বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
দাঁড়ি কামাতে গিয়ে ভয়ানক বিপদে পড়ে গেল শান্তনু। ভোর ছ’টা বত্রিশ -এ ঘুম থেকে ওঠা চাট্টিখানি কথা নয়। তবুও কোনরকমে উঠে ঢুলুঢুলু চোখে বাথরুমে মুখে শেভিং ক্রিমটা মাখাচ্ছিল। ঘুমে চোখ বুজে আসছে প্রায়। তখনি বিপত্তিটা ঘটল। চোখ খুলেছে কী খোলে নাই, মস্ত বড় এক ভীমরুল নাকের ডগায় বসে থাকতে দেখে পিলে চমকে গেল! একটা চাপা চিতকার করতে যাবে, তখনি কে যেন পরিষ্কার গলায় বলে উঠল, 'আহ, চিল্লানোর কী আছে? মনে হয় ভীমরুল দেখিস নাই জীবনে!'
প্রথমটায় কিছুই বুঝে উঠতে পারল না শান্তনু। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছে! গলার কাছটায় কোত্থেকে জুটে যাওয়া শক্ত গোছের ঢোঁকটা গিলে হঠাত মনে হল সে কি পাগল-টাগল হয়ে গেল নাকি? চাকুরি অনেকেরই থাকে না কিংবা হয় না। তাই বলে এই সাত-সকালে একটা তুচ্ছ পোকার ধমক খাবার মত ঘটনা ঘটবে? তাছাড়া পোকাটিইবা কী করে তার মনের কথা বুঝতে পারছে?
কী, খুব ঘাবড়ে গেছিস তো? ও সবারই হয় – মানে যখন আমি দর্শন দেই আর কি!
দর্শন দেন, মানেটা কী? নিজেকে খুব বড় কিছু ভাবেন নাকি? কোনো এক বিচিত্র কারণে শান্তনু ভীমরুলটাকে আপনি বলে সম্বোধন করছে, অথচ তার কিন্তু মোটেও সে ইচ্ছে নেই!
হ্যাঁ দর্শন দেই যখন তোর মত কিছু মারাত্মক রসাতলে যাওয়া হাবাদের সাহায্যে আসতে হয়।
এহ, কে সাহায্য চেয়েছে? যেই না একটা পোকা, একটা থাবড়া দিলেই তো ভবলীলা সাঙ্গ হয়ে যাবে। সে কিনা আমার সাহায্যে এসেছে! এত প্যাঁকে পড়ি নি বাবা! হেঁড়ে গলায় হাসতে থাকে শান্তনু।
কী, এত বড় কথা! ভয়ানক চটে গিয়ে ভীমরুলটা শান্তনুর নাকে একটা ভীষণ কামড় বসিয়ে দিল...
সিমি বাথরুমের দরজায় দাঁড়িয়ে ফুঁসছিল। আধা ঘন্টার বেশি হয়ে গেছে শান্তনু ঢুকেছে। বের হবার নাম নেই ... উলটো কিছুক্ষণ আগে চাপা স্বরে কথা এবং হাসির শব্দ শুনেছে। এখন এইমাত্র আর্তনাদের শব্দ শুনে পিত্তি জ্বলে গেল। দরজায় সজোড়ে ক’টা বাড়ি মারল।
এই যে, তোমার না হয় কাজ-কর্ম নেই, আমার তো আছে। অফিসে দেরীতে পৌঁছলে জবাবদিহিটা কি নবাবজাদা করবেন নাকি? বাথরুমে এই সকালে নাটক ঝাড়তে লেগেছে! লজ্জা করে না?
ঠিক তখুনি দরজাটা খুলে গিয়ে শান্তনু বের হয়ে এল। চোখেমুখে বেশ খানিকটা এলোমেলো হতভম্ব ভাব। আর মুখে আধা কামানো দাঁড়ি। সিমিকে এক রকম উপেক্ষা করেই বিড়বিড় করতে করতে পাশ কেটে চলে গেল। বিস্ময়ে চোয়াল ঝুলে গেল সিমির – এত বড় সাহস! কোনোরকম ব্যাখ্যা না দিয়েই চলে গেল! কিন্তু এ বিষয়ে আর মাথা ঘামানোর সময় নেই। বড্ড দেরী হয়ে গিয়েছে। এখনি না করলে সোবহান সাহেবের সাথে গুরুত্বপূর্ণ মিটিংটা ফস্কে যাবে। পরে দেখা যাবে – উপযুক্ত শিক্ষা দিতে হবে – মনে মনে ভেবে রাখল সিমি।
আয়নায় সচরাচর নিজেকে দেখা হয় না শান্তনুর। তবে আজকে দেখতে হল। এক মাথা অবিন্যস্ত ঝাঁকড়া চুল তামাবর্ণের মুখের দু’পাশে আংগুল চালিয়ে চিরুনি করে নাকটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকল। আশ্চর্য, কোনো কামড়ের দাগ নেই, অথচ ব্যথা পাবার অনুভূতিটা খুবই বাস্তব। এমনকি ভীমরুলটার প্রতিটি কথাই ঠিকঠাক মনে আছে। কী হচ্ছে এসব? সে কি সত্যিই বিপদ্গ্রস্থ? পরিত্রাতা ভীমরুলরূপে এসেছে, এমন অদ্ভূত কথা তো কখনো শুনেছে বলে মনে পড়ে না!
উফফ, এ কি যন্ত্রণা? আজকে কী শুরু করেছ? আয়নার সামনেও জ্যাম বাঁধিয়ে দিবে নাকি? সরে যাও, আমাকে তৈরি হতে দাও। তাছাড়া এমন কোন সুপুরুষ নও তুমি যে আয়নায় দাঁড়িয়ে নার্সিজম প্রাকটিস করতে হবে। বিদ্রূপ ঝরে সিমির কণ্ঠে।
হঠাত কী হয়, চকিতে ঘুরে দাঁড়ায় শান্তনু। বেশ সরল ভাবেই জিজ্ঞেস করে, ‘নই, সুপুরুষ নই?’
আধা কামানো দাঁড়িতে ভাবালু চোখের লম্বা লোকটিকে দেখে সিমির বহু আগের কথা মনে পড়ে যায়। বুকটা যেন ধ্বক করে ওঠে। বলে ফেলা কথা বুমেরাং হয়ে যায় যেন।
কিন্তু আজকে দ্বিতীয়বারের মত সিমিকে কোনো সুযোগ না দিয়েই ঝড়ো বেগে বেরিয়ে যায় শান্তনু। ক্ষোভে ঠোঁট কামড়ে ধরে সিমি। কেমন যেন পরাজিতের মত মনে হয়। কিন্তু হেরে প্রায় ভূত হয়ে যাওয়া কারো কাজে কি পরাজয়ের অনুভূতি পাওয়া সম্ভব? বেশিক্ষণ ভাবতে পারে না সিমি। তার অনেক কাজ পড়ে রয়েছে! আজকেই হয়তো শেষ দিন।
মেঘলা দিন শান্তনুর বরাবরের প্রিয়। এই যেমন আজকের দিনটা। থমথম করছে আকাশ। বাসে বসে থাকা অফিস যাত্রার মানুষগুলো রাজ্যের বিরক্তি মুখে মেখে বসে আছে। বাদলা দিন তাঁদের বিরক্ত ঘাঁয়ে নুন মাখিয়েছে। প্রসন্নমুখে পেছনের আসনে বসে ছিল শান্তনু। অমনি কানের কাছে ভীমরুলের আবির্ভাব হল।
এত খুশির কী হল? কী বিচ্ছিরি আবহাওয়া! আজকে সারাদিনটাই মাটি।
কেন, আপনারও কি অফিস যেতে হয় নাকি? খুট করে খানিক হেসে ফেলে শান্তনু।
ভীমরুলটি বেজায় ক্ষেপে যায়, ‘মশকরা করবে না। আমি তোমার দুলাভাই নই...’
আহা চটে যাচ্ছেন কেন? বেশ আলাপের ভাবে ছিলেন। তাই একটু গল্প করতে চাইলাম। আমার মত আপনারও মনে হয় মনের কথা বলার কেউ নাই।
বেশি বাজে বকবে না। কথা কম বলাই ভাল।
অথচ আপনি সেই সক্কাল থেকে আমার পেছনে লেগেছেন। আবার কামড়ে পালিয়েছেনও। আপনার মতলবটা কী?
ও বাবা, আজকাল মানুষের উপকার করতে নেই! আমার এভাবে আসাটাই ভুল হয়েছে। মানুষ একটি নেমকহারাম জীব।
এই আপনি মুখ সামলে কথা বলবেন। আপনার নেমক ক’বে খেলাম যে *** করতে যাব? আজকেই তো দেখা হল। সত্যি বলতে কী, আমার দৃঢ় বিশ্বাস আপনার কোনো অস্তিত্বই নাই। সবই আমার মন তৈরি করছে।
ভীমরুলটি একটু নরম হয়ে যায়। আহা, সেই কথা বলেছি নাকি? তোমরা আজকালকার ছেলেপিলেরা কথার মানেই ধরতে জান না। যাক সে কথা – তোমার বউকে মনের কথা বলো না কেন? সে বুঝি শোনে না?
তা আর বলেন কেন? সত্যি বলতে কী ওকে আজকাল বড্ড অচেনা মনে হয়।
কীরকম?
আচ্ছা, আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার আপনাকে বলব কেন? আপনাকে তো চিনিই না। না, ঠিক হলো না। আপনি একটি ভীমরুল। খুবই নটোরিয়াস পতঙ্গ!
ঠিক আছে, না বললি নাই! বেয়াদব মনুষ্যজীব, আরেকটা কামড় খা।
উফফফ্!
একটু দূরে বসে থাকা এক টেকো যাত্রী বড় বড় চোখে তাকিয়ে, ‘ভাই আপনি ঠিক আছেন? কী সমস্যা? তখন থেকে বিড়বিড় করে যাচ্ছেন। হেড অফিসে গোলমাল নাকি?’ বলেই হাসি সহযোগে চকচকে মাথায় আংগুল দিয়ে ক’টা গুঁতো দিয়ে দেখালেন।
জ্বী ভাই, কোন সমস্যা নেই। আর সমস্যায় পড়লেও আপনার মত ঘাসের মাঠ কেটে মার্বেলের মেঝে তৈরি করতে হয় নাই!
মাঝ বয়সী লোকটি বেশ থতমত খেয়ে গেছেন, কিন্তু সেদিকে নজর নেই শান্তনুর। তাঁকে ঠিক সময়েই পৌঁছতে হবে। ভীষণ জরুরী কাজ...
২.
ঝা চকচকে কোনো অফিসে গেলে যা হয়, নিজের অজান্তে সবাই কিছুটা সচেতন হয়ে ওঠে। পোশাকটা ঠিক আছে? চুলটা কি এলোমেলো? জুতায় অবাঞ্ছিত কাদার দাগ? শান্তনুর ক্ষেত্রে আজ সেসবের কিছুই ঘটল না। এমনকি দ্বিধাদ্বন্দ্বও বেশ খানিকটা উবে গেছে! সকালের অদ্ভূত ঘটনার পর কেবল একটা কথাই মনে হচ্ছে, সে কি আসলেই সেই মাত্রার অসহায়? যাই হোক ভাবনাটাকে আপাতত এক পাশে সরিয়ে রাখল। তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে শোকেসে সাজিয়ে রাখা পুতুলের মত রিসেপশনিস্ট –এর কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
আমার একটা ইন্টারভ্যু আছে আজ। সাড়ে দশটায়।
অল্প বয়সী মেয়েটি চোখ তুলেই মুখ টিপে হেসে ফেলল। আসলে দেখার মতই চেহারা হয়েছে শান্তনুর। ভেজা কাক। সকালের অকাল বর্ষণ তার ঝাঁকড়া চুলের প্রান্ত বেয়ে টুপটুপ ঝরে পড়ছে। অথচ কেমন নির্বিকার ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে!
নাম?
শান্তনু চৌধুরি।
উমম, হ্যাঁ, সে দেরী আছে অনেক। আপনি আপাতত ঐ ওয়াশরুমটাতে চলে যান।
মানে? সেখানে যাব কেন? আপনাদের বসার জায়গা-টায়গা নাই?
তা থাকবে না কেন? কিন্তু আপাতত আপনার সেখানে যাওয়াই ঠিক হবে। যা একটা চেহারা করে এসেছেন না, যান একটু ভদ্রস্থ হয়ে আসুন। এবার সে হেসেই ফেলে।
ওহ হো, স্যরি! খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে যায় শান্তনু।
ওয়াশরুমে রিসেপশনিস্ট –এর দাঁতের মত শুভ্র টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ ঘাড়ের জল মুছতে মুছতে আয়নার দিকে তাকিয়ে হতভম্ভ হয়ে গেল। সেখানে আবার ভীমরুলটার আবির্ভাব হয়েছে। পতঙ্গ হাসতে পারে বলে জানা নেই, কিন্তু এখন সেটিকে দেখে অনেকটা সেরকমই মনে হচ্ছে। মেজাজটা বিগড়ে গেল!
আপনার মত বিটকেল নির্লজ্জ আর দেখি নাই! সমানে উতপাত করে যাচ্ছেন।
তা বাবা, বিটকেল তো তুমিও কম না!
মানে, কী বলতে চান? চেঁচিয়ে ওঠে শান্তনু।
খামোখা চেঁচাবে না। ঠিকই বলছি। আজকে তোমার ইন্টারভ্যু। তা একটু ভদ্র হয়ে এলে ভাল হত না? নিজেকে কী ভাবিস তুই? খুব ড্যাম কেয়ার, তাই না? কীসের এত অহংকার তোর?
অহংকার? নিমেষে মুষড়ে যায় শান্তনু। সত্যিই তো, অহংকার করার আর কী বাকী আছে তার? স্মৃতির পাতা আনমনে দৌড়ে চলে দু’বছর পেছনে। নিকট অতীতের দিনগুলি কী বড্ড দূরাতীত মনে হতে থাকে...যেন এক অন্য জগতের শান্তনু! কেতাদুরস্থ, আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান আর সর্বোপরি সৎ এক যুবক। আর কী আশ্চর্য, সিমিন্তিও এল অনায়াসে...চাঁপাকলি আংগুলে নিরব-মধুর শাসন...শান্তনুর দস্যুপনা! তারপর সেই এক সর্বনাশা ভুল... প্রত্যেকের জীবনেই পতনোন্মুখ কিছু সম্ভাবনা প্রবল আকর্যণে হাত নেড়ে যায়। কেউ কেউ খাদের বিপজ্জনক কিনারে দাঁড়িয়ে কেবল বুঝতে পারে অফেরতা বিন্দু কাকে বলে।
আরে বাবা, এ যে দেখি ভাবুক হয়ে গেলি! খেঁকিয়ে ওঠে ভীমরুলটা।
ভাবনার সুতো কেটে যায়। আপনি ঠিকই বলেছেন, আমার অহংকারের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই! ভেঙ্গে যাওয়া মানুষ দেখেছেন? আমাকে দেখুন...আমাকে দেখুন। গলাটা ধরে আসে শান্তনুর।
এ কী মেলোড্রামা শুরু করলি হে? মানুষ আবার দেখি নাই? সাধে কি আমার চুল পেকেছে নাকি?
আপনার আবার কী করে মাথায় চুল থাকতে পারে? ভুলে যাচ্ছেন আপনি একটা পোকা। একটি টেকো পোকা। ফোঁড়ন কাটে শান্তনু।
বেয়াদব কোথাকার! সে যাক, বলছিলাম, ব্যাগে যে টাইটা সন্তর্পনে লুকিয়ে রেখেছিস, সেটি পরে নে। আর ইন্টারভ্যু –এ কিছু লুকাবি না। সত্যকে স্বীকার করিয়া লও সহজে.. হারাবার ভয়ে মরে যাওয়ার কিছুই নেই তোর!
মেলা জ্ঞান দিয়েছেন। যান তো এখন। মাথাটাই খেয়ে ফেলল।
কী! বেয়াদব, অকৃতজ্ঞ!
নিতান্ত বিরক্তি ভরে কখন যে ব্যাগটা খুলে টাইটা বের করে পরে নিল, শান্তনু ঠিক টের পেল না। নিজের মনেই গজগজ করছে – প্যাঁকে পড়লে সবাই জ্ঞান দিতে আসে... ঠিক তখনি আয়নায় চোখ রেখে দেখে, সেখানে কিচ্ছু নেই! শান্তনুর একটু ভয় ভয় করতে থাকে। সে কি পাগল হয়ে যাচ্ছে?
রিসেপশানে এসে বসতেই সেই পুতুল চেহারার মেয়েটি এসে বলল, শান্তনু সাহেব, আপনি ভেতরে যান। ইটস ইয়্যর টার্ন!
বুকটা ধড়াস করে উঠল শান্তনুর।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now