বাংলা গল্প পড়ার অন্যতম ওয়েবসাইট - গল্প পড়ুন এবং গল্প বলুন
বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ

বাবা

"ছোট গল্প" বিভাগে গল্পটি দিয়েছেন গল্পের ঝুরিয়ান রিয়েন সরকার (০ পয়েন্ট)

X বাবা তামান্না ইসলাম . বাবার লাশটা কবরে নামিয়ে দিয়ে অপু যখন উঠে দাঁড়ালো, ওর সমস্ত শরীরের ভেতরে জমে থাকা কান্নাটা গলার কাছে এসে পাকিয়ে উঠছে। ঠিক তখনই চোখে পড়লো একটু পিছনে দাঁড়ানো সদ্য বিধবা মা শূন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে, দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই মুহূর্তে তার মা, যাকে বাবা আদর করে ডাকতেন পুতুল সে তার চার পাশের জগত থেকে একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। মায়ের পাশে দাঁড়ানো ছোট বোন নিপু অঝোর ধারায় কাঁদছে, আর তার পাশে ওর চার বছরের অবুঝ ভাইটা বোনের হাত ছাড়িয়ে ছুটে যাওয়ার চেষ্টা করছে। দশ বছরের নিপু না পারছে নিজের কান্না থামাতে , না পারছে দিপুটাকে আটকে রাখতে। ঠিক সেই মুহূর্তে আঠার বছরের অপুর বয়স যেন এক ধাক্কায় বেড়ে তাকে একজন পরিণত মানুষ বানিয়ে দিল। তার এখন অনেক দায়িত্ব। গলার কাছের কান্নাটাকে অনেক কষ্টে শরীরের ভেতরে পাঠিয়ে দিয়ে সে ছুটে গেল মা, বোন আর ভাইয়ের কাছে। মৃদু হেসে নিপুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল 'কিরে আমি আছি না? আজ থেকে আমিই তোর আর দিপুর বাবা হব, দেখিস।' তার এই কথায় যেন সম্বিত ফিরে পেল পুতুল। বড় ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে হু হু করে কেঁদে উঠলো চল্লিশ না পেরনো বিধবা পুতুল। এক হাতে দিপুকে কোলে নিয়ে আরেক হাতে মাকে জড়িয়ে ধরল অপু। তার দেখাদেখি নিপুও জড়িয়ে ধরল মাকে। চারটি প্রাণ এক হয়ে যেন একে অপরের শক্তির উৎস হয়েছে। প্রাণ থেকে প্রাণে পাঠিয়ে দিচ্ছে ভালোবাসা, সাহস। শুধু দিপুর তেমন কোন ভাবান্তর নেই। অপুকে পেলে তার আর তেমন কিছু লাগে না। যদিও অপু আর দিপুর বয়সের পার্থক্য অনেক বেশি, তবুও জন্মের পর থেকেই কেন যেন অপুর সাথে দিপুর বেশ খাতির। দিপু সবচেয়ে বেশি ভক্ত ছিল বাবার। ওদের বাবা শাহেদ সংসার অন্তঃপ্রাণ মানুষ ছিলেন। খুব অল্প বয়সে বাবা হয়েছিলেন তিনি। কাজের বাইরে তার পৃথিবী ছিল তার তিন সন্তান আর স্ত্রী পুতুল। মনে আছে, যেদিন বাবা আর মা দিপুকে নিয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি এলো, অপুর বেশ লজ্জা লাগছিল। তার বন্ধুরা তাকে নিয়ে সবাই হাসাহাসি করবে। কিন্তু দিপুর ছোট্ট মুখটায় অবিকল নিজের মুখ বসানো দেখে কী রকম যেন একটা টান অনুভব করেছিল। বাড়িতে এসেই মা আবার অসুস্থ হলেন, আরেক দফা হাসপাতালে যেতে হল। বাবা যখন মাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে ব্যস্ত, তখন অপু আর নিপুই অনেকটা দিপুর দেখা শোনা করেছে। সেই থেকে দুই ভাইয়ের বন্ধুত্বের শুরু। কিন্তু বাবা বেঁচে থাকতে দিপুর সব খেলা ধুলা আর আনন্দ ছিল বাবাকে ঘিরেই। বাবার এক্সিডেন্টের পর আবার নতুন করে বড় ভাইয়ের সাথে খাতির হয়েছে ওর। এক্সিডেন্টটা ছিল ভয়ঙ্কর। প্রথম থেকেই বাবার প্রাণ সংশয়, জ্ঞান ছিল না পুরো দুই সপ্তাহ। মা, বাবাকে আগে বলতে শুনতেন 'বিদেশ বিভুয়ে বিপদে পড়লে কে পাশে এসে দাঁড়াবে?' অপু তখন বুঝত না, ওর জন্ম এখানেই, তাই এটা ওর কাছে বিদেশ নয়। তবে সেই এক্সিডেন্টের পর মা যখন দিনের পর দিন বাবার সাথে হাসপাতালে, তখন অপু কথাটা কিছুটা বুঝতে পেরেছিল। নিপুকে ওর বান্ধবীর বাবা, মা স্কুলে আনা, নেওয়া করছে। বাবা, মায়ের পরিচিত বন্ধুরা ওদের বাসায় নিয়মিত খাওয়া দিচ্ছে। কিন্তু দিপু একমাত্র ভাইয়া ছাড়া আর কারো কাছেই থাকবে না। অপুই ওকে খাওয়াত, গোসল দিত, ঘুম পাড়াত। ওর নিজেরই অবাক লাগতো যে মায়ের মত প্রায় সব কাজই ও করতে পারছে। কলেজ কামাই গেছে দিনের পর দিন। কিন্তু বাবা, মায়ের এই বিপদে তাদের পাশে থাকতে পারছে ভেবে খুব ভালো লাগতো। নিজেকে বড় বড় আর সংসারে প্রয়োজনীয় একজন মানুষ মনে হত । সেই সাথে ভীষণ ভয়ও হত , 'বাবার যদি কিছু হয়? সংসার চলবে কীভাবে? তাছাড়া, বাবাই যে ওদের সংসারের সকল আনন্দের উৎস, ওদের পরিবারের প্রাণ। ' দু সপ্তাহ পরে বাবার জ্ঞান ফিরলে ওরা কিছুটা আশার আলো দেখেছিল। জ্ঞান আসা যাওয়া করতে করতেই মাত্র মাস খানেকের নোটিশে ওদের সংসারটাকে তছনছ করে দিয়ে চলে গেলেন বাবা। বাবা চলে যাওয়ার পর অপুকে আরও প্রবলভাবে আঁকড়ে ধরেছে দিপু। ওর সাথেই ঘুমাবে, ওর হাতেই খাবে, অকারণে ওকেই বিরক্ত করবে। পুতুল খুব শক্ত ধাঁচের মহিলা। কিন্তু তারপরেও খুব অন্যমনস্ক থাকে। এই হঠাৎ আসা ঝড়ের আঘাত সামলে উঠতে পারছে না যেন। সারাটা ঘরময় শাহেদের ফেলে যাওয়া স্মৃতি। এইতো সেদিনও জীবন ছিল কত আনন্দময়। তার জীবন থেকে যেন সব আলো নিভে গেছে এক লহমায়। সবাই বুঝায়, 'কিছু একটা শুরু করতে হবে, বাচ্চাদের মুখের দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াতে হবে। জীবন তো আর থেমে থাকে না কারো জন্য। ' সে নিজেও জানে এভাবে তো আর সংসার চলবে না। কিন্তু শক্তি পায় না কিছুতেই। শাহেদ যেন তার সমস্ত জীবনী শক্তি সঙ্গে নিয়ে চলে গেছে। এবারো মায়ের পাশে এসে দাড়ায় অপু। সে একটা পার্ট টাইম কাজ নিয়েছে। 'তোর পড়া লেখার ক্ষতি হবে বাবা।' পুতুল অনুযোগ করে। 'শুধু সামারটা করবো মা, সামারে তো এমনিতেই ছুটি।' মাকে বোঝায় ছেলে। সে মনে মনে ভাবে মাকে উঠে দাঁড়াতে কিছুটা সময় দিতে হবে, সেই সময়টুকু চালাতে হবে তাকে, যেমন করেই হোক। দিপু আজকাল মাঝে মাঝেই বাবকে খুঁজে। সব সময় না। হয়তো ঘুমাতে যাওয়ার আগে বায়না ধরে, 'আজ বাবার কাছে ঘুমাব।' পুতুলের খুব অসহায় লাগে। কিন্তু অপু কেমন করে যেন ঠিকই তাকে ম্যানেজ করে ফেলে। একদিন শাহেদের কবর জিয়ারত করে এসে লুকিয়ে কাঁদছিল পুতুল। আড়াল থেকে দেখে ফেলে অপু। কিছুক্ষণ পরেই সে হই হই করতে করতে রান্না ঘরে এসে হাজির হয় , 'মা চল না আজ পার্কে যাব বেড়াতে দিপু আর নিপুকে নিয়ে, আজ যা সুন্দর ওয়েদার।' পুতুল অবাক হয়ে দেখে, 'ছেলেটা কবে এত বড় হয়ে গেল? দেখতে অবিকল ওর বাবার মত।' আজকাল প্রায়ই ওকে দেখে চমকে ওঠে পুতুল। মানুষটা নেই, কিন্তু রয়ে গেছে তার ছায়া। আজ অপুর জন্মদিন। সকাল থেকেই এত মন খারাপ লাগছে। বার বার মনে হচ্ছে বাবা বেঁচে থাকলে এই করতো, ওই করতো। বাবা খুব ভালো বিরিয়ানি রান্না করতেন। অপুর পছন্দ বলে প্রতি জন্মদিনে রান্না করতেন। কেক নিয়ে আসতেন, অপু লজ্জা পেতো তারপর ও। বাবার কাছে টাকার জন্য বায়না ধরত অপু। আজ আবার খুব ছোট হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। মা ও মনে করে বিরিয়ানি রেঁধেছে, কিন্তু একদম খেতে ইচ্ছে করছে না। মায়ের বিরিয়ানি বাবার মত হয় না। না খেলে মা কষ্ট পাবে। পুতুল সারাক্ষণ চেষ্টা করছে বাচ্চারা যেন না ভাবে বাবার জন্য কোন কিছু থেকে তাঁরা বঞ্চিত। অপু সেটা জানে ভালো করেই। তাই মাকে খুশি করতেই খেতে বসলো অপু। খাবার নিয়ে ওর নাড়া চাড়া দেখে পুতুল বুঝল ওর মন খারাপ। জোর করলো না আর। ওরা দুজন মুখোমুখি বসে আছে মন খারাপ করে, মুখে কথা নেই। ঠিক এসময়ে নিপু এলো দৌড়াতে দৌড়াতে। ওর চোখে মুখে খুশির ছটা। 'হ্যাপি বার্থডে ভাইয়া' বলেই ওর দিকে বাড়িয়ে দিল ওর গিফট। পিগি ব্যাঙ্কে জমানো টাকা দিয়ে ভাইয়ের জন্য বোর্ড গেম কিনেছে একটা। বোনকে জড়িয়ে ধরল অপু। নিপুর দেখাদেখি দিপুও লাফাচ্ছে 'বাইয়ার বাদ্দে বাদ্দে।' এক নিমেষে মন খারাপ ভাবটা চলে গেলো। মা আর নিপুকে নিয়ে ওরা হই হই করে গেমটা খেলতে বসলো। খেলায় হেরে নিপুর সেকি রাগ। ওর মান ভাঙ্গাতে এইবার জোরে রেডিওতে ওর প্রিয় একটা গান ছেড়ে দিল অপু। মাকে আর বোনকে টেনে টেনে উঠালো 'আয় নিপু নাচি, মা তুমিও আসো।' ভাইয়ের সাথে বোন নাচছে উলটা পাল্টা, আর তার চেয়েও বেশি লাফ ঝাপ করছে দিপু, ওদের আনন্দ দেখে হাসছে মা, 'নাহ অপুটা সেই ছোট্ট অপুই আছে।' এই মুহূর্তে এই দৃশ্য দেখে কেউ বুঝতে পারবে না এই পরিবারে কোন দুঃখ আছে। এমন সময়ে কলিংবেল বাজলো। গানের শব্দে ওরা প্রথমে শুনতে পায় নি। কিন্তু যে এসেছে সে হাল ছাড়বে না, বেল বাজিয়েই যাচ্ছে একটানা। অপু, নিপুর হুঁশ নেই। পুতুল যেয়ে দরজা খুলল। দরজায় দাঁড়িয়ে আছে স্যাম, অপুর ছোট বেলার বন্ধু। ওকে কেমন বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে, মুখটাও খুব শুকনা। 'ভেতরে আসো, ওরা সবাই বাড়িতে।' স্যামকে দেখে অপুর নাচের উৎসাহ যেন আরও বেড়ে গেলো। 'কাম অন্য স্যাম, হ্যাভ সাম ফ্যান উইথ আস।' স্যাম চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। কোন উত্তর দিল না। অপুর কেমন খটকা লাগলো। হটাত মনে হল গতকাল স্যামের জন্মদিন ছিল, একদম মনে ছিল না। তাই বোধহয় রাগ করেছে। দৌড়ে যেয়ে বন্ধুকে জড়িয়ে ধরল 'হ্যাপি বার্থডে দোস্ত। নিশ্চয়ই অনেক গিফট পেয়েছিস। ' এবারো স্যামকে চুপ করে থাকতে দেখে অপু সত্যি সত্যি কোন হদিস পেলো না। গল্প করার জন্য ওকে টেনে খাবার টেবিলে নিয়ে গেলো। পুতুল জোর করে একটা প্লেটে বিরিয়ানি তুলে দিল। মা সরে যেতেই ওকে চেপে ধরল অপু 'কী হয়েছে তোর? সব ঠিক আছে তো?' এই বার ভেঙ্গে পড়লো স্যাম। বিরিয়ানি নাড়া চাড়া করছিলো, থামিয়ে দিয়ে বলল 'কাল রাতে মা আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছে। বাবার বছর খানেক চাকরি নেই, এতো অভাব অনটন মায়ের পোষাচ্ছে না। এক বছর ধরেই বসায় প্রতিদিন তুমুল অশান্তি, আমি কেউকে বলতে পারি নি এতদিন লজ্জায়। শুনেছি মায়ের নতুন বয় ফ্রেন্ড হয়েছে, অনেক নাকি বড়লোক। আর আমার গরিব বাবা সকাল থেকে বসে বসে মদ খেয়ে চূড় হয়ে আছে। তাদের দুজনের একজনেরও মনে হয় মনেই নেই কাল আমার জন্মদিন ছিল। আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলি না কী গিফট পেয়েছি? এই হোল আমার গিফট, বাবা, মায়ের সেপারেশন। অপু তোর তো শুধু বাবা নেই, কিন্তু মা আছে, ভাই আছে, বোন আছে, একটা বাসা আছে যেখানে তোর ফিরতে ইচ্ছে করে রোজ। আমার সব কিছু থেকেও আজ আর কিছুই নেই। আজ সারা দিন কিছু খাই নি। তোর বাসায় খাওয়া পেলাম। আর শোন, আজ রাতটা তোর সাথে থাকতে দিবি?'


এডিট ডিলিট প্রিন্ট করুন  অভিযোগ করুন     

গল্পটি পড়েছেন ২১০৭২ জন


এ জাতীয় গল্প

→ আচরণের আয়নায় বাবা-মা
→ বাবা-মেয়ের অতৃপ্ত ভালোবাসা
→ আমার প্রিয় বাবা
→ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাবা
→ মায়ার মা আর বাবা
→ বাবা
→ বাবাকে হারিয়ে
→ বাবা ও ছেলের গল্প
→ বাবা
→ বাবা মা এখন আমাদের সন্তান
→ বাবা ও ছেলে
→ বাবা
→ বাবা দিবস
→ আদর্শ মা-বাবার যোগ্য ছেলে পড়তে
→ বাবার জুতা

গল্পটির রেটিং দিনঃ-

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন

গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now