বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
সমুদ্রের কিনার ঘেঁষে এক অদ্ভুত রাজ্য ছিল— নাম তার “পানিখেকো প্রজাতন্ত্র”। রাজ্যটির বিশেষত্ব ছিল, এখানে মানুষ জমিতে বাস করলেও জমির মালিক ছিল জল। বছরের অধিকাংশ সময় লোকজন ঘর বানাত, আর বাকি সময় ভাসত। শিশুরা হাঁটতে শেখার আগেই শিখে যেত কীভাবে বালতি দিয়ে ঘর থেকে পানি ফেলা যায়। বৃদ্ধরা মৃত্যুর আগে শেষ ইচ্ছা হিসেবে বলত, “আমারে কবর দিও একটু উঁচু জায়গায়, যেন জোয়ারে আবার ভেসে না যাই।”
পানিখেকো প্রজাতন্ত্রের উপকূলীয় অঞ্চলটির নাম ছিল “ভাঙনপুর”। নাম শুনেই বোঝা যায়, এখানে কিছু না কিছু প্রতিদিন ভাঙতই। কখনও নদী ভাঙত, কখনও ঘর ভাঙত, কখনও মানুষের আশা। তবে সবচেয়ে বেশি ভাঙত সরকারি প্রতিশ্রুতি।
ভাঙনপুরের মানুষ বহু বছর ধরে একটাই দাবি করে আসছিল— “একটা মজবুত বাঁধ চাই।” কিন্তু তাদের এই চাওয়া ছিল রাজ্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক দাবি। কারণ পানিখেকো প্রজাতন্ত্রে সেতু ভাঙা চলত, রাস্তা ডোবা চলত, মানুষ ভেসে যাওয়া চলত; কিন্তু দাবি করা চলত না।
রাজ্যের দুর্যোগমন্ত্রী ছিলেন মহামান্য জলোচ্ছ্বাস চন্দ্র বাহাদুর। তিনি প্রতিবার ঘূর্ণিঝড়ের পর হেলিকপ্টারে করে ভাঙনপুরে আসতেন। তাঁর আগমনের আগে সরকারি কর্মচারীরা তড়িঘড়ি করে কিছু শুকনো খাবারের প্যাকেট এনে সাজিয়ে রাখত, যেন মনে হয় রাজ্যবাসী খুব সুখে আছে।
মন্ত্রী নামার সঙ্গে সঙ্গে ক্যামেরা অন হতো। তিনি হাঁটু পর্যন্ত পানিতে নেমে ছবি তুলতেন। তারপর বলতেন, “সরকার আপনাদের পাশে আছে।”
লোকজন মনে মনে ভাবত, “পাশে না থেকে যদি একটু সামনে দাঁড়াইতেন, তাহলে পানি ঠেকাইতে পারতেন।”
কিন্তু এসব কথা কেউ মুখে বলত না। কারণ পানিখেকো প্রজাতন্ত্রে সত্য কথা বললে তাকে “রাষ্ট্রবিরোধী ঢেউ” বলে গণ্য করা হতো।
ভাঙনপুরের মানুষ একসময় খুব আশাবাদী ছিল। তারা বিশ্বাস করত, একদিন নিশ্চয়ই একটা টেকসই বাঁধ হবে। কিন্তু বছর যেতে যেতে তারা বুঝল, এই রাজ্যে বাঁধের চেয়ে বাঁধের প্রকল্প বেশি শক্তিশালী।
প্রতি বছর নতুন করে “মহাপরিকল্পনা” হতো। কাগজে-কলমে এমন সব বাঁধ আঁকা হতো, যেন সেগুলো শুধু জলোচ্ছ্বাস নয়, সুনামি, হারিকেন, এমনকি বিচারবুদ্ধিহীন রাজনীতিকদের কথাও ঠেকাতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে কাজ শুরু হওয়ার আগেই বাজেটের অর্ধেক উধাও হয়ে যেত।
রাজ্যের প্রধান প্রকৌশলী ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার ফাঁকাফাঁকি মল্লিক। তিনি বলতেন, “বাঁধ এমনভাবে বানাতে হবে, যাতে প্রতি বছর সংস্কারের সুযোগ থাকে। একেবারে টেকসই বানাইলে ভবিষ্যৎ উন্নয়ন বন্ধ হয়ে যাবে।”
এই “উন্নয়ন” কথাটা ভাঙনপুরের মানুষ খুব ভয় পেত। কারণ যখনই সরকার বলত “উন্নয়ন হচ্ছে”, তখনই তারা বুঝত— এবার হয়তো আরেকটা ঘর যাবে।
ভাঙনপুরে এক বৃদ্ধ জেলে ছিলেন— নাম তার রহিম গাঙচিল। তিনি সারাজীবন নদীর সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। তাঁর শরীরের চামড়া লবণে শক্ত হয়ে গিয়েছিল। একদিন চায়ের দোকানে বসে তিনি বললেন, “আমরা বাঁধ চাই, ওরা ব্যানার দেয়। আমরা মাটি চাই, ওরা মাইক দেয়। আমরা বাঁচতে চাই, ওরা বক্তৃতা দেয়।”
চায়ের দোকানের মালিক সঙ্গে সঙ্গে রেডিওর শব্দ বাড়িয়ে দিল। কারণ দেয়ালেরও কান ছিল, আর সেই কান সাধারণত ক্ষমতাবানদের দিকেই ঝুঁকে থাকত।
এদিকে রাজ্যে নতুন এক ট্রেন্ড শুরু হলো— “দুর্যোগ পর্যটন।” শহরের ধনী লোকেরা ঘূর্ণিঝড়ের পর ভাঙনপুরে ঘুরতে আসত। তারা পানিবন্দী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সেলফি তুলত। ক্যাপশন দিত— “মানবতার পাশে আছি।”
একজন অভিনেত্রী তো কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ছবি তুলে লিখেছিলেন, “আজ খুব কষ্ট পেলাম।” ছবির নিচে হাজার হাজার লাইক পড়েছিল। কিন্তু ভাঙনপুরের মানুষ ভাবছিল, “কষ্ট যদি এতই লাগে, তাহলে একটু বাঁধ বানাইয়া দেন না!”
একবার ঘূর্ণিঝড় “লালমোহন” আঘাত হানল। নাম শুনে অনেকেই ভেবেছিল, হয়তো কোনো মিষ্টির দোকানের মালিক আসছে। কিন্তু ঝড়টা এমনভাবে এল যে রাতারাতি পুরো ভাঙনপুর ডুবে গেল।
মানুষ গাছের ডালে আশ্রয় নিল। গরু ছাগল ছাদে উঠল। স্কুলঘর ভেসে গেল। সকালে দেখা গেল, গ্রামের কবরস্থানও পানির নিচে। মৃতরাও যেন নিরাপদ না।
তখন দুর্যোগমন্ত্রী আবার এলেন। এবার তিনি আরও আবেগী কণ্ঠে বললেন, “আমরা আপনাদের কষ্ট বুঝি।”
রহিম গাঙচিল জিজ্ঞেস করলেন, “বুঝেন যখন, তখন বাঁধ দেন না কেন?”
মন্ত্রী হেসে বললেন, “বাঁধের কাজ প্রক্রিয়াধীন।”
ভাঙনপুরের মানুষ “প্রক্রিয়াধীন” শব্দটার অর্থ ভালো করেই জানত। এর মানে— “আপনারা মরতে থাকেন, আমরা ফাইল চালাচালি করি।”
এরপর রাজ্যে “বিশ্বমানের বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প” শুরু হলো। রাজধানীতে বিশাল অনুষ্ঠান হলো। মঞ্চে লেখা— “উপকূল এখন নিরাপদ।” টেলিভিশনে বিজ্ঞাপন চলল— হাসিমুখে এক শিশু বাঁধের ওপর ঘুড়ি ওড়াচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবে সেই বাঁধের কাজ করছিল এক ঠিকাদার কোম্পানি— “ভেসে যাও অ্যান্ড সন্স।” তারা বালুর সঙ্গে মাটি কম, বাতাস বেশি মেশাত। ফলে বাঁধ দাঁড়াত ঠিকই, কিন্তু দেখতে। জলোচ্ছ্বাস এলেই সেটি এমন ভেঙে পড়ত, যেন বিয়ের পর আত্মীয়তার সম্পর্ক।
প্রকল্প উদ্বোধনের দিন মন্ত্রী ফিতা কাটলেন। সাংবাদিক জিজ্ঞেস করল, “স্যার, বাঁধ কত বছর টিকবে?”
মন্ত্রী গর্ব করে বললেন, “আমাদের সরকারের মেয়াদকাল পর্যন্ত নিশ্চয়ই।”
লোকজন বুঝে গেল, বাঁধের আয়ু খুব বেশি না।
ভাঙনপুরে এক স্কুলশিক্ষক ছিলেন— নাম অমল কাদামাটি। তিনি ছাত্রদের বলতেন, “বাচ্চারা, বইয়ে লেখা আছে— মানুষ প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। কিন্তু আমাদের দেশে মানুষ আগে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তারপর যদি বেঁচে থাকে, প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়ে।”
একদিন তাঁর এক ছাত্র জিজ্ঞেস করল, “স্যার, বাঁধ কী?”
তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “যেটা কাগজে সবচেয়ে শক্ত আর বাস্তবে সবচেয়ে দুর্বল।”
এদিকে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও মাঝে মাঝে ভাঙনপুরে আসত। তারা সভা করত, সেমিনার করত, “ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স” নিয়ে ইংরেজি বলত। গ্রামের লোকেরা কিছুই বুঝত না। শুধু দেখত, বড় বড় গাড়ি আসে, মিনারেল ওয়াটার খাওয়া হয়, তারপর সবাই চলে যায়।
একবার এক বিদেশি প্রতিনিধি রহিম গাঙচিলকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনারা সবচেয়ে বেশি কী চান?”
রহিম বললেন, “একটা শক্ত বাঁধ।”
অনুবাদক সেটা ইংরেজিতে অনুবাদ করল— “They need sustainable emotional infrastructure.”
তারপর সবাই হাততালি দিল।
ভাঙনপুরের মানুষ ধীরে ধীরে বুঝে গেল, তাদের দুর্ভোগও একটা পণ্য। কেউ তা দিয়ে রাজনীতি করে, কেউ এনজিও চালায়, কেউ টিআরপি বাড়ায়।
ঘূর্ণিঝড় এলেই টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান হতো— “উপকূলের কান্না।” সেখানে বিষণ্ন সুরে উপস্থাপক বলতেন, “দেখুন, মানুষ কত কষ্টে আছে!”
তারপর বিজ্ঞাপন বিরতিতে দেখানো হতো বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বিজ্ঞাপন— “নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা।”
এক বর্ষায় পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠল। বাঁধ ভেঙে এমনভাবে পানি ঢুকল যে পুরো ভাঙনপুর এক বিশাল লবণাক্ত হ্রদে পরিণত হলো। ধানক্ষেত সাদা হয়ে গেল। মাছ মরে ভেসে উঠল। শিশুরা ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলো।
তখন রাজধানী থেকে বিশেষজ্ঞ দল এল। তারা ড্রোন ওড়াল, ছবি তুলল, রিপোর্ট বানাল। রিপোর্টে লেখা হলো— “মানুষের দুর্ভোগের প্রধান কারণ অতিরিক্ত পানি।”
ভাঙনপুরের লোকজন অবাক হয়ে ভাবল, “এতদিন তো আমরা ভাবছিলাম, প্রধান কারণ বাঁধ নাই!”
এদিকে দুর্যোগমন্ত্রী রাজধানীতে সংবাদ সম্মেলন করলেন। তিনি বললেন, “সরকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে।”
ঠিক সেই সময় তাঁর পেছনের টেলিভিশনে দেখা যাচ্ছিল— মানুষ কোমরসমান পানিতে দাঁড়িয়ে ত্রাণের লাইনে।
কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত ঘটনা ঘটল পরের বছর।
রাজা ঘোষণা দিলেন— “ভাঙনপুরকে আমরা আধুনিক ভাসমান নগরী বানাব।”
সবাই হতবাক।
মন্ত্রী ব্যাখ্যা করলেন, “যেহেতু পানি ঠেকানো যাচ্ছে না, তাই মানুষকেই পানির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। এটা যুগান্তকারী চিন্তা।”
এরপর শুরু হলো “ভাসমান জীবন অভিযোজন প্রকল্প।” মানুষকে নৌকায় বসবাসের প্রশিক্ষণ দেওয়া হলো। স্কুলে শেখানো হলো— “বাড়ি ভেসে গেলে কীভাবে হাসিমুখে ছবি তুলতে হয়।”
রাজধানীর বুদ্ধিজীবীরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে গেলেন। তারা লিখলেন, “এটি উন্নয়নের নতুন দর্শন।”
শুধু রহিম গাঙচিল চুপ করে রইলেন।
এক রাতে তিনি নাতিকে নিয়ে ভাঙা বাঁধের পাশে বসেছিলেন। দূরে সমুদ্র গর্জন করছিল। নাতি জিজ্ঞেস করল, “দাদু, সমুদ্র কি আমাদের শত্রু?”
রহিম অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন, “না রে। সমুদ্র তো তার কাজই করছে। শত্রু হইল ওইসব মানুষ, যারা বাঁধের টাকায় শহরে দালান তোলে।”
নাতি আবার জিজ্ঞেস করল, “তাহলে আমরা বাঁচব কীভাবে?”
রহিম আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “যেদিন এই দেশের মানুষ ত্রাণের চেয়ে অধিকার চাইতে শিখবে, সেদিন হয়তো একটা সত্যিকারের বাঁধ উঠবে।”
পরের বছর রহিম গাঙচিল মারা গেলেন। জলোচ্ছ্বাসের রাতে তাঁর কবরও ভেসে গেল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, মৃত্যুর পর তিনি যেন আরও জীবিত হয়ে উঠলেন। ভাঙনপুরের দেয়ালে দেয়ালে কেউ একজন লিখে দিতে শুরু করল—
“আমরা ত্রাণ না, বাঁধ চাই।”
সরকার সেই লেখা মুছে ফেলল।
পরদিন আবার লেখা উঠল—
“আমরা করুণা না, নিরাপত্তা চাই।”
এবার পুলিশ পাহারা বসল।
কিন্তু সমুদ্রের বাতাসে কথাগুলো ছড়িয়ে পড়ল। স্কুলের শিশুরা খাতায় লিখতে লাগল। জেলেরা নৌকায় লিখল। নারীরা ভাঙা ঘরের দেয়ালে লিখল।
একদিন রাজধানী থেকে এক সাংবাদিক এলেন। তিনি ভাঙনপুর ঘুরে ফিরে গিয়ে লিখলেন— “উপকূলের মানুষ খুব সহনশীল।”
ভাঙনপুরের লোকেরা প্রতিবেদন পড়ে হেসেছিল। কারণ তারা জানত, সহনশীল না হলে তারা অনেক আগেই রাজধানীর দিকে বাঁশের ভেলা নিয়ে রওনা দিত।
শেষ পর্যন্ত পানিখেকো প্রজাতন্ত্রে একটি সত্যিকারের শক্ত বাঁধ হয়েছিল কি না, কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না।
তবে এতটুকু জানা যায়— এখনও যখন আকাশ কালো হয়, ভাঙনপুরের মানুষ প্রথমে আকাশ দেখে না; তারা বাঁধের দিকে তাকায়।
আর বাঁধ তখনও নীরবে কাঁপতে থাকে— ঠিক রাজনীতিকের বিবেকের মতো।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now