বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
বকুল তলার মোড়। তিনদিক থেকে তিনটে রাস্তা এসে মিশেছে
সেখানে।
রাস্তার পূর্বপাশ্বে রয়েছে একটি টং দোকান। গণী মিঞার টং
বলে চেনে সবাই। দোকানের পিছনে আছে দুইটি
ক্যারামবোর্ড। এই ক্যারামকে ঘিরে এই জায়গাটি ভোরের
আলো বিকিরণের পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জমজমাট
থাকে। অনবরত উড়তে থাকে নিকোটিনের বিষাক্ত কালো
ধোয়া আর অবিরাম ঘুরতে থাকে স্টাইক নামক গোল গুটিটা, নেহাত
নির্জীব তাই কিছু বলেনা। নয়ত ওর যদি প্রাণ থাকত তবে নিশ্চয় এই
আনাড়ি মানুষগুলির সাথে একমুহূর্ত থাকতনা।
সব সময় এখানে মৃদুকোলাহল পাওয়া যায়। সারাটিক্ষণ লেগে থাকে
অভিশপ্ত আড্ডা। এলাকাজুড়ে যত ক্রাইম হয় তা পরিচালনার
হেডকোয়াটার এই টং দোকান। সব গুন্ডা- পান্ডা, মাফিয়া আর চোর
ছ্যাছড়ের সেরা আবাস্থল এই টং দোকান। তবে বেশীরভাগই
হলো উঠতি যুবক। বাবা- মায়ের স্বপ্নকে জলাঞ্জলি দিয়ে, অসৎ
সঙ্গলাভ করে লেখাপড়া ছিঁকেই তুলে এখন একেকটি সোনার
ছেলে একেকজন আইকন নেশাখোর হিসেবে আত্মপ্রকাশ
করেছে ।
তেমনই একটা ছেলে শিশির। উঠতি বয়সী মাস্তানদের লিডার।
স্যামবরণের থেকে একটু উজ্জ্বল গায়ের রং, লিকলিকে
শরীর, চোখ টকটকে লাল, মাথাভরা উসকো- খুসকো চুল, এক
হাতে স্টাইক অন্যহাতের দুই আঙ্গুলের মাঝে রয়েছে
সিগারেট। সেটি থেকে এঁকে বেঁকে ধোয়া উড়ে টিনের
চালের ফাক দিয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে। ধোয়াগুলো আদৌ কোথায়
যায় তা নিয়ে ভাবার মতো ইচ্ছা বা মন মানসিকতা নেই তার। নেশা করার
কারণে কোন বিষয় নিয়ে সুক্ষ্ম চিন্তা করার মত ধৈর্য্য সে
রাখতে পারেনা। বেশি চিন্তা করলে তার স্নায়ুতে চাপ পড়ে। হঠাৎ
হঠাৎ মাথা চক্কোর দিয়ে উঠে চোখে- মুখে অন্ধকার
দেখতে শুরুকরে ও।
নিত্যদিনের মতো আজও শিশিরের তিক্ষ্ণ নজর রেড গুটিটির
দিকে । চোখ বাঁকা করে সব এঙ্গেল থেকে দেখেনিয়ে
আঙ্গুল দিয়ে যেইনা টোকা দিতে যাবে ওমনি কে যেন খবর
দিলো পুলিশ আসছে। সাথে সাথে বেড়া ভেঙ্গে- চুরে যে
যেদিকে পারল দৌড় দিলো কিন্তু বাশের বেড়াই আটকেথাকা
আল-পিনের সাথে জড়িয়ে নিচের কাদার মধ্যে পড়ে যায় শিশির।
সাথে সাথে কালো পোশাক পরা র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের
সদস্যরা তাকে ধরে ফেলল। অনেক আকুতি করেও ছাড়া
পেলোনা শিশির। গ্রাম জুড়ে শুনশান নীরাবতার সাথে অন্যরকম
আতঙ্ক বিরাজ করছে।
গ্রামের মানুষজন বলাবলি করছে একজন ছেলের হঠাৎ বদলে
যাওয়ার গল্প। তাদের কথা থেকে জানতে পারা যায় শিশির নামের
ছেলেটির পরিচয়। মুহূর্তেই যেন বাতাসেও বেড়াতে লাগলো
সুন্দর- সুশ্রী, নম্র- ভদ্র, একটি মেধাবী ছেলে থেকে
আকস্মিক নেশায় বুদবুদ হয়ে যাওয়া, আক্রমনাত্বক দৃষ্টি- ভঙ্গির
একটি বখাটে ছেলে হওয়ার করুণ গল্প।
ভাষার জন্য, একটি স্বাধিন মানচিত্রের জন্য জীবন উৎস্বর্গকারী
লক্ষ মুক্তিযোদ্ধাদের দেখা স্বপ্ন- সমৃদ্ধির দেশগড়তে নামা
একঝাক তরুণের নেতৃত্বদানকারী আগামীর একজন আইকনের
এমন গল্পের ভেসেচলা কথাগুলোর অভিশপ্ত ঝঙ্কারে
নড়েচেড়ে উঠলো দেশের বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়।
তাইতো আজ র্যাব অফিসের ৭ নং রুমটির শক্ত কংক্রিটের
পোড়াগন্ধ আর মৃদু আলো- আঁধারির মাঝে শিশিরকে ঘিরে
জিজ্ঞাসাবাদের ধুম চলছে।
রুমের মাঝখানে আছে তিনটে চেয়ার আর একটি টেবিল। আর
টেবিলের উপরে কাঠমিস্ত্রিদের কাজের জন্য প্রয়োজনীয়
কিছু অস্ত্র রাখা আছে।
উপরে একটি হলুদ আলো ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে যার কিছুটা পশরা
সহসা এসে পড়ছে শিশিরের মাথা, চোখ- মুখে আর বাকিটা পড়ছে
ঘুনধরা টেবিলের উপরে রাখা দুই জোড়া হাতে। একটি হাতে
পরানো আছে ঢলমলে সোনালী রঙের ঘড়ি। শিশিরের মনে
হলো এইরকমের ঘড়ি সাধারনত শশুরবাড়ি থেকে যৌতুক নেওয়া
হয়।
ঘড়ির কাঁচ থেকে আলো প্রতিফলিত হয়ে রুমের
উত্তরপাশ্বের কোনায় ঝুলে থাকা মাকড়শার চোখে লাগছে।
শিশির অনেকটা কৌতূহল নিয়ে এক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে
আছে। দেখার চেষ্টা করছে মাকড়শারজালে কোন মশা
আটকে আছে কি না।
মাকড়সাটি কেমন যেন ঘাপটি মেরে বসে আছে।
তার অগোছালো ভাবনা শেষ হলো সামনে বসে থাকা মানুষদুটির
ডাকে। শিশির ভেবেছিল হয়ত প্রতিবারের মতো মাইর- ধর
করবে তারপর হাজতে পাঠিয়ে দিবে, কিন্তু না একজন বেশ আদর
মাখা কণ্ঠে জানতে চায়লো হঠাৎ কেন সে এপথে পা বাড়ালো।
কেন সুন্দর ভবিষ্যৎকে পর্যুদস্ত করে এমন অনিশ্চয়তাকে
সঙ্গী করলো। কেন তার বাবা- মায়ের পরিশ্রমকে পণ্ড করে
পৈশাচিকতায় গা ভাসালো।
শিশির চুপটি করে বসে রইলো। রুমজুড়ে পিনপতন নীরবতা,
শিশিরের অবনমিত দৃষ্টি আর করুন নিশ্বাস জিজ্ঞাসুদের কৌতূহল
বাড়িয়ে দিলো।
আবারও একই প্রশ্নের কিছুটা পুনরাবৃত্তি করা হলো।
শিশির এবার মুখ তুলল। চোখ দুটি বিশেষ ভঙ্গিমায় দুবার বন্ধ করে
আবার খুললো। এই স্টাইলটি তার ক্লাসে পড়াবলার পূর্বমুহূর্তের
প্রস্তুতি বলে বিবেচিত হতো। এর মানে বোঝানো হতো
'He has prepared for answer'
যথাযথ উত্তর রেডি। আজও কি তবে তার মধ্যে সেই মেধাবী
ভাবটি ফুঁটে উঠছে?
চশমাপরা অফিসারটির মুখে মৃদু হাসির রেখা উঁকি দিলো। কারণ উনি
আগেই জেনেছেন এই স্টাইলটা হলো শুভ কিছুর বহিঃ প্রকাশ।
শিশির বলতে শুরুকরল
স্বপ্ন! আপনি কোন স্বপ্নের কথা বলছেন যা টাকার কাছে
অসহায়? আপনি কোন স্বপ্নের কথা বলছেন যা মেধাবীর
মেধায় নয়, টাকাওয়ালার দুষ্টু হাসিতে পূর্ণতা পায়?
যা নোংরা মানসিকতার কাছে ভু- লুণ্ঠিত হয়?
তার প্রশ্ন শুনে থমকে গেলেন উনারা। শিশির উত্তরের
তোয়াক্কা না করে আবার বলতে লাগলো
'বাস্তবতাকে যারা সুগভীর ষড়যন্ত্রের আড়ালে বশীভূত করে
রেখেছে আপনাদের দৃষ্টি সেখানে পৌঁছানোর আগেই অবৈধ
ক্ষমতাধরদের ক্ষমতা আর টাকার কড়কড়ে সৌরভে বিমুগ্ধ হয়ে
যান। কিন্তু তারা থেকে যায় অন্তরালেই। মাঝখান থেকে আমার
মতো দরিদ্র পরিবারে জন্মনেওয়া দিগন্তপ্রসারী স্বপ্ন দেখা
ছেলেগুলো ঝরে পড়ে অসীম দৈবল্যতায়।
উনারা নড়েচড়ে বসলেন,
'স্বপ্ন! হ্যাঁ আমিও দেখতাম। বাবা- মায়ের মুখ উজ্জ্বল করব একদিন
দশের একজন হব। কিন্তু কলেজ লাইফে পা দেওয়ার পরে তা
ক্রমেই ঝাপসা হয়ে আসে। কিছু স্টুডেন্টদের পাঠানো হতো
বিভিন্ন ভাবে প্রলোভন দেখিয়ে। কিন্তু আমাদের মত
প্রথমশ্রেণীর স্টুডেন্টদের কারও দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে
অথবা কাউকে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে পাঠানো হত অথবা
জনসভায় নামক নষ্ট রাজনৈতিক রঙ্গমঞ্চে।
স্যাররা আমাকে স্কলারশিপ দেওয়ার নামে পাঠিয়েছিল প্রথমদিন।
পরে আর যেতে না চাইলেও ভয়ভীতি আর হুমকী আমাকে
বাধ্য করেছিল সেদিন তাদের সঙ্গী হতে।
তারপর থেকে গা সওয়া হয়ে গেলো।
এভাবেই দিনের পর দিন তাদের সঙ্গী হতে হতে নিজের সব
বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ড্রাগ এডেক্টেড হতে সময় লাগলো না।
প্রথমে তারা সেচ্ছায়- জোরকরে সরবরাহ করলেও
পরবর্তীতে তারা আর নেশাদ্রব্য দিত না। তখন আমাদের নেশায়
কাতর অসহায়তার সুযোগ নিয়ে নেশাদ্রব্যের বিনিময়ে ছোট
ছোট অপরাধমূলক কাজ করিয়ে নিতো। এ যেন কোন সংগঠিত
চক্রের নিঁখুত প্রয়োগ- পর্যবেক্ষণ আমাদেরকে আস্তে
আস্তে স্টাবলিশ ভাবে এ জগতের বাসিন্দা বানিয়ে নিলো।
কেমন ঘোরের মাঝে সবকিছু এলোমেলো হয়েগেল,
সকল রঙিন স্বপ্ন ফিকে হয়ে এলো। বুঝতেই পারিনি কেমন
করে একজন আদর্শ ছেলে থেকে সমাজের কীটে
পরিণত হলাম।'
শিশির থামলো। কিন্তু কেন যেন অবাধ্য অশ্রুকণাগুলো
নির্লজ্জের মত গাল বেয়ে নেমে আসছে।
নির্বাক চেয়ে আছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বাংলাদেশের
সিনিয়র দুজন অফিসার। কি জবাব দিবে তাকে তা ভেবে পাচ্ছেন না
উনারা। তাই একটু সুন্দর মস্তিষ্কে ভেবে চিন্তে শিশিরকে এপথ
থেকে ফেরাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার একজন
সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর আপতত শিশিরকে তারজন্য গ্রামে
প্রতিক্ষিত বাবা মায়ের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হোক, তারপর
অফিসিয়াল ভাবে তার সাথে কন্টাক্ট করা হবে।
পরদিন বিকালে বকুল তলায় সেই তিন রাস্তার মোড়ে তিন তিনটে
চকচকে গাড়ি এসে ব্রেক করলো। কালো পোশাকের
মানুষগুলোর মধ্য থেকে দুজন লোক শিশিরের গায়ে
আদরের হাত বুলিয়ে ঠোটে একচিলতে মিষ্টি হাসির রেখা
টেনে ইশারা করলো তার বাবা মায়ের কোলে ফিরে যেতে।
এলাকাজুড়ে সবাই থ হয়ে দেখতে লাগলো সবকিছু।
শিশির কয়েকপা ছোট ছোট ধাপ ফেলে এগিয়ে গেলো,
তারপর পিছু ফিরে একবার ঐ দুটি মানুষের চেহারায় দৃষ্টি ফেলে
আবার সম্মুখে হাটতে লাগলো ।
আলহামদুলিল্লাহ্ সমাপ্ত
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now