বিশেষ নোটিশঃ সুপ্রিয় গল্পেরঝুরিয়ান - আপনারা যে গল্প সাবমিট করবেন সেই গল্পের প্রথম লাইনে অবশ্যাই গল্পের আসল লেখকের নাম লেখা থাকতে হবে যেমন ~ লেখকের নামঃ আরিফ আজাদ , প্রথম লাইনে রাইটারের নাম না থাকলে গল্প পাবলিশ করা হবেনা
আপনাদের মতামত জানাতে আমাদের সাপোর্টে মেসেজ দিতে পারেন অথবা ফেসবুক পেজে মেসেজ দিতে পারেন , ধন্যবাদ
X
গল্প - " আমি হাসান "
.
সকাল ৯ টা। ঘুম ভেঙে গেল হটাৎ। আজকাল ঘুম ভেঙে গেলেও বিরক্ত লাগে। ঘুম ভাঙার কারণ খোজায় নেমে পড়লাম। কিছুই পেলাম না, চারিদিক নিরব। মাঝেমধ্যে অতিরিক্ত নিরবতায়ও ঘুম ভাঙতে পারে, অসম্ভব কিছু না।
.
নাস্তার সময় হয়ে গেছে। মেস থেকে কিছুটা দূরেই ছোটখাটো এক হোটেল আছে। মিসকল দিলেই নাস্তা দিয়ে যায়। মিসকল মেরে চুপচাপ শুয়ে রইলাম।
.
ভাবছি আজ কোন কাজ আছে কিনা। কিছুই মনে পড়ছে না। এর মানে আজ কাজ নেই। মিসকল দেয়ার চার মিনিটের মাথায় হোটেল বয় নাস্তা নিয়ে এলো।
.
এটাও বড় আশ্চর্যের বিষয়। মেস থেকে হোটেলে যেতে আমার সাত মিনিটের বেশি সময় লাগে। কিন্তু হোটেল বয় চার মিনিটেই চলে আসে। একবার দৌড়ে চার মিনিটে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, তাও পারিনি। এই ছেলে কিভাবে আসে কে জানে!
.
নাস্তা খেতে খেতে আমার পেপার পড়ার অভ্যাস। নতুন পেপার লাগে না। নাস্তা যেই পেপারে মুড়িয়ে আনে সেই পাতাটাই আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়ি। আজ পেপার নাই, কবিতার পাতা দিয়ে মুড়ানো।
.
কবিতা গুলোই পড়া শুরু করলাম।
.
" রঙিন করি মুখ।
কাঁদি-ভরা খেজুর গাছে
পাকা খেজুর দোলে
ছেলেমেয়ে, আয় ছুটে যাই
মামার দেশে চলে। "
.
এতটুকুই আছে, উপরের অংশটুকু ছেঁড়া। কবিতাটা পরিচিত। কার লেখা কবিতা তা মনে করতে চেষ্টা করছি। দরজা নক করার শব্দ শুনলাম। তাকিয়ে দেখি সিরাজ সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন।
.
বেটার অবস্থা ঢুলুঢুলু। এর আবার মদ খাওয়ার অভ্যাস আছে। দুই মাস ধরে আবার চাকরি নাই। মদ খেয়ে অফিসে যাওয়ার অপরাধেই চাকরি গেছে।
.
সিরাজ সাহেব দরজার ওপার থেকেই বললেন, " ভাই, আসতে পারি?? "
.
অনুমতি দেওয়ার আগেই ঘরে এসে প্রবেশ করলেন সিরাজ সাহেব। বিছানার সামনের চেয়ারে বসলেন। তারপর বললেন,
.
- আধঘণ্টা আগেও দরজায় নক করে গেছি। ঘুমাচ্ছিলেন।
.
এতক্ষণে ঘুম ভাঙার কারণটি ধরতে পারলাম। এই লোকের নকের শব্দে ঘুম ভেঙেছে। সিরাজ সাহেব আবার বললেন,
.
- ভাইজান, পানি খাবেন?
-- না।
.
পানি খাওয়া ধরেছে। কিন্তু এই লোকের পানি পানি না। এই লোক মদকে পানি বলে।
সিরাজ সাহেব আবারো বললেন,
.
- ইকটু খেয়ে দেখেন না, দেশী মাল।
-- আমি এইসব খাই না।
- আপনি না খেলেও আমি খাই। দেশীটা খাই। আমি দেশী লোক দেশী খাই। একটা দরকারে এসেছি আপনার কাছে।
-- বলুন কি দরকার।
.
- এই বোতলটা আপনাকে গিফট দিলাম।
.
আমি আতকে উঠে বললাম,
.
-- কোন দরকার নাই।
- দরকার নাই মানে! গিফটের জিনিস নিতে হয়।
-- ও আচ্ছা। খাটের তলে রেখে দেন।
.
সিরাজ সাহেব খাটের তলে পানির (দেশী) বোতলটি রেখে চলে যাচ্ছিলো, আমি ডাকলাম।
.
- ইকটু শুনে যান।
-- বলুন।
- আর কত ভাই? মদ খেয়ে চাকরি গেল...
-- চাকরি গেছে যাক। ওই বান্দির পুতদের আমি নিকুচি করি! করমু না ওদের চাকরি।
.
- তা বুঝলাম, কিন্তু গ্রামে আপনার বউ বাচ্চা আছে না? তাদের চলবে কিভাবে? খাবে কি?
-- রোজার মাস এসে যাচ্ছে, খাওয়া লাগবেনা বেশি। আপনি ভেবেছেন ওই বান্দির পুতদের আমি পায়ে ধরবো? অসম্ভব। আমার জমিদার বংশ, আমার নাম কিন্তু সিরাজ তালুকদার.....
.
সিরাজ ইচ্ছেমত বলে যেতেই লাগলো। দোষটা আমারই। এই লোককে ঘাঁটানো ঠিক হয়নি। মাতাল মানুষ পাগলের চেয়েও উম্মাদ।
.
(দুই)
.
আজ আর কাজকাম নেই। তাই চুপচাপ শুয়ে আছি। গেটটা আটকে শোয়া উচিত ছিলো। কারণ যেকোন সময় সিরাজ সাহেব আবারো চলে আসতে পারে।
.
আমার ভাবনা অমূলক ছিলো না। কিছুক্ষণ বাদেই সিরাজ সাহেব লাফ দিয়ে ঘরে ঢুকে পড়লেন, এইবার আর অনুমতির তোয়াক্কা করলেন না। দেখে মনে হচ্ছে তিন মাইল দৌড়ে এসেছেন, দারুণ হাপাচ্ছেন। হাপাতে হাপাতেই বললেন,
.
- ভাই পুলিশ, ভাই পুলিশ....
-- পুলিশ কেন?
- আমাকে ধরতে এসেছে। ভাই, পালাবো কিভাবে? মেস ঘেরাও করেছে।
.
আমি জানালা খুলে দিয়ে বললাম,
.
- এখান দিয়ে বের হয়ে যান। লাফ দিতে পারবেন না?
-- আপনার জানালায় শিক নাই দেখি!
- শিক থাকলে খাঁচা খাঁচা লাগে, তাই খুলে ফেলেছি। যান লাফ দিন।
.
সিরাজ সাহেব সত্যিই জানালা দিয়ে লাফ দিলেন। আমি ভেবেছিলাম আপত্তি করবে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে উচ্চতা তিন তলা হলেও এই লোক লাফ দিতো। আমি আবার শুয়ে পড়লাম।
.
(তিন)
.
ঘরের মধ্যে হুরমুরিয়ে তিনজন পুলিশ প্রবেশ করলো। আমি ঘুমের ভান করে পড়ে রইলাম। একজন হাতের লাঠি দিয়ে খোঁচা মারলো। আমি ঘুম ভাঙার ভান করে উঠে বসলাম। বললাম,
.
- আসসালামু আলাইকুম।
.
কেউ সালামের উত্তর দিলো না। তিনজন পুলিশই একবার তাকাচ্ছে আমার দিকে, আরেকবার খোলা জানালার দিকে। একজন বলল, (সম্ভবত সে লিডার)
.
- এই জানালা দিয়ে কি কেউ পালিয়ে গেছে?
-- জী।
.
পুলিশ তিনজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। আবারো বলল,
.
- আপনি তাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছেন?
-- জী।
- আপনি পালিয়ে যাননি কেন?
.
আমি কিছু বললাম না। মুচকি হাসলাম। পুলিশটি অন্যজনকে ইশারা দিলো ঘর সার্চ করতে। খাটের তলের বোতলটি পেয়ে গেল। পুলিশটি বোতল হাতে নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
.
- এই বোতলে কি আছে?
-- পানি।
- তাহলে এই বোতলে কেন?
-- এটা এই বোতলেই থাকে।
.
- তাহলে পানি বললেন কেন?
-- একে পানি বলেই ডাকে। আরেক নাম আছে, বাংলা।
- আপনি আমাদের সাথে থানায় চলুন।
.
আমি পুলিশের সাথে থানায় রওনা দিলাম। আজ কোন কাজ নেই, থানায় যাওয়া যেতে পারে।
.
(চার)
.
- তোমার নাম কি?
-- হাসান।
- পুরো নাম বলো...
-- মো হাসান।
.
- মো হাসান আবার কি?
-- মোহাম্মদ হাসান।
- কথা পেচানোর চেষ্টা করছো কেন? সোজাসুজি উত্তর দাও। তুমি কি মদ বিক্রেতা??
-- জী না স্যার।
.
- আমি যদি বলি তুমি মিথ্যে বলছো?
-- আমি যদি বলি আপনি মিথ্যে বলছেন?
.
ওসি সাহেব কিছুক্ষণ নিরবে তাকিয়ে রইলেন। তারপর আমাকে হাজতে পাঠিয়ে দিলেন।
.
হাজতে আমি একা নই। এক বালককেও দেখা যাচ্ছে। ভয়ে জড়সড়। ডাক দিলাম,
.
- এই এদিকে আয়।
.
বালকটি ধীরপায়ে হেটে হেটে আসলো।
আমি বললাম,
.
- ভয় পাচ্ছিস?
-- হ।
- তুই জেলে কিভাবে এলি?
-- চুরি করছি।
.
- আসলেই করেছিস? নাকি ফাঁসিয়ে দিয়েছে?
-- না, করছি চুরি।
- কেন চুরি করলি?
-- মালিকে ঠিকমতো খাইতে দিতো না। জিদ উঠলো জবর। টেকা নিয়া ভাগলাম।
.
- কত টাকা?
-- জানিনা। অনেক টাকা।
- ধরা পড়লি কিভাবে?
-- পত্থম গেলাম হোটেলে, পেট ভইরা খাইছি। হেয়ার পর আমার বস্তিতে গিয়া দেহি পুলিশ। তারা এহানে নিয়া আইলো।
- মেরেছে তোকে?
.
- এক পুলিশ দুইডা লাত্থি দিছে। তয় কঠিন মাইর দিবো ইকটু পরে। আমনেরেও দিবো।
-- ভয় লাগছে তোর?
- হ।
-- ভয় কাটানোর পদ্ধতি আছে। বুক ডাউন মার, ভয় কেটে যাবে।
.
- বুক ডাউন কেমনে মারে?
.
আমি বুক ডাউন মেরে দেখিয়ে দিলাম। আমার দেখাদেখি ছেলেটা বুকডাউন মারা শুরু করলো। আমি বললাম,
.
- কিছুক্ষণ বুকডাউন মারলেই নিজেকে মনে হবে সালমান খান। সালমান খানের সাথে কি পুলিশ পারে?
-- না ভাইজান।
.
ওসি সাহেব আমাকে ডেকে পাঠালেন।
.
(পাচঁ)
.
- তুমি কি শুরু করেছো??
-- কি করেছি স্যার?
- জেলের মধ্যে দেখলাম সুরুজের সাথে নানান কায়দাকানুন করছো।
-- এখানে বসে কিভাবে দেখলেন?
.
- ক্যামেরা আছে। আমি এখানে বসেও দেখতে পারি।
.
আসলেই তো। ওসি সাহেবের ডান দিকেই বিশাল টিভি। সেখানে অসংখ্য ছোট ছোট স্ক্রিন। থানার সামনে, বিশ্বরোডের, জেলের ভেতরের, সব জায়গাতেই কি হচ্ছে তা দেখা যাচ্ছে। সুরুজ এখনো বুকডাউন মেরে যাচ্ছে। ওসি সাহেব আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন।
.
- এদিকে তাকাও। এমন কায়দাকানুন এর মানে কি?
-- ওকে সাহস দিচ্ছিলাম, ভয় পাচ্ছিলো।
- তুমি ভয় পাচ্ছো না?
-- না।
.
- কেন?
-- কারণ আমি কোন অপরাধ করিনি।
- তোমাকে মদ বিক্রেতা হিসেবে ধরা হয়েছে।
-- প্রমাণ কি?
.
- তোমার সাথে মদের বোতল পাওয়া গেছে।
-- সেটার ভেতরে পানি।
- মানে?
-- আপনি যাচাই করে দেখুন।
.
ওসি সাহেব বোতলটি আনালেন। দেখা গেল বোতলে আসলেই পানি। ওসি সাহেব বিব্রত হয়ে পড়লেন। আমাকে বললেন,
.
- তুমি জানতে যে এর মধ্যে পানি?
-- না জানতাম না।
- তাহলে কিভাবে বললে?
-- অনুমান করে বলেছি। মদ সিরাজ সাহেবের জানের চেয়েও প্রিয়। সে আমাকে এক বোতল দিয়ে দিবে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
.
ওসি সাহেব চুপ করে রইলেন। কপাল কুঞ্চিত। সম্ভবত তিনি আমার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। আমি বললাম,
.
- স্যার, আমি কি চলে যাব?
.
ওসি সাহেব তবুও চুপ করে রইলেন। আমি আবার বললাম,
.
- স্যার...
-- বলো।
- আমি সুরুজকে সাথে নিয়ে যাবো।
-- কেন?
.
- ওকে রেখে আপনাদের কোন ফায়দা নেই। ওর কাছ থেকে জরিমানাও পাবেন না। নিয়ে যাই, কি বলেন??
-- আচ্ছা আচ্ছা।
.
(ছয়)
.
আমি আর সুরুজ থানা থেকে বেরুচ্ছি। সুরুজের ভয় কেটে গেছে। সে এখন হাসছে। হাসতে হাসতেই বলল,
.
- ভাইজান আপনের মেলা খেমতা!
-- তাই..
- হ ভাইজান, আমি আপনের সাথেই থাকমু।
-- আচ্ছা চল।
.
ব্যাপক ঘুম পাচ্ছে। বাসায় গিয়ে ঘুমাতে হবে।
.
লেখক - মুনীর আহমদ।
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করুন
গল্পটির বিষয়ে মন্তব্য করতে আপনার একাউন্টে প্রবেশ করুন ... ধন্যবাদ... Login Now