বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
"ভাঙা কুলো"
স্মরণজিৎ চক্রবর্তী
------------------
রাতুল দেখল হন্তদন্ত হয়ে গড়িয়াহাটের দিকে যাচ্ছে বিজন। যাক, আর ভাবনা নেই। আসলে পৃথিবীর নিয়ম হল, একজনের সমস্যা আর-একজনের সুবিধের রূপ নেয়।
রাতুল জানে, বিজন কাউকে “না” বলতে পারে না। ছোট থেকেই এই জন্য ভুগতে হয়েছে ছেলেটাকে। স্কুলে পড়ার সময় স্যার চক-ডাস্টার আনতে ভুলে গিয়েছেন। কে যাবে টিচার্স রুমে? না, বিজন যাবে।
ফুটবল মাঠে গোলপোস্টের নেট ছেড়া। বল গোলে মারলেই বড় ফুটো দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। তা গোলপোস্টের পিছনে কে দাঁড়াবে? কেন বিজন দাঁড়াবে।
পাড়ায় তো বিজনের নাম হয়ে গিয়েছিল ভাঙা কুলো। সেই ছোট থেকে আজ পর্যন্ত ওই নামে ডাকতে-ডাকতে লোকজন ওর বিজন নামটাই ভুলে গিয়েছে। সবাই কুলো বলে ডাকে।
রাতুল সেই কুলোকে রাস্তা দিয়ে হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে যেতে দেখে হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। যাক আর চিন্তা নেই। ট্যাক্সিটা কিছুতেই গলির ভিতরে ঢুকতে চাইল না। দুই ব্যাগ জিনিসপত্তর এই মাঝরাস্তায় নামিয়ে দিয়ে চলে গেল।
ব্যাগ দুটো বেশ বড়। শাড়ি, ফল, মিষ্টি, গোবিন্দভোগ চাল, ধুতি আরও কত কী যে আছে ওতে।
রাতুলের খুব তাবিজ-কবজ, তন্ত্ৰ-মন্ত্রে বিশ্বাস। চারিদিকে খবর কাগজে এতসব বাবাজিদের ছবি দেখে নানানজনের কাছে গিয়েছে রাতুল। কিন্তু ঠিক মনমতো কিছু হয়নি ওর। অবশেষে এই গোকুলানন্দ মহারাজ (স্বর্ণমুকুট জয়ী, পিশাচসিদ্ধ, গোল্ড মেডেলিস্ট)-কে ও খুঁজে পেয়েছে। যদিও রাতুলের এক বন্ধু জিজ্ঞেস করেছিল, “পিশাচসিদ্ধ গোল্ড মেডেলিস্ট মানে কী রে? পিশাচদের গরমজলে সিদ্ধ করায় গোল্ড মেডেল পেয়েছে?”
রাতুলের এসব বোকাটে ইয়ার্কি একদম ভাল লাগে না। আরে বাবা, এঁরা অন্য মার্গের মানুষ। না হলে কেউ মুখ দেখে বলে দিতে পারে যে, রাতুলের সর্দির ধাত, চুল পড়ার সমস্যায় ভুগছে। বলে দিতে পারে, রাতুলের মন দুর্বল, ভগবানে খুব ভক্তি। গোকুলানন্দ কি আর যেমন- তেমন মানুষ!
আর আজ তো বিশেষ দিন। ভূত চতুর্দশী। মহারাজ আজকের দিনটাই ধার্য করেছে রাতুলের জন্য। আজ মহারাজ রাতুলের পরলোকগত পিতৃদেবকে আহ্বান করে নিয়ে আসবে।
কিন্তু সে তো আর এমনি হবে না। পাঁচ হাজার টাকা দক্ষিণাসহ একটা বড় লিস্টি ধরিয়েছে বাবাজি।
রাতুলের তাতে আপত্তি নেই। গত বছর বাবার মৃত্যুর সময় রাতুল কাছে ছিল না। তাই বাবার সঙ্গে কথা বলাটা খুব জরুরি। কসবার বাড়িটা নিয়ে এই দাদার সঙ্গে মামলা চলছে। ওর। এই যে দাদা বলছে, মারা যাওয়ার আগে নাকি বাবা ওই বাড়িটা দাদাকে মৌখিকভাবে দিয়ে গিয়েছিলেন, সেটা সত্যি কিনা বাবার থেকে জানতে হবে।
কিন্তু মহারাজ এটাও বলেছে যে, গোটা ব্যাপারটা জানতে মাত্র পাঁচ মিনিট সময় পাবে রাতুল। সাড়ে ছ’টা থেকে ছ’টা পয়ত্রিশ। তাই সময় নেই আর।
ছ’টা কুড়ি বেজে গেল এখানেই। কী করে সময়মতো পৌঁছবে এমন ভারী দুটো ব্যাগ নিয়ে।
এইসব ভাবতে-ভাবতেই রাতুল দেখল কুলো, মানে বিজনকে। ছেলেটা ওদের পাড়াতেই থাকে।
রাতুল সময় নষ্ট না করে বিজনকে ডাকল।
বিজনের সামনে সে দাঁড়াল। মুখটা বোজার হয়ে আছে।
রাতুল বলল, “বিজন, আমার সঙ্গে একটু চল তো। ওই সামনেই যাব। এই ব্যাগ দুটো বয়ে দিতে হেল্প কর একটু।”
বিজন সামান্য গাইগুই করে বলল, “আমার খুব তাড়া আছে। এখন না গেলে...”
“আরে তাড়া আমারও আছে। একটুক্ষণের কাজ। তারপর চলে যাবি। বাস-ট্রামের তো অভাব নেই।”
“আরে তুমি জান না রাতুলদা,” বিজন ছটফট করে বলল, “ট্র্যাঙ্গুলার পার্কে খুব বড় একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়ে গিয়েছে। সব বন্ধ। সেখানে...”
“আহ্, চল না,” রাতুল জোর করল, “আমার বাবার সঙ্গে দেখা করার টাইম পার হয়ে যাচ্ছে। চল।”
‘কী?” বিজনের চোখ গোল হয়ে গেল।
রাতুল খানিক তাকিয়ে রইল বিজনের দিকে। তারপর বলল, “তোর এত তাড়া যে আমায় একটু হেল্প করতে পারছিস না।”
বিজন দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তারপর নিচু হয়ে বড়, ভারী ব্যাগদুটো তুলে ফেলল একাই। রাতুল সামান্য অবাক হলেও খুশিও হল। এই না হলে ভাঙা কুলো!
(২)
গোকুলানন্দের ঘরটি বেশ বড়। তবে আজ পরলোক থেকে রাতুলের বাবাকে ডেকে আনবে বলেই বোধ হয় কয়েকটা মোমবাতি ছাড়া ঘরে আর কিছু জ্বালায়নি লোকটা।
বিজন ব্যাগদুটো নামিয়ে রাতুলকে ফিসফিস করে বলল, “আমি আসি। তাড়া আছে খুব।”
আবছায়া অন্ধকারের এক কোণে একটা তিন পেয়ে টেরিলে নিয়ে বসেছিল গোকুলানন্দ। বিজনের ফিসফিসে গলা শুনে গম্ভীর স্বরে বলল, “না, যাওয়া চলবে না।”
“মানে?” বিজন ঘাবড়ে গেল যেন।
“ওকে যেতে দিয়ে না রাতুল। আমার সহকারীটি আজ অসুস্থ। আসতে পারেনি। কিন্তু তোমার পিতৃদেবকে অনয়ন করতে হলে তিনজনের দরকার। ওকে আমাদের কাজে লাগবে।”
“কিন্তু আমার যে সত্যি খুব তাড়া...”
বিজনকে কথা শেষ করতে দিল না রাতুল, “আহ, মহারাজ কী বলল শুনলি না। আমার বাবাকে ডাকা হবে আজ। তিনজন দরকার। তুই এটুকু করতে পারবি না?”
বিজন কাতর চোখে তাকাল মহারাজের দিকে।
“রাতুল, তোমার বন্ধু ভয় পাচ্ছে। দানব, পিশাচ, দৈত্য, অশরীরী সব আমার করতলগত। আমার আজ্ঞাবহ। ভয়ের তো কিছু নেই। শুধু তিনজনের উপস্থিতি প্রয়োজন।”
“কিন্তু ...”
“আরে ভয়ের কিছু নেই। মহারাজ আছেন তো। দ্যাখ বিজন আমার বাবার সঙ্গে কথা বলাটা খুব দরকার। তিনজন না হলে তো হবে না। তুই আমার সঙ্গে এমন করছিস?”
বিজন মাথা নিচু করে নিল। তারপর এগিয়ে গেল টেবিলের দিকে। রাতুল হাসল মনে-মনে। ভাঙা কুলো!
তিন পায়া টেবিল ঘিরে সবাই বসার পরে টেবিলের মাঝে একটা ধূপ কাঠি আর প্রদীপ জ্বালাল মহারাজ। তারপর টেবিলের উপর রাতুলের বাবার একটা ছবি রেখে বলল, “সবাই চোখ বন্ধ করে একে স্মরণ করো।”
“কিন্তু...” বিজন কিছু বলতে গেল।
“চোপ” ধমকে উঠল। মহারাজ, “বলছি। স্মরণ করো।”
বিজনকে আলতো করে বলল রাতুল, “স্মরণ কর, স্মরণ কর। ভাল করে স্মরণ কর।”
মিনিটখানেক নীরবতার পরে মহারাজ আচমকা চিৎকার করে অনুস্বর-বিসর্গ দিয়ে মন্ত্র বলতে শুরু করল। আর তার কিছুক্ষণের মধ্যেই টেবিল নড়তে শুরু করল ঠকঠক করে।
“রা-তু-ল,” এবার কাঁপা আর সামান্য খোনা গলা শোনা গেল ঘরের মধ্যে।
“বাবা,” রাতুলেরও গলা কেঁপে গেল, “এসেছ?”
“এসেছি।”
“তোমার গলাটা এমন শোনাচ্ছে কেন বাবা?” রাতুল ভয়ের গলায় জিজ্ঞেস করল।
“সর্দি হয়েছে। কী জানতে চাস?” টেবিলের ঠকঠকানিটা যেন বাড়ল এবার।
“সর্দি।” রাতুল থতমত খেয়ে বলল, “ভূতের সর্দি। মানে?”
“আহ, কী জানতে চাস ...”
“ধুত্তোর, বলছি দেরি হয়ে যাচ্ছে,” বিজন ছিটকে দাঁড়িয়ে পড়ল এবার, ‘রাতুলদা এসব বুজরুকি তুমি শুনছ। ভূতের সর্দি। ভূতের ওসব হয় না।”
গোকুলানন্দ মহারাজ এবার চেয়ার ঠেলে উঠে পড়ে ঘরের আলো জ্বালিয়ে বলল, “আমি বুজরকি করছি। ভূতের সর্দি হয় না? কে বলেছে হয় না।
স্ট্র্যাটোস্ফিয়ারের উপরে পাতলা স্পেক্ট্রোস্ফিয়ারে ভূতেরা থাকে। কী ঠান্ডা জান ওই জায়গা। আমি মাঝে-মাঝে ধ্যানযোগে যাই সেখানে। রাতুলের বাবার সর্দি হতেই পারে।”
বিজন তেরিয়া হয়ে বলল, “না হতে পারে না। আপনি গুল মারছেন। আমি জানি।”
“কী! আমি মিথ্যে বলছি,” গোকুলানন্দ রেগে গিয়ে বলল, “তুমি সব জান? তবে তুমিই দেখাও ভুত। দেখাও।”
রাতুল আমতা-আমতা করে বলল, “বিজন, আজ তোর কী হয়েছে?”
বিজন চুপ করে রইল।
মহারাজ আবার বলল, “কী হল দেখাও। দেখি তুমি কত ভাল ভূতেদের চেন! দেখাও।”
বিজন মাথা নিচু করে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই ওর সমস্যা। কেউ কিছু বললে ও না করতে পারে না একদম।
“হয়ে গেল?” গোকুলানন্দ চিৎকার করে বলল, “এখন কথা নেই কেন। দেখাও।”
বিজন আচমকা শূন্যে ভেসে উঠে নিজের মাথাটা এক হ্যাঁচকায় ঘাড় থেকে খুলে নিয়ে বাড়িয়ে দিল গোকুলের দিকে, “দেখুন-দেখুন। দেখুন। আমি কে।”
মহারাজ ছিটকে উঠে “আঁ আঁ” শব্দ করে চোখ উলটে নিমেষে জ্ঞান হারাল।
রাতুল ভয়ের চোটে ভুলে গেল যে ওকেও অজ্ঞান হতে হবে। শুধু ধরা গলায় বলল, “তুই. তুই...”
বিজন বলল, “বললাম না অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে ট্র্যাঙ্গুলার পার্কে? বাস একটা অটোকে মেরেছে। আমি অটোর সামনে বসেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গিয়েছি। এখন তাড়াতাড়ি না গেলে জায়গা পাব না। চারিদিকে টুকটাক তো মরছে লোকজন। আমিও নতুন ভূত হয়েছি। কলকাতায় ঘুরে বেড়াতে হলে নিউটাউনের ভূত সেন্টারে নাম তুলতে হয়। ভূত বলে কি আমাদের রেজিষ্ট্রেশন করাতে হয় না ভেবেছ? ফালতু আমার দেরি করিয়ে দিলে।”
রাতুল ঢোক গিলল। ভয়ে-ভয়ে বলল, ‘তা তুই ইয়ে. একটু বাবাকে জিজ্ঞেস করবি বাড়ির ব্যাপারটা? তোর সঙ্গে তো দেখা হবেই। তাই...”
বিজন দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ভূত হয়েও রেহাই নেই ওর। সেই ভাঙা কুলোই রয়ে গেল। ও মেনে নেওয়া গলায় বলল, “ঠিক আছে। বলব।”
তারপর শূন্যে ভাসমান অবস্থায় মিলিয়ে গেল হাওয়ায়।
(পরের রবিবার খবরকাগজের বিজ্ঞাপনে গোকুলানন্দ আর-একটা লাইন জুড়েছিল, ‘ভূত নামানো ও তাড়ানোয় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। একশো শতাংশ গ্যারান্টিসহ।’) বিশ্বাস না হয় খোঁজ নিয়ে দেখো।
(সমাপ্ত)
----------
।। একাকী কন্যা ।।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now