বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
আজ সৈকতের বারবার মনে পড়ছে মাধবীর কথা। সবসময়ই তো মনে পড়ে। কিন্তু আজকের টা আলাদা। আজ তো সেই দিন, তার জীবনের সবচেয়ে অভিশপ্ত দিন।
বাবা - মা, ভাই - বোন ও বন্ধুদের কথায় গত দুবছর ধরে সৈকত মাধবীকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু ভুলতে তো পারেই নি বরং তার স্মৃতি গুলো জগদ্দল পাথরের মতো সৈকতের বুকে চেপে বসে আছে।
.
রাত প্রায় বারোটা। এক মগ গরম চা, সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটার নিয়ে বারান্দায় গিয়ে চেয়ারে বসে সৈকত। আগে ধুমপান এর অভ্যাস ছিলো না। বন্ধুদের সাথে মাঝে মাঝে শখ করে দুই এক টান দিতো। কিন্তু এখন সিগারেটই সবসময়ের এবং সবচেয়ে প্রিয় সঙ্গী। আজ রাতে আর ঘুম আসবে না। দীর্ঘ এই রাতে সময় কাটানোর জন্য এই চা ও সিগারেট চলবে। একটা সিগারেট জ্বালিয়ে দুটো টান দিয়ে ভাবনার সাগরে ডুব দেয় সৈকত।
|
২০১৫ সাল।
সৈকত তখন অনার্স ৪র্থ বর্ষে পড়ে আর মাধবী ২য় বর্ষে পড়ে একই কলেজে। একে অপরকে খুব ভালোবাসে। হাসি - আনন্দ, মান - অভিমান করে আর দশটা প্রেমিক - প্রেমিকার মতো করেই যাচ্ছিল তাদের জীবন।
|
২০১৫ সালের জানুয়ারি তে দুই বন্ধুর সাথে এক সপ্তাহের জন্য কক্সবাজার ও সেন্টমার্টিন বেড়াতে যায় সৈকত। মাধবী ও গ্রামের বাড়িতে যাবে বাবা - মায়ের সঙ্গে। তাই যাওয়ার আগের দিন বিকেলে দুজন অনেক্ষন ঘোরাঘুরি করে। সন্ধ্যা বেলা নাস্তা খেয়ে বিদায় নেয় একে অপরের থেকে।
রাত ১১ টায় যখন সৈকত বন্ধুদের সাথে কুমিল্লা পদুয়ার বাজার বিশ্বরোডে বাসে উঠে তখনও কথা হয় মোবাইলে। কক্সবাজারের হোটেল সি প্যালেস এ এসে পৌঁছে সকাল ৭টার কিছু পরে। তখন আবার কথা হয় মাধবীর সাথে। মাধবী জানায়, কিছুক্ষণ পর গ্রামের উদ্দেশ্যে বের হবে তারা। তাই, পরে কথা হবে আল্লাহ হাফিজ বলে রেখে দেয় মাধবী।
|
সেদিন রাতে সৈকত ও তার বন্ধুরা একটু বেশি সময় ঘোরাঘুরি করে সমুদ্র সৈকতে।দিনের বেলা জার্নির ক্লান্তিতে বেশি ঘোরাঘুরি না করতে পারা পুষিয়ে দেওয়ার জন্য। রাত প্রায় একটার পর কিছু স্থানীয় বখাটে ছেলে তাদেরকে অস্ত্র ঠেকিয়ে মোবাইল, মানিব্যাগ কেড়ে নেয়।
সবাই মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলে। তাই বিষয় টা কারো কাছে বড় কিছু নয়। পরদিন বাসায় কল দিয়ে বিকাশের মাধ্যমে টাকা এনে আবার মোবাইল কিনলো। সৈকত তার ২ সিম এর একটা তুলতে পারছে আর একটা তুলতে পারেনি, কারণ ওই সিমটা মাধবীর নামে এন্ট্রি। তাতে কি যোগাযোগ তো চলবে। সবাই মোটামুটি স্বাভাবিক।
|
কিন্তু সৈকত স্বাভাবিক হতে পারছে না। কারণ কক্সবাজারে আসার পর এখন অব্ধি মাধবীর সাথে কথা হয়নি। মাধবীর মোবাইলে কল দিলে বারবার একই কথা, আপনার কাঙ্ক্ষিত নাম্বারে সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রথমে ভাবছে গ্রামে নেট প্রবলেম, তাই সংযোগ পাওয়া যাচ্ছেনা। কিন্তু সৈকতের অনেকগুলো এসএমএস এর ও কোন আনসার নেই। সৈকত এর কাছে মাধবীর কোন বন্ধুর নাম্বারও নেই। তাই অন্য কোনভাবে খবর নিতে পারছে না। আর এজন্যই সৈকত বেশি চিন্তিত। টিপু এবং আকাশের সাথে (সৈকতের দুই বন্ধু) শেয়ার করার পর তারা বললো চিন্তা করিস না, হয়তো গ্রামে কারেন্ট নেই।
|
আকাশ ব্লাড ডোনেশন এর কাজ করে।
সেদিন সন্ধ্যায় নাস্তা খাওয়ার সময় ফেসবুকে কলেজ এর একটা আড্ডা গ্রুপে মাস্টার্স এর এক বড় ভাইয়ের একটা পোষ্ট দেখে আকাশ। তাতে লেখা,
"আমাদের কলেজের ইংরেজি বিভাগের ২য় বর্ষের ছাত্রী নুসরাত জাহান বাস এক্সিডেন্ট করেছে। তার জন্য প্রচুর রক্ত প্রয়োজন। রক্তের গ্রুপ বি নেগেটিভ। রোগী কুমিল্লা মুন হাসপাতালের ৫ম তলায় ৫১২ নাম্বার রুমে। মোবাইল ০১৮৩৮৯৫৮...
আকাশ পোস্ট টা টিপু কে দেখায়, কারণ টিপুর রক্তের গ্রুপ বি নেগেটিভ। যেহেতু এই গ্রুপ রেয়ার, তাই পরিচিত - অপরিচিত সবাইকেই টিপু রক্ত দেয়।
টিপু - এখন কি করা যায়?
আকাশ - চল, সৈকত কে বলি।
সৈকত নাস্তা খেতে আসেনি, ভালো লাগছে না বলে। সৈকত এর জন্য নাস্তা নিয়ে দুজন এলো রুমে। দরজা নক করার পর সৈকত দরজা খুলে দিলো।
|
টিপু - সৈকত, আমাদের কলেজের জুনিয়র একটা মেয়ে এক্সিডেন্ট করেছে। প্রচুর রক্তের প্রয়োজন। কি করা যায়?
সৈকত - ব্যবস্থা করে দে। ব্লাড গ্রুপ কি?
আকাশ - বি নেগেটিভ।
সৈকত - বি নেগেটিভ? কোন ডিপার্টমেন্ট এর? নাম কি?
আকাশ - নুসরাত জাহান। ইংরেজি ডিপার্টমেন্ট।
সৈকত - কি বললি? (আতংকিত কন্ঠে) সৈকত বসে পড়ে চেয়ারে।
টিপু - আরে কি হইছে, এমন করতেছিস কেন?
আকাশ - এই সৈকত, কি হইছে?
মাধবী............. মাধবী এক্সিডেন্ট করছে।
তখনই আকাশ ও টিপুর মনে পড়লো, মাধবীর পুরো নাম নুসরাত জাহান মাধবী। স্তম্ভিত হয়ে গেলো দুজন। কয়েক মিনিট পর টিপু বললো, চল আমরা যাই।
|
দ্রুত ব্যাগ গুছিয়ে হোটেল বিল পেইড করে আটটার সময় বাসে উঠে তিনজন। রাত ৪টায় এসে পৌঁছে কুমিল্লা। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে কোন রিকশা বা গাড়ি না পেয়ে হাঁটতে থাকে তিনবন্ধু। জাঙ্গালিয়া বাস স্টেশনে এলে একটা রিকশা পেয়ে তাতে উঠে তিনজন। ভোর ৫টায় এসে পৌঁছে মুন হাসপাতালে। সারাপথে একবারও নিজ থেকে কোন কথা বলেনি সৈকত। কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিয়েছে নাহয় সারাক্ষণই চুপ ছিলো।
|
৫ তলায় উঠতেই কান্নার শব্দ শুনে দৌড় দেয় সৈকত। তার পিছু পিছু বাকি দুজন। কান্নার আওয়াজ অনুসরণ করে এসে দেখে তারা ৫১২ নাম্বার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে। খোলা দরজা দিয়ে কয়েকজন ডাক্তার আর নার্স বেরিয়ে আসছে।
|
ভিতরে তাকাতেই সৈকত দেখে মাধবীর বাবা - মা, ছোট ভাই চিৎকার করে কাঁদতেছে। মাধবীর বেডের পাশে মাধবীর বন্ধু আনিকা কাঁদতেছে আর মাধবী ঘুমিয়ে আছে। মাথা ও হাতে ব্যান্ডেজ, বুক, পেট এবং ডান পা পুরোটা ব্যান্ডেজ বাঁধা। সবাই কান্নাকাটি করছে কিন্তু মাধবী ঘুমাচ্ছে। এগিয়ে যায় সৈকত। মাধবীর বেডের কাছে গিয়ে আস্তে করে হাত বুলিয়ে দেয়। বেচারির মনে হয় কষ্ট হচ্ছে। হাসিমাখা সুন্দর মুখটাতে বিষাদের চাপ। সৈকত খুব বিরক্তি ফিল করতেছে, এরা এভাবে কান্নাকাটি করছে কেন! এদের চিৎকারে তো মাধবীর ঘুম ভেঙে যাবে।
|
আকাশ ডাক্তারের সাথে কথা বলে জানতে পারে কিছুক্ষণ আগে মারা গেছে মাধবী। এক্সিডেন্টে প্রচুর রক্ত ক্ষরণ হয়েছে। রক্ত প্রয়োজন কমপক্ষে ৫ ব্যাগ অথচ ২ দিনে ব্লাড ম্যানেজ হয়েছে মাত্র ৩ ব্যাগ। আবার কিছুক্ষণ পরপর শরীরের বিভিন্ন অংশ দিয়ে ব্লিডিং হয়ে তার অর্ধেক বের হয়ে গেছে।
ওদের দেখে আনিকা এগিয়ে আসে। টিপুকে লক্ষ্য করে বলল, ভাইয়া পারলাম না ওকে বাঁচাতে। শুধুমাত্র রক্তের অভাবে তাকে বাঁচাতে পারলাম না।
টিপু - সৈকতকে কল দিলে না কেন?
আনিকা - সৈকত ভাইয়ার নাম্বার যেটা আমার কাছে আছে সেটা বন্ধ পাইছি। আপনাদের মোবাইল নাম্বার তো আমার কাছে নেই।
টিপু - মাধবীর মোবাইলে তো আমাদের নাম্বার আছে। সেখান থেকে....................
আনিকা - তার মোবাইল তো এক্সিডেন্ট যেখানে হয়েছে, সেখানেই কোথাও পড়ে গেছে।
টিপু - এক্সিডেন্ট কিভাবে হলো?
আনিকা - মাধবী তার ফ্যামিলিসহ গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছে। বাস থেকে নামার পর তার ছোট ভাইটা দৌড় দিলো রাস্তা পার হওয়ার জন্য। অপর দিক থেকে দ্রুতগতিতে একটা ট্রাক কে আসতে দেখে ভাইকে বাঁচানোর জন্য মাধবী দৌড় দিলো তার পিছনে। তার ভাইটা ঠিকই বেঁচে যায় কিন্তু মাধবী ট্রাক এর নিচে চাপা পড়ে।
|
সৈকত এর দিকে এগিয়ে যায় টিপু। মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। আকাশ এসে পাশে দাঁড়ায়।
সৈকত - এদেরকে থামতে বল, এতো কান্নাকাটি করতেছে কেন?
প্লিজ বলনা, ওদের কে থামতে। একজন অসুস্থ মানুষের সামনে কেউ এভাবে কাঁদে?
আকাশ - সৈকত উঠে আয়, এদিকে বোস।
সৈকত - না, আমি এখানেই বসি। মাধবী একটা ইঞ্জেকশন দিতেও ভয় পেতো। আর আজ তার পুরো শরীরে ব্যান্ডেজ। আমি তার পাশে থাকি, তাহলে বেচারি সাহস পাবে তার মনোবল বাড়বে।
আকাশ - মাধবী আর কখনোই ভয় পাবে না রে। সে যে দুনিয়াবি সব ভয়ের উর্ধ্বে চলে গেছে। মাধবী মারা গেছে।
সৈকত - পাগল হয়ে গেছিস নাকি? দেখিস না, ঘুমিয়ে আছে। হঠাত চিৎকার করে কেঁদে উঠে সৈকত। মাধবী মরতে পারেনা। মাধবী আমাকে ছেড়ে যেতে পারেনা। এরপরই অজ্ঞান হয়ে যায় সৈকত।
|
প্রায় দু ঘন্টা পর যখন তার জ্ঞান ফিরে পায়, তখন মাধবী কে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আর সৈকত কে নিয়ে আসা হয় তার বাসায়। বিকেল ৩টায় তার জানাজা দেওয়া হবে। জানাজার নামাজে অংশ নিতে সৈকতের আব্বু - আম্মু, আকাশ, টিপু ও সৈকত রওয়ানা হয় মাধবীদের গ্রামের উদ্দেশ্যে। ওদের ভালোবাসার কথা সৈকতের আম্মু জানতো আর তার আব্বুও কিছুট জানতো।
|
|
দরজ ধাক্কার আওয়াজে বাস্তবে ফিরে আসে সৈকত।
ঊঠে দরজা খুলে দিতেই দেখে তার আম্মু দাঁড়িয়ে ওনার পিছনে টিপু দাঁড়িয়ে।
সৈকত - কিরে, তুই কোথা থেকে আসলি?
টিপু - কেন? আসাতে কি তোর সমস্যা হইছে।
সৈকত- আরে ধুর আয় ঘরে আয়।
টিপু- না আগে খাবো, ক্ষুধা লাগছে। তুই খাইছিস? চেহারা দেখে তো মনে হয় খাস নি?
আন্টি ভাত রেডি করেন। আমাদের কে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে হবে কিন্তু।
সৈকত এর আম্মু কিছু বলার আগেই তার ছোট বোন বললো, হ্যা, বুড়ো ব্যাটাদের খাইয়ে দাও।
আমরা বুড়ো? দাঁড়া, আসতেছি বলে টিপু এগিয়ে যায় স্বপ্নার দিকে।
সৈকতের আম্মু খুশি হয়ে বললো, ঠিক আছে তোরা আয়।
|
সৈকত হাসতেছে আর ভাবছে,
আজ ২৩শে জানুয়ারি মাধবীর ২য় মৃত্যুবার্ষিকী। সকালে আকাশ ও টিপু কে নিয়ে মাধবীর কবর জেয়ারত করে এসেছে সৈকত। তার আব্বু - আম্মুর সাথে দেখা করেছে। তারা তাকে থাকার জন্য অনুরোধ করায় সারাদিন সেখানে থেকে সন্ধ্যায় ফিরে এসেছে। তারপর সারাক্ষণ ঘরের দরজা বন্ধ করে গিটার বাজিয়েছে আর গলা ছেড়ে গান গেয়েছে। এগারোটায় আম্মু ভাত খেতে ডাক দেওয়ায় বলে দিয়েছে আজ আর খাবে না।
আকাশ আর টিপু সন্ধ্যায় বাসায় গেলেও টিপু আবার ফিরে এসেছে, কারণ টিপু জানে সৈকত আজ খাবে না, ঘুমাবে না আসলে ঘুমাতে পারবে না।
তাই তাকে সঙ্গ দিতেই টিপু এসেছে। কিন্তু টিপু কি পারবে, মাধবীর কথা ভুলিয়ে দিতে? পারবেনা, টিপু পারবে না। কারণ আমার বন্ধুরা আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ আর তোমার বসবাস যে আমার মনের মাঝে।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now