয়ে শুধু ফুসফুস করে শেষে বললেন, ‘যে-কথা বললাম কাউকে যেন সে কথা বোলো না।’ বীরবল চলে যেতেই মন্ত্রিপুত্র সেলিমকে জিজ্ঞেস করলেন, উনি কী বলে গেলেন? আবার যাওয়ার সময় বলে গেলেন—না বলতে।’ সেলিম বললেন, কিছুই না, শুধু ফুসফুস করলেন। সত্যি বলছি, আর কিছু বলেননি। মন্ত্রিপুত্র সে-কথা বিশ্বাস করলেন না। জরুরি কাজ আছে বলে উঠে চলে গেলেন। মন্ত্রিপুত্র মনে মনে ভাবলেন হয়তো ওঁরই সম্বন্ধে বীরবল কিছু বলতে মানা করছেন। সেলিম কিন্তু সেজন্যই বলছে না। এরপর থেকেই কোনওদিনই আর ওঁদের দু’জনকে একত্রে দেখা যেত না। মন্ত্রিপুত্র আর একেবারেই আসতেন না।
-
সম্রাট একদিন বেশ হাসিখুশি মুখে ছিলেন। সেই সুযোগে বীরবল বললেন, সম্রাট, আপনার কাছে একটি ভিক্ষে চাই?’ সম্রাট বললেন, ‘বেশ তো, বলো? ‘ যদি আমি কোনওদিন দোষ করি, আমার মনোনীত জুরিরা যেন আমার বিচার করেন। বাদশা বললেন, ‘বেশ ভাল কথা। তাই হবে।’ বেশ কিছুদিন পরে ইচ্ছা করেই বীরবল একটি ঘোরতর অন্যায় কার্য করে বসলেন। সম্রাট স্থির করলেন বীরবলকে শাস্তি দিতেই হবে। এমন উপায় নেই। বীরবল বেশ বুঝতে পারলেন, যদি ঠিকমতো শাস্তি হয় তবে অন্তত দশ-বিশ হাজার টাকা তার অর্থদণ্ড হতে বাধ্য। কিন্তু সেই সময় সম্রাটকে তিনি পূর্বপ্রতিজ্ঞা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললেন, ‘হুজুর, আমার জুরিদের আমিই স্থির করব বলে যে ভিক্ষা : চেয়েছিলাম, এবং আপনি ভিক্ষা দেবেন বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন, অতএব আপনার কথা যদি এখন রাখেন তবে আমার পক্ষে ভাল হয়।
সম্রাট বললেন, ‘তাই হোক, পাঁচজন বিচারক স্থির করে দাও, তাদের বিচার যাই হোক না কেন তোমাকে কথা দিলাম, আমি মেনে নেব।’ ‘তাহলে গ্রাম থেকে পাঁচজন দরিদ্র লোককে আনতে বলুন, তারা এসে আমার বিচার করুক। তারা যা বিচার করে দেবে তা আমি মাথা পেতে নেব।” ‘মানে? সম্ভ্রান্ত বিচারক তুমি চাও না? ‘হুজুর। দরিদ্ররাও তো মানুষ, সম্ভ্রান্ত লোকরীও মানুষ! ঈশ্বরের কাছে কেউ ছোট নয়, কেউ বড় নয়। এ তো আপনারই কথা! দিন না তাদের বিচার করতে হুজুর? গ্রাম থেকে পাঁচজন বৃদ্ধ কিন্তু অতি দরিদ্র ব্যক্তি এল, এবং সম্রাট নিজে তাদের ডেকে মামলাটা ভাল করে বুঝিয়ে দিলেন এবং এও মনে করিয়ে দিলেন যে, ভাল করে বিচার করবে যাতে তোমাদের সুনাম হয়। তারা সবাই ভাল করে মাথা খাটিয়ে আলোচনা করে দেখল, বীরবল ভীষণ অপরাধী। এত বড় অপরাধের জন্য বীরবলের কমপক্ষে দেড়শো টাকা জরিমানা হওয়া উচিত। এর কমে কিছুতেই হতে পারে না। যেমনই অপরাধ তার তেমনি সাজা। একজন বলল, “দেড়শো? না, না, বীরবল মরে যাবেন। অত টাকা তিনি পাবেন কোথায়? স্ত্রী-পুত্র নিয়ে পথে পথে ভিক্ষে করবেন বলতে চাও? না-না, তা হতেই পারে না কিছুতেই, এতটা অন্যায় বিচার করা যায় না।’ আরেকজন বলল, তা ঠিক বলেছ, বেচারা পাবে কোথায়? যাকগে, পচাত্তর টাকা অর্থদণ্ড দিক। এর কম করলে বিচার ঠিক হবে না। পাঁচজনে পাঁচরকম আলাপ করার পর অবশেষে মাত্র পঞ্চাশ টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত হল। এও অনেক টাকা। বীরবল চিরজীবন এই শাস্তি মনে রাখবেন। তিনি পঞ্চাশ টাকা কোথা থেকে পাবেন?’ বিচারের সিদ্ধান্ত নিয়ে, তারা এল সম্রাটের কাছে। এসে বলল, জাঁহাপনা, জানি বীরবলের ওপর এটা কঠোর শাস্তি। কিন্তু অপরাধ তাঁর গুরুতর। এই বিপুল পরিমাণ অর্থদণ্ড তাঁর পক্ষে মৃত্যুদণ্ডেরই মতো। কিন্তু উপায় নেই, এ হল ন্যায়বিচারের মানদণ্ড! আপনি দেখুন, এই বিপুল অর্থদণ্ড ছাড়া আমাদের বিচারে আর কিছু করা যায় না।’ ‘মাত্র পঞ্চাশ টাকার শাস্তি!’ সম্রাট এবার একথায় বুঝতে পারলেন বীরবলের চাতুরি। কেন এই দরিদ্র ব্যক্তিদের দিয়ে বিচারের নামে প্রহসন করলেন! অতি দরিদ্র ব্যক্তিদের বিচারে পঞ্চাশ টাকাই হল বিপুল পরিমাণ জরিমানা, সন্দেহ নেই। কিন্তু সম্রাট খুশি হলেন এই ভেবে যে, বীরবল মানুষের মনোজগতেরও বহু খবর রাখেন। দীন দরিদ্র প্রজাদের মন সরল ও নিরপেক্ষ এবং তাদের দ্বারাও যে মহৎ উপকার হয়, তা বুঝিয়ে দিলেন তিনি।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now