বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

ভালো থাকিস পাগলী

"রোম্যান্টিক" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান Md mainul islam (sagor) (০ পয়েন্ট)

X অনেকখন ধরে মোবাইলটা নিয়ে ঘরের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করছি। কিছু একটা শুরু করবো। কিন্তু কি ভাবে শুরু করবো তাই ভাবছি। বেশ কয়েকবার ম্যাসেঞ্জার ওপেন করেও আবার রেখে দিচ্ছি। মাথার ভিতর একগাদা চিন্তা। আবারো মোবাইল এর লক ওপন করে ম্যাসেঞ্জার এ ঢুকে গেলাম। যা আছে কপালে। পাগলী! লাইনে আছিস্ ? হুম আছি তো। ফ্রি আছিস্ না বিজি? তোর টেক্সট পাওয়া পানেই তো সব কাজ বন্ধ। শোন পাগলী তোর সাথে জরুরী কথা আছে। তোর মত পাগলের আবার জরুরী কথা কি! পাগলী। হুম পাগল। সিরিয়াস হও। আচ্ছা সিরিয়াস, বল। তুই আমার বউ হবি ? হুম হবো। সত্যি করে বল। হবো তো। তাহলে একটা কাজ কর। তারাতারি সাঁজুগুজু করে সাতাশ নাম্বার রোড এ চলে আয়। কতখন লাগবে ? ডিপেন্ড করে কোন ড্রেসটা পড়বো। কোন ড্রেস পড়বি মানে! কোন ড্রেস পড়বি আবার! শাড়ি পড়বি। আজ তোর বিয়ে ভুলে গেছিস্ ? না তো, ভুলি নাই। কিন্তু আমি যে শাড়ি পড়তে পারি না রে! অকেশন গুলোতে আম্মু পড়ায় দেয়। একে তো পালিয়ে বিয়ে করবো তার উপর আম্মুকে যদি বলি শাড়ি পড়িয়ে দিতে তখন কি না কি জিজ্ঞেস করে কে জানে। যদি ধরা খেয়ে যাই! শোন ওতো কথা শুনতে চাই না। তুই কি ভাবে শাড়ি পড়বি আমি জানি না। শাড়ি না পড়ে আসলে আজ তোর বিয়ে হবে না। দেখ একটু বোঝার চেষ্টা কর। আমি সত্যিই পাড়ি না। পাড়বি। কোন মতে শরীর এর সাথে প্যাঁচিয়ে তারাতারি চলে আয়। আর বের হওয়ার আগে কল দিস। তুই আস্ত একটা পাগল। আচ্ছা রাখ দেখি কি করা যায়। আমি আবার ঘরের মধ্যে হাঁটাহাঁটি করছি। আমার দেরি একদম সহ্য হয় না। কিন্তু আমি ভাল করেই জানি ও দেরি করবেই। প্রতিবার ওকে নিয়ে কোথাও বের হতে গেলে কম করে হলেও তার সাঁজুগুজুর জন্য এক ঘন্টা সময় দিতে হয়। নড়ে তো চরে না, চরে তো নড়ে না এমন অবস্থা। হ্যালো! কি রে কত দূর ? এই তো হাত মুখ ধুয়েছি মাত্র। উফফফ! তুই এতো স্লো কেন! তারাতারি কর। দশ মিনিটে সবে মাত্র সে হাত মুখ ধুয়েছে। বাকি পঞ্চাশ মিনিট এ পুরোপুরি রেডি হয়ে বেরুতে পারবে বলে মনে হয় না। নাহ আজ ঘন্টা পার হয়ে যাবে। এই বিশ মিনিট এ চারবার কল দিয়েছি। এখনও না কি কিছুই করা হয় নাই। আজব এক পাগলীরে বিয়ে করতে যাচ্ছি। আচ্ছা তোর হইছে কি বল তো! এতো বার কল দিলে আমি ফোন এ কথা বলবো না রেডি হবো! তুই এক কাজ কর লাউড স্পিকার দিয়ে রাখ। ফোন এর লাইন কাটার দরকার নাই। বাহ! তোর মত পাগল এই দুনিয়ায় কয়টা আছে রে! আমি জামা কাপড় চেঞ্জ করবো, সাঁজুগুজু করবো আর তুই লাইনে থাকবি! তা তে কি! আমি তো আর ভিডিও কল দেই নাই। আচ্ছা সত্যি করে বল তো, তুই টাকা পাইসিছ কোই! তোর তো মোবাইলে ব্যালেন্সই থাকেন না। বিয়ে উপলক্ষে আব্বার পকেট থেকে চুরি করছি। বুঝছি, রাখ এখন ফোন। আমারে রেডি হতে দে। একটু তারাতারি করিস। জানিস তো আমার দেরি সহ্য হয় না। তুই ফোন রাখবি ? আচ্ছা আচ্ছা রাখছি। আমার পাগলী, নাম্বার ওয়ান পাগলী। আমার মত এক পাগলের সাথে বাপের আদরের একমাত্র মেয়ে এই পাগলীর পাগলামি বেশ ভালই চলে। চার বছর ধরে এভাবেই চলছে। আমি নিষ্কর্মা আমড়া কাঠের ঢেকি। আর ও বাপের আদরের দুলালী। মাঝে মাঝেই আমাদের তুমুল ঝগড়া চলে। এমন কি হাতাহাতি মারামারি ও। কিন্তু একটু পরেই সব কিছু আবার আগের মতন হয়ে যায়। দু'জনের কারই মনে থাকেনা একটু আগে কি হয়ে ছিল। এতোটা দিন এক সাথে চলছি অথচ কেউই বুঝতে পারি না আমাদের মাঝে আসলে সম্পর্কটা কি! তবে এতোটুকু বুঝি কেউ কাউকে ছাড়া এক মুহুর্ত থাকতে পারি না। প্রেমিক প্রেমিকাদের মতন জাপটাজাপটি চুমাচুমি না করেও যে নামহীন একটা সম্পর্ক নিয়ে বেশ থাকা যায় তার উদাহরণ আমি আর আমার পাগলী। ওই তোর হলো রে! এইতো আরেকটু। বিকাল তো যাইতেছে। সন্ধ্যা হওয়া বাদ আছে। আর একটু দেরি কর। আমি বাসা থেকে বের হয়ে তোরে কল দিচ্ছি। প্লিজ তারাতারি কর। আমার সাথে কোথাও যাওয়া মানেই ওরে দৌড় এর উপর রাখা। এমনও সময় গেছে তারাহুড়া করতে গিয়ে একদিক দিয়ে মেকাপ করছে আর একদিক দিয়ে ঘেমে ভিজে গেছে। আর সেই চেহারা দেখে আমি যখন আমার উনত্রিশটা দাঁত বের করে খেক খেক করে হাসতাম তখন পাগলীটা মাথা নিচু করে থাকতো। কখনও কখনও ডালিম এর রসের মত চোখ দিয়ে পানি পরতো। ওর একটাই কষ্ট। এই চার বছরে আমি ওরে কোন এক দিনের জন্যও বলি নাই তোরে আজ অনেক সুন্দর লাগছে। অথচ এই পাগলীটার সব কিছুই আমার মত একটা পাগলকে ঘিরে। বের হইছিস ? এই তো বের হইতেছি। হুম হয়ে গেছি। তোরে নিয়ে আর পারলাম না। পাক্কা দের ঘন্টা সময় নিছিস। আরে একটু ঝামেলা হইছিল। এসে বলতেছি। তারাতারি রিক্সায় উঠ। হুম উঠছি। তুই বের হ। যদি তোর জন্য আমার রাস্তায় অপেক্ষা করা লাগে তবে দেখিস তোরে আজ কি করি! কি করবি ? বিয়ের প্রথম দিন জামাই পিটাবি ? তুই পাগল হলেও তোর মাথায় বুদ্ধি আছে রে। শোন তোর সাথে কথা আছে। আমি আগে আসি তারপর তোর যত কথা আছে সব বলিস। নাহ, তুই কাছে এলে আর বলা হবে না। এখনই শোন। আচ্ছা বল। তুই কি আমাকে ভালবাসিস ? আজ চারটা বছর তোর মত একটা পাগল এর সাথে আছি। রুপে গুনে কোন দিক থেকেও কম না। তার চেয়ে বড় কথা হলো বাপের অঠেল টাকা আছে। চাইলেই যে কারো সাথেই চুটিয়ে প্রেম করতে পারতাম। তা করি নাই। আর তুই পাগল বলেই এখন এই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করলি যখন আমি বিয়ে করার জন্য শাড়ি পড়ে বের হয়ে গেছি। যদি সুস্থ মানুষ হইতি তবে জিজ্ঞেস করতি না। তোর কথায় যুক্তি আছে। কবি এখানেই নিরব। এই শোন, একটা তো ঝামেলা করে ফেলছি। এখন কি করি! কি ঝামেলা ? আমি যে জিন্স প্যান্ট পড়া ছিলাম ভুলেই গেছিলাম। তারাহুড়া করে কখন যে ওইটার উপরেই শাড়ি পড়ে ফেলছি নিজেও খেয়াল করি নাই। এখন কি করি বল তো ? এক কাজ কর। প্যান্টটা নিজ থেকে ফোল্ডিং করে ফেল। শাড়ি দিয়ে ঢেকে যাবে। আর দেখা যাবে না। বাহ দারুন একটা বুদ্ধি দিয়েছিস। পাগলী শোন, তুই কি সত্যিই আমার বউ হবি ? এই তুই এখন ফোন রাখ। মেজাজ খারাপ করিস না। এই প্রশ্নের উত্তর দে। আর কিছু জিজ্ঞেস করবো না। তুই ফোন রাখবি কি না বল! আমি কিন্তু এখন ফোন আছাড় দিয়ে ভেঙ্গে ফেলবো। আর তুই খুব ভাল করেই জানিস আমার ফোন ভাঙ্গার অভ্যাস আছে। বাপের একমাত্র মেয়ে গুলা মনে হয় এমনই হয়। হঠাৎ রেগে যায়। আর খুব যেদি টাইপের হয়। পাগলী ও তার ব্যতিক্রম না। বরং আর সব মেয়েরাই ওর যেদ এর কাছে হার মানবে। ওর এই সব পাগলামি আর যেদ এর কারনে ওর বাপ একবার হার্ড এটাক করেছে। দ্বিতীয় বার করতে গিয়েও কোন রকমে ফিরে এসেছে। বড্ড যেদি মেয়ে! একবার যদি কিছু বলে তবে সেটা করেই ছাড়বে। ওর পাগলামিতে মাঝে মাঝে আমিও ভয় পাই। আর এই ভয়েই কখনও পাগলীটরে ছেড়ে যেতে পারি নাই। একবার ঝগড়া করে দুই ঘন্টার জন্য ফোন ওফ করে রেখে ছিলাম। পাগলী বলে কথা। বাড়ির নিচে এসে ঠিল ছুঁড়ে জানালার চার পাঁচটা গ্লাস ভেঙ্গে ফেলছে। আমি আর আব্বা দৌড় দিয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে রাস্তায় চলে আসা মাত্রই থাপ্পাস করে বাপের সামনে দিল এক থাপ্পর মেরে। আমি গালে হাত দিয়ে বাপের দিকে তাকাতেই দেখি বাপ আমার লজ্জা পেয়ে অন্য দিকে মাথা ঘুরিয়ে নিছে। বাপ তো আর জানে না ওর হাতে মার খেয়ে আমার অভ্যাস আছে। তা হলে তুই আসলি! হুম আসলাম। এখন বল এতো দেরি করলি কেন ? তুই তো টাকা পয়সা ইনকাম করিস না। বিয়ে করে আমাকে রাখবি কই! খাওয়াবি কি! তাই আলমারি থেকে টাকা সরাতে গিয়ে দেরি হয়ে গেলো। আর তাছাড়া আজ আমার বিয়ে। বউরে যে স্বর্ন অলংকার দিবি তা তো কিছুই আনিস নাই। তাই আম্মুর গহনা গুলা চুরি করে নিয়া আসছি। তুই জাতে পাগলী হলেও তালে ঠিক আছিস। হুম, এখন চল। কোই যাবো ? কোই যাবি মানে! কাজী অফিসে যাবি! কাজী অফিসের সামনেই তো দাঁড়ানো। এইটা তো বন্ধ! হুম, আজ মার্কেট বন্ধ। তাই কাজী অফিস ও বন্ধ। কাজী অফিস বন্ধ! বিয়েও বন্ধ। দেখ আমার কিন্তু এইবার মেজাজ খারাপ হয়ে যাইতেছে! সব কিছু নিয়ে ফাজলামী ভাল লাগে না। নিয়ত করে ছিলাম এই কাজী অফিসেই তোকে বিয়ে করবো। কাজী অফিসও বন্ধ তাই আজ আর তোর বিয়েও হবে না। আমি কিন্তু সত্যি সত্যিই এখন রাস্তার মধ্যে কান্নাকাটি শুরু করে দিব! শোন শান্ত হও। আমার কথা শোন। না আমি তোর কোন কথা শুনবো না। আমার কথাটা আগে শোন, তারপর কান্নাকাটি কর। তুই এবারো ভুলে গেছিস। আজ আমার জন্ম দিন। পাগলীটা চোখ মুছতে গিয়ে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ও সব কিছু মনে রাখতে পারলেও ও কেন জানি আমার জন্ম দিনের কথাটা মনে রাখতে পারে না। প্রতিবারই ভুলে যায়। আর প্রতি বছরই এ নিয়ে তুমুল এক ঝগড়া হয়। যদিও বছরের এই দিনটায় বরাবর আমারই জয় হয়। পাগলীটা চুপ করে ভাবছে আমি কখন শুরু করবো। কিন্তু আজ আমার ঝগড়া করার ইচ্ছে নাই। কারন আজ পাগলীটা ভীষন সুন্দর করে সেঁজেছে। মনে হচ্ছে আকাশ থেকে যেন পরী নেমে এসেছে। পাগলী চল কোথাও যেএ বসি। কোথায় বসবি ? ভাল কোন একটা রেস্তরাঁয়। ঠিক আছে চল। পাগলীটার মন খারাপ হয়ে আছে। আজ ওর বিয়ে হচ্ছে না এই কারনে না। মন খারাপ হয়ে আছে আমার জন্মদিন উপলক্ষে ও কিছুই করতে পারেনি। সারা বছর জুড়ে তার হাজারটা প্ল্যান থাকে। কিভাবে, কোথায়, কখন আমার জন্মদিনটা পালন করবে।অথচ আজ সব ভুলে গেছে। তার উপর বেশ ভয়ে ভয়ে সময় কাটাছে না জানি আমি কখনও এক বস্তা কথা দিয়ে ওর উপর আক্রমণ করে বসি। কি রে চুপ করেই থাকবি ? আমি সরি রে! একদম ভুলে গেছিলাম। আমি জানি তুই অনেক মন খারাপ করছিস। তোর যা ইচ্ছা তুই বল। আমি কিছু বলবো না তোরে। তুই প্রতিবার ভুলে যাস। এইটা নতুন কিছু না। বাদ দে। কি খাবি অর্ডার কর। আজ আমি বিল দিব। জন্মদিন আমার আর বিল দিবি তুই! মেরে নাক ফাটাবো। হি হি হি। আচ্ছা। পাগলী! বল। আমার দিকে তাকা। হুম। তোরে আজ এতো গুলা সুন্দর লাগতেছে। আজ প্রথম মনে হচ্ছে তুই অনেক সুন্দরী। তোর চোখ দু'টো যে এতো মায়াবী আগে কোন দিন খেয়াল করিনি। চার'টা বছর পার কারলাম তোকে নিয়ে অথচ কোন দিন বুঝতে পারিনি এতো সুন্দরী কেউ একজন আমার পাশে থাকে। আমি অনেক বার নিজে থেকে সাঁজুগুজু করে তোর সামনে আসতাম। তুই খেয়ালি করতি না। তোকে যদি জিঙ্গেস করতাম কেমন লাগছে আমাকে ? সহজ ভাষায় বলে দিতি ভালই খারাপ না। তুই আসলেই একটা পাগল। একটা মেয়ে কি চায় কিছুই বঝিস না। সত্যিই আমি বুঝি না। বুঝলে কি আর তোর মত পাগলীকে বিয়ে করতে চাইতাম। তুই পাগল পাগলী বিয়ে করবি না তে কি ভাল মানুষ বিয়ে করবি ? হা হা হা। তা যা বলেছিস। শোন মজার কথা। আব্বাকে ওই দিন তোর কথা বলছিলাম। আব্বা কি বলে জানিস! আব্বা বলে তোরে বিয়ে করলে না কি সারাজীবন আমার তোর হাতের থাপ্পর খেতে খেতে জীবন যাবে। বাহ! চান্স পেয়ে নিজের বাপের কথা খুব ভাল করে শুনিয়ে দিলি তাই না। আমার বাপ কি বলছে তাই শোন। আব্বা বলছে তুই না কি একটা অপদার্থ। তুই যদি ঘর জামাই থাকতে রাজি থাকিস তবেই না কি তোর সাথে আমার বিয়ে দিবে। হা হা হা তোর বাপ এখনও চ্যারলি চ্যাপলিনই রয়ে গেলো। আর তোর বাপটা কি শুনি! ইয়া বড় টাক মাথার নিচে যেই বড় গোঁফ। পুরাই তামিল সিনেমার ভিলেন। যাই হোক তোর কপাল খারাপ রে পাগলী। যেহেতু আমার বাপ ভিলেন আমার সাথে বিয়ে হলে তোর নায়িকা হওয়ার একটা চান্স ছিল। সেইটাও ভেস্তে গেলো। এখন তোর কি হবে রে পাগলী! হা হা হা। কি আর হবে, চুপ থাক! পাগল একটা। এই ভাল কথা! তুই না বলে ছিলি তোর এই বার জন্মদিনে আমাকে জীবন এর সব চেয়ে বড় সারপ্রাইজটা দিবি। হুম বলে ছিলাম। এখন দে। আচ্ছা একটু পরে দেই। পরে না। এখন দে। আচ্ছা দিব বলছি তো। খাওয়া দাওয়া শেষ করি। যাবার সময় দিয়ে যাব। না না না! আমি কোন কথা শুনবো না। তুই এখনই সারপ্রাইজ দিবি। সব সময় যেদ করিস না তো! হ্যা করবো! তুই এখন দিবি কি না বল ? আসতে কথা বল। আমরা রেস্তোরাঁয় বসা। এখানে আরও অনেক মানুষ আছে। পাগলী এক নজর এ আমার দিকে তাকিয়ে কাল নাগিনী সাপের মত ফোস ফোস করতেছে। রেগে গেলে কারো চেহারা যে এতো সুন্দর হয় তা দেখতে হলে এই পাগলীকেই দেখতে হবে। হরিণীর মত চোখ গুলো যেন জ্বল জ্বল করে উঠে। সরু নাক আর গালের দুই পাশটা লালচে রং এর হয়ে যায়। এই বুঝি বিষাক্ত একটা ছোঁবল এসে পরলো পরলো ভাব। টেবিলে রাখা হাতের কাছে গ্লাস আছে। মারলে হয় তো ওটাই আমার মুখে ছুঁড়ে মারতে পারে। আমাদের দুই জনরই অবশ্য রেস্তোরাঁর গ্লাস প্লেট ভাঙ্গার অভ্যাস আছে। এর জন্য ইতিমধ্যেই আমার বেশ কয়েকটা রেস্তরাঁয় নিষিদ্ধ। যদিও বেপারটা মোটেও সুখ কর নয়। পাগলী তোর হাতটা দে। এতো রোমান্টিক হলি কবে থেকে ? দে, হাতটা দে। হুম দিলাম। আমার শুধু একটা কথাই বলার আছে। ওই একটা কথাই তোর জীবন এর জন্য সবচেয়ে বড় সারপ্রাইজ। কথাটা আমি সিরিয়াসলি বলবো। তুই কোন পাগলামি করবি না। আর কোন হৈইচৈই ও করবি না। আচ্ছা ঠিক আছে বল। আমি কিছু করবো না। আমার ব্রেইন ক্যান্সার। ডাক্তার সময় বেঁধে দিয়েছে ছয় মাস। আজকের পর থেকে তোর সাথে আমার আর দেখা হবে না। ওর চোখের দিকে তাকানোর মত আমি আর কোন শক্তি পেলাম না। কেন যেন মাথাটা নিচে নেমে এলো। মনে হচ্ছে হঠাৎ করেই শরীর এর তুলনায় মাথার ওজনটা বেরে গেছে। টেবিলের উপর পরে আছে আমার শূণ্য দু'টো হাত। বুঝতে পারছি পাগলীর হাত দুটো আমার কাজ থেকে সরে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে উঠে আসা মায়াবী সুন্দরী পাগলীটা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। ততখনে আমার চোখের কোণ ঘেষে দুই বিন্দু জল ভিজিয়ে দিয়ে গেল আমার গালের দুই পাশটা। হঠাৎই মতে হলো কে যেন রেস্তরাঁর মেঝেতে ঠিক আমার পায়ের কাছে এসে আচমকাই বসে পরলো। মাথা ঘুরিয়ে দেখি চোখের পানিতে পাগলীর কাজল নষ্ট হয়ে গেছে। কাঁপা কাঁপা ঠোঁটে ফুপিয়ে কাঁদছে। পাগলীরে! তোর মাঝে এতো মায়া কেনও রে! তুই তো আমাকে আজ ডুবিয়ে দিবি। তোর এমন মায়া ভরা মুখ রেখে মৃত্যুর কোলে যেতে আমার যে অনেক কষ্ট হবে। সার্ট এর এক পাশটা টেনে ধরে আমাকে চেয়ার থেকে মেঝেতে নামিয়ে নিলো। ওর পুরোটা শরীর রাগ আর কষ্টে কাঁপছে। আজ পাগলীর শক্তির বড় অভাব। তা না হলে হয়তো এই পুরো রেস্তরাঁটাই ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিত। আমি এক দৃষ্টিতে ওর লাল হয়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে আছি। বার বার চিৎকার দেবার আপ্রাণ চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় কান্নার আওয়াজটা যেন গুঙ্গিয়ে উঠছে। দু'হাত দিয়ে খাঁমচে ধরে রেখেছে আমার বুকটা। দাঁতে দাঁত চেপে ওর বড় বড় নখের আঁচড় গুলো সার্টের কাপড়টা ভেদ করে দিবি আমার বুকেতে এসে লাগছে। কয়েকটা সার্টের বোতাম রেস্তরাঁর মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরলো। পাগলীর থেমে থেমে কেঁদে উঠার আওয়াজ ছাড়া পুরো রেস্তরাঁয় চলছে নীরবতা। নাহ! আমি আর পারলাম না! এক ঝটকায় ওর হাত দুটো সরিয়ে দিয়ে রেস্তরাঁ থেকে বেরিয়ে পরলাম। আমি জানি পাগলী এখন চিৎকার করে কাঁদছে। পুরো রেস্তরাঁর মানুষের সামনে বসে পাগলী কাঁদছে। পাগলীরা লোক লজ্জা বোঝে না। তাই পাগলীরা কাঁদে। ওরা পাগলী বলেই ওরা কাঁদে। আমি চাই না আমার মৃত্যুর আগে ওর বুক ফাটানো কান্না দেখতে। তাই রেস্তরাঁ থেকে বেরিয়ে আর দেরি করিনি। সোজা রিক্সায় উঠে বসলাম। নিজের ভেজা চোখ দু'টোর মাঝে পাগলীর মুখটা কল্পনা করার চেষ্টা করছি। হঠাৎই মাথাটা কেন জানি প্রচন্ড ভাবে ঘুরিয়ে উঠলো। বুঝতে পারলাম, আমি চলন্ত রিক্সা থেকে পরে যাচ্ছি। তিন মাস হলো আমি হাসপাতাল এ ভর্তি। সে দিনের পর থেকে পাগলীর সাথে আর কোন কথা হয়নি। শোক এ পাথর হয়ে গেছে কি না! না কি আমার আগেই মরে গেলো কে জানে! তা যাই হোক, আমি মন থেকেই চাই না আমাদের আর যোগাযোগ হোক। আমার মৃত্যুর আগে পাগলীকে দেখতে পাবও না এই অভিমান নিয়ে মরতে রাজি আছি। কিন্তু ওকে দেখে এ বুক কষ্ট নিয়ে আমি মরতে রাজি নাই। এই হাসপাতালটা খুব বাজে একটা জায়গায়। যেখানে সকালের ঘুম ভাঙ্গার কথা পাখির মিষ্টি ডাকে সেখানে ঘুম ভাঙ্গে কাউয়া মানে কাক এর ডাকে। খুবই বিরক্তিকর। তার মাঝে আজ ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় আর এক বিপদে পরলাম। আমি ঠিক কখন মারা গেলাম বুঝতে পারতেছি না। সাদা পাঞ্জাবি পড়া দাড়িওয়ালা এক লোক বুকের মধ্যে মোটা একটা খাতা ধরে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তবে কি উনিই মুনকার নাকির ফেরেশতা! তার হাতের ওই খাতার মধ্যেই কি আমার পাপ পূন্যের হিসাব! সব কিছু কেমন যেন আবল তাবল লাগতেছে। এতো মানুষ কেনও এখানে! আমার আব্বা আম্মা, পাগলীর আব্বা আম্মাও আছে। তবে কি সবাই এক সাথে কবরে আসলাম! না কি এইটা হাশর এর ময়দান! ডান পাশে তাকাতেই দেখি পাগলী লাল রং এর শাড়ি পড়ে বসে আছে পায়ের উপর পা তুলে। কি যন্ত্রণায় পরলাম! আমি এখন আছি কোথায়! কাজী সাহেব শুরু করেন। মানে কি! মানে হচ্ছে আজ তোমার আর আমার বিয়ে। পাগলীর কথায় বুঝতে পারলাম আমি এখনও জীবিত। তার মানে মরি নাই। কিন্তু বিয়ে! এইটা হতে পারে না। আমি খুব বেশি হলে আর তিন থেকে চার মাস বেঁচে থাকবো। কিন্তু ওই যে বললাম না! পাগলীরা যা পারে তা অন্য কেউ পারে না। ওর পাগলামির কাছে শেষ পর্যন্ত আমাকে হার মানতেই হয়েছে। পাগলী বলেই হয়তো মৃতপথ যাত্রী কাউকে বিয়ে করে স্বামী হিসেবে স্বীকার কারতে দিধা বোধ করলো না। কিন্তু পাগলী এমন ভালবাসার প্রতিদান এ কি পেলও! দেখতে দেখতে তিনটা মাস চলে গেলো। বিয়ের প্রথম দিনই কথা দিয়ে ছিলো আজ থেকে আর কোন দিনই না কি শাড়ি ছাড়া আর কিছুই পরবে না। তাই দূরের শেগুন গাছের ছায়ায় সাদার রং এর শাড়ির আঁচলের ফাক দিয়ে চোখ ভিজিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে তার পাগলটাকে কবর দিতে মানুষ জনের ব্যস্ততার শেষ নেই। আমি জানি আমার পাগলীটা সারাটা জীবন এভাবেই কাটিয়ে দিবে। এই পাগলীরাই জানে কি করে কাউকে পাগলের মত করে ভালবাসতে হয়। বাকিটা জীবন এক অদৃশ্য ভালবাসকে আঁকড়ে ধরে থাকতে হয়। এরা পাগলী বলেই এদের কাছে ভালবাসাটাই সব। নিঃস্বার্থ ভাবে ভালবাসে বলেই এরা পাগলী। এরা প্রতিদান এ কিছু চায় না। কিছু পায় না বলেই এরা পাগলী। তোকে ছেড়ে যেতে খুব কষ্ট হচ্ছেরে পাগলী! তুই তো আমার দশটা পাঁচটা না। তুই আমার একটামাত্র পাগলী। আমার মতন এমন প্রতিটা পাগলের যেনও তোর মতন একটা পাগলী থাকে। জানি ভাল থাকবি না। বুক চাপরে চাপরে কাঁদবি। সারাদিন রাত কাঁদবি। তারপরও বলছি, ভাল থাকিস পাগলী! আমি জানি, এই পৃথিবীতে সব পাগলের জায়গা পাগলাগারদ এ হয় না। কিছু কিছু পাগলের জায়গা হয় কিছু পাগলীর হৃদয়ে। যেমনটা আমার মত পাগলের জায়গা হয়েছে তোর মত পাগলীর হৃদয়ে।


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১২৫৩ জন


এ জাতীয় গল্প

→ ভালো থাকিস পাগলী

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now